কালীকৃষ্ণ গুহ-র কবিসত্তার স্বাতন্ত্র্য
কালীকৃষ্ণ গুহ-র কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এ-কথাটা বলতেই হয় যে, তাঁর কবিতা আমাদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার কবিতা, জীবনযাপনের আনন্দ-বেদনা-ব্যর্থতা-হতাশা-ইচ্ছে পূরণের কবিতা। কবিতার বক্তব্যে কোনো জড়তা নেই, অস্পষ্টতা নেই, জোর-জবরদস্তির ব্যাপার নেই।
কালীকৃষ্ণ গুহ-র কবিতার সঙ্গে পরিচয় কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন ছোট পত্রিকার সূত্রে। তারপর একসময় হাতে পাই তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (২০০৪)। এই বইটা পড়তে গিয়েই ওঁর কবিতার আদলটা বুঝে নিতে খানিকটা সুবিধা হয়েছিলো। এরপর তাঁর লেখালেখি নিয়ে আগ্রহটা দিন-দিন বাড়তেই থাকে। আর সে-কারণেই সম্ভবত একে-একে হাতে এসে পৌঁছোতে থাকে ওঁর কবিতার বইগুলো। যার মধ্যে এই কবির কবিতাসংগ্রহের দুটো খণ্ডের কথা বলতেই হয়। কবিতার পাশাপাশি কালীকৃষ্ণ গুহ-র কবিতা-বিষয়ক গদ্যগ্রন্থগুলোরও একটা আবেদন রয়েছে। নিজের বিষয়ে খুবই কম কথাবার্তা বলেন এই কবি, তাঁর কবিতার মতো এখানেও তিনি মিতকথনের সূত্র প্রয়োগ করে থাকেন। কবির স্মৃতিচিহ্নিত ব্যক্তিগত গদ্য ‘গতজন্মের কথা’-র শেষে এসে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘ঠিক হয় আমাকে কলকাতায় আসতে হবে। আমার কোনো মতামত নেই। এই জীবনে ফেল-করা ছাত্র হিসেবে অনেক গ্লানি বেড়ে গেছে আমার। আমি চাই শুধুই দূরে চলে যেতে।’ কাদের কাছ থেকে দূরে, কতোটা দূরে?-তারই জবাব দিতে গিয়ে যেন তিনি আত্মমগ্নতায় আচ্ছন্ন হয়ে বলেন, ‘মার কাছ থেকে, ভাইবোন-ঠাকুরদা-বড়োমার কাছ থেকে, বাবার স্মৃতি থেকে, ছাইবেড়িয়া গ্রামের নক্ষত্রখচিত অন্ধকার রাত্রিগুলির কাছ থেকে দূরে চলে যেতে।’ দূরে চলে যেতে চাচ্ছেন, কিন্তু যাবেনই-বা কোথায়? কালীকৃষ্ণের ভাষায় সেটা হচ্ছে, ‘যে-শহরের কিছু গল্প শুনে বিস্ময়াবিষ্ট হয়েছি, যেখানে কেউ আমাকে চেনে না, সেখানেই চলে যাব।’ এরপরই তিনি বলেছেন, ‘আমার পালানো দরকার। সেই বাঁশিঅলা জাদুকরের সঙ্গে পালাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে ফিরেও তাকায়নি আমার দিকে। তাহলে পালানোর সুযোগ এল এবার।’ তারপর ১৯৫৭ সালের এপ্রিলের একটা দিনে তাঁর ‘নওয়াঠাকুমার সঙ্গে খালিপায়ে লজ্জায় মাথা নিচু করে কলকাতায় চলে এলাম। যা-কিছু বিদায় দিয়ে এলাম তার মধ্যে পড়ে রইল আমার শতচ্ছিন্ন বাল্যকাল’ ( কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০১৪ : ২২)। খানিকটা হয়তো বুঝতে পারা যায়, এই কবির পথ-পরিক্রমা শুরুটা হয়েছিলো ঠিক এইভাবেই।
২.
কালীকৃষ্ণ গুহ-র কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এ-কথাটা বলতেই হয় যে, তাঁর কবিতা আমাদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার কবিতা, জীবনযাপনের আনন্দ-বেদনা-ব্যর্থতা-হতাশা-ইচ্ছে পূরণের কবিতা। কবিতার বক্তব্যে কোনো জড়তা নেই, অস্পষ্টতা নেই, জোর-জবরদস্তির ব্যাপার নেই। তাই বলে এইটাও বলা যাবে না যে কালীকৃষ্ণ গুহ-র কবিতা একেবারেই বক্তব্য-প্রধান কবিতা। বরং সেটি তার উল্টো। যাকে বলে কবিতার শিল্পিত রহস্য, সেটি তাঁর কবিতায় পুরোপুরি আছে। কালীকৃষ্ণের এইসব কবিতা ব্যক্তি-মানুষের সামগ্রিক চৈতন্যের কবিতা, আলো-অন্ধকারের কবিতা, তার কবিতা মানুষের চেতনালোকের একধরনের অন্তর্দীপ্তির কবিতা। এই কবিতা কতোটা আধুনিক, কতোটা না-আধুনিক-সেই প্রশ্নটাই যেন অবান্তর মনে হয়। তাঁর ‘অক্ষয়বটের দেশ পার হই’ কাব্যের ভাষালিপি সংস্করণের চতুর্থ মলাটে সম্পাদক অরুণাভ সরকার বলেছেন, ‘কালীকৃষ্ণ গুহ-র প্রায় ষাট বছরের কবিতা-যাত্রা-পথ লক্ষ্য করলে তাঁর কবিতার মেজাজ স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। মূল কথা-প্রশান্তি। অত্যন্ত বিষণ্ন এমনকী যন্ত্রণাকাতর কাব্য-অভিজ্ঞতাও তিনি প্রকাশ করেছেন শান্ত এবং নিরাসক্তভাবে’ (কালীকৃষ্ণ গুহ : জানুয়ারি ২০২৬)। কালীকৃষ্ণ গুহর যে-কবিতাগুলো আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের মতন স্বাভাবিক বলে মনে হয়, তার আধুনিকতার উৎসের খোঁজ করাটাও কখনো-কখনো নিতান্ত অবান্তর মনে হয়। কারণ কালীকৃষ্ণের কবিতাগুলো এক পূর্ণ সত্তার কবিতা; বাংলার একটা শান্ত নদীর প্রবাহের মতো তাদের স্বাভাবিক গতি, যে-নদীর উৎস যেন আমাদের অনেক দিনের চেনা। কিন্তু তার আদ্যোপান্ত কেউ যদি জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে ঠিকঠাক গুছিয়ে বলাটা সমালোচকের পক্ষে আবার মুশকিল হয়ে পড়ে। তার প্রধান একটি কারণ হচ্ছে কালীকৃষ্ণ গুহ-র কবিতা বিশ্লেষণের চেয়ে পাঠককে স্পর্শ করে বেশি। আর সে-কারণেই শিবনারায়ণ রায়ের মতো মননশীল ব্যক্তির চোখে তিনি হয়ে উঠেছেন একজন ‘সুবেদী কবি, সংবৃত ভাবুক, সাধিষ্ঠ পুরুষ’, যিনি কিনা গভীরের সন্ধানী’ ( শিবনারায়ণ রায়, ২০২২ : ২৯)। এই বুদ্ধিবাদী সাহিত্যরসিক খুব-যে-একটা বাড়িয়ে বলেননি, সেটি আমরা বুঝতে পারি, যখন কালীকৃষ্ণ গুহ-র কাছ থেকে শুনতে পাই যে তিনি বলেছেন, ‘চেষ্টা করেছি নিজের অনুভূত চিন্তা বা উপলব্ধির কাছে সত্য থাকতে। আর ভাষাও পেয়েছি সমকাল থেকে। তবে স্বীকার করতেই হবে, মাইকেল রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দ সমকালের ভাষা বা প্রচলিত কাব্যবোধ বিরাটভাবে অতিক্রম করতে পেরে যুগস্রষ্টার আসন নিয়েছিলেন।’ সেইসঙ্গে তিনি এটিও মেনে নিয়েছিলেন যে, ‘প্রত্যেক বড়ো কবিই যুগকে কিছুটা এগিয়ে দেন বা বলা যায়, যুগের অগ্রগতিতে অন্যের সঙ্গে মিলে একটা ভূমিকা পালন করেন’ (কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০২২ : ২০৫)। আমরা যদি বলি, কবি কালীকৃষ্ণ গুহ নিজেও বাংলা কবিতার অগ্রগতিতে খানিকটা হলেও ‘বড়ো ভূমিকা’ পালন করে চলেছেন, তাহলে বোধকরি অত্যুক্তি হবে না।
৩.
