০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ধ্রুপদীর দর্পণে আধুনিকতা: অ্যান কার্সনের নোবেল জয় ও সীমানা ভাঙার সাহিত্য

“আমি তো বিশ্বাসই করি না যে এই জীবনেও আমি কবি ছিলাম। আমি কিছু জিনিস তৈরি করেছি। সেগুলোর কিছু কিছু কখনও কখনও কবিতার আকার নিয়েছে। কেন নিয়েছে, তা আমি জানি না।”

ধ্রুপদীর দর্পণে আধুনিকতা: অ্যান কার্সনের নোবেল জয় ও সীমানা ভাঙার সাহিত্য

উইকিপিডিয়াতে ব্যবহৃত ছবি

বিপাশা চক্রবর্তী বিপাশা চক্রবর্তী

Published : 08 Oct 2026, 08:24 PM

Updated : 08 Oct 2026, 08:50 PM

অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ঘোষিত হলো ২০২৬ সালের সাহিত্যের নোবেল বিজয়ীর নাম। বিভিন্ন চটকদার পূর্বাভাস আর ছায়া তালিকার সব হিসাব উল্টে দিয়ে সুইডিশ একাডেমি এবার পুরস্কৃত করল কানাডার বিশ্বখ্যাত কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং ধ্রুপদী সাহিত্যের অধ্যাপক অ্যান কার্সনকে। একাডেমির আনুষ্ঠানিক সাইটেশনে বলা হয়েছে, "তাঁর সাহসী ও উদ্ভাবনী সৃষ্টির জন্য, যা ক্লাসিক্যাল বা ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সাথে এক কৌতুকপূর্ণ সংলাপের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যের এক নতুন রূপ তৈরি করেছে"। মার্গারেট অ্যাটউডের নাম নিয়ে বছরের পর বছর যে কানাডীয় অঞ্চলের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, একাডেমি ঠিক সেই ভৌগোলিক সমীকরণ মেনেই উত্তর আমেরিকার এই নিভৃতচারী শব্দশিল্পীর মাথায় তুলে দিল নোবেলের মুকুট।

অ্যান কার্সনের এই নোবেল জয়ের একটি গভীর ভূ-রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তাৎপর্য রয়েছে। নোবেল কমিটি দীর্ঘদিন ধরেই চরম ‘ইউরোকেন্দ্রিকতা’ এবং মূলধারার রৈখিক কথাসাহিত্যের প্রতি পক্ষপাতের কারণে সমালোচিত হয়ে আসছিল। গত বছর হাঙ্গেরির লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের পর এবার কার্সনকে বেছে নিয়ে একাডেমি স্পষ্ট বার্তা দিল যে, তারা ইউরোপের ভৌগোলিক বৃত্ত ভেঙে যেমন বাইরে বেরোতে চাইছে, তেমনি প্রথাগত উপন্যাসের ছকবাঁধা কাঠামোকেও চ্যালেঞ্জ করতে প্রস্তুত। কার্সন এমন একজন লেখক, যিনি কোনো নির্দিষ্ট ঘরানা বা জনরায় বন্দী নন। তিনি একাধারে কবিতা, কল্পকাহিনী, পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রবন্ধ এবং নাটকের মাঝখানের দেয়ালটি পুরোপুরি ধসিয়ে দিয়েছেন। তাঁর নোবেল প্রাপ্তি আসলে বিশ্বসাহিত্যে পরীক্ষামূলক ও ধারা-ভাঙা (Genre-bending) গদ্যের এক পরম প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

একজন অনুবাদক ও ধ্রুপদী সাহিত্যের গবেষক হিসেবে অ্যান কার্সনের সাহিত্যজগৎ যেন এক অন্তহীন প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের মাঠ। ১৯৫০ সালে টরন্টোতে জন্ম নেওয়া কার্সন তাঁর জীবনের সিংহভাগ সময় ব্যয় করেছেন প্রাচীন গ্রিক ও লাতিন সাহিত্য নিয়ে। সাফো, ইউরিপিদিস কিংবা এসকাইলাসের ধ্রুপদী টেক্সটগুলোকে তিনি যেভাবে আধুনিক ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন, তা কেবল আক্ষরিক রূপান্তর নয়, সেগুলো হয়ে উঠেছে প্রাচীন আত্মার সাথে আধুনিক মানুষের এক মনস্তাত্ত্বিক কোলাজ। কার্সন বিশ্বাস করেন, শব্দের ব্যুৎপত্তি (Etymology) এবং শব্দের ভেতরের নীরবতাই হলো আসল সাহিত্য।

