Published : 07 Jun 2026, 11:28 PM
লেখক পরিচিতি: Yáng Shuāng-zǐ হলেন তাইওয়ানের একজন লেখক। ১৯৮৪ সালের ১০ জুলাই তাইওয়ানের তাইচুং(Taichung) শহরের উরি(Wuri) জেলায় তাঁর জন্ম। চীনা ভাষা ও সাহিত্যে National Chung Hsing University থেকে তিনি স্নাতক সম্পন্ন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১২ সালে ‘তাইওয়ান সাহিত্য ও সীমান্ত-অতিক্রমী সাংস্কৃতিক অধ্যয়ন’ বিষয়ে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণাপত্রের বিষয় ছিল তাইওয়ানের জনপ্রিয় রোমান্স সাহিত্য, এবং গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন Kuo-wei Chen।
২০১৭ সালে ইউরি (নারী-নারী প্রেমভিত্তিক) উপন্যাস Seasons of Bloom-এর মাধ্যমে ইয়াং বিশেষভাবে আলোচনায় আসেন। এরপর ২০২০ সালে প্রকাশিত Taiwan Travelogue এর মাধ্যমে, ইয়াং এর সাহিত্যিক জীবনে একটি নতুন মোড় আসে। উপন্যাসটি প্রকাশ করে Springhill Publishing। Taiwan Travelogue-ই ছিল তাঁর প্রথম বই, যা ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়। এই অনুবাদের মাধ্যমেই উপন্যাসটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির এক নতুন স্তরে পৌঁছে যায়। ২০২৪ সালে এটি সাহিত্য অনুবাদ বিভাগে National Book Award for Translated Literature অর্জন করে, পাশাপাশি Asia Society-এর উদ্বোধনী Baifang Schell Book Prize-এও সম্মানিত হয়। বইটি ইতোমধ্যেই বা অচিরেই জাপানি, কোরিয়ান, নরওয়েজিয়ান, ইউক্রেনীয়, ইতালীয়, জার্মান, ডাচ, ড্যানিশ এবং গ্রিক ভাষা ইত্যাদি ভাষায় প্রকাশিত হচ্ছে। এ বছরের ১৯ মে, বইটি আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারে ভূষিত হয়। বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন Lin King।
Taiwan Travelogue হলো International Booker Prize প্রাপ্ত তাইওয়ান মান্দারিন ভাষা থেকে অনূদিত প্রথম বই। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে Yáng Shuāng-zǐ এবং Lin King উভয়েই ইতিহাসে প্রথম তাইওয়ানি লেখক ও তাইওয়ানি-আমেরিকান অনুবাদক হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন। বিজয়ী এই লেখক ও অনুবাদকের সাক্ষাতকার দুটি অনুবাদ করেছেন নীলিমা রশীদ তৌহিদা। বি. স

প্রশ্ন: Taiwan Travelogue লেখার পেছনের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে কিছু বলবেন?
কোরিয়া এবং তাইওয়ান—দুটি দেশই একসময় জাপানি সাম্রাজ্যের উপনিবেশ ছিল। কিন্তু সেই অতীতকে ঘিরে এই দুই দেশের অনুভূতি এক নয়। কোরিয়ানদের মধ্যে সেই ইতিহাসের প্রতি একধরনের অভিন্ন ক্ষোভ লক্ষ করা যায়, অথচ তাইওয়ানের মানুষের অনুভূতি অনেক বেশি জটিল; কেননা তাদের অনুভূতিটি হলো অস্বস্তি ও স্মৃতিচারণের একটি মিশ্রণ। আমি সমকালীন তাইওয়ানের দৃষ্টিকোণ থেকে সেই জটিল ইতিহাসের স্তরগুলো উন্মোচন করতে চেয়েছি। জানতে চেয়েছি, অতীতের মানুষ কেমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল, আর ইতিহাসের সেই অন্ধকার পথ পেরিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎটা ঠিক কেমন হওয়া উচিত।
প্রশ্ন: উপন্যাসটি লেখার প্রক্রিয়া কেমন ছিল?
২০১৭ সালের শেষভাগে কোনো একসময় আমি উপন্যাসটির কাঠামো দাড় করাই, এবং প্রথম অধ্যায়টি লিখি। তবে প্রকল্পটি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করি ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি এবং সেই বছরেরই ২০ আগস্ট প্রথম খসড়া সম্পূর্ণ হয়। উপন্যাসটির দুটি কেন্দ্রীয় বিষয়— ভ্রমণ ও খাদ্য—নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আমার জীবনে দুটি সুস্পষ্ট পরিবর্তন আসে: আমার সঞ্চয় কমে যায়, আর শরীরের ওজন বেড়ে যায়।
প্রশ্ন: এ বছরের আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘সীমানা ছাড়িয়ে কথাসাহিত্য’। আপনার মতে, অনূদিত সাহিত্য কীভাবে পাঠককে ভৌগোলিক সীমানার বাইরে দেখতে সাহায্য করে, এবং কেন তা গুরুত্বপূর্ণ?
