অ্যান কারসনের ‘সংক্ষিপ্ত কথন’
“এগুলো প্রচলিত অর্থে ছোটগল্প নয়, আবার প্রথাগত কবিতার সংজ্ঞার মধ্যেও পুরোপুরি ধরা পড়ে না। Short Talks-এর মধ্য দিয়ে কারসন এমন এক স্বতন্ত্র সাহিত্যিক আঙ্গিক নির্মাণ করেছেন, যেখানে কবিতা, দর্শন, জীবনী, শিল্পসমালোচনা ও ব্যক্তিগত আত্মচিন্তা পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়।”
কানাডীয় লেখক অ্যান কারসন কবিতা, প্রবন্ধ ও অনুবাদ—বিভিন্ন সাহিত্যিক আঙ্গিকে কাজ করেন। ২০২৬ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন।
অ্যান কারসনের Short Talks বা ‘সংক্ষিপ্ত কথন’ তাঁর স্বতন্ত্র ও তীক্ষ্ণ লেখনীর এক অভিনব প্রকাশ। এই রচনাগুলো একই সঙ্গে অতি সংক্ষিপ্ত গদ্যকবিতা, চিন্তার খণ্ডাংশ, ক্ষুদ্র প্রবন্ধ এবং দার্শনিক ধাঁধার মতো। প্রথম পাঠে এগুলো সহজ মনে হলেও, কয়েকটি বাক্যের মধ্যেই ধারণা ও ভাবনার এক বিস্তৃত জগৎ উন্মোচিত হয়। এই সংকলনে তাঁর এমনই কয়েকটি Short Talks অন্তর্ভুক্ত করা হলো।
এগুলো প্রচলিত অর্থে ছোটগল্প নয়, আবার প্রথাগত কবিতার সংজ্ঞার মধ্যেও পুরোপুরি ধরা পড়ে না। Short Talks-এর মধ্য দিয়ে কারসন এমন এক স্বতন্ত্র সাহিত্যিক আঙ্গিক নির্মাণ করেছেন, যেখানে কবিতা, দর্শন, জীবনী, শিল্পসমালোচনা ও ব্যক্তিগত আত্মচিন্তা পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়।
১ মে ১৯৯১-এ The Yale Review-এ প্রকাশিত তাঁর “Short Talks” রচনার শুরুতে তিনি লিখেছেন —
.....................
মূল: অ্যান কারসন
অনুবাদ: লায়লা ফারজানা
.....................
একদিন ভোরে শব্দ হারিয়ে গিয়েছিল। এমনটি আগে হয়নি।
শব্দ হারায়নি। তথ্য হারিয়েছে, মুখ হারিয়েছে।
অ্যারিস্টটলের মতে, একটি ভালো গল্পে যা কিছু ঘটে, তার পেছনে অন্য কোনো চালিকাশক্তি কাজ করে। একদিন কেউ লক্ষ্য করেছিল, নক্ষত্র আছে কিন্তু শব্দ নেই— কেন?
আমি অনেক মানুষকে এই প্রশ্ন করেছি।
আমার ধারণা প্রশ্নটি ভালো।
তিন বৃদ্ধা মাঠে ঝুঁকে ছিল।
বলল, “আমাদের প্রশ্ন করে কী লাভ?”
তবে, খুব তাড়াতাড়িই স্পষ্ট হলো সে সম্পর্কে জানার মতো সবকিছুই তাঁদের জানা—
তুষারে ঢাকা মাঠ, নীল-সবুজ অঙ্কুর, আর “দুঃসাহস” নামের যে গাছটিকে কবিরা ভায়োলেট ভেবে ভুল করেছিল।
আমি সব লিখে নিতে শুরু করেছিলাম—
যা যা বলা হচ্ছিল।
এই আঁচড়গুলোই গল্পের একঘেয়েমি ছাড়া প্রকৃতির একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলে।
আমি জোর দিয়ে বলছি।
একঘেয়েমি এড়াতে আমি যেকোনো কিছু করতে পারি।
এ আমার আজীবন সাধনার কাজ।
জ্ঞান বা কাজের কোনো শেষ নেই; ইনফিনিটিভ ও পার্টিসিপলের অদ্ভুত ব্যবহার, গতির কঠোর প্রতিবন্ধকতা কিংবা মনকে দ্রুত সরিয়ে নিয়ে আসা—এসবের কোনোটিতেই ‘যথেষ্ট’ বলে কিছু নেই।
তিপ্পান্নটি খণ্ডে যা যা বলা হয়েছিল আমি সব লিখে রেখেছিলাম—
এমন সব বিষয়, যেগুলোর মধ্যে বিশাল দূরত্ব।
প্রতিদিন একই সময়ে আমি সেগুলো পড়তাম।
গতকাল পর্যন্ত।
গতকাল কয়েকজন এসে সেগুলো নিয়ে গেল।
একটি বাক্সে ভরল। তালা দিল।
তারপর আমরা একসঙ্গে দৃশ্যপটের দিকে তাকালাম।
তাদের নির্দেশ পরিষ্কার ছিল: আমাকে জলের মতো আয়নার অনুকরণ করতে হবে।
(কিন্তু জল আয়না নয়, এবং তাকে আয়না ভাবাও বিপজ্জনক।)
আসলে পুরোটা সময় আমি শুধু অপেক্ষা করেছি তারা কখন যাবে—
আর আমি বাকী অংশগুলো পূরণ করতে শুরু করব।
শেষ পর্যন্ত আমার কাছে ছিল তিনটি খণ্ড
(যেগুলো আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম) ।
আমি কী লিখে রাখছি, সে ব্যাপারে আমাকে সাবধান হতে হবে।
অ্যারিস্টটল তো সম্ভাব্যতার কথা আর আবশ্যিকতার কথা বলেন।
কিন্তু —এমন বিস্ময়ের কী মূল্য?