কার্সনের এই ধ্রুপদী অনুবাদ ও আধুনিকতার মেলবন্ধনের সবচেয়ে বড় নিদর্শন তাঁর ১৯৯৮ সালের কালজয়ী সৃষ্টি—'অটোবায়োগ্রাফি অব রেড' (Autobiography of Red)। কাব্যোপন্যাস বা 'Novel in Verse' ঘরানার এই বইটি বিংশ শতাব্দীর বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সেরা মাস্টারপিস। প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকোরাসের একটি খণ্ডিত কাব্যের ওপর ভিত্তি করে কার্সন এখানে এক অলৌকিক রূপক তৈরি করেছেন। পুরাণের লাল ডানাবিশিষ্ট দানব ‘গেরিয়ন’-কে তিনি রূপান্তর করেছেন আধুনিক যুগের এক সমকামী ডানাওয়ালা তরুণে, যে ক্যামেরার লেন্স দিয়ে নিজের অস্তিত্ব আর একাকীত্বকে খুঁজে বেড়ায়। এই উপন্যাসে মিথ বা পুরাণ অতীত নয়। বর্তমানের মানুষের বিচ্ছিন্নতা, প্রেম এবং ট্র্যাজেডিকে বোঝার এক অমোঘ দর্পণ হয়ে ওঠে। তাঁর অন্য দুই বিখ্যাত সৃষ্টি—ভাইয়ের মৃত্যুর পর লেখা কোলাজধর্মী শোকগাথা 'নক্স' (Nox) এবং কাম ও আকাঙ্ক্ষার মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ 'ইরোস দ্য বিটারসুইট' (Eros the Bittersweet) প্রমাণ করেছে কার্সনের কাছে ভাষা হলো এক ধরণের ক্ষত নিরাময়ের অস্ত্র।

অ্যান কার্সনের নোবেল জয় আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যকর্মীদের জন্যও একটি বড় পাঠ। তিনি দেখিয়েছেন, শিকড়হীন আধুনিকতার চেয়ে ধ্রুপদী ঐতিহ্যের মাটিতে পা রেখে সমকালীন সংকটকে ব্যবচ্ছেদ করাই হলো সাহিত্যের আসল শক্তি। ২০২৬ সালের এই নোবেল পুরষ্কার আমাদের এক নতুন আলোর সন্ধান দিল। অ্যান কার্সনের ধ্রুপদীর দর্পণে চেনা সেই আলোতেই আমরা এখন আধুনিক মানুষের আত্মিক সংকটের প্রতিচ্ছবি খুঁজে নেব।

তিনি তাঁর সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্য ভাষার মাধ্যমে প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য, দর্শন এবং সমকালীন মানব অভিজ্ঞতাকে এক অনন্য শিল্পরূপে উপস্থাপন করেছেন।

কানাডায় জন্ম নেওয়া অ্যান কারসন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসিকস বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন। কবিতা ও গদ্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি গগেনহাইম ফেলোশিপ, ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ, ল্যানান সাহিত্য পুরস্কার, পুশকার্ট পুরস্কার এবং টি. এস. এলিয়ট পুরস্কারসহ বহু আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে জ্ঞান, কল্পনা ও মানবিক অনুভূতির গভীর সংমিশ্রণ লক্ষ করা যায়।

নিজের সৃজনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি একবার বলেছিলেন, “আমি কবিতা শুরু করি না, কবিতাই আমাকে শুরু করে।” এই বক্তব্য তাঁর শিল্পদর্শনের গভীরতাকে প্রকাশ করে। আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর হিসেবে অ্যান কার্সন আজ বিশ্বসাহিত্যে এক অনন্য নাম।

এই সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, অ্যান কার্সন নিজেকে প্রচলিত অর্থে "কবি" বলতে অনাগ্রহী। তাঁর উত্তরগুলোতে একই সঙ্গে রসবোধ, আত্মসমালোচনা, দর্শনচিন্তা এবং রহস্যময় এক ধরনের বিনয় ধরা পড়ে।

একটি কবিতা শুরু করেন কীভাবে?

উল্টোটা ঘটে। কবিতাই আমাকে শুরু করে।

সবচেয়ে বাজে পরামর্শ কোনটি পেয়েছেন?

কেউ আমাকে খুব একটা পরামর্শ দেয় না।

আপনি বলেছিলেন, প্রাচীন গ্রিকদের ভাষা ও সাহিত্য ছিল “সব কিছুর শিকড়ে”, যেখান থেকে আমাদের বর্তমান পৃথিবীর বিশাল বৃক্ষটি গড়ে উঠেছে। আপনি আরও বলেছেন, “সেগুলো এখনো সতেজ, তাদের ভাবনাগুলোর গায়ে এখনো শিশির লেগে আছে।” আপনার কি মনে হয়, একবিংশ শতাব্দীর কবিতাও সেই শিকড়ের দিকেই ফিরে যাচ্ছে?

ওহ না। শিকড়ে ফিরে যাওয়ার কোনো উপায়ই আমাদের নেই। আমরা তো উপরের দিকে ডালপালাগুলির মাঝে হারিয়ে গেছি। এদিক-ওদিক দুলছি, প্রায়ই অসহায়ের মতো। পুষ্টি কমে আসছে, পরিকল্পনাগুলোও তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।

সাফল্যকে কীভাবে সামলান?

ইদানীং তো কমবেশি প্রচারের আলো থেকে সরে গেছি। তাই আমি যেন এক হাইপারবোরিয়ানের জীবন যাপন করি। সেই পৌরাণিক মানুষের মতো, যারা উত্তরী বাতাসেরও ওপারে বাস করত।

আপনি আপনার সৃজনপ্রক্রিয়াকে বর্ণনা করেছেন "নিজের ভেতরের ‘আমি’কে সরিয়ে দেওয়ার সংগ্রাম" হিসেবে। যখন সেই ‘আমি’ মুছে যায়, তখন কী অবশিষ্ট থাকে?

আশা করি, এমন কিছু যা অপ্রত্যাশিত।

শেকসপিয়ার সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?

তিনি ছিলেন এমন একজন, যিনি অবচেতনের ভাষাকে হুবহু লিখে নিতে পারতেন। আর তিনি যে সাধারণ মানুষ ছিলেন না, সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

আপনার কবিতায় এমিলি ব্রন্টির জীবন ও লেখালেখি এসেছে। ছোটবেলায় ব্রন্টির লেখা কি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

না, চল্লিশে পা দেয়ার আগে পর্যন্ত নয়।

Each Day Unexpected Salvation (John Cage)" কবিতায় আপনি "shade" শব্দটি চুয়াল্লিশবার ব্যবহার করেছেন। এই পুনরাবৃত্তিকে কি আপনি এক ধরনের সত্তা-বিয়োজন (decreation) হিসেবে দেখেন?

এভাবে কখনও ভাবিনি। সম্ভবত ব্যাপারটা আরও যান্ত্রিক। যেন একই মাথা এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে একই চোখে নানা জিনিস দেখা।

আরেকটি জীবন পেলে কি আবারও কবি হতেন?

আমি তো বিশ্বাসই করি না যে এই জীবনেও আমি কবি ছিলাম। আমি কিছু জিনিস তৈরি করেছি। সেগুলোর কিছু কিছু কখনও কখনও কবিতার আকার নিয়েছে। কেন নিয়েছে, তা আমি জানি না।

সাক্ষাতকারের উৎস: The Penn Review নামক অনলাইন ম্যাগাজিন।