আমার মতো একজন মানুষের জন্য, যে মাত্র একটি ভাষায় পড়তে পারে, অনুবাদ না থাকলে পৃথিবীকে দেখার জানালাটি ভীষণ সংকীর্ণ হয়ে যেত। অনূদিত সাহিত্য আমার কাছে দ্বিতীয় এক জোড়া চোখের মতো। তবে শুধু তা-ই নয়। আমার কাছে অনুবাদকরা হলেন অপরিহার্য পথপ্রদর্শক, যাঁরা পাঠকের হাত ধরে অচেনা ভূখণ্ডের দুর্গম পথ বেয়ে গভীরে নিয়ে যান।
প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার তার বর্তমান রূপে দশ বছর পূর্তি উদ্যাপন করছে। আপনার মতে, গত এক দশকে এই পুরস্কার অনূদিত সাহিত্য সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে কীভাবে বদলেছে?
গত দশ বছরে আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার লেখক ও অনুবাদক—উভয়কেই সমান মর্যাদা দিয়েছে। এই সমমর্যাদার দৃষ্টিভঙ্গি অনূদিত সাহিত্যকে দেখার প্রচলিত ধারণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। এতে পাঠকেরা আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে সাহিত্য-অনুবাদ কোনো একক সৃজনশীলতার ফল নয়; বরং এটি দুটি সৃজনশীল মানুষের যৌথ সাধনা।
প্রশ্ন: আমাদেরকে এমন একটি বইয়ের কথা বলবেন কি যা শৈশবে আপনাকে বইমুখী করে তুলেছিল?
Akira Toriyama-এর Dragon Ball। ১৯৮৪ সালে, যে বছর আমার জন্ম, এর ধারাবাহিক প্রকাশনা শুরু হয়। আর সমাপ্তি ঘটে যখন আমার বয়স এগারো। মোট বিয়াল্লিশ খণ্ডে বিস্তৃত এক দীর্ঘ যাত্রা। বইটি আমাকে পড়ার পাশাপাশি গল্প বুনতেও শিখিয়েছে। সৃজনশীল মানুষ হওয়ার যে স্বপ্ন পরবর্তীতে আমার মধ্যে জন্ম নেয়—এই বইয়ের হাত ধরেই তার প্রথম বীজ রোপিত হয়েছিল।
প্রশ্ন: এমন কোনো বই কি আছে, যা আপনাকে লেখক হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল?
দুর্ভাগ্যবশত, আমার পক্ষে একটি নির্দিষ্ট বইয়ের নাম বলা সম্ভব নয়। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তাইওয়ানে স্থানীয় রোমান্স উপন্যাসের ব্যাপক জনপ্রিয়তা আমাকে প্রথম গল্প লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। আমার মিডল স্কুলের কয়েকজন সহপাঠী মিলে একটি লেখালেখির দল গড়ে তুলেছিল। আমরা ছিলাম পাঁচজন। সময়ের স্রোতে বাকিরা কলম ছেড়ে দিলেও, লেখালেখির সঙ্গে এখন পর্যন্ত একমাত্র আমিই জড়িত আছি।
প্রশ্ন: এমন কোনো বই কি আছে, যা আপনার পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে?