নিজের এবং সমসাময়িক কবিদের কাব্যযাত্রা প্রসঙ্গে তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র ভূমিকায় কালীকৃষ্ণ গুহ বলেছিলেন, ‘গোপন একটা ভয় নিয়ে আমাদের কবিতালেখা শুরু হয়েছিল চার দশক আগে। কবিতা যথেষ্ট ‘আধুনিক’ হচ্ছে কিনা এই প্রশ্ন থেকে--সময়ের এক শাস্ত্রপাঠ থেকে--ভয়।’ সেইসঙ্গে তিনি এ-ও জানিয়েছেন যে, ‘এই ভয় অতিক্রম করতে গিয়ে বুঝেছি বাংলাকবিতায় আমাদের প্রথম পূর্বসূরি, কাহ্নপাদ, এক প্রান্তিক জীবনসাধক, আমাদের সঙ্গে রয়েছেন আজও। রয়েছেন চণ্ডীদাসসহ বৈষ্ণব পদকর্তারা, কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম রামপ্রসাদ লালন ফকির মধুসূদন সার্বভৌম রবীন্দ্রনাথ জীবনানন্দ। অবশ্যই আরও অনেকে আছেন, সংখ্যাতীত, উজ্জ্বল’ (কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০০৪ : ভূমিকা)। আমরা কবির এই ইশারা থেকে বুঝতে পারি যে, আধুনিকতাকে বাংলা সাহিত্যের নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পরম্পরা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে রাজি ছিলেন না, কালীকৃষ্ণ গুহ। আধুনিকতা তাঁর কাছে কোনো খণ্ডিত ব্যাপার নয়, বরং সমন্বিত বোধের ব্যাপার। আধুনিকতা এই কবির কাছে আত্মশক্তির সঙ্গে নিজের অস্তিত্বের স্বাবলম্বন। সে-কারণেই তাঁকে বলতে দেখি, ‘বুঝেছি, আধুনিকতা বলে এমন কিছু নেই যা অস্তিত্বকে অতিক্রম করতে পারে। শুধু কবিতা আছে। পরম্পরা ও বিবর্তন আছে। ক্রমবিবর্তিত দৃষ্টিনিক্ষেপ ও লিখনভঙ্গিমা জ্ঞানের ক্রমজায়মান বিস্তার আছে। বিশ্বকবিতার উত্তরাধিকার আছে। অপার একটা মর্মলোক আছে। অব্যক্ত থেকে অব্যক্তে পৌঁছোনো আছে শেষ পর্যন্ত। আজও সময়ের এক নতুন শাস্ত্রপাঠ থেকে জিজ্ঞাসা করা হয় : কবিতা ‘উত্তরাধুনিক’ হচ্ছে তো? কিন্তু নতুন করে ভয় পাবার প্রশ্ন বা সময় আর নেই’ (কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০০৪ : ভূমিকা)। এইভাবেই কালীকৃষ্ণ গুহ আধুনিকতাকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন, যেখানে আধুনিকতার প্রশ্নের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে কবিতার শৈল্পিক সুষমা, যা কিনা তাঁর মতে একজন কবির ‘জ্ঞানের ক্রমজায়মান বিস্তার।’ এই আধুনিকতার সীমারেখাকে তিনি দেশীয় ঐতিহ্যের চেতনা থেকে বিশ্বকবিতার পরিমণ্ডল পর্যন্ত এক দীর্ঘ পথরেখায় সামনের দিকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন। কবির কাব্যচেতনার মর্মলোকে সেই সামর্থ্যটুকু ছিলো। একজন আধুনিক কবি হিসেবে এখানেই কালীকৃষ্ণ গুহর স্বাতন্ত্র্য। স্বাতন্ত্র্যের সেই গাঢ়-চিহ্ন তাঁর কবিজীবনের একেবারে প্রথম পর্যায় থেকেই আমরা দেখতে পাই-‘রক্তাক্ত বেদীর পাশে/ ফুল/ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।/ফুল/ দুহাত দিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছিলে/মৃত বন্ধুর চারপাশে/ জ্যোৎস্নায়।/ ছায়ার ভিতর থেকে/হাত/ কেঁপে উঠেছিল। জ্যোৎস্নায়/ ফুলগুলি কেঁপে উঠেছিল। বন্ধু রক্তাক্ত বেদীর পাশে কাঁপে চিরদিন।’ (“রক্তাক্ত বেদীর পাশে”)। এমন-সব কবিতা লেখা হচ্ছে ১৯৬৫-৬৬-৬৭ সাল জুড়ে, যেখানে কবিতার আধুনিকতা বা অনাধুনিকতার প্রশ্নটা ধীরে-ধীরে গৌণ হয়ে যায়। কালীকৃষ্ণ গুহ-র পরবর্তী সময়ের কবিতাগুলোতেও আমরা সেই আধুনিকতার ক্রমজায়মান প্রসারণ নানাভাবে দেখতে পাই। ১৯৮৯-১৯৯৫-এর কালসীমায় রচিত একটি কবিতায় তিনি বলছেন-
‘কিছু লিখি-
যা-কিছু লিখি না সব অনন্তযাত্রার দিকে প্রবাহিত থাকে
সেইখানে দাহ, অগ্নি, অবলুপ্ত গান
‘স্থির থাকো’ আমি তাকে বলি
‘স্থির থাকো’ সে বলে আমাকে
আমরা দুজন, একা নক্ষত্রলোকের দিকে স্তব্ধ মাথা তুলি
মায়ের মৃত্যুর পর ডিসেম্বর মাস, আলো আসে...’ (প্রবাহ/ অক্ষয়বটের দেশ পার হই)
এই যে কবিতায় একটানা সুরের প্রবাহ, সেটি দেখতে পেয়েই বোধকরি, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, কালীকৃষ্ণের কবিতায় শুনতে পেয়েছিলেন ‘মগ্নচৈতন্যের মন্দিরায় বেজে-ওঠা এক অপূর্ব ঝঙ্কার, একটা স্পন্দন।’ আর এরই প্রতিক্রিয়ায় অলোকরঞ্জন এইভাবে বলেছিলেন, ‘অনেকবার ভেবেছি, সেই স্পন্দনের কারণটা আসলে কী? অচিরেই যখন তাঁর কণ্ঠে শুনতে পাই ‘ভাষার ভিতরে তাকে আনো, লুপ্ত শব্দ আনো, স্তব্ধতার ভাষা’, উচ্চকিত হয়ে উঠি আমরা, আঁচ করতে পারি, তিনি ভাষার চেয়েও মহত্তর একটি গীতিদ্যোতনার কথা বলতে চান’। শুধু এইটুকুই নয়, অলোকরঞ্জন আরো বলেছিলেন, ‘আমার বিনীত বিবেচনায় এই সংগীতসত্তাই কালীকৃষ্ণের সাম্প্রত কবিতার সারসত্য ও প্রাণপৈতি। আনুমানিক নিশ্চিতি নিয়েই বলতে পারি, তাঁর যে-কোনো স্বগত অথবা উন্মুক্ত বাণীর বেদনা আজ এই নিভৃত প্রণোদনার মুখাপেক্ষী হয়ে উঠেছে। তিনি যখন রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরীর সঙ্গে