Published : 09 Jun 2026, 08:29 PM
০.
কোনো কোনো কবির কাব্য নিজগৃহে সীমাবদ্ধ থাকে, আরেক প্রকারের কবির বন্ধুগৃহ পর্যন্ত পৌঁছায়, আবার কোনো কোনো কবির কাব্য বিশ্বভ্রমণে কৌতূহলী হয়ে মূর্খ ব্যক্তিদের মুখে পদাঘাত করে এগিয়ে চলে। প্রাচীন ভারতের আলঙ্কারিক রাজশেখর তাঁর কাব্যমীমাংসায় এ কথাটি বলেছেন। তিনি এর যোজক হিসেবে আরও বলেছেন, ‘কবিত্বের রহস্যময় শক্তি’র কথা। জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে আলোচনায় এ কথামুখটি দিয়ে আমার আলোচনা শুরু করছি। জীবনানন্দ এখন বিশ্বকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছেন তাঁর কবিতা দিয়ে। নিজঘর, বন্ধুঘর থেকে তিনি কবিতার এক মহান জাদুকর হয়ে সমগ্র বিশ্বে দেখিয়ে চলেছেন কবিতার একের পর এক ‘খেইল’। কিন্তু এর জন্য তাঁকে দিতে হয়েছিল চড়া মূল্য: একটি একাকী ও প্রলম্বিত ইচ্ছামৃত্যু যার জন্য বস্তুত তাঁর কোনো খেদই ছিল না। তাঁর কবিতার কাছে যাওয়ার মানে হলো এক ‘ওশানিক ফিলিংস’-এর মুখোমুখি হওয়া, কবিতার ভরকে বহন করা। কীভাবে তাঁকে নিজ করি? আমার উপায় হলো এক নাছোড় ইম্প্রেশন যা দিয়ে তাঁর মুহূর্তকে আমি এঁকে চলি, আমার মুহূর্ত করে চলি। আমি আঁকি তবে আমার ভরসা হলো রবীন্দ্রনাথের উৎসর্গ কাব্যের ‘প্রসাদ’ কবিতার শিশিরকণাটির মতো, যে সূর্যকে বলে: তোমা ছাড়া মোর ক্ষুদ্র জীবন কেবলি অশ্রুজল, কিন্তু সূর্যকে বেঁধে রাখার তার কোনো বল নেই; কেবল ভরসা হলো সূর্য যদি সে নিজে ধরা দেয় যা সূর্য তাকে প্রতিশ্রুতিও দেয়: তবু শিশিরকণারে ধরা দিতে পারি/ বাসিতে পারি যে ভালো।
১.
বাংলা কবিতায় জীবনানন্দকেই বলা যায় প্রথম নেতি-সম্ভবের (negative capabilities) কবি। এবং তিনি অসম্ভব সার্থকও এক্ষেত্রে। নেতি-সম্ভবতা এমন একটি অবস্থা যা মানুষের অনিশ্চয়তা, রহস্য, ভঙ্গুরতা ও সংশয়কে নিয়ে বিরাজমান থাকে, থাকতে চায়, রাতারাতি কোনো স্থান পরিবর্তন না করে। আমরা জানি, কিটস ১৮১৭ সালে ভাইকে তাঁর লেখা এক চিঠিতে প্রথমবারের মতো এই বিষয়টি আলোকপাত করেন এই বলে যে, মানুষের সৃজনশীলতা তখনই প্রতিভাত হয়ে ওঠে যখন সে অনিশ্চয়তা, রাহসিকতা ও ধন্দের মধ্যে অবস্থান করতে পারে। কিটসের ‘ওড টু দ্য নাইটিঙ্গেল’ বা ‘ওঠ অন দ্য গ্রিসিয়ান আর্ন’ কবিতায় এই প্রবণতা স্পষ্ট; জীবনানন্দের ক্ষেত্রেও ‘অবসরের গান’, ‘জীবন’ ইত্যাদি কবিতায় তা স্পষ্ট। এই নেতিবাচক দ্বন্দ্বের সঙ্গে পরোক্ষভাবে মিল আছে বুদ্ধদর্শনের ক্ষণভঙ্গুরবাদের, যেখানে জগতের অনিত্যতার বিষয়টিকে দার্শনিকতায় ভাস্বর করা হয়েছে নিত্য হিসেবে। এটি স্বভাবশূন্যের কথাও বলে যা আমাদের নেতি-ক্ষমতার কাছাকাছি যায়। রবীন্দ্রনাথকে সবল বিবেচনায় রেখেই, রলাঁ বার্তের বর্গসূত্রকে ধরে বলতে পারি, বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দই প্রথম ‘টেকস্ট অব ব্লিস’ রচনা করেছেন, কারণ তাঁর কবিতা পূর্বধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়, ভাষা ও অর্থের স্থিরতাকে ভেঙে দেয়। ‘টেকস্ট অব প্লেজার’ পাঠকের প্রত্যাশাকে পূর্ণ করে, তৃপ্ত করে, স্থিরতাকে উপহার দেয়; অন্যদিকে ‘টেকস্ট অব ব্লিস’ পাঠককে রূপান্তরিত করে, অন্য-এক পাঠক করে তোলে, এক পাঠকের ভেতরে অসংখ্য পাঠকের জন্ম দিতে থাকে। উদাহরণত বলতে পারি, সুধীন্দ্রনাথের ‘শাশ্বতী’ কবিতাটির কথা যা পাঠান্তে যে-কোনো পাঠকই তৃপ্তি আর আনন্দে সুখী বোধ করবেন, একটি কাব্যিক সুখ তাকে আবিষ্ট করে রাখবে। এটা হলো টেকস্ট অব প্লেজার ধারার কবিতা। কিন্তু জীবনানন্দের ‘মৃত্যুর আগে’ কবিতাটি পড়লে পাঠক প্রথমত বিস্মিত ও অতঃপর বিমূঢ় হয়ে পড়বেন, তিনি ঘোরগ্রস্ত হবেন এবং নির্জ্ঞানের তাড়নায় অন্তর্গতভাবে পরিবর্তিত হতে থাকবেন। এর সঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, জীবনানন্দর শৈলী এক্ষেত্রে কোনো অলংকার নয়, নয় কোনো কৌশলও; বরং তাঁর কাছে শৈলী হলো বিশেষ রূপকৈল্পিক গুণ, এক মহাবিশ্বের উদ্ঘাটন। এই ভিন্ন শৈলীর প্রয়োজন হয় আমাদের সামনে আরেকটি ভিন্ন জগৎকে উন্মোচনের জন্য, তাকে পরিচিত করার জন্য। জীবনানন্দের শৈলী আসলে অন্তর্জগতের প্রকাশ, এক অধিবিদ্যক পরাদৃষ্টির আতশিকাচ।