জ্বি, The Analects। প্রায় দুই হাজার বছর আগে সংকলিত এই গ্রন্থটি কনফুসীয় দর্শনের ভিত্তিমূল। কৈশোরে যখন বইটি পড়ি, তখন এর মাধ্যমে কনফুসীয় চিন্তাধারাকেন্দ্রিক চীনা সংস্কৃতির প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতা জন্মায়। সেই আকর্ষণই আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা সাহিত্য নিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর এই গ্রন্থটিই আমাকে একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় যে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে কীভাবে এই চিন্তাধারাকে ক্ষমতাবান ও শোষণমূলক শাসনব্যবস্থাগুলো নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে? সেসময় আমি সিদ্ধান্ত নিই, নিজের জন্য নতুন একটি বৌদ্ধিক ভিত্তি নির্মাণ করতে হবে।
প্রশ্ন: ম্যান্ডারিন ভাষায় লেখা কোন বইটি সবার পড়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আমি বিশ্বাস করি না যে কোনো বইকে ‘অবশ্যপাঠ্য’ বলা যায়। তবে যারা হান-লিপি ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত বিশ্বদৃষ্টিকে বুঝতে চান, তাদের জন্য The Analects একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। তবে আমি সংশয়কে সঙ্গী করেই বইটি পড়তে বলব।
প্রশ্ন: সবশেষে, আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের জন্য মনোনীত কোন বইটি সবার পড়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আগের উত্তরের মতোই বলব যে আমি মনে করি না এমন কোনো বই আছে, যা সবারই পড়া উচিত। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি, ২০১৮ সালের আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের দীর্ঘতালিকায় স্থান প্রাপ্ত, The Stolen Bicycle-কে অসাধারণ একটি উপন্যাস বলে মনে করি। এর রচয়িতা হলেন Wu Ming-Yi ও অনুবাদক হলেন Derryl Sterk।

অনুবাদক পরিচিতি: Lin King একজন তাইওয়ানি-আমেরিকান লেখক ও অনুবাদক, যিনি তাইপে ও নিউ ইয়র্ক—দুই শহরেই বসবাস করেন। ১৯৯৩ সালের ৬ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে তাঁর জন্ম। ‘ইংরেজি সাহিত্য, সৃজনশীল লেখা, ও পূর্ব-এশীয় অধ্যয়ন’ বিষয়ে আমেরিকার Princeton University থেকে স্নাতক অর্জন করেন। পরবর্তীতে, আমেরিকার Columbia University থেকে ‘কথাসাহিত্য ও সাহিত্যিক অনুবাদ’ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
One Story, Boston Review এবং Joyland–সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য সাময়িকীতে তাঁর কথাসাহিত্য প্রকাশিত হয়েছে । ছোট গল্প ‘Appetite’ এর জন্য উদীয়মান লেখকদের জন্য প্রদত্ত PEN/Dau Short Story Prize for Emerging Writers-পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন তিনি।
অনুবাদক হিসেবে তাঁর কাজের মধ্যে রয়েছে ইউ পেই-ইউন এবং ঝৌ জিয়ান-শিন রচিত গ্রাফিক উপন্যাস সিরিজ The Boy from Clearwater, পাশাপাশি Yáng Shuāng-zǐ এর Taiwan Travelogue।
তাঁর প্রথম উপন্যাস Weeb, Henry Holt and Co. প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিতব্য।
প্রশ্ন: Taiwan Travelogue–এর মধ্যে কী এমন ছিল, যা আপনাকে এটি অনুবাদ করতে আগ্রহী করে তুলেছিল?
ব্যক্তিগতভাবে আমি এমন কোনো ঐতিহাসিক উপন্যাস পছন্দ করি না, যেগুলোতে খুব বেশি দুর্ভোগ ও বিষন্নতার ছায়া থাকে। আমার কাছে এসব গল্প সত্য বলে মনে হয় না। কারণ ইতিহাস যতই কঠিন হোক না কেন, মানুষ তার ভেতরেও হাসির মুহুর্ত খুঁজে নেয় এবং গড়ে তোলে ভালোবাসার গভীর কূপ।
জাপানি শাসনামলে কি তাইওয়ানের মানুষ নিপীড়িত ও বঞ্চিত হয়েছিল? অবশ্যই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাদের পরিচয়, ব্যক্তিত্ব কিংবা জীবনবোধ কেবল সেই যন্ত্রণার নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। সেই সময়েও ছিল রসিকতা; ছিল সুস্বাদু খাবার, সিনেমা, বিদ্যালয়, তুচ্ছ ঝগড়াঝাঁটি, এবং প্রেম। এর বিপরীত কিছু ভাবা মানে একটি সংস্কৃতিকে তার ক্ষতচিহ্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলা। এবং Taiwan Travelogue-এ এমনটি হয় নি আর এ বিষয়টির আমি তারিফ করি।
প্রশ্ন: বইটি অনুবাদ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
এটাই ছিল আমার প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস-অনুবাদ। আর শুরুতেই আমি লেখককে ভয় পাওয়ার ভুলটি করেছিলাম। তখন আমার পেশাগত পরিচিতি বা গ্রহণযোগ্যতা খুবই সীমিত ছিল। ফলে Yáng Shuāng-zǐ-কে খুব বেশি প্রশ্ন করতে সাহস পেতাম না। মনে হতো, বেশি প্রশ্ন করলে হয়তো তিনি ভাববেন আমি এই কাজের উপযুক্ত নই। ভবিষ্যতে এই ধরনের ভুল আমি আর করতে চাই না।
তবে অন্যদিকে, বইটির মার্কিন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান Gratwolf Press—এর সম্পাদক Yuka Igarashi-এর সঙ্গে আমি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি। তিনি আমাকে ভাষার জটিল মিশ্রন, বহুভাষিক শব্দচয়ন, ও নানা ধরনের টীকা—এসকল বিষয়াদি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।
আমরা একধরনের ‘সর্বোচ্চবাদী’ কৌশল গ্রহণ করেছিলাম। অনুবাদের প্রচলিত অসংখ্য নিয়ম আমরা ভেঙেছি এবং শেষ পর্যন্ত বহুস্তরবিশিষ্ট, পরীক্ষাধর্মী যে কাজটি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে আমরা গর্বিত।
প্রশ্ন: এ বছরের আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘সীমানা ছাড়িয়ে কথাসাহিত্য’। আপনার মতে, অনূদিত সাহিত্য কীভাবে পাঠককে ভৌগোলিক সীমানার বাইরে দেখতে সাহায্য করে, এবং কেন তা গুরুত্বপূর্ণ?
