কবিতাপ্রেমীদের ঘুমঘোরে জাগিয়ে রাখা কবি জীবনানন্দ দাশ
বস্তুত জীবনানন্দ দাশের কবিতার জাদু, গভীরতা এবং নান্দনিকতাই তাঁকে ‘কবিদের কবি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর কবিতা শুধু পাঠের জন্য নয় বরং অনুভব এবং বিশ্লেণের জন্যও। তিনি এমন এক কবি, যিনি বাংলা কবিতাকে শুধু সমৃদ্ধ করেননি, বরং তাকে নিয়ে গেছেন এক নতুন মাত্রায়।
গতকাল ছিল কবি জীবনানন্দ দাশের প্রয়াণদিবস। বাংলা কবিতার ইতিহাসে জীবনানন্দ এমন এক কবি, যিনি শুধু কবিতার ভাষা বদলে দেননি, বদলে দিয়েছেন আমাদের দেখার চোখও। রবীন্দ্রনাথের বিপুল প্রভাবের মধ্যেও তিনি নির্মাণ করেছিলেন সম্পূর্ণ নিজস্ব এক কাব্যজগৎ। তাঁর শব্দ, চিত্রকল্প, উপমা এবং সময়চেতনা বাংলা কবিতাকে দিয়েছিল এক নতুন মাত্রা। মৃত্যুর এত বছর পরেও তাঁর কবিতা আমাদের বিস্মিত করে, নতুন করে ভাবায়। জীবনানন্দের এই স্বাতন্ত্র্য, তাঁর কবিসত্তার গভীরতা এবং পরবর্তী বাংলা কবিতায় তাঁর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়েই আমাদের বহুবার বলতে হয়েছে, বলতে হবে।
জীবনানন্দ দাশ-এর মৃত্যুর পর কবি অজিত দত্ত আনন্দবাজার পত্রিকায় লিখেছিলেন:
তাঁর কাব্যের জগৎ ছিল তাঁর একান্তই নিজস্ব। যে কাব্যলোক সাধারণ কাব্যপাঠকের পরিচিত তার সঙ্গে মেলাতে গেলে জীবনানন্দের কবিতা অদ্ভুত, দুর্বোধ্য ও সঙ্গতিহীন মনে হওয়া কিছু আশ্চর্য নয়। তাঁর মন যেন চলেছিল প্রচলিত ভাব ভাবনা ও চিন্তার পথ এড়িয়ে অন্য পথে, তাঁর উপমাগুলো যেন অন্যরকম, তাঁর ছবিগুলো যেন অন্যভাবে আঁকা। ... সেই হিসেবে তাঁকে কবিদের কবি বললে অন্যায় বলা হবে না।
কাব্যচর্চার প্রথমদিকে পূর্বসূরিদের অনুসরণ করার ঝোঁক দেখা গেলেও একপর্যায়ে জীবনানন্দ দাশ নিজের স্বতন্ত্র পথ খুঁজে পান। তিনি নানারকম বোধে আক্রান্ত কবিতা দিয়ে পাঠকদের আচ্ছন্ন করে রাখতেন। অম্বুজ বসু প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’-এ জীবনানন্দ বিষয়চেতনায় সে যুগের সাধারণ কবিতা চেতনার সংলগ্ন ছিলেন বলে লেখেন। পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রভাবে তাঁর কবিতায় পাশ্চাত্য প্রভাবও দৃষ্টিগোচর হয়। ‘ঝরা পালক’-এর কবিতা ছিল ভিন্ন মেজাজের, এখানে খুব কমই ‘জীবনানন্দ’কে স্বতন্ত্রভাবে খুঁজে পাওয়া যায়। এই বইকে তিনি তাই কবি খারিজই করে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ থেকে আমরা এক নতুন কবিকে পেলাম। এসব কবিতায় শব্দের যে-অর্থ নিহিত বা নিপতিত আছে তা বাংলা ভাষায় তখনো পর্যন্ত ছিল অচেনা।
কলকাতার ডিএম লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিত ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ উৎসর্গ করা হয়েছিল বুদ্ধদেব বসুকে। পরবর্তী সময়ে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ই বাংলা আধুনিক কবিতার এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় বদলের গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
বইটির ভূমিকায় কবি লেখেন:
আমার প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৩৪ সালে। কিন্তু সে বইখানা 'অনেকদিন হয় আমার নিজের চোখের আড়ালেও হারিয়ে গেছে। আমার মনে হয় সে তার প্রাপ্য মূল্যই পেয়েছে।
‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’তে জীবনানন্দ দাশ বাংলা কবিতার ভাষাকে এক নতুন অভিজ্ঞতার ভেতর নিয়ে গেছেন। এখানে তাঁর ভাষা একদিকে স্বপ্নময় ও চিত্রধর্মী, অন্যদিকে গভীরভাবে অন্তর্মুখী। প্রচলিত অলংকারময় কাব্যভাষা থেকে সরে এসে ভাঙা বাক্য, অসমাপ্ত অনুভূতি, নীরবতা ও বিরামচিহ্নের মধ্য দিয়ে তিনি এখানে অর্থ নির্মাণ করেছেন।
পরবর্তীতে বাংলা কবিতার চারিত্রিক পরিবর্তন ঘটিয়ে জীবনানন্দ কবিতায় আধুনিকতার সূচনা করেছেন। যদিও কবির মৃত্যুর আগে তাঁর প্রতিভার মূল্যায়ন সেভাবে হয়নি, কেবল বুদ্ধদেব বসু এবং সঞ্জয় ভট্টাচার্য তাঁকে নিয়ে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। কবির মৃত্যুর পর ‘কবিতা’ পত্রিকা জীবনানন্দ স্মৃতি সংখ্যা প্রকাশ করে। বুদ্ধদেব বসু, সঞ্জয় ভট্টাচার্য ছাড়াও অমলেন্দু বসু, অজিত দত্ত, অশোক মিত্র, অরুণকুমার সরকার, নরেশ গুহ, অশোকবিজয় রাহা কবিকে নিয়ে সেখানে প্রবন্ধ রচনা করেন। এর বাইরে চিঠিপত্রের মাধ্যমে কবির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা দু-একজন পাঠকের কথাও উল্লেখ করতে হবে, যাদেরকে চিঠি লিখে জীবনানন্দ আনন্দ পেতেন।
জীবনানন্দের কবিতায় প্রকৃতি, গ্রামবাংলা, সময় এবং মানুষের অস্তিত্বের গভীর প্রশ্নগুলো অনন্যভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। যে ভাষা, ছন্দ এবং চিত্রকল্প তিনি ব্যবহার করেছেন তাঁর আগে বাংলা কবিতায় এর অস্তিত্ব ছিল না। এভাবে তিনি বাংলা কবিতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর কণ্ঠ ছিল নিচুু। ধ্যান এবং নিমগ্নতাকে জীবনানন্দ দাশ নিছক সাহিত্যচর্চার উপাদান বিবেচনা করেননি, তাঁর জীবনচর্যার মধ্যে বিষয়গুলো ঢুকে পড়েছিল।
‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র একটি কবিতা, ‘সারা দিন মিছে কেটে গেল, সারা রাত বড্ড খারাপ, নিরাশায় ব্যর্থতায় কাটবে, জীবন দিনরাত দিনগতপাপ’।
ফ্রয়েডীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর কবিতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর কাব্যজগৎ গভীর অবদমন, নিঃসঙ্গতা ও মৃত্যুচেতনার ভেতর নির্মিত। জীবনানন্দের কবিতায় বারবার মৃত্যু এক আকর্ষণীয়, প্রায় মায়াময় উপস্থিতি নিয়ে ফিরে আসে; মৃত্যু তাঁর কাছে কেবল সমাপ্তি নয়, বরং ক্লান্ত অস্তিত্ব থেকে মুক্তির এক নীরব আশ্রয়। একই সঙ্গে তাঁর প্রেমও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপূর্ণ ও অবদমিত। বাস্তব জীবনের ব্যর্থ সম্পর্ক, অপ্রকাশিত আকাঙ্ক্ষা এবং মানসিক দূরত্ব তাঁর কবিতার ভাষাকে করেছে বিষণ্ন ও স্বপ্নাচ্ছন্ন। ফলে তাঁর নারীচরিত্ররা কখনও সম্পূর্ণ বাস্তব নয়; তারা স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা ও হারিয়ে যাওয়া সময়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। বনলতা সেন, সুচেতনা কিংবা অন্যান্য নারীমূর্তির মধ্যে তিনি যেন খুঁজে ফিরেছেন হারানো প্রশান্তি ও অন্তর্গত অশ্রয়। তাঁর গভীর নিঃসঙ্গতাও এই কাব্যবিশ্ব নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ভিড়ের মধ্যেও বিচ্ছিন্ন এক মানুষের মানসিক ক্লান্তি জীবনানন্দের কবিতায় বারবার প্রতিফলিত হয়েছে। তাই তাঁর কবিতা শুধু প্রকৃতি বা সৌন্দর্যের কাব্য নয়; বরং মানুষের অবচেতন মন, দমিত আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি ও মৃত্যুবোধের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভাষ্য।
কবির অস্তিত্ববাদী স্তর ছিল সংশয়, নিরর্থকতার মানে খোঁজার আকুলতার মাঝে। উপনিবেশ, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, ও দেশভাগ--এইসব ইতিহাস তাঁর মনকে আঘাত করেছিল। রবীন্দ্রনাথের আশাবাদ থেকে আলাদা হয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক আধুনিক, দ্বিধাগ্রস্ত আত্মা।
জীবনানন্দের কবিতায় ব্যবহৃত যতিচিহ্ন শব্দের সঙ্গে মিশে যেন আলাদা ভাষার জন্ম দিয়েছে। কমা, ড্যাশ, লম্বা ড্যাশ, উর্দ্ধকমার ব্যবহার বাংলা ভাষায় আর কোনো কবি এত সচেতনভাবে ব্যবহার করেছেন এমনটা দেখা যায়নি। তিনি যেন স্পর্শ করতে জানতেন শব্দের শরীর, অনুভব করতে পারতেন শব্দের ভাষা। কখনো কখনো যতিচিহ্ন তাঁর কবিতাকে আলাদা করে তুলেছে। ‘দিন’ শব্দের পর ড্যাশ বা লম্বা ড্যাশ ব্যবহারের উদ্দেশ্য, কোনো ‘দিন’ স্বল্পায়ুর কোনো ‘দিন’ লম্বা দৈর্ঘের। এমনটা রাত, বা দূর, বা কালো ইত্যাদি শব্দের ক্ষেত্রেও তিনি ব্যবহার করেছেন। শব্দকে তিনি নিজস্ব ভাষারীতির অনুগামী করেছেন আর যতিচিহ্নকে করেছেন প্রবহমান। তাঁর কবিতা পড়লে বোঝা যায়, যতিচিহ্ন তাঁর কাছে কেবল ব্যাকরণের নিয়ম মানা নয়; বরং তা এক ধরনের নির্বাক সঙ্গীতের জন্ম দিয়েছে, যা তাঁর কবিতার ছন্দ, নীরবতা ও ভাবপ্রবাহকে গড়ে তোলে। কখনো কমার পর বিরতি, কখনো লম্বা ড্যাশের পর নীরবতা, এই ওঠানামা তাঁর কবিতায় স্বপ্ন ও বাস্তবের মিশ্র অনুভূতি তৈরি করে। যেমন ‘বনলতা সেন’-এর বিখ্যাত পঙক্তি, ‘সব পাখি ঘরে আসে-সব নদী-ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন।’ এখানে লম্বা ড্যাশ যতিচিহ্নটি দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি ও অসীম সময়ের অনুভূতিকে বহন করছে। এটি শুধু একটি যতিচিহ্ন নয়; বরং কালাতীত যাত্রার ছাপ।
স্বভাবগতভাবে কবি ছিলেন অনেকটা ভিন্নপ্রকৃতির। বুদ্ধদেব বসুর মতে:
আসলে জীবনানন্দর স্বভাবে একটি দুরতিক্রম্যদূরত্ব ছিল। যে অতিলৌকিক আবহাওয়া তাঁর কবিতার, তাই যেন মানুষটিকেও ঘিরে থাকত সব সময়--তার ব্যবধান অতিক্রম করতে ব্যক্তিগত জীবনে আমি পারিনি, সমসাময়িক অন্য কোনো সাহিত্যিকও না।
জীবনানন্দ দ্বারা প্রভাবিত কবির ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া কবির তালিকায় প্রথমেই নাম করা যাবে শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং বিনয় মজুমদারের নাম। কিন্তু জীবনানন্দ নিজে কার উত্তরসূরি?
১৯৫২ সালে একদিন সঞ্জয় ভট্টাচার্যের বাড়িতে ভূমেন্দ্র গুহ, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, জীবনানন্দ দাশ একসঙ্গে আলাপ করছিলেন। সঞ্জয় ভট্টাচার্য যেন কিছুটা উত্তেজিত, তাঁর প্রশ্ন, জীবনানন্দ কি স্বতন্ত্র কবিতা লিখছেন? জীবনানন্দের কবিতার সঙ্গে শেলি-কীটস-হুইটম্যান থেকে আরম্ভ করে ইয়েটস-রিলকে-এলিয়ট পেরিয়ে ডিলান টমাস পর্যন্ত কবিদের কবিতার আত্মীয়তা রয়েছে বলে তিনি অভিমত দেন। জীবনানন্দ দাশ স্বভাবসুলভ মৃদুস্বরে বলে ওঠেন, ‘একজন সচেতন কবিকে এতজন অগ্রজ বা সমসাময়িক কবি একই সঙ্গে প্রভাবান্বিত করতে পারেন?’ জীবনানন্দের উত্তর শুনে সঞ্জয় ভট্টাচার্য রেগে গেলেন। বললেন, ‘আপনি এঁদের বংশপরম্পরার।’
প্রভাব নয়, বংশপরম্পরা। আত্মীয়তার বিষয়টায় জীবনানন্দ আর গেলেন-ই না! তিনি অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন।
জীবনানন্দ দাশ পাশ্চাত্য কবিতা আর দেশীয়-সংস্কৃতিকে সার্থকভাবে বাংলা কবিতায় আত্মীকরণ করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই জীবনানন্দের মত সৃষ্টিশীল এবং প্রভাবশালী কবি কারো অনুকারক হতে পারেন না বরং পরবর্তীকালে অনেক কবি তাঁকে অনুসরণ করে কাব্যচর্চা করেছেন। তাঁর কবিতার দ্বারা প্রভাবিত কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন: আমার মনে হয় সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছেন আমাদের বয়সী কবিরা জীবনানন্দের দ্বারা। প্রভাবিত হয়েছেন, আবার প্রভাব কাটিয়েও উঠেছেন, তাঁর মতো লেখা তো সম্ভব নয়। কোথাও কোথাও তিনি থেকে গেছেন। আমার নিজের কথাই বলি-আমার পদ্যের মধ্যে অনেক সময়, জীবনানন্দ রয়ে গেছেন।
কবিদের কবি জীবনানন্দ কি জনপ্রিয় কবি ছিলেন? কথাটির সত্যতা নিরূপণে কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত জীবনানন্দের প্রিয় কবি গটফ্রীড বেন-এর একটি উক্তি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বেন বলেছিলেন, 'শ্রেষ্ঠ কবির কাছে সবশুদ্ধ পাঁচটি শুদ্ধ কবিতা আমরা আশা করব'। কথাটিকে আশ্রয় করে অলোকরঞ্জন বলেন, ‘তাহলে, তার নিরিখে অনায়াসেই বলা সম্ভব, অন্তত উত্তীর্ণ পঞ্চাশটি কবিতায় জীবনানন্দ তাঁর আরব্ধ শিল্পযোগ উৎকীর্ণ করে রেখে গিয়েছেন। এই পঞ্চাশটি কবিতা, রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তাকে পার হয়েও, বাংলা-যাদের-মাতৃভাষা-তাদের হৃদয়ে চিরদিনের জন্য মুদ্রিত হয়ে গিয়েছে, এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, যাঁকে 'নির্জনতম কবি' বলে গণ্য করা হয়েছিল, তিনিই আসলে বাংলাভাষার জনপ্রিয়তম কবি।’
জীবনানন্দ চিঠি লিখতেন। তাঁর পাঠানো চিঠি এবং পোস্ট না করা চিঠির কিছু খসড়া পরে উদ্ধার করা হয়। একবার একটি খসড়া চিঠিতে তিনি হুমায়ুন কবিরকে, যিনি সেসময় ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী আবুল কালাম আজাদের সচিব ছিলেন, লিখেছিলেন:
আমি বিশিষ্ট বাঙালিদের মধ্যে পড়ি না; আমার বিশ্বাস জীবিত মহত্তর বাঙালিদের প্রশ্রয় পাওয়ার মতনও কেউ নই আমি। কিন্তু আমি সেই মানুষ, যে প্রচুর প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রতিটি দ্রব্যকে সোনা বানিয়ে তুলতে চায় অথবা মহৎ কিছুু যা শেষ বিচারে কোনও একটা জিনিসের-মতন-জিনিস কিন্তু ভাগ্য এমনই যে তার খাদ্য জুটছে না। কিন্তু আশা করি, ভবিষ্যতে খাঁটি মূল্যের যথার্থ ও উপযুক্ত বিচার হবে; আমার ভয় হয়, সেই ভালো দিন দেখতে আমি বেঁচে থাকব না।
তিনি যা আশংকা করেছেন তা-ই। জীবদ্দশায় নিজের সাফল্যের তেমন কিছুই দেখে যেতে পারেননি তিনি। কবির মৃত্যুর এক বছর পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম. এ ক্লাসে তাঁর রচনাসমূহ পাঠ্যসূচির বিষয় হয়, কিন্তু তার আগেই যাদবপুর এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সেসব পাঠসূচিতে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে।
জীবনানন্দের কবিতা একাধিক আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করা যায়। কবিতাগুলোর প্রতীক, রূপক, এবং চিত্রকল্প এতটাই গভীর এবং অর্থবহ যে তা সাধারণ পাঠকের পাশাপাশি কবি ও সাহিত্যবোদ্ধাদের কাছেও বেশি আবেদনমূলক। তাঁর কবিতায় রয়েছে সুর। বুদ্ধদেব বসুর মতে এটাই জীবনানন্দের কবিতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। ‘সে কেন জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়’, বুদ্ধদেব বসু বলেন, ‘তাঁর কবিতা নিয়ে বসলেই তাঁর এই লাইনটি মনে পড়ে। একটি সুর জলের মতো হাওয়ার মতো ঘুরে ঘুরে অনেক দূর থেকে কানে এসে লাগছে।’
বস্তুত জীবনানন্দ দাশের কবিতার জাদু, গভীরতা এবং নান্দনিকতাই তাঁকে ‘কবিদের কবি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর কবিতা শুধু পাঠের জন্য নয় বরং অনুভব এবং বিশ্লেণের জন্যও। তিনি এমন এক কবি, যিনি বাংলা কবিতাকে শুধু সমৃদ্ধ করেননি, বরং তাকে নিয়ে গেছেন এক নতুন মাত্রায়। এজন্যই তিনি আজও কবি ও বোদ্ধাদের কাছে প্রাসঙ্গিক। এখনো বাংলা কবিতা নিয়ে নিরলস চর্চায় রত নবীন কবিরা জীবনানন্দকে নিয়ে মেতে আছেন। এখনো নতুন কোনো কবি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করার আগে এই অগ্রজ কবির কবিতার বই উলটে পালটে দেখেন। তাই তাঁকে কবিদের কবি বলা মনে হয় অত্যুক্তি হয়নি।
ট্রাম দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হয়ে কবির মৃত্যু (২২ অক্টোবর ১৯৫৪) হয়েছিল। যেন পথভুলে ধূসর এই পৃথিবীতে এসেছিলেন তিনি। অন্যমনে, কেমন এক হেলাফেলায় যাপন করেছেন জীবন, তারপর প্রবল এক অন্যমনস্কতার ঘোরে কলকাতার রাস্তায় ট্রামের চাকার নিচে সমাপ্ত হয়েছে তার জীবনচক্র। তাঁর সময়ের বাঙালি তাঁকে চেনেনি, অনুতাপ থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টায় উত্তরকালের বাঙালি এবং যেখানে যত কবিতাপ্রেমী আছেন তাঁরা চেনার চেষ্টা করছেন জীবনানন্দ দাশ নামের ধোঁয়াশাটিকে। কুসুমকুমারী দাশের অভিমানী সন্তানের তাতে অবশ্য কিছু আর যায় আসে না। হেমন্তের ঝড়ে ঝরে যাবার আগে অনন্তকালের গায়ে অমোঘ চিহ্ন এঁকে দিয়ে গেছেন তিনি। অমোচনীয় সে চিহ্ন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কবিতাপ্রেমীদের ঘুমঘোরে জাগিয়ে রাখবে।