এমন গল্পেরই বা কী মূল্য, যার মধ্যে বিষাক্ত ড্রাগন নেই?
আসলে, কোনো কাজেই ‘যথেষ্ট’ বলে কিছু নেই।।
উল্টো পথে হাঁটা
(SHORT TALK ON WALKING BACKWARDS)
মা আমাদের উল্টো হয়ে হাঁটতে বারণ করতেন। বলতেন, মৃতেরা নাকি ওভাবেই হাঁটে। এই ধারণাটা তাঁর কোথা থেকে হয়েছিল? হয়তো কোনো ভুল অনুবাদ থেকে।
আসলে মৃতেরা উল্টো হয়ে হাঁটে না ঠিকই, তবে তারা আমাদের ঠিক পেছনেই থাকে। তাদের ফুসফুস নেই, তাই তারা ডাকতেও পারে না; কিন্তু আমরা পেছন ফিরে তাকালে তারা খুব খুশি হয়।
আসলে তাদের অনেকেই ভালোবাসারই শিকার।
ভালোবাসা পাওয়ার আনন্দ
(SHORT TALK ON LE BONHEUR D’ÊTRE BIEN AIMÉE)
জেগে উঠেই আমি দিনের পর দিন —
তোমার কথা ভাবি।
কেউ যেন বাতাসে ছড়িয়ে রেখেছে রত্নের মতো পাখির কান্না।
সংশোধন
(SHORT TALK ON RECTIFICATION)
কাফকা তাঁর ঘড়ি দেড় ঘণ্টা এগিয়ে রাখতেন, আর ফেলিস বারবার তা ঠিক করে দিতেন।
‘আমরা একে অপরকে যেমন, ঠিক তেমনই ভালোবাসি’—এ কথা লেখা সত্ত্বেও, নিজের ডায়েরিতে সেই সঙ্গে ছিল ফেলিসের সোনার দাঁত নিয়েও কিছু মন্তব্য, ১৯১২ সালে যা তাঁর কাছে ছিল নরকের ছটা। পাঁচ বছর ধরে তাঁরা প্রায় বিয়েই করে ফেলছিলেন।
বিয়ের পক্ষে বিপক্ষে তিনি নানা যুক্তি সাজিয়েছেন, যার মধ্যে — নিজের জীবনের কঠিন বাস্তবতার আঘাত সইতে না পারার অক্ষমতা (পক্ষে) এবং রাত সাড়ে দশটায় বাবা-মায়ের বিছানায় নাইটশার্ট পেতে রাখার বিষয়টি (বিপক্ষে)। শেষমেশ রক্তক্ষরণই তাঁকে রক্ষা করেছিল। স্যানাটোরিয়ামে চিকিৎসকরা যখন তাঁকে কথা না বলার পরামর্শ দিলেন, মেঝেজুড়ে তিনি তখন ছড়িয়ে দিলেন কাঁচের মতো সব বাক্য। এমনই একটি বাক্যে বলা হয়েছে, ফেলিসের সত্তায় তখনও যেন অতিরিক্ত এক নগ্নতা রয়ে গিয়েছিল।
সুস্থ দাঁত? সেগুলোও ছিল নিজস্ব ভয়াবহতায় ভারী।
ভ্যান গগ
(SHORT TALK ON VAN GOGH)
“আমি মদ খাই ওই হলুদ আকাশটাকে —বিশাল হলুদ আকাশটাকে—বুঝতে"—
বলেছিলেন ভ্যান গগ।
পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে তিনি বস্তুর গায়ে রঙ আটকে রাখা 'পেরেক'গুলোকে দেখেছিলেন;
আরও দেখছিলেন, পেরেকগুলোর কষ্ট।
ঘুম-পাথর
(SHORT TALK ON SLEEP STONES)
ক্যামিল ক্লদেলের জীবনের শেষ ত্রিশ বছর কেটেছে এক মানসিক হাসপাতালে এই ভেবে ভেবে —
যে কেন তাঁকে সেখানে রাখা হলো, আর তাঁর সেই কবি ভাইকে চিঠি লিখে যে তাঁকে সেখানে পাঠানোর নথিতে স্বাক্ষর করেছিল। তিনি তাঁকে লিখেছিলেন, "আমার সাথে দেখা করতে এসো। আর মনে রেখো, আমি এখানে পাগল-মেয়েদের মাঝে বাস করছি; দিনগুলো এখানে বড় দীর্ঘ।"
সে ধূমপানও করতো না, হাঁটাহাঁটিও করতো না। এমন কি কোনো ভাস্কর্য গড়তেও রাজি হয়নি। যদিও তাঁকে 'ঘুম-পাথর'—মার্বেল, গ্রানাইট ও পোরফিরি—দেওয়া হতো, সে সেগুলো ভেঙে ফেলতো; তারপর রাতের আঁধারে আবার সেই টুকরোগুলো কুড়িয়ে প্রাচীরের বাইরে পুঁতে রাখতো। রাতেই তাঁর হাত দুটো ক্রমশ আরও বিশাল হয়ে উঠত — যতক্ষণ না ছবিতে, তাঁর হাঁটুর ওপর রাখা হাত দুটো অন্য কারও শরীরের দুটি অংশ হয়ে উঠতো।
জল-নিরোধক
(SHORT TALK ON WATERPROOFING)
ফ্রাঞ্জ কাফকা ছিলেন ইহুদি। তাঁর বোন—অটলা—সে-ও ইহুদি। অটলা বিয়ে করেছিলেন জোসেফ ডেভিড নামের এক আইনবিদকে, যিনি ইহুদি ছিলেন না।
১৯৪২ সালে বোহেমিয়া-মোরাভিয়া অঞ্চলে যখন নুরেমবার্গ আইন কার্যকর করা হয়, তখন শান্ত স্বভাবের অটলা জোসেফ ডেভিডকে বিবাহবিচ্ছেদের প্রস্তাব দেন। প্রথমে জোসেফ রাজি হননি। অটলা তখন রাতের অশুভ ছায়া, সম্পত্তি, তাঁদের দুই মেয়ে এবং পরিস্থিতির যৌক্তিক বিচার-বিশ্লেষণের কথা তুলে ধরলেন। তিনি ‘আউশভিৎস’-এর কথা উল্লেখ করেননি —কারণ তখনো তিনি ওই শব্দটির সাথে পরিচিত ছিলেন না—যেখানে ১৯৪৩ সালের অক্টোবরে তাঁর মৃত্যু হয়।
অ্যাপার্টমেন্টটি গুছিয়ে তিনি একটি রুকস্যাক গুছিয়ে নিলেন; আর জোসেফ ডেভিড তাঁর জুতো ভালো করে পালিশ করে দিলেন। তিনি জুতোর ওপর গ্রিজের একটি প্রলেপ লাগিয়ে দিলেন।
বললেন, “এখন এগুলো জল-নিরোধক হয়ে গেছে।”
হোমো সেপিয়েন্স
(SHORT TALK ON HOMO SAPIENS)
ছোট ছোট আঁচড় কেটে ক্রো-ম্যাগনন মানুষ হাতিয়ারের হাতলে চাঁদের দশাগুলো খোদাই করত,
কাজের ফাঁকে ভাবত চাঁদের কথা। পশু-পাখি। দিগন্তরেখা। জলের পাত্রে নিজের মুখ।
আমার বলা প্রতিটি গল্পেই এমন এক মুহূর্ত আসে যখন আমি আর সামনে দেখতে পাই না।
সেই মুহূর্তটিকে আমি ঘৃণা করি। এ কারণেই গল্পকথকদের অন্ধ বলা হয়—
এ আসলে এক বিদ্রূপ।
অর্কিড
(SHORT TALK ON ORCHIDS)
আমরা সুড়ঙ্গ খুঁড়ে বেঁচে থাকি, কারণ আমরা জীবন্ত সমাধিস্থ মানুষ।
তোমার তৈরি সুড়ঙ্গগুলো আমার কাছে মনে হবে অদ্ভুতভাবে লক্ষ্যহীন, শিকড়ছেঁড়া অর্কিডের মতো। কিন্তু তার সুবাস অবিনশ্বর। ১৮৮৩ সালের এক চিঠিতে এমিলি ডিকিনসন লিখেছেন, কিছুদিন আগে আমহার্স্ট থেকে একটি ছোট ছেলে পালিয়ে গিয়েছিল; যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো সে কোথায় যাচ্ছে, উত্তর দিয়েছিল—ভার্মন্ট কিংবা এশিয়া।
বিমান-উড্ডয়নের অনুভূতি
(SHORT TALK ON THE SENSATION OF AIRPLANE TAKEOFF)
আমি ভাবি, এই তবে ভালোবাসা—
দুই হাত ওপরে তুলে চিৎকার করে আমার জীবনের দিকে দৌড়ে আসছে —
চলো, কিনে ফেলি! কী দারুণ সস্তা!