সংলাপরত হয়ে গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠেন, ‘কোথায় ঘর/ আরশিনগর’ আমরা অনায়াসেই ধরে নিতে পারি তাঁর সেই ধরতাই লালন ফকিরের একতারা থেকে উজ্জিত হয়ে রমেন্দ্রকুমারের চর্যাপদ ছুঁয়ে বাংলা কবিতার ঐতিহ্যের দিকে আমাদের মনস্ক করে তুলতে চাইছে’ (অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, ২০২২ : ২৭)। আর সে-কারণেই কালীকৃষ্ণ গুহ সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, একজন ‘নিরভিরাম, সাংসিদ্ধিক, সহৃদয়, সুবেদী কবি এবং ভাবুক’ (অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, ২০২২ : ৩২)। কালীকৃষ্ণ নিজেও মনে করেন, কবিতার নির্মাণের জন্য যেসব উপাদান আমাদের অনুভূতিকে সমৃদ্ধতর করে, সেসব খুবই জরুরি। তাঁর মতে, ‘যা-কিছু আমাদের অনুভূতিলোককে সমৃদ্ধ করে তার মধ্যে সাহিত্য সংগীত ছবি চলচ্চিত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ (কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০১৪ : ২৬৬-২৬৭)।
কালীকৃষ্ণ গুহর কাব্যচেতনার কথা বলতে গিয়ে চিত্রকর রবীন মণ্ডল জানিয়েছিলেন, ‘তার শিল্পকলার প্রতি ভালোবাসা আমাদের কাছে আনন্দের।... শিল্পকলার মতো সংগীতেও তার উৎসাহ আমাদের মুগ্ধ করে, উদ্দীপিত করে। তার মানসিকতায় ছবি, গান, কবিতার যে অনায়াস বিচরণ, যা আমাদের মানসিকতাকেও আলোকিত করে, দর্শনায়িত করে’ (রবীন মণ্ডল, ২০২২ : ৩৬)। আবার অন্যদিকে কবি-প্রাবন্ধিক-অনুবাদক হেমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ‘কালীকৃষ্ণ গুহের কবিতায় বিশেষ উল্লম্ফন লক্ষ করা যাবে না। স্বরক্ষেপণ বা আঙ্গিক-নির্মাণে তিনি কখনই ঘন-ঘন বৈচিত্র্যপ্রয়াসী হয়ে ওঠার চেষ্টা করেন না। তাঁর কবিতায় স্বনিত হয়ে ওঠে এক ভ্রাম্যমাণ পথিকের নিঃসঙ্গ উচ্চারণ--সরলতাই যার ভূষণ। এক দার্ঢ্য সরলতা--যা কখনই তরলতায় পর্যবসিত হয় না। সরল বিশ্বাসের মতোই সরল অবিশ্বাসও তাঁর কবিতায় ব্যাপ্ত হয়ে থাকে অজটিল, অকঠিন বাক্যবিন্যাসে।’ ( হেমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, ২০২২ : ৯৫) এসবের পাশাপাশি এই সমালোচক আরো বলেছিলেন, ‘কালীকৃষ্ণ গুহের কবিতায় সুরের প্রসঙ্গ আছে, আছে ধ্বনির প্ররোচনা। যে-মিলন রচনা করেছে উৎসব। আর সেই উৎসব যে ‘নৈঃশব্দ্যশাসিত’- সেটি উল্লেখ করতেও তিনি ভোলেননি। সে-কারণেই তিনি কবি কালীকৃষ্ণ গুহ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘এই নীরবতার বাঁশির সঙ্গে, এই নীরবতার উৎসবের সঙ্গে যিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন-তাঁকে দেখা যায় না, তাঁর অন্ধকারটুকু কেবল উপলব্ধি করা যায়। অর্থাৎ, সেই নেই-কে, সেই শূন্যতাকে সমগ্র সত্তায় অনুভব করা। কল্পনামনীষার বিকিরণে এক সম্পূর্ণতায় পৌঁছনো’ ( হেমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, ২০২২ : ৯৭)। সত্তার নির্মাণের প্রশ্নে মানুষের নিজস্ব প্ররোচনাকে কবি রিলকে কী অসাধারণভাবেই-না মৌমাছিদের মধু-সংগ্রহের সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, “As the bees bring in the honey, so do we fetch the sweetest out of everything and build Him. With the trival even, with the insignificant (if it but happens out of love) we make a start, with work and with rest after it, with a silence or with a small solitary joy, with everything that we do alone without suporters and participants.” (Rainer Maria Rilke, 1993 : 50)। আর সেইসঙ্গে সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসে আনত কবি, মানুষের গভীর ভালোবাসা যা একাকীত্বের নীরবতা ও আনন্দের উৎসারণ হিসেবেই দেখতে চেয়েছিলেন। এই প্রক্রিয়াটির সঙ্গে কালীকৃষ্ণের কবি-মানসের অদ্ভুত একটি সাদৃশ্য দেখতে পাই, যদিও ঈশ্বরের প্রশ্নে আমাদের এই কবি রীতিমতো অবিশ্বাসী। তারপরও তিনি বিষয়টিকে দেখেছেন এইভাবে। তাঁর ভাষায়, ‘আমার কাছে ঈশ্বরের কোনো অস্তিত্ব নেই। মানুষ ঈশ্বর সৃষ্টি করে নিয়েছে বহু রহস্যের উত্তর পাবার জন্য, দুঃখের দিনে সান্ত্বনা পাবার জন্য এবং একটি অন্তহীন বিমূর্ততার মধ্যে নিজেকে মিশিয়ে রাখার জন্য। এতে অবশ্যই গভীর লাভ হয়েছে তার। ঈশ্বরবিরহ থেকে তার হাতে জন্ম নিয়েছে আশ্চর্য সব সাহিত্যকীর্তি সংগীত ও শিল্পকলা।’ আর সে-কারণেই কালীকৃষ্ণ গুহ বলতে চেয়েছেন, ‘আমি ব্যাপারটা বুঝতে চেয়েছি এই সবকিছু একসঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে যেহেতু, অন্যথায়, বোঝার কোনো সমগ্রতা তৈরি হয় না’ ( কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০২২ : ২০৬)। আর এইভাবেই পশ্চিমের রিলকের সঙ্গে পুবের কালীকৃষ্ণ গুহ-র একটি আন্তরিক ও অন্তরতম যোগসূত্র সৃষ্টি হতে থাকে।
৪.
পরবর্তী সময়ে, আমরা খেয়াল করি যে, কালীকৃষ্ণ গুহ অকপটে স্বীকার করেছিলেন, ‘কবিতার আধুনিকতার প্রশ্নটা এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। তবে ষাট বছর আগে, আমরা যখন লিখতে এসেছিলাম, তখন এই প্রশ্নটা সর্বত্র সর্বক্ষণ দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে ফিরেছে।’ প্রশ্ন উঠবে তাহলে কবির অবলম্বন কী? কালীকৃষ্ণ গুহ জানিয়েছিলেন, ‘অজস্র স্মৃতির আলোড়ন ও নির্জ্ঞান নিয়ে অভিজ্ঞতার পুরাণ ও অন্তর্নিহিত ভাঙন নিয়ে ক্ষতবিক্ষত অবচেতন নিয়ে নারী ও শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর কম্পন নিয়ে নিরন্তর নাক্ষত্রিক উৎসবের কিছু অন্ধকার নিয়ে যে-জীবন কাটিয়ে এসেছি তা থেকে সঞ্চারিত কিছু বেদনাবোধ আর কিছু নীরবতার প্রতিবেদন।’ সেইসব প্রতিবেদন শৈল্পিক কাঠামো নিয়ে এইভাবে প্রসারিত হয়ে ওঠে :
ক.
‘দেবীর শরীরে বজ্র নেমে আসে, বিদ্যুৎ আসে, দেবী
ভাসানে যান।
চারদিক ঘনঘোর মুখরতা, করুণা, পূজার অসমাপ্ততা, কান্না-
এইসব অপ্রাকৃততার ভিতর দিয়ে দেবী
জলের ভিতরে, বজ্র এবং বিদ্যুতের ভিতরে নেমে যান।’ (“ভাসান”)
খ.
‘শুদ্ধ-কল্যাণ রাগে বেজেছে সেতার।
আমাদের পাপের ভিতর থেকে বেজে উঠেছে কি?
পুণ্যের ভিতর থেকে?
নাকি পাপপুণ্য অতিক্রম করে ওই সেতার বেজেছে?
আজ বৃষ্টির বিকেলে যার শুদ্ধ-কল্যাণ মুখ নিষ্পলক-দাঁড়িয়ে
দেখেছি
তাকে কোন সংকেত পাঠাব?’ (“শুদ্ধ কল্যাণ”)
গ.
‘রাত্রি জেগে যার চিঠি পড়ি, সে আজ অনেকদিন মৃত।
তার সময়ের সঙ্গে আমারও সময় কিছু মিশে আছে, ভাবি।
সমস্ত ক্লান্তির পরে এ বসন্তকাল এইসব আমাদের মুকুল
তবু কিছু মুগ্ধতা দিয়েছে।
এই নিয়ে সূর্য-প্রদক্ষিণ-
শালপাতা হাতে তুলে নিয়ে জন্ম পার হয়ে চলে যাওয়া।’ (“জন্ম”)
‘কবিতাসংগ্রহ-১’-এর “প্রস্তাবনা” অংশে কবি বলেছিলেন, ‘জীবন থেকে যা-কিছু হারিয়ে গেছে তার জন্য দুঃখ হত একসময়। এখন আনন্দ হয়। মনে হয় ভারমুক্ত হওয়া গেল কিছুটা। সমস্ত ঘটনাবলির পিছুটান, বিরহবোধের ধারা, শীতবসন্তের সুসময়, গ্রীষ্মদিনের উদ্যাপিত দাহ, পার-হয়ে-আসা কত মৃত্যু-যোগ-সব বহন করে যাওয়া সম্ভব নয়। এইসব কিছু-কিছু হারিয়ে ফেলতে ফেলতে বহনযোগ্য করে নিতে হয় এগিয়ে যাবার স্বার্থে। মৃত্যু পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়া। তবু শীর্ণ-হয়ে-আসা স্মৃতি সততই সুখের’ (কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০১৭ : প্রস্তাবনা)। তাঁর এইসব টুকরো-টুকরো গদ্য থেকে কালীকৃষ্ণ গুহ-র কাব্যিক অভিযাত্রা বুঝে নেওয়াটা খানিকটা অন্তত সহজ হয়ে ওঠে। আর সে-কারণেই হয়ত, তাঁর এই কথাগুলো তখন আমাদের কাছে আর একেবারেই অচেনা মনে হয় না। কালীকৃষ্ণ গুহ নিজের কবিতাকর্ম সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘স্মৃতি বেদনাবোধ আর অভিজ্ঞতার কিছু সারাৎসার নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম যা-কিছু কবিতা নয় তা কবিতা থেকে বাদ দিতে।’ এর পরক্ষণেই তিনি বেশ-খানিকটা নিচুস্বরে পাঠককে জানান, ‘ কিন্তু কী কবিতা আর কী কবিতা নয়, তা স্পষ্ট হল না। এখন, এই অস্পষ্টতায়, শুধু কাকের ডাক ভেসে আসে। ভাষাও অন্ধকার হয়ে এল’ (কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০১৭ : প্রস্তাবনা)। এই যে আলো-ছায়ায়, দৃঢ়তায়-সংশয়ের মধ্যে থাকা, না-থাকা--এটাই কালীকৃষ্ণ গুহ-র স্বভাবের ধরন, তাঁর কবিতাও সেই আলো-ছায়ারই বিচিত্র শিল্পিত রূপ। আমরা কবির ‘অক্ষয়বটের দেশ পার হই’ কাব্যের কথা আগেও একবার বলেছি, যেখানে কিনা তাঁর কবিতার সেই বিশিষ্টতা অনবদ্যভাবে প্রকাশিত হয়েছে- ‘যা-কিছু লিখি না সব অনন্তযাত্রার দিকে প্রবাহিত থাকে’। কবির সেই না-লেখা পঙ্ক্তির দুঃখের বেদনাধারাজল অনন্তযাত্রার প্রবহমানতার মতো আবহমান চেতনায় সম্প্রসারিত হয়ে ওঠে--সে-ও তো অনবদ্য একক কবিতা। আর সম্ভবত সেজন্যেই, কালীকৃষ্ণ মনে করেন, একজন কবির একক ‘কবিসত্তা বলে আলাদা কিছু আছে বলে মনে হয় না। বেঁচে-থাকার একটা ঐকান্তিক স্তর থেকে যে ভাবনাচিন্তার জন্ম হয় সেখান থেকেই লেখালেখির কাজ করতে হয়’ (কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০১৭ : প্রস্তাবনা)। আমরা এ-থেকে বুঝে নিতে পারি যে, কতোটা আন্তরিকতার সঙ্গে, কতোখানি নিবিষ্ট হয়ে কবি তাঁর কাব্যচর্চাকে নিজের প্রাণ-প্রবাহের পাশাপাশি বয়ে নিয়ে চলেছেন! কবিচেতনার জাগ্রত ও গভীর উপলব্ধি থেকে কালীকৃষ্ণ এইটিও বিশ্বাস করেন যে, ‘কবিতালেখা বস্তুত সংযোগ স্থাপন করা অন্য কোনো মনের সঙ্গে। সমস্ত রকম সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কেই এই কথা সত্য। আমাদের শাস্ত্রে বলেছে, সহৃদয়হৃদয়সংবাদী হওয়াতেই সৃষ্টির সার্থকতা। তবে লেখার সময় এটা মনে থাকে না, মনে রাখার কোনো দরকার হয় না, উচিতও না।’ তার মানে শাস্ত্রকথা, তা সে কাব্যশাস্ত্র কি লোকশাস্ত্র বা ধর্মশাস্ত্র-কোনোটাই কবিতা লেখার সময় কবির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না। তাঁর কাছে গুরুত্ব পায় স্মৃতির আলোড়ন-চৈতন্যের বিস্ময়বোধ, সমন্বিত জীবনবোধের জাগরণ-সবকিছু মিলেমিশে যেন আরেক অনন্তযাত্রার দিকে যাওয়া-
ক.
‘কথা শেষ হল না।
কথা আর শেষ হবে না কোনোদিন
যেমন কাজও শেষ হবে না।
আমাদের সত্যই কি কিছু বলার ছিল?
আজ সব কথা বাবা-মায়ের দিকে প্রবাহিত...’ (“আস্থায়ী অন্তরা”)
খ.
আমি জেগে থাকি-
সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পরও
আমি জেগে থাকি।
নক্ষত্রপতন হয়।
অথচ আমি ঘুমিয়ে থাকতে
চেয়েছিলাম।
চেয়েছিলাম,
গাছপালার মতো নিশ্চুপ একটা জীবন কাটাতে...’ (গাছপালার মতো)
কালীকৃষ্ণ গুহ-র কবিতা একটা সাদামাটা জীবনের মতোই ঝঞ্ঝাটহীন কবিতা। সেখানে ভারী কারুকাজ নেই, অলংকারের বাহুল্য নেই-সব মিলিয়ে সাধারণ একটি স্নিগ্ধ দৃশ্য; কিন্তু পুরো অবয়ব মিলে এক অসামান্য শৈল্পিক কথামালার মাত্রচেতনা, তার গভীর-সামগ্রিক উদ্যাপন পাঠককে আচ্ছন্ন করে রাখে। আবারও কবির নিজের এই বক্তব্যকেও আমরা কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারি না, যেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার সব লেখাই এখন দিশেহারা আর হতবুদ্ধি মানুষের চিন্তাপ্রবাহের প্রতিবেদন মাত্র।...এখন আর বিচলিত হবার বা দুঃখ পাবার বয়স নেই। এ একটা বড়ো মুক্তির জায়গা। আমি যে কিছুই নই-এই বোধেই তো মুক্তি’ (কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০১৪ : ২৫৫)।
৫.
অনেকগুলো কবিতাপর্ব, অনেকটা সময় পেরিয়ে এসে, আমরা বুঝতে পারি, আলোক সরকারের মতো কবি কেন বলেছিলেন, ‘কালীকৃষ্ণ গুহর কবিতা গাঢ়তম অভিনিবেশের কবিতা।’ তিনি সেইসঙ্গে আরও জানিয়েছিলেন, ‘তা সেই নিমগ্নতা যা এলিয়ট ওয়ার্ডসওয়ার্থের “প্রশান্তির মুহূর্তে আবেগের অনুস্মরণ”-এর সূত্রকে অস্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলেন।’ তাঁর কথাটাকে ব্যাখ্যা করে আলোক সরকার এ-ও বলেছেন, ‘বস্তুত এলিয়ট কবিতাকে এক চৈতন্যময় ক্রম-অগ্রসর বলে মনে করেছিলেন, যা সচেতন প্রজ্ঞানির্বাচন নয়। তার জন্ম কোনো অভিজ্ঞতার দ্বিতীয় স্মরণ থেকে তো নয়ই, তা নিমগ্নতার সঙ্গে-সঙ্গে পরিণত হয়, সৃষ্টি করে। একটা জল-হাওয়া, একটা সম্প্রসারিত প্রান্তর, হিরন্ময় উদ্ভাসন।’ আর এরপরই আলোক সরকার তাঁর প্রবন্ধে সেই ‘ক্রম-অগ্রসরতা’র কথা তোলেন, যা কালীকৃষ্ণ গুহ-র কবিতায় এক নিশ্চিত নিদর্শন হয়ে রয়েছে। আলোক সরকার সেই প্রসঙ্গ উত্থাপন করেই বলেছিলেন, ‘সেই ক্রম-অগ্রসরতা অবশ্যই তার পূর্বস্থিতির ওপর ভর করে দ্বিতীয় স্থিরতায় উত্তীর্ণ হয়, সবই অনুষঙ্গের প্রবহমানতা, চিন্তাক্রম, একটা তরঙ্গের নিশ্চয়তায় নতুন তরঙ্গে উলম্ফন, আলো-ছায়ার স্ববিরোধ, একটা উদ্দীপনা, একটা অতিনিশ্চয়ের পরবর্তী আর একটা অতিনিশ্চয়।’ আলোক সরকারের মতে, ‘তাকে সচেতন হতেই হয়, তবে সেই সচেতনতা তার অন্তঃকোলাহলের ব্যাকরণ মেনে চলে। সেই ব্যাকরণের প্রথম সূত্র অভিনিবেশ।’ আর এর পরপরই তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত টেনে বলেছিলেন, ‘কালীকৃষ্ণের কবিতা সেই অভিনিবেশের অভিযাত্রা’ (আলোক সরকার, ২০২২ : ২১)। সেই ‘অভিনিবেশের অভিযাত্রা’-র একটি অসাধারণ নমুনা এখানে পেশ করতেই হচ্ছে-
‘পুরাণও যে ইতিহাস-মহাকাব্য ইতিহাস-এই কথা
মনে রাখতে হয়
বিশেষত যখন বৃষ্টির শব্দ ভেসে আসে-
অমাবস্যা ঘোরতর করে যামিনীর তৃতীয় প্রহর
যখন জাগে না কেউ
জাগে শুধু- জেগে থাকে-একা সব স্বাবলম্বী
মৃত্যুপথগামী
এ-ও শরশয্যায় জাগা অথবা তা হেমলক-ভরা পাত্র
পাশে নিয়ে জাগা
বৃষ্টি নামে
চরাচর জুড়ে শান্তিপাঠ...’ (“মার্জনাভিক্ষার দিনে কথকতা”)
কবি আলোক সরকার তাঁর প্রবন্ধে কালীকৃষ্ণ গুহ-র কবিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছিলেন, ‘কালীকৃষ্ণর কবিতা অনেকসময় যে আত্মকথন, নিজের সঙ্গে সংলাপকে কেন্দ্র করে তা তার রচনাভঙ্গির সঙ্গে একাকার হয়েছে।’ এই কথাটি হয়তো সাধারণভাবে আরও বেশ কিছু কবি সম্পর্কে বলা যায়। কিন্তু এখানে আলোক সরকার যে-দিকটির প্রতি আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে চেয়েছিলেন, সেটি হচ্ছে, কালীকৃষ্ণের বেলায়, এই যে আত্মকথন ‘তা কখনো অতিরিক্ত হয়নি, যে অতিরিক্ত কেন্দ্রচ্যুতি ঘটায়, আনে অসমতল অবান্তর, তা শেষ পর্যন্ত এক সমাপ্তির সম্পূর্ণতা পায়’ (আলোক সরকার, ২০২২ : ২৩)। সেই সম্পূর্ণতার একটি নিদর্শনের উদাহরণ হিসেবে আমরা তাঁর “উৎসর্জন” কবিতাটি থেকে খানিকটা উদ্ধৃত করছি-
‘আশ্চর্য সব কবিতা লিখছ তোমরা।
বসন্তদিনের আলোর ভিতর থেকে জন্ম নিচ্ছে
তোমাদের কবিতা।
ইতিমধ্যে আমগাছে গুটি ধরেছে
কত রকমের পাখি ডাকছে
মেয়েরা নাচের মহড়া দিতে গিয়ে
তাদের যৌবন উৎসর্গ করে দিচ্ছে।
অন্তহীন এই উৎসর্জন।’
অন্যদিকে আবার, আলোক সরকার এ-ও বলেছিলেন যে, ‘নিরপেক্ষতা আর বিষাদ-যা কালীকৃষ্ণ গুহর কবিতার আস্তর পটভূমি, তার সামনে দাঁড়ানো এক বিষাদসিন্ধুর সামনে দাঁড়ানো। তরঙ্গদোল বিবর্জিত বিষাদসিন্ধু-কেবল একটা জেগে থাকা, সবক’টা স্নায়ু নিয়ে জেগে থাকা, তা আবেগের স্বতঃস্ফূর্তি নয়, তা নিমগ্নতার স্থিরলক্ষ্য অনুধ্যান’ ( আলোক সরকার, ২০২২ : ২৩)। কবির সেই নিমগ্নতার স্থিরলক্ষ্যের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারা যায়-
‘অসুখ ভালো হয়ে যাবে
এই বিশ্বাস নিয়ে দিন কাটে-
সপ্তাহ মাস বছর যুগ কেটে যায়।
মাঝে মাঝে মনে হয়
একটা অসুখ বহন করে যাওয়াই প্রকৃতপক্ষে
সচেতনভাবে বাঁচা।
বাঁচার সচেতনতার পাশে
সারাক্ষণ ধিকিধিকি আগুন জ্বলে
আর
মাঝে মাঝে একটা আলখাল্লা-পরা লোক এসে দাঁড়ায়।
তার কাজ বাচ্চাদের ভয় দেখিয়ে বেড়ানো...’ (“আলখাল্লা-পরা লোক”)
একেই কবি আলোক সরকার সমালোচকের একাগ্রতা নিয়ে বলেছিলেন, একজন কবির ‘যথার্থ জেগে থাকা, যা বস্তুকে, বস্তুধর্মকে সমগ্রতার ভিতর দেখে, কারো থেকে বিচ্ছিন্ন করে নয়, কারো সঙ্গে যুক্ত করে নয়।’ এই যে সমগ্রতা, যাকে বলা যায়, এক ‘ভেঙে পড়া সমগ্রতা’ (আলোক সরকার, ২০২২ : ২৩)। এ-প্রসঙ্গে কবির রাজনৈতিক মতাদর্শের কথা, তাঁর সমাজসচেতনতার কথা, নানাভাবেই, পাঠক-সমালোচকের দিক থেকে উঠে আসতে চায়। কিন্তু আত্মবিশ্বাসী কবি এ-সম্পর্কে তাঁর নিজের ধারণার কথা প্রকাশ করতে গিয়ে অকপটে জানিয়েছিলেন, ‘কবিকে বিশেষভাবে সমাজসচেতন হবার কোনো দরকার নেই। যার মন বিভিন্ন দিকে রাখা থাকে তার লেখায় বিভিন্ন প্রসঙ্গ আসতে পারে। তবে সমাজসচেতনতার তাড়নায় নিরন্তর লিখে-যাওয়া বা সর্বতোভাবে এড়িয়ে চলা- কোনোটাই কোনো আদর্শ নয়।’ তাহলে কবির নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জায়গাজমি কতোখানি জুড়ে থাকে? এর উত্তর দিতে গিয়ে কালীকৃষ্ণ বলেছেন, ‘সময়ের সঙ্গে একান্তভাবে জড়িত যে জীবন, সেই জীবনের কথা সময়ের তথা সমাজের কথা আসতেই পারে। আসেও। তবে এর মধ্যে দেখার একটা দূরত্ব বা উচ্চতা থাকা বাঞ্ছনীয়-তা যেন কিছুটা পথ অতিক্রম করতে পারে’ (কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০১৪ : ২৬৪)। এরই সূত্র ধরে আমরা বলতে পারি, এই বিশ্বাসটুকু সম্বল করেই এই ভঙ্গুর সময়ে কবির কাব্যপরিক্রমা চলছে, চলতে থাকে। এই পথের শেষ কোথায়, সেটি কবিরও জানা নেই। তিনি শুধু নিষ্পৃহভাবে এইটুকুই বলতে পারেন, ‘পথের শেষ কোথায়? এই প্রশ্নটি অনুচ্চারিত থাক।’
৬.
দীর্ঘ একটা সময় কাব্যচর্চার শেষে আমরা কালীকৃষ্ণ গুহ-র মুখে একজন আত্মতৃপ্ত নিজের মধ্যে নিমগ্ন এক কবির মুখচ্ছবি যেন দেখতে পাই। যিনি কোনা ধরনের প্রত্যাশা ছাড়াই নিয়ত নিজের কাজের মধ্যে নিজেকে সমর্পিত রেখেছেন। আর তাঁর কবিতা তো সেই নিমগ্নতারই এক শৈল্পিক বিস্তার। এসবের পাশাপাশি আমাদের পক্ষে এটা বলা অসঙ্গত হবে না যে কবি শুধু একা-একা অন্ধকার ঘরে বসে আত্মোপলব্ধির চেষ্টায় নিজের সময় কাটাননি। তাঁর জীবনে ‘জনতা ও নির্জনতা’-দুটোই মহাসত্যি হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। কালীকৃষ্ণ কলেছেন, ‘আমাদের এই সূর্যস্নাত জীবনে জনতা ও নির্জনতা দুইই সত্য। মানুষের সঙ্গে মানুষের মধ্যে বসবাস করেই নানা চিন্তা ও উপলব্ধিতে পৌঁছতে হয়।’ এইটা মেনে নিয়েও তিনি এ-কথা বলতে দ্বিধা করেননি, ‘নির্জনতার মধ্যে ঘটে সমস্ত উপলব্ধির বিশুদ্ধতর উচ্চারণ। তাই জনতা ও নির্জনতার মধ্যে এই ক্রম-আবর্তন।’ এরইসঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতাকে পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিতে জানিয়েছিলেন, ‘আমি শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি অতিক্রম করে এখনো কফিহাউসের ভিড় আর কোলাহলের মধ্যে গিয়ে বসি। অনেক সময় কারো সঙ্গ পাই না। কিন্তু তাতে কোনো অসুবিধা হয় না। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে মানুষের মুখ দেখি-সর্বহারা মানুষের ক্লান্তি ও আহারগ্রহণ দেখি।’ তার মানে শুধু নিজেকে নিয়েই কবির জগতের সীমানা নির্মিত নয়, এর বাইরের জগতেও কবি সাদর নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। আর সেই অনুভবের জগতে গিয়ে কবি আমাদের জানাতে সক্ষম হয়েছেন-‘এইসব গ্রীষ্মের দুপুর একজন স্থবিরের দিকে চলে যাবে,/ এইসব পাতা/ ওই যে হাত, ওই শতচ্ছিন্ন শেষ প্রাচ্য ঝুলি’ (“গ্রীষ্মের দুপুর”)। জীবনের এই পর্বে এসে ধীরে-ধীরে নিজের পরিক্রমণের পথ-রেখাটি সংক্ষিপ্ত করে যেন কবি গুটিয়ে নিয়ে আসতে চাইছেন। এসবের নেপথ্যের কারণ সম্পর্কে জানাতে গিয়ে তিনি বলেন যে, কবিতায় ‘ “তুমি” বা “সে” অনেকক্ষেত্রেই “আমি”র পরিবর্তে বসে। একটা আড়াল তৈরি করে না-নিয়ে অনেক সময় কিছু বলা যায়-বললে তা একটা প্রগল্ভতায় পর্যবসিত হয়, ব্যঞ্জনা হারিয়ে ফেলে। তাছাড়া “আমি” শব্দটি উচ্চারণ করারও অস্বস্তি আছে।... তবে এখানে লেখক একজন ব্যক্তিগত মানুষ নন, একটা সত্তা’ (কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০১৪ : ২৫৯)। কালীকৃষ্ণ গুহ-র কবিতায় আমরা প্রতিনিয়ত সেই সত্তার মুখোমুখি হই। কবির নিজস্ব সেই সত্তার গড়ে-ওঠার বিষয়ে পড়ালেখার সম্পর্ক কতোটুকু?- সেই বিষয়ে বিনয়ী কবি কালীকৃষ্ণ বলেন, ‘খুব বেশি পড়াশোনা করা আমার হয়নি। পড়েছি শুনেছি যতটুকু তাই নিয়ে গড়ে উঠেছে যে ধারণা সেটুকুর মধ্যেই বসবাস। সেইটুকুর মধ্যেই বিশ্বসাহিত্য বাংলাসাহিত্য ভারতীয় সাহিত্য তথা উপনিষদ পুরাণ মহাকাব্য দর্শন ইতিহাসের মলিন পাঠ গ্রহণ।’ এর ফলে একজন কবির চিন্তা-মনন ও চেতনার জগৎ কতোটা সমৃদ্ধ হয়?- সে-সম্পর্কে কালীকৃষ্ণ জানিয়েছেন, ‘এইসব কিছুর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কোনো-না-কোনো ধরনের উত্তরাধিকার নিয়ে আমাদের বাঁচা, লেখা, রাত্রির আকাশের নক্ষত্রমণ্ডলীর নীচে মাথা পেতে দাঁড়ানো।’ সেইসঙ্গে তিনি নিজের এই ধারণাকে আরেকটু বিস্তৃত করে বলেছেন, ‘আমরা প্রত্যেকেই পূর্বসূরিদের কাছ থেকে যে আলো পাই তা থেকেই নতুন একটা আলো জ্বালিয়ে নিতে চাই আমাদের সৃজনকর্মে, যার মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া আলো নিহিত থাকে। একটা আলো থেকে আরেকটা আলো জ্বালিয়ে নেয়ার মধ্যে যা-কিছু মৌলিকতা, সেইটুকুই মৌলিক।’ নিজের ঐতিহ্যকে এইভাবেই কবি দার্শনিক একটা ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা করেছেন। এরও কিন্তু একটা কারণ রয়েছে। কালীকৃষ্ণ গুহ বিশ্বাস করতেন, ‘কবিতায় দার্শনিকতার একটা জায়গা থাকে বলেই অনুমান করি। বহুদূর পর্যন্ত দেখতে পাওয়ার জায়গা। দার্শনিকের দেখা জ্ঞান ও যুক্তির দেখা, কবির দেখা জ্ঞান ও যুক্তি অতিক্রম করে দেখা যা রসসৃষ্টি করে এবং যা, এক অর্থে, একটা অলৌকিকতায় পৌঁছতে চায়। দার্শনিকেরা পথ নির্দেশ করে। কবিরা হয়তো কোনো স্মরণবেদনার পথ খুঁজে পেতে চান’ ( কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০১৪ : ২৫৫)।
৭.