অনেক সময় ভ্রমণ আমার কাছে হতাশাজনক মনে হয়। আপনি আগে থেকে যতই প্রস্তুতি নিন না কেন, অপরিচিত কোনো দেশে পৌঁছে খুব সহজেই পুঁজিবাদের ফাঁদে পড়ে যেতে পারেন। অজান্তেই এমন কিছু ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে পারেন, যা শোষণ ও বৈষম্যের চক্রকে টিকিয়ে রাখে।
আমার কাছে আদর্শ ভ্রমণ হলো এমন একজন বন্ধুর সঙ্গে পথচলা, যে সেই স্থানটিকে গভীরভাবে চেনে; ইতিহাস বলে, প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে, এবং বিভিন্ন গল্প শোনায়। অনূদিত সাহিত্য ঠিক তেমনই এক বন্ধু। বিশ্বজুড়ে যখন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে, তখন অনুবাদের মাধ্যমে সীমানার ওপারে থাকা মানুষের প্রতি সহমর্মিতা গড়ে তোলা এখন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার তার বর্তমান রূপে দশ বছর পূর্তি উদ্যাপন করছে। আপনার মতে, গত এক দশকে এই পুরস্কার অনূদিত সাহিত্য সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে কীভাবে বদলেছে?
ইংরেজিভাষী সাহিত্যজগৎ দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলকভাবে খুব অল্প পরিমাণ অনূদিত সাহিত্য প্রকাশ করে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে সাহিত্য পুরস্কারগুলো যখন অনূদিত কথাসাহিত্যকে সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে ও স্বীকৃতি দেয়, তখন তা পাঠকের সামনে নতুন নতুন বিশ্বদৃষ্টির দরজা খুলে দেয়।
বাস্তবতা হলো, আজও ইংরেজি বিশ্বের প্রধান যোগাযোগভাষা। ফলে বুকার পুরস্কারের মতো মর্যাদাপূর্ণ কোনো ইংরেজিভাষী পুরস্কার যখন কোনো অনূদিত বইকে আলোচনায় নিয়ে আসে, তখন কেবল সেই ইংরেজি সংস্করণই নয়; বরং বইটির জন্মভূমি, তার মূল ভাষা, এমনকি অন্যান্য ভাষার প্রকাশকরাও নতুন করে মনোযোগ পায়। প্রতি বছর বুকার পুরস্কার এই গুরুত্বপূর্ণ গল্পগুলোকে শুধু ইংরেজিভাষী বিশ্বের ভেতর নয়, বরং সমগ্র পৃথিবীর পাঠকমহলে পৌঁছে দেয়।
প্রশ্ন: আমাদেরকে এমন একটি বইয়ের কথা বলবেন কি যা শৈশবে আপনাকে বইমুখী করে তুলেছিল?
এগারো বছর বয়সের আগ পর্যন্ত, আমি ইংরেজিতে সাবলীল ছিলাম না। আর নিজের চেষ্টায় প্রথম যে ইংরেজি অধ্যায়ভিত্তিক বইগুলোর একটি পড়ে শেষ করতে পেরেছিলাম, সেটি ছিল Roald Dahl এর Matilda।
ছোটবেলায় আমার শরীর খুব দুর্বল থাকায় জিম ক্লাসে খুব একটা সুবিধা করতে পারতাম না। সেসময় বই ছিল আমার জন্য এক ধরনের আশ্রয়স্থল। আর তাই ম্যাটিল্ডার অভিযাত্রা আমার কাছে ছিল একাধারে আনন্দময় ও অনুপ্রেরনামূলক। আর হ্যাঁ—ভীষণ মজারও।
প্রশ্ন: এমন কোনো বই কি আছে, যা আপনাকে অনুবাদক হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল?