কিন্তু জীবনানন্দর এই রূপান্তর বিভাবের আধাররূপ হলো, তাঁর কবিতা সৃষ্টিশীল নির্জ্ঞানের ওপর অধিক নির্ভরশীল। এই রূপান্তরিত সৃষ্টিশীল নির্জ্ঞান এক রহস্যময় ও অজানা জগৎ। এটি একটি অন্ধকারকে ধরে রাখে, যেখানে এক ধরনের স্থিতিগতির চলন দৃষ্ট হয়। নির্জ্ঞানের অন্ধকার হলো কবির সৃষ্টির উৎসভূমি, এবং এখান থেকেই , সবকিছুর পর, কবিতার পরাবাস্তবিক উড্ডয়ন শুরু হয়। সুতরাং সৃষ্টিশীল নিয়মনীতি গভীরভাবে প্রোথিত থাকে নির্জ্ঞানের গভীর ও অন্ধকারতম প্রদেশে যা আমরা তার অস্তিত্বের ফলাফল থেকে বুঝতে পারি। বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অধিকাংশত অন্ধকার। স্থান প্রায় খালি, নক্ষত্র ও গ্যালাক্সিগুলোর মাঝখানটার বিশাল এলাকা প্রায় পদার্থহীন এবং প্রায়ই নিরালোক। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বলে যে এসব এলাকা রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জিতে পূর্ণ। সুতরাং এই কসমিক ডার্কনেস বা ব্রাহ্মাণ্ডিক আঁধার সাহিত্যে এসে আস্তিত্বিক একাকিত্ব এবং মহান রহস্যে পরিণত হয়েছে, এটা ভাবলে সমস্যা নেই। রূপান্তরিত সৃষ্টিশীল নির্জ্ঞান এবং অণুবিশ্ব ও আবিশ্বের এই আন্ধকারিক সম্পর্কসূত্রকে বুঝলে জীবনের ও জীবনানন্দর অন্ধকারকে বোঝা সহজ হয়।
কিন্তু তার আগে দেখা যাক জীবনানন্দীয় আধুনিকতার অবস্থাটা কেমন।
২.
জীবনানন্দ কি আধুনিক ছিলেন? প্রশ্নটা আশ্চর্যেরও জন্ম দিতে পারে। সব কালের যে আধুনিকতা তাকে না ধরে আমরা যদি আধুনিকতাবাদের তথাকথিত আধুনিকতাকে ধরি, তবে ভাবাই সংগত যে তিনি সম্পূর্ণত আধুনিক ছিলেন না। কেতাবি আধুনিক হলে লিখতে পারতেন না রূপসী বাংলা বা মহাপৃথিবীর মতো কাব্য। তিনি ছিলেন এক অর্থে আধুনিকতাকে পেরিয়ে যাওয়া এক বিনির্মাণকারী। আধুনিকতাবাদকে তাঁর মনে হতো আপতিক বিষয়। কেননা আধুনিকতার সম্প্রত্যয়গুলো যে অচিরেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে, তা হয়তো তিনি তার চিরন্তন বোধ দ্বারা বুঝতে পেরেছিলেন। যে আধুনিক চেতনার নিয়তি পৃথিবীচ্যুতি বা মানববিবিক্তি, যে আধুনিকতা চেতনার খণ্ডিত উপস্থাপনে আগ্রহী, সেই আধুনিকতাকে মনে মনে মেনে নিলে তিনি বলতে পারতেন না: ‘অনেক রাত্রির শেষে তারপর এই পৃথিবীকে/ ভালো ব’লে মনে হয়।’ দ্বন্দ্ব ছিল তাঁর, সত্যকে আচ্ছন্ন বলে মনেও করেছেন। হয়তো ঈশ্বরে বিশ্বাস ছিল বা ছিল না, হয়তো-বা ছিলেন সন্দেহ বা অজ্ঞেয়বাদী। স্টোয়িকদের মতো নির্বিকারত্বও তাঁর মধ্যে ছিল বলে মনে করা যায় বা যায় না; আবার বিচলনবোধে, সিদ্ধান্তহীনতায়ও আক্রান্ত হতেন প্রায়শই। ধর্ম সম্পর্কে তেমন কিছু বলেনওনিবলার ক্ষমতা নেই, এই ছুতো তুলে এড়াতে চেয়েছেন ব্যাপারটা। তবে দু-একটি প্রবন্ধে বা উপন্যাসের চরিত্রের মুখ দিয়ে তাঁকে বলতে দেখি কিছু কথা। ‘যুক্তি জিজ্ঞাসা ও বাঙালি’ প্রবন্ধে তিনি বলেন: ‘বিশ্বাসী ধর্মাশ্রয়ীরা কেবলমাত্র নীতি ও যুক্তিকে ধর্ম ব’লে মনে করে না, এগুলো বাদ দিয়েও ধর্ম চলে, তাদের মতে ধর্মসাধনায় এমন কোনো চৈতন্যের দরকার নেই যার ফলে বিশ্বাস জন্মাবার আগে যুক্তি ও জিজ্ঞাসার জন্ম হয়। কথাটা ভেবে দেখার মতো; হয়তো অসত্য নয়; কিন্তু প্রায় লোকের হাতেই এর অপব্যবহারের সম্ভাবনা, যারা অশিক্ষিত আধা-শিক্ষিত তারাই শুধু নয়, অনেক সুশিক্ষিত বুদ্ধিমান লোকও ভক্তিকেই ধর্ম মনে করেন--অন্ধভক্তিকেও। ঈশ্বর আছেন কি-না স্বতন্ত্র কথা। কিন্তু খুব সম্ভব কারো নেহাতই ভাবাবেগের ফলের ভিতর তিনি বা তাঁর অন্ধ স্বরূপের কিছু আছে ব’লে মনে হয় না।’ এই কথাটির মোক্ষমতা এ সময়ে আরও বেশি যেন সত্য হয়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেছেন, ধর্মের সত্যগুলো বিজ্ঞানের হাতে চলে গেছে। কারু-বাসনা উপন্যাসেও চরিত্রের মুখ দিয়ে ধর্ম বিষয়ে দ্বন্দ্ব প্রকটিত হতে দেখা যায়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তথাকথিত পুণ্যের পাপ নিয়ে জীবনানন্দ মৃদুভাবে প্রশ্ন তুলেছেন, যা আধুনিকবাদীর আংশিক লক্ষণ। কিন্তু মঙ্গলবোধ ও মানবভাবনা তাঁকে তাড়িয়ে ফিরেছে, নীতিকে ধর্ম মনে করতে পারলে সুখ বোধ করার কথা তিনি বলেছেন। একবার অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেন ‘কী মানো’, তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘মানুষের নীতিবোধ মানি’। তাঁর তরুণ সহকর্মী অজিতকুমার ঘোষকে কখনও জিজ্ঞেস করে বসেন এই প্রশ্ন , মৃত্যুর পর ‘কী’। আবার কখনও তাকে শুনিয়ে দেন মৃত্যুর আগে জন স্টুয়ার্ট মিলের বিখ্যাত উক্তিটি: ‘যদি তুমি থাকো, তাহলে হে ঈশ্বর, আমার আত্মার মঙ্গল কোরো, যদি আত্মা বলে কিছু থেকে থাকে।’ আরেকবার ‘ব্রহ্মে বিশ্বাস করেন কি না’, এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হয়ে তিনি ‘না’ বলে জানান যে তিনি মানবে বিশ্বাস করেন। তবে বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের অন্তিম আলোড়ন যে বিশৃঙ্খলতা আনে, সে বিষয়ে উদ্বেগের কথাও তিনি বলেছেন। আর একটি বিষয়, রোমান্টিকেরা যেমন মহাপৃথিবীকে অবলোকনের জন্য কল্পনাপ্রতিভা, জগৎকে বোঝার জন্য প্রকৃতিকে গুরুত্ব দেন, জীবনানন্দর মধ্যেও এর ছায়াসম্পাত কিছুটা হলেও ছিল বলে মনে করা যায়। আমরা জানি ওয়ার্ডসওয়ার্থের ভ্রমণপিপাসার কথা, জানি আরও অনেক রোমান্টিকদের হাঁটার নেশার কথা, কেননা তাঁরা প্রকৃতিকে নিজের মতো পরিগ্রহণের জন্য হাঁটতে ভালোবাসতেন; হাঁটাই বস্তুত বাহ্য প্রকৃতির সাথে ব্যক্তির প্রত্যক্ষ সংযোগ ঘটিয়ে থাকে। এর বিপরীতে আধুনিকেরা ঘরকুনো, প্রকৃতিবিমুখ এবং আত্মক্লিষ্ট। এ বিবেচনায় জীবনানন্দকে আধুনিকতাবাদীর তকমা দেওয়াটা কষ্টকর হয়ে যায়, যদিও তিনি তাঁর কবিতাকে আধুনিক কবিতা বলেছেন। সেটা হয়তো সবকালের জন্য প্রযোজ্য আধুনিকতা অর্থেই তিনি বলেছেন। তবে তাই বলে তাঁকে উত্তরআধুনিকও বলা যাবে না। তাহলে কী বলা যাবে তাঁকে? আমরা সোজাসাপটা ভাবে তাঁকে বলতে পারি কবি----প্রাচীন গ্রিক অর্থে পোইয়েতেস: যিনি কোনো কিছুকে অস্তিত্বে আনেন। বা প্রাচীন ভারতীয় নিষ্পন্নে কাব্যপুরুষও বলতে পারি তাঁকে যিনি কোনো কিছুর মধ্যে আবদ্ধ থাকেন না। নিশ্চয় তিনি আধুনিক কিন্তু আধুনিকতাবাদের আধুনিকতাতে তিনি শুধুমাত্র থাকেন না। তিনি এক চিরন্তন অধিকরণ।
জীবনানন্দর কবিতাকে কীভাবে রূপসম্ভব করা যায়? আমরা বলতে পারি ল্যান্ডস্কেপিং, ভূদৃশ্যায়ন, যা তাঁর আগে বাংলা কবিতায় ঘটেনি। এর সঙ্গে স্মৃতির বেদনা যা তাঁর ক্রিয়েটিভ আনকনশাস থেকে উঠে এসেছে। কিন্তু এই সব ঠিক জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো নয়, বরং আগুন নিভে যাওয়ার পর ছাইয়ের মধ্যেকার আগুনের এক দগ্ধ রূপকে শান্তভাবে উপস্থাপন করে। এহো বাহ্য, পৃথিবীর সাহিত্যিক নামকরণের দায়িত্ব তিনি নিয়েছিলেন যেখানে যাবতীয় জৈব ও অজৈব সত্তা এক অভিন্ন সঞ্চরণে মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে পেরিয়ে যেতে চায়। তারা এমন একটি অন্ধকারকে রূপভাসিত করে যেখানে সকল সত্তা একত্রে ওঠাবসা করতে চায়। অনেক সময় রেনে ম্যাগরিতের ছবির মতো মাধ্যাকর্ষণমুক্ত হয়ে যেন ওপরে, মহাশূন্যে, উঠে যেতে চায়। নামকরণের আরেকটি দিক হলো পোজেসিভ অ্যাডজেক্টিভের পাশাপাশি কমপাউন্ড নাউনের ব্যবহার: ‘তাহাদের হৃদয়ের বোন’--- এখানে তাহাদের হলো পোজেসিভ অ্যাডজেক্টিভ আর হৃদয়ের বোন হলো কমপাউন্ড নাউন। কবিরা এই বস্তুবিশ্বের নামকরণ করেন, এবং তা করেন বস্তুর বা ভূগোলের অন্তর্গত রূপকে আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রীতিব্যঞ্জক শব্দপ্রয়োগের দ্বারা, প্রকৃতিস্মরণ ও অঙ্কনের দ্বারা । জয়েস বলেছিলেন, যদি ডাবলিন শহরটা কখনও পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায় তবু ইউলিসিস পড়ে জানা যাবে কেমন ছিল শহরটা; এই কথাটিকে শিরোধার্য করে আমরাও বলতে পারি, যদি বাংলাভূমি হারিয়ে যায় কখনও, তখন রূপসী বাংলা পড়ে বলা যাবে কেমন ছিল বাংলা। এভাবেই জীবনানন্দ অন্য একটি প্রতিবিশ্ব সৃষ্টির মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বকে নামকরণ করেন। এখানে আমরা মনে রাখব দার্শনিক লাইবনিৎসের এ কথাটি যা জীবনানন্দের নামকরণের বিষয়টিকে বুঝতে সহায়ক হবে: সম্ভাব্যের যে জগৎ তা বাস্তব জগৎ থেকে অনেকানেক প্রসারিত।
৩.
এই যে অব্যবস্থিত জীবন, এই যে তমসজীবন, এই যে নিরোধজীবন, এই যে আবদ্ধজীবন,--এই ভাবপ্রপঞ্চের আঁতুড়ঘর রয়েছে কিছু মানুষের চিন্তায়, বা বলা ভালো নির্জ্ঞানে। তাদের চিন্তাই প্রথম তাদের বুঝতে শেখায় যে এ পৃথিবীতে সত্তার অবলীলা এমন অবস্থায় উপনীত হতে পারে, যখন ব্যক্তি তার বিচ্ছিন্নতার বিন্দুটিকে চিহ্নিত করতে পারেন শুধু তার চিন্তার সামর্থ্য। সাহিত্যের জোরালো দিক হলো, সাহিত্য তার কথা দিয়ে সমগ্রের না হোক, কিছু মানুষের জীবনকে পরিচালিত করতে পারে ক্ষণিকের জন্য হলেও। আর এই চিন্তনের সূত্রপাত হতে পারে মন্থর দেহপরিক্রমায়। মানসভ্রমণ কবির স্বাভাবিক অভিমুখ, কিন্তু শারীরিক ভ্রমণ তাকে জোগায় উদ্যোগ। আর এমতে যে চিন্তার উদ্গম হয় তারা সূত্রবদ্ধ নয়, তারা খণ্ডিত এবং তির্যক। জীবনানন্দর কবিতা, এমনকি গদ্যও, কখনও কখনও মনে হয় সামগ্রিক চিন্তার গতিভঙ্গি, যা মোটেই অবচ্ছিন্ন নয়। মনে হয়, কবিতায় অনুচিন্তারা স্থান করে নিয়েছে তাঁর জীবনবীক্ষার কোনো অস্থির মুহূর্তে ভর করা ভাবনার হঠাৎ প্রাপ্তিতে, খণ্ডিত উপায়ে। আর মনে করাই যায়, এসব চিন্তা বা তার প্রতীকের জন্ম হয়েছে কোনো সৃষ্টিশীল অনুবর্তনের সময়ে। এককভাবে সে বুঝতে শেখে পৃথিবীর বহির্বস্তু ও অন্তর্বস্তুকে, দুইয়ের সম্পর্ককে, তাদের রূপপ্রকৃতি ও অসহায়তাকে। সে সংযোগ স্থাপন করতে পারে মহাপৃথিবীর অদৃশ্য উপস্থিতির সাথে। এটা সম্ভব হয় বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতার কারণে। একটি সময়-এককে ব্যক্তি চারপাশের জগৎ থেকে মুক্ত করতে পারেন নিজেকে, পরাদৃষ্টির উন্মোচনের মাধ্যমে। এই আপাত বিযুক্তি তাকে আবার যুক্ত করে অন্য কিছুর সাথে। কিন্তু যে চিন্তারা হানা দেয়, লেখার সময় তার সামগ্রিকতা ভেঙে যায়। ভেঙে যে যায়, তা-ই হয়ে ওঠে কবিতার উপযোগী চিন্তা। তা না হলে এই চিন্তা কবিতায় সফলভাবে স্থান করে নিতে পারত না। সুতরাং চিন্তা ভেঙে যে অণুচিন্তারা সংবেদিত হয়, কবিতার জন্য তা হয়ে ওঠে মহার্ঘ। জীবনানন্দর কবিতায় এই অণুচিন্তন পুনর্জন্ম নেয়। সুতরাং যে উপাদান বা গতিভঙ্গি তিনি সময়ে সময়ে পেয়েছেন, মনে করা সংগত যে তারই আভিপ্রায়িক সম্পর্কগুলো কবিতায় প্রতিস্থাপন করেছেন তিনি। রূপসী বাংলার শেষ কবিতাটিতে তিনি বলছেন: ‘মনে হবে, পৃথিবীর পথে যদি থাকিতাম বেঁচে’, অর্থাৎ তিনি চিরপথিক হওয়ার আকুতি প্রকাশ করছেন। আসলে কবি ছাড়া কে আর তাকাতে পারে বস্তুসৌন্দর্যের দিকে, আশ্চর্য বিস্ময়ে, আর সেইসব বস্তুসুন্দরকে নামকরণ করতে পারে!
৪.
আমরা জীবনানন্দর অব্যবস্থিত সত্তার কথা জানলেও তাঁর পথিকসত্তার কথা জানি না। তাঁর পথিকসত্তা প্রকৃতপক্ষে এক অন্ধকারের দিকে যাত্রা, সেই অবিনাশী অন্ধকার যাকে আমরা বহন করে আনি জন্মপূর্ব স্থান থেকে আর পৌঁছে দিই মৃত্যুপরবর্তী কালে।
ভ্রমণ আসলে পথের হাতছানির ফল, যা হয়তো হয়ে ওঠে জীবনের অনুস্মরণ। ভ্রমণ তাই পথের অন্তরঙ্গতা, আশ্লিষ্টতা এবং অনিঃশেষ চেতনা। হাঁটা মানে নতুন পথের আবিষ্কার বা পুরোনো পথের নতুন আবর্তন। তাঁর বনলতা সেন কাব্যের শেষ কবিতাটির নাম ‘পথ হাঁটা’, যা এই বিষয়ের এক ইঙ্গিতবাহিতাকে প্রতিপন্ন করে:
কি এক ইশারা যেন মনে রেখে একা একা শহরের পথ থেকে পথে
অনেক হেঁটেছি আমি; অনেক দেখেছি আমি ট্রাম-বাস সব ঠিক চলে;
তারপর পথ ছেড়ে শান্ত হয়ে চলে যায় তাহাদের ঘুমের জগতে:
এ পৃথিবীতে কে না হাঁটে? জীবন তো হাঁটা আর হাঁটা, থেমে থেমে হাঁটা বা হেঁটে হেঁটে থেমে যাওয়া। খোঁড়াও হাঁটে, মনে মনে বা ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে; অন্য প্রাণীরাও হাঁটে। প্রাচীন গ্রিক পুরাণের এরেবুসে মৃতরাও হাঁটে। জেগে ওঠার আগ আর পর, হাঁটা চলে বিরাম নিয়ে নিয়ে অবিরাম, পথে-বিপথে, অনন্তের পিছু পিছু, একা বা যৌথভাবে। অনেকে নিদ্রার ভেতরও হাঁটেন, তারা তো স্বপ্নচারী: স্লিপ ওয়াকার। সেই কবির কবিতার মতো যেখানে কবি বলেন, ‘উই আর দ্য স্লিপ ওয়াকার, উই আর দ্য ড্রিমার অফ ড্রিমস।’ কিন্তু বলতে চাইছি সত্যিকারের সেই হাঁটার কথা, যার পরতে পরতে, যার মুহূর্তপ্রতিমে কেলাসিত হতে থাকে ভাবনা, শেষ পরিণতি যার সৃষ্টিতে। এ পৃথিবীতে হাঁটার সময়টিই, মনে হয়, সবচেয়ে সৃষ্টিশীল। দৌড়াতে দৌড়াতে কেউ ভাবতে পারে না। বসে বসে যে ভাবনা, তা মূলত সংযোগরহিত। হাঁটা সৃষ্টিশীল দেহ-সঞ্চরণ, তা মানুষকে করে তোলে ব্যতিক্রমী চিন্তাশীল। কিন্তু তা কখনও কিছু মানুষকে এমন এক আচ্ছন্নতা দেয়, যা জীবনকে বিপন্ন করে তোলে চিন্তাকে উসকে দিয়ে। তাঁকেও তাই করেছিল। সেই হাঁটা যা জন্ম দিয়েছিল মৃত্যুপরিণতির, তাঁকে করেছিল পুরোপুরি আচ্ছন্ন, এমনকি মানসিক সামীপ্যে জগদ্বিচ্ছিন্ন। জেগে জেগে তিনি যেন এ পৃথিবী থেকে বিমুক্ত হয়ে পড়েছিলেন, তা না হলে কেন এই শ্লথগতিযানের নীচে চাপা পড়বেন, কেন আনমনে দাঁড়িয়ে থাকবেন তাঁর বহু কবিতার স্মৃতিধর ট্রামলাইনের ওপর! হ্যাঁ, জীবনানন্দ দাশ। তাঁর হাঁটার অভ্যাস ছিল বরাবরই। এই হাঁটা ছিল না অবকাশ বা বিনোদনজনিত, বরং তা ছিল চিন্তা ও অনুভূতির সমিধ সংগ্রহের এক সংরাগ; ঠিক নিটশের মতো বা বিভূতিভূষণের মতো। হাঁটার সময় চারপাশ অন্তর্বীক্ষণে তিনি হয়ে উঠতেন ঋদ্ধ, অনুপ্রাণিত, তাঁর ভাষায়, ‘একা একা হেঁটে হেঁটে এদের গভীর শান্তি হৃদয়ে করেছি অনুভব।’ সেই বরিশালের জীবনেও হেঁটেছেন, জানা যায় তিনি হেঁটে হেঁটেই ব্রজমোহন কলেজে যেতেন। ছোটোবেলায় বাবার সাথে বাড়ির সামনের খালি পড়ে থাকা জমিতে সকালে বা সন্ধ্যায়, সুযোগমতো, পায়চারী করে বেড়ানো ছিল তাঁর অভ্যাস। কলকাতায়ও নানা কিছু দেখার টানে, প্রকৃতিকে উপভোগের জন্য, প্রায় দিনই দীর্ঘ পথ, প্রায় পাঁচ-সাত মাইল হাঁটতেন তিনি; কখনও সঙ্গীসহ, কখনওবা একা। সঙ্গী হিসেবে পেতেন প্রতিবেশী বন্ধু সুবোধ রায় বা তরুণ সহকর্মী অজিতকুমার ঘোষকে। কলকাতায় যে পথরেখা ধরে তিনি ভ্রমণ করতেন তা ছিল--ল্যান্সডাউন থেকে শুরু করে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ দিয়ে কিছুটা পশ্চিম দিকে, এরপর রসা রোড ধরে সাদার্ন অ্যাভিনিউ ধরে গড়িয়াহাটা গোলপার্ক পর্যন্ত; কখনওবা ঢাকুরিয়া লেক থেকে ছোটো লেক হয়ে টালিগঞ্জ ব্রিজ পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে হাঁটতেন। যানবাহনে নয়, হেঁটেই কোথাও যেতে চাইতেন তিনি, আর হাঁটতে হাঁটতে চারপাশে দেখতে চাইতেন প্রিয় বকুল আর কৃষ্ণচূড়া। সুবোধ রায় বলেছেন, একই পথে রোজ হাঁটতে তিনি পছন্দ করতেন না। একবার একঘেয়েমি ছাড়তে সন্ধ্যার পর তাঁরা গেলেন রোয়িং ক্লাবের পাশে ছোট্ট লেকের নিভৃত কোণে, আর জীবনানন্দ সেই সৌন্দর্যে মুগ্ধ আর চিত্রার্পিত হয়ে গেলেন যেন! কখনও পড়ন্ত দুপুরেও একাকী হাঁটতেন তিনি। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তও বলেছেন দুজনে মিলে ‘চৌরঙ্গী ছাড়িয়ে গড়ের মাঠের দিকে’ বেড়ানোর কথা। বস্তুত হাঁটা ছিল জীবনানন্দের নৈঃসঙ্গচেতনা এবং জীবনাচ্ছন্নতার বাহ্যিক দিক। তাঁর দেহমানসের বাহ্যিকতা হাঁটায় পেত মাত্রা। শেষ বয়সে ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হওয়ায় হাঁটা হয়ে পড়েছিল রোজকার দায়িত্বের মতো, তবু হাঁটা যে ছিল তাঁর অন্তরঙ্গ সংরাগ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ভাই অশোকানন্দ দাশ বলছেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমাদের রক্তে--বিশেষ করে দাদার--হাঁটার নেশা ছিল। স্মরণপ্রান্তের প্রায় শেষ সীমানায় গিয়ে মনে হচ্ছে, পঞ্চাশ বছর পূর্বে খুব ছোটবেলায় নেপালে নয়,--নেপালের কাছে সুপোলে গিয়েছিলাম। রোজই সকালে ও সন্ধ্যার প্রাক্কালে সেখানকার জনবিরল উদার প্রান্তরে আমরা হেঁটেছি। মাঠে হাঁটতে হাঁটতে, আকাশের বুকে মেঘ পাল তুলে সাঁতার কেটে যাচ্ছে দেখে, দাদা বলতেন, ‘‘জানিস, বড় হ’য়ে আমি এমন নৌকা তৈরী করব, যাতে করে তুই ঐ মেঘের মতন আকাশে বেড়াতে পারবি।’’ মনপবনের নৌকার যাঁরা মাঝি, তাঁরা বলতে পারবেন সে-রকম নৌকা তৈরী হয়েছে কি-না। প্রায় ছোটবেলা থেকেই বরিশালের উপকণ্ঠে শ্মশানভূমির পাশ দিয়ে আমরা দু-জনে হেঁটেছি, অবাক হয়ে কখনো-বা লাশকাটা ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখেছি। কখনও আরও দূরের পাল্লা, শহর ছাড়িয়ে গ্রামের পথে। বর্ষাকালে নদীর তীরে কত সন্ধ্যায় হেঁটেছি,... গিরিডিতে উশ্রী নদী পার হয়ে বালুর তট, আমলকী বনে বহুদিন হেঁটেছি। কখনও হেঁটেছি এপারে ক্রিশ্চান হিলের দিকে।... পুনা শহরে হেঁটে গেছি পার্বতী মন্দিরের চূড়ায়, যারবেদায় পর্ণকুটীরের পাশ দিয়ে মূলা-মূথা নদীর সঙ্গমে, মালাবার হিলে, ওয়ার্লির সমুদ্র পাশে, ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস থেকে বান্দায়, বান্দা থেকে সান্টাক্রুজে, সান্টাক্রুজ থেকে জুহুর সমুদ্রতীরে হেঁটেছি। দিল্লীর সড়কে... জীবনানন্দ শেষ ঘুমের আগ পর্যন্ত রোজই হেঁটেছেন এক নেশায় আক্রান্ত হয়ে, কোনও সাথীর সঙ্গে অথবা সঙ্গীহীন হয়েও।’ অশোকানন্দ হাঁটার যে সব স্থানের বর্ণনা দিয়েছেন তার সবকিছুই আমরা দেখি জীবনানন্দর কবিতায়, বিশেষ করে আমলকী বন, মালাবার হিল, সান্তা ক্রুজ, জুহু ইত্যাদি। সেই ‘জুহু’ নামের একটি কবিতার শুরুই করেন এই বলে যে ‘সান্টা ক্রুজ্ থেকে নেমে অপরাহ্নে জুহুর সমুদ্রপারে গিয়ে/ কিছুটা স্তব্ধতা ভিক্ষা করেছিলো সূর্যের নিকটে থেমে সোমেন পালিত।’ অশোকানন্দ আরও বলেছেন, জীবনানন্দ ‘এক নেশায় আক্রান্ত হয়ে’ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হেঁটেছেন, তাঁর এ কথা যে এক অমোঘ সত্য তা তো দেখতে পাই জীবনানন্দর কবিতায়ই যেখানে তিনি বলছেন, এক অন্ধ ইশারাকে মনে রেখে একা শহরের পথে পথে হাঁটার কথা। জীবনের শেষ ক্ষণেও ছিলেন সেই ইশারার অমূলপ্রত্যক্ষণে আবিষ্ট হয়ে পদভ্রমণরত, সংবেদনাত্মক আবেশে মুহ্যমানও হয়তো। কিন্তু এটাই হলো তাঁর মৃত্যুরতির শেষ অস্তিত্বগামিতা। সেদিন বরাবরের মতো ল্যান্সডাউনের বাসার দক্ষিণে অবস্থিত পার্কে হাঁটাহাঁটি করে যখন ঘরে ফিরছিলেন, ঘরে পৌঁছানোর একশ গজ আগে রাসবিহারী অ্যাভিনিউতে ‘জলখাবার’ এবং ‘জুয়েল হাউস’-এর সামনের রাস্তাটি পার হতে গিয়ে, পথের মাঝখান দিয়ে, তাঁর ভাষায়, ‘সর্পিণী সহোদরার মতো’ চলে যাওয়া ট্রামলাইনের ওপর আনমনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ট্রাম আঘাত করল তাঁকে। যে হাঁটা ছিল তাঁর চিন্তা উন্মোচনের এক সংরাগ, তা-ই হলো তাঁর মৃত্যুর কারণ। অনেক দিন আগে লেখা একটি কবিতায় তিনি বলেছিলেন, ‘পায়ের তলে লিকলিকে ট্রামের লাইন’ শাসন করছে তাঁকে, তা-ই যেন সত্য হলো তাঁর মৃত্যুর পরিধিতে। মহাপথিক জীবনানন্দ হাসপাতালে মৃত্যুদীর্ণ অবস্থায়ও আকাশের দিকে তাকিয়ে পড়তে চাইলেন কবিতা! যে আকাশ তাঁর প্রিয় ছিল, যে আকাশে তিনি একা একা হাঁটতেন মনে মনে, সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে কবিতা তো তিনিই পড়তে চাইবেন!
হাঁটার কথা--যা ছিল তাঁর শবলিত চারণা, তাঁর যাপনোদ্ভাস--অনেক কবিতায় বলেছেন তিনি। সেই কবে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত ‘মৃত্যুর আগে’ কবিতাটি তিনি শুরুই করেছেন এই বলে যে, ‘আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষ সন্ধ্যায়,/ দেখেছি মাঠের পারে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল/ কুয়াশার;।’ বুঝতে পারি, এই হাঁটা চিরন্তন দ্যোতক-মহিমা নিয়ে হাজির হয়েছে কবিতাটিতে। এই আভিযাত্রিক আরম্ভ আসলে এক মহা দর্শনের নামান্তর, যা চোখের সামনে খুলে দেয় অন্য এক জগৎ, অন্য এক ভ্রমণের বারতা, যা বস্তুত জীবনমন্থক। এ জন্যই তিনি বলতে পারেন:
আমরা মৃত্যুর আগে কী বুঝিতে চাই আর? জানি না কি, আহা,
সব রাঙা কামনার শিয়রে-যে দেয়ালের মতো এসে জাগে
ধূসর মৃত্যুর মুখ;--
তিনি এখানে জীবন থেকে মৃত্যুতে পরিণত করছেন অভিদর্শনকে। এবং এই দর্শন তাঁর কবিতায় ফিরে ফিরে এসেছে, কখনও জীবনবেদের ইন্দ্রিয়গম্যতায়, কখনওবা মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবী রূপকের অনন্যত্বে। কবিতাটিতে জীবনানন্দ হেঁটেছেন জীবনের মাঠ থেকে মৃত্যুর বহ্নিহীন প্রান্তরে। জীবনের এক শান্ততা থেকে কবিতাটি উপনীত হয় মৃত্যুর অসহনীয় নির্জনতায়, মনে হয় সব আয়োজন এক চিরবিলীনতায় নিয়তিপ্রাপ্ত। কবিতাটিতে রয়েছে আটটি স্তবক, প্রতিটি স্তবকে ছয়টি করে পঙ্ক্তি। প্রথমেই শুরু হয় কবির পরাভ্রমণের অভিজ্ঞতা দিয়ে: আমরা হেঁটেছি যারা..., তারপর হেঁটে হেঁটে দেখার কথা: দেখেছি মাঠের পারে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল..., তারপর ভালোবাসবার কথা: অন্ধকারে দীর্ঘ শীত-রাত্রিটিরে..., তারপর আবারও দেখার কথা যা পরিণত হয় অভিদর্শনে: বুনোহাঁস শিকারীর গুলির আঘাত..., তারপরের স্তবকে অনুধ্যানের কথা; আমরা বুঝেছি যারা বহু দিন মাস ঋতু শেষ হলে..., আর অবশেষে সবকিছুকে বাতিল করে এক অপসৃতির অভিজ্ঞানের কথা: আমরা মৃত্যুর আগে কি বুঝিতে চাই আর?...ধূসর মৃত্যুর মুখ... ইত্যাদি। জীবন এক চলমানতা, যা নানা মায়াপ্রপঞ্চকে আত্মসাৎ করে মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়।
কবি এক পরিব্রাজক, যিনি নশ্বর জীবন থেকে মৃত্যুর অনশ্বর অবস্থানে প্রবেশ করেন, আর এই অভিযাত্রা দ্রুততালে নয়, হয় মন্থর অভিগমনে। তিনি, বিলম্বিত বা সাবলীল মধ্যলয়ে চালান তার যাত্রাপথের খেয়াল। এ জন্যই কবি বেছে নেন এক আচ্ছন্ন চলন। সেই আচ্ছন্ন চলন যা হাতছানি দেয় এক মহান বিলুপ্ততার যা তাঁকে বিপ্রলব্ধ করে জীবন নামক বিশাল প্রপঞ্চের সত্যগুলোকে নিজের মতন করে উপস্থাপন করতে। কী সেই সত্য, যার সন্ধান চালান কবি তাঁর জীবনের মিথ্যাগুলোর ভেতর দিয়ে? শব্দসত্য হলো বলার মহিমা, যা কবিতাকে প্রথমে ভিন্ন করে অন্য সাহিত্যমাধ্যম থেকে। কিন্তু শুধু শব্দসত্য দিয়ে কবিতার শেষ রক্ষা হয় না। কবিতা উদ্ধার করতে চায় জীবনের সেই অবস্থানগুলো, যা হৃত, যা হতে পারত কিন্তু হয় না। কবিতা এর জন্য পেরিয়ে যায় শব্দসত্যের মতো প্রাথমিক সত্যতাকে, পৌঁছাতে চায় সেই প্রতিভাস এলাকায় যেখানে আপাত সত্যগুলো মিথ্যা হয়ে যায় আর মিথ্যাগুলো কেন জানি কোন রহস্যের তাড়নায় সত্য হয়ে ওঠে। এর জন্যই কবিরা ভাষার পেছনের নীরবতায় পৌঁছাতে তৎপর হয়ে ওঠেন। ভাষার নেপথ্য নীরবতার প্রকাশই কবিতা। আর মাত্র চিত্রকরদের জন্যই এ কথা খাটে। জীবনানন্দ হলেন এমন একজন কবি যাঁর কবিতা পাঠককে একচ্ছত্রভাবে সেই নীরবতার স্থানাঙ্কে, সেই নৈঃশব্দ্যস্থানে পৌঁছে দেয়। পৃথিবীর কবিদের মধ্যে এতটা আচ্ছন্ন চলন, এতটা দ্বিধাগামিতা আর হয়তো চোখে সহজে পড়বে না, যা জন্ম দিয়েছিল সেই মন্থর দর্শনের, আর তা আমাদের দিয়েছে সেই উপলব্ধি যা জীবন নামক অধরা সত্তার তীব্র শৈত্যকে উপলব্ধি করায় নিদারুণ ইন্দ্রিয় বিপর্যয়ে।
৫.
খাপ-না-খাওয়া শব্দবন্ধটি কবিদের জন্য বড়ো বেশি ক্লিশে হয়ে গেছে যেন এখন, তা রোমান্টিক বহির্স্থিত বা আস্তিত্বিক বহির্স্থিতের লক্ষণ হিসেবে আলোচিত। অব্যবস্থিত শব্দটিও আর টানে না। কিন্তু এই শব্দবন্ধগুলোর ভেতর রয়েছে সত্তার অবস্থান-চাঞ্চল্য। কিছু কিছু শব্দ যেন শুধু শব্দ থাকে না, তা যেন ব্যক্তিপ্রতিস্বের উন্মোচকের দায়িত্ব পালন করে যায় নিরবধি। বলতেই হয়, এই পৃথিবীতে জীবনানন্দ অদ্ভুত ও আশ্চর্যজনকভাবে যেন রয়ে গিয়েছিলেন এক আগন্তুক। আগন্তুকরা বা বহিরাগতরা আলো নয় বরং আলোর প্রতিসরণের প্রতি মনোযোগী হয়। মনে পড়ে প্লাতোনের সেই নীতিগল্পের কথা : মানুষটি এক অন্ধকার গুহার দিকে মুখ করে বসে আছে সূর্যের আলোর দিকে পিঠ দিয়ে, আর দেখছে আলো থেকে সৃষ্ট ছায়ার খেলা; আলো আসে বাস্তব জগৎ থেকে আর ছায়া যেন আরেক জগৎ, যা মানুষটির কাঙ্ক্ষিত। প্লাতোনের ব্যক্তি আসলে দেখছে পেছনে থাকা বাস্তবের অবভাস। জীবনানন্দর মতো কবিরা যেন এই ছায়াবাজির ঘোরে আগন্তুক জীবন কাটিয়ে দেন আর মাঝে মাঝে একান্ত স্বরে বলে ওঠেন, ‘এই কি জীবন? এই-ই কি সব? ও, তাহলে এ-ই সবকিছু!’ শোপেনহাওয়ার এই জীবনকে বলছেন মিসলিশে জাশে: ‘বেয়াড়া বিষয়’; বলেছেন, এর চিন্তনেই জীবন কাটাতে হয় কিছু মানুষকে। জীবন এক অপ্রীতিকর অবস্থা, একে নিয়ে ভেবে ভেবে চালাতে হয় জীবন। তলস্তয়ের যুদ্ধ ও শান্তির পিত্র্ বেজুকভ ভাবে, ‘কাকে বলে মন্দ? ভালোই-বা কী?...কীসের জন্য বেঁচে থাকে একজন? আমি কেন বেঁচে আছি? জীবন এবং মৃত্যুই-বা কী?’ এই যে প্রশ্ন, তা নয় অতিপ্রশ্ন, স্বাভাবিক মনের প্রশ্ন; তা শুধু আধুনিকের নয়, চিরন্তন দার্শনিক প্রশ্ন, তা তাড়িয়ে বেড়ায় আজীবন কিছু মানুষকে। জীবনানন্দ এই প্রশ্নের মীমাংসায় যাননি, তিনি জানতেন এর মীমাংসা হয় না, বরং এর ভাবনার ভেতরেই জীবন কাটাতে হয়, অভিযাত্রা করতে হয়। তা না হলে কেন তিনি বলবেন, ‘কত যে কত যে গভীর রাতে/ হেঁটেছি হেঁটেছি শুধু স্তব্ধ গ্যাসপোস্টদের সাথে।’ নিজেকে তিনি যাত্রী মনে করতেন পৃথিবীর, ‘ব্রহ্মাণ্ডের মতো গোল প্রপঞ্চ’, তার যাত্রী বা সহযাত্রী। আর যাত্রী হতে হলে মাড়িয়ে যেতে হয় পৃথিবীর পথ ও পান্থশালা, অতিক্রম করতে হয় পথের বাঁক ও রহস্য, হেঁটে হেঁটে। কেননা অস্তিত্বের পরিক্রমণে সত্তা ছাড়া কোনো যান নেই, নিজের ভরকে নিজেই বহন করে পাড়ি দিতে হয় পথনির্জনতা। কিন্তু এই ভ্রমণ যতটা শারীরিক, তার চেয়েও বেশি মানসিক। অন্তর্ভ্রমণ ছিল তাঁর উদাসীন অবসন্নতার উৎসার। পৃথিবীর পথে পথে, সমভূমি থেকে সমুদ্রভূমিতে, পাহাড়ে, পৃথিবী থেকে মহাপৃথিবীতে, আকাশ থেকে মহাকাশে তাঁর মানসভ্রমণ। কারু-বাসনার নায়ক ভাবে, ‘এই সৃষ্টির রহস্যের ভিতর নিজের রহস্যময় হৃদয়ের সঙ্গে আলো-অন্ধকারের পথে অবিরাম চলতে ইচ্ছা করে।’ এই যে ইচ্ছা জাগ্রত হয় মনে, তা আসলে অন্তর্ভ্রমণের অভিলাষ। মাল্যবান উপন্যাসের মাল্যবানও ভোগে এই অন্তর্ভ্রমণের আগুনে: ‘সেই ছোটবেলা এক-এক দিন শীতের শেষ-রাতে বাউলের গান শুনতে খুব ভালো লাগত, কোনও দূর হিজল বনের ওপার থেকে অন্ধকারের মধ্যে সে-সুর ভেসে এসে তাঁর কিশোর আঁতে ব্যথা দিয়ে যেত।’ শুধু এটুকুই নয়, তাঁর মানসভ্রমণ অতীতচারী হয় সজীব-অজীব সত্তার মাঝ দিয়ে, তা কখনও ফ্লাশব্যাকে বিয়াল্লিশ বছর পেছনে গিয়ে কোনো এক অগ্রহায়ণের বিশ তারিখে, কলকাতা থেকে দেড়শ মাইল দূরের এক পাড়াগাঁয়ে, তার জন্মমাস অঘ্রানের শীতরাতের স্মৃতিরূপ নিয়ে হাজির হয়: ‘এমনই শীতে খেজুর-গাছের মাথা চেঁছে একটা নল বসিয়ে গলায় হাঁড়ি বেঁধে দেওয়া হয়, সমস্ত শীতের-রাতে ফোঁটা-ফোঁটা রস ঝরতে থাকে, মাছি মৌমাছি ছোট-ছোট রেতো প্রজাপতি, বড়োগুলোও, সেই হাঁড়ির রসে সাঁতার কাটছে, পাখনা নাড়ছে, ম’রে আছে; কুয়াশা-নির্জন ঠান্ডা-নিবিড় শেষ-রাতে দেখা যায় এই সব।’ আমরা জানি, প্রকৃতির দুটো শ্রেণিবিভাগ: সজীব বা বায়োটিক আর অজীব বা অ্যাবায়োটিক। জীবনানন্দর সব লেখাতেই এই দুই প্রকৃতির খোলামেলা অংশগ্রহণ এবং তার মাঝ দিয়ে মানসভ্রমণ একটি বিশিষ্টতা নিয়ে প্রতিভাত হয়ে ওঠে। কিন্তু এই মানসভ্রমণ নির্জ্ঞানস্তরে, স্বপ্নস্তরেও চলাচল করে। মনোভাবনা অতিক্রম করে অন্তদিনের পরপারে চলে যায় তা। মাল্যবান তাই তার মরে যাওয়াকে স্বপ্নে দ্যাখে। দ্যাখে স্বপ্নের ভেতর নিজেকে মরে যেতে। দ্যাখে, তাকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সে সেখানে সবার সাথে কথা বলছে। মাল্যবানের এই স্বপ্নভ্রমণ হলো সজীব সত্তার নির্জীব-অবস্থাকে অবলোকন।
মনঃশারীরিক জীবনানন্দ শারীরিকভাবে শুধু নয়, মানসিকভাবেও হেঁটেছেন। তাঁর কবিতা-গল্প-উপন্যাসের প্রধান চরিত্রেরা, যারা ঠিক অনেকটা তাঁর আত্মরূপে গড়া, মনের হাঁটায় বুঁদ হয়ে থাকে। হাঁটা দিয়ে কি তারা আড়াল করতে চাইত দিনানুদৈনিকের স্থূলতা, বা পরাজয়কে? সম্ভবত মুক্ত হতে চায় পার্থিব অব্যবস্থা থেকে, যেতে চায় একটি মেরুস্থবিরতায়, যা তাদের স্বল্পক্ষণের জন্য হলেও স্বস্তি দেবে, করবে মানসপথিক। তাঁর কারু-বাসনা উপন্যাসের প্রধান চরিত্র সংসারে তার শিকড়হীনতাকে এবং ব্যর্থতাকে ঠিক আড়াল করতেই ভাবে মানসিক হাঁটার কথা, যা তাকে সত্তার হাওয়া দেয় :
জীবন তো শুধু স্ত্রী সন্তান নিয়েই নয়-- বিকেলের ধূসরতার ভিতর যখন সবুজ মধুকূপী ঘাসের মাঠের পথে হাঁটতে থাকি, কিংবা হেমন্তের সন্ধ্যার চড়ুই-শালিখ যখন উড়ে চ’লে গেছে, দিকে দিকে কুয়াশা জ’মে উঠেছে, লক্ষ্ণী-পূজার ধূপের ভিতরেও যখন ঘাস ও মৃত্যুর গন্ধ,--কিংবা আরও গভীর রাতে, অশ্বত্থের ডালপালা যখন জ্যোৎস্নায় বাতাসে শিরশির করে--কত বিহঙ্গম-বিহঙ্গমার নীড় বুকে নিয়ে বিরাট বট-গাছ দাঁড়িয়ে থাকে--বটের নিচে উপকথা পথিক গিয়ে দাঁড়াচ্ছে--এক মুহূর্তের ভিতরেই সমস্ত অতীত ও ভবিষ্যতের প্রেম স্বপ্ন ও সফলতার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক খুঁজে পাই আমি; এই সৃষ্টির রহস্যের ভিতর নিজের রহস্যময় হৃদয়ের সঙ্গে আলো অন্ধকারের পথে অবিরাম চলতে ইচ্ছা করে। সংসারের সঙ্গে সম্পর্কহীন,-- জীবনের এই আর এক রূপ।
আমরা যাকে বলি দেহ, আত্মা, প্রাণ-- তা আসলে একই জিনিসের তিনটি অবস্থান: দেহ হলো অস্তিত্বের বস্তুপ্রপঞ্চ, আত্মা হচ্ছে দেহের অশারীরিক প্রপঞ্চ, আর দেহ ও আত্মার স্পন্দনই হলো প্রাণ। সুতরাং সৃষ্টিশীলদের হাঁটা বস্তুত এই তিনটিরই চলন, কেননা এ তিনটির গতি ও সংগতিতেই বেজে ওঠে তাঁদের ভাবনার কনচের্টো। হাঁটা ছিল জীবনানন্দর স্নায়ুর সংরাগ, সতেজ হতো তাঁর স্নায়ুধারা, দিনে যা হয়ে যেত ম্রিয়মাণ