দীর্ঘ-এক সাক্ষাৎকারের শেষে এসে কালীকৃষ্ণ গুহ জানিয়েছিলেন, ‘এখন রাত্রে প্রায়ই দুঃস্বপ্ন দেখি। দিনে কোনো স্বপ্ন দেখি না। না, আর কোনো কিছু করার কথা ভাবি না। শুধু শুয়ে থেকে বই পড়ে যতদিন কাটানো যায় অসুস্থ না হয়ে, ততদিন কাটাতে চাই। হয়তো একবার দু’বার সমুদ্রের ধারে যেতে চাই। এইটুকু’ ( কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০২২ : ২৬০)। তাঁর এই বক্তব্য আমাদের খানিকটা হলেও বিস্মিত করে বৈ কি! বিস্ময় এই কারণে যে, একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসেও, কলকাতার এই ব্যাপক কোলাহলের মধ্যে, আমরা যেন এক সন্ত-কবির দেখা পেয়ে যাই : যাঁর পদযাত্রার পুরোটাই ধুলোমাটির পথে। আলোক সরকার বলেছিলেন, ‘কবিতা রচনার শুরু থেকেই কালীকৃষ্ণ নিজস্ব মানসিকতা, নিজস্ব কাব্যরীতির আনুকূল্য পেয়েছিল। এই সহায়তা তাকে যে আত্মপ্রত্যয় দিয়েছিল তা তাকে সুস্থির করার সঙ্গে-সঙ্গে এমন একটা বিশেষতা দিয়েছিল যা স্রোতের বিরুদ্ধ অথবা স্রোতের অনুষঙ্গ-দুটোর কোনোটাই নয়। তা শিকড়ের অবগাঢ় আত্মময়তা। আত্মময়তা অর্থাৎ বিশেষতা। সব বিশেষই আত্মগৃহ আনে, আত্মবিন্যাস, আত্মপর্যবেক্ষণ।’ এই যে ‘বিশেষতা’র কথা বলেছিলেন আলোক সরকার, তিনি তাঁর সেই মন্তব্যকে একটু বিস্তারে নিয়ে গিয়ে খানিকটা সহজভাবে বলেছিলেন যে, কবির এই ‘বিশেষতা মানেই একটা অভ্যন্তর, একটা চতুষ্পার্শ্ব। এই অভ্যন্তর এই চতুষ্পার্শ্ব নিজেকে প্রমাণ করে, সব দৃশ্যের ভিতর, সব গ্রহণের ভিতর তা নিজেকে প্রমাণ করে। এই অভ্যন্তর এই চতুষ্পার্শ্ব যার নেই সে স্রষ্টা হতে পারে না। সব দৃশ্যই তার কাছে সমভূমি, সব দৃশ্যের ভিতর সে একাকার। কালীকৃষ্ণের প্রসঙ্গে সে দুর্ঘটনা ঘটেনি-তার কবিতা এক ব্যক্তিত্বের রচিত কবিতা। মৌল মৌন এককতা। তার কবিতাপাঠ একটা সম্পূর্ণ আলাদা নিস্তব্ধতা’ (আলোক সরকার, ২০২২ : ২৩)। ‘মাল্টে নোটবুকে’ রিলকে যেমন বলেছিলেন, ‘ You ought to wait and gather sense and sweetness for a whole lifetime, and a long one if possible, and then, at the very end, you might perhaps be able to write ten good lines. For poems are not, as people think, simply emotions (one has emotions early enough)—they are experiences.' (Rainer Maria Rilke, 1990 : 19)।
৮.
কবি-প্রাবন্ধিক অলোকরঞ্জন মনে করতেন, ‘কবির সঙ্গে কবির স্বাতন্ত্র্য আধুনিকতার প্রথম এবং প্রধান লক্ষণ’ (অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, ২০০২ : ১৭৫)। অন্যদিকে দীপংকর দাশগুপ্তের মতে, কাব্যের আধুনিকতা কবির ‘অনুভব এবং তার প্রকৃতির উপর নির্ভর করে’ কোনো ধরনের আরোপিত বাগভঙ্গির উপর নয়( দীপংকর দাশগুপ্ত, ২০০২ : ১৮২)। এঁদের পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই, কবি রাইনের মারিয়া রিলকে যেমন শুধু অনুভূতি নয়, কবির অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন; কবি কালীকৃষ্ণ গুহ তাঁর সৃজনকর্মে, কবিতা রচনার মৌলিকতা নির্মাণের ক্ষেত্রে নিজের ধরনে অনুভূতি, অভিজ্ঞতার পাশাপাশি কবির মেধাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘ মেধাই অনুভূতির জননী। মেধার সাহায্য ছাড়া এমন কোনো অনুভূতিতে পৌঁছনো যায় না, যার মধ্যে অনন্যতা আছে, যা একিট কবিতা হয়ে উঠতে পারে’ (কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০২২ : ২৩১)। আর এইভাবেই তিনি তাঁর কবিতায়, তাঁর যাবতীয় সৃষ্টিকর্মে নতুন-একটা আলো জ্বালিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় নিজেকে নানাভাবে প্রসারিত করে চলেছেন। কবির এই প্রসারণের কাজ কখনো আনন্দের মধ্যে দিয়ে আবার কখনো মেধার বিস্তারে তার সার্থকতা খুঁজে পাবার চেষ্টা করেছে। এখানেই কবি কালীকৃষ্ণ গুহ-র স্বাতন্ত্র্য, তাঁর মৌলিকতা, তাঁর আত্মপ্রকাশের তাৎপর্য নিহিত ।
সহায়কপঞ্জি
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, ২০০২। ‘শতভিষা’ সংকলন (সম্পাদনা : মুহম্মদ মতিউল্লাহ্), কবিতা পাক্ষিক, কলকাতা।
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, ২০২২। মলিন পাঠগ্রহণ : অন্বেষণ ও বিশ্লেষণে কবি কালীকৃষ্ণগুহ (সম্পাদনা : শুভদীপ সেনশর্মা), আলোপৃথিবী, কলকাতা।
আলোক সরকার, ২০২২। মলিন পাঠগ্রহণ : অন্বেষণ ও বিশ্লেষণে কবি কালীকৃষ্ণগুহ (সম্পাদনা : শুভদীপ সেনশর্মা), আলোপৃথিবী, কলকাতা।
কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০০৪। শ্রেষ্ঠ কবিতা, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০১৪। অণুমাত্রিক : কালীকৃষ্ণ গুহ বিশেষ সংখ্যা (সম্পাদক : দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য), হুগলী।
কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০১৭। কবিতাসংগ্রহ-১, ঋত প্রকাশন, কলকাতা।
কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০২২। মলিন পাঠগ্রহণ : অন্বেষণ ও বিশ্লেষণে কবি কালীকৃষ্ণ গুহ (সম্পাদনা : শুভদীপ সেনশর্মা), আলোপৃথিবী, কলকাতা।
কালীকৃষ্ণ গুহ, ২০২৬। অক্ষয়বটের দেশ পার হই (প্রথম প্রকাশ : ১৯৯৭), ভাষালিপি, কলকাতা।
দীপংকর দাশগুপ্ত, ২০০২। । ‘শতভিষা’ সংকলন (সম্পাদনা : মুহম্মদ মতিউল্লাহ্), কবিতা পাক্ষিক, কলকাতা।
রবীন মণ্ডল, ২০২২। মলিন পাঠগ্রহণ : অন্বেষণ ও বিশ্লেষণে কবি কালীকৃষ্ণ গুহ (সম্পাদনা : শুভদীপ সেনশর্মা), আলোপৃথিবী, কলকাতা।
শিবনারায়ণ রায়, ২০২২। মলিন পাঠগ্রহণ : অন্বেষণ ও বিশ্লেষণে কবি কালীকৃষ্ণ গুহ (সম্পাদনা : শুভদীপ সেনশর্মা), আলোপৃথিবী, কলকাতা।
হেমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, ২০২২। মলিন পাঠগ্রহণ : অন্বেষণ ও বিশ্লেষণে কবি কালীকৃষ্ণ গুহ (সম্পাদনা : শুভদীপ সেনশর্মা), আলোপৃথিবী, কলকাতা।
Rainer Maria Rilke, 1993. Letters to a Young Poet (Translation by M. D. Herter Norten), W. W. Norton & Company, New York.
Rainer Maria Rilke, 1990. The Notebooks of Malte Laurids Brigge ( Translated by Stephen Mitchell), Vintage International, New York.