হ্যাঁ, Elena Ferrante-এর Neapolitan Novels। আমি যখন মাত্র কলেজ শেষ করেছি তখন এই উপন্যাসমালার ইংরেজি অনুবাদ খুব জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল, যার অনুবাদক ছিলেন Ann Goldstein।
আমি যখন সাহিত্যকে পেশা হিসেবে বেছে নেব কি না তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলাম, তখন এই সিরিজ আমাকে বুঝিয়েছিল যে একটি গল্প তার স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা ও বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থেকেও পৃথিবীর অন্য প্রান্তের পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করতে পারে।
এই উপন্যাসমালা আমার মনে গেঁথে থাকা দীর্ঘদিনের একটি ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে দিয়েছিল। আমি ভাবতাম, অনুবাদে গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে গল্পকে সব সাংস্কৃতিক খাঁজ মুছে ফেলে এমন এক মসৃণ রূপ ধারণ করতে হবে, যা যে-কোনো ইংরেজি পাঠকের কাছে অবিলম্বে বোধগম্য হয়। এই বইগুলোর মাধ্যমে আমি জানলাম যে, একটি গল্প তার নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেও মানুষের সার্বজনীন অনুভূতিকে স্পর্শ করতে পারে।
প্রশ্ন: এমন কোনো অনুবাদক আছেন, যার কাজ আপনি সবসময় খুঁজে পড়েন?
Leri Price। আরবি ভাষা থেকে জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট বয়ানকে তিনি এমনভাবে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন, যা একই সঙ্গে আবেগঘন, তথ্যসমৃদ্ধ ও আশ্চর্যরকম স্বচ্ছ। তাঁর অনুবাদ পড়তে গিয়ে আমার মনে হয় যেন কেউ দৃঢ় অথচ কোমল হাতে আমাকে এমন এক ভূদৃশ্যের ভেতর দিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যার সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুবই সীমিত। তিনি নিশ্চিত করেন যেন আমি পথ হারিয়ে না ফেলি, আবার একই সঙ্গে আমার পূর্বধারণাগুলোকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করান।
প্রশ্ন: ম্যান্ডারিন ভাষায় লেখা কোন বইটি ইংরেজি ভাষাভাষী পাঠকের পড়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
Terao Tetsuya( এটি তাইওয়ানের লেখক Tsao Sheng-Hao এর ছদ্মনাম) রচিত ও Kevin Wang অনূদিত Spent Bullets বইটির কথা আমি বলব। এই উপন্যাস একদিকে যেমন এক কুইয়ার তরুণের বেড়ে ওঠার গল্প, অন্যদিকে এটি তাইওয়ানের সেই তীব্র একাডেমিক প্রতিযোগিতার দলিল, যার স্রোত শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায় সিলিকন ভ্যালিতে।
বইটি BDSM, প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা, বিষণ্নতা, আত্মমূল্যবোধ—এমন নানা জটিল বিষয়কে এমনভাবে তুলে ধরে, যা আমি আগে কোনো ভাষার সাহিত্যেই দেখিনি। কেভিন ওয়াং-এর অনুবাদও অসাধারণ—কখনও সংকোচবোধক ও বুদ্ধিদীপ্ত, কখনও সংযত ও নীরব। সব মিলিয়ে এটি যেন নিহিলিস্টিক প্রতিভাবান কিছু মানুষের মনোজগতের মধ্য দিয়ে এক উন্মত্ত যাত্রা।
প্রশ্ন: সবশেষে, আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের জন্য মনোনীত কোন বইটি সবার পড়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
এ বছরের মনোনীত বইগুলো আমার এখনও পড়ে ওঠার সুযোগ হয়নি। (আমি এই উত্তর লিখছি মনোনয়ন ঘোষণার এক সপ্তাহ পরে।)
তবে লেখক Olga Ravn ও অনুবাদক Martin Aitken এর The Employees বইটি আমার খুব ভালো লেগেছে। লেখক -এর সেই কাজের অভিজ্ঞতা থেকেই আমি আগ্রহ নিয়ে The Wax Child বইটির জন্য অপেক্ষা করছি।
আর গত বছরের মনোনীত বইগুলোর মধ্যে লেখক Vincenzo Latronico ও অনুবাদক Sophie Hughes এর Perfection এবং লেখক Saou Ichikawa ও অনুবাদক Polly Barton এর Hunchback—এই দুটি বই আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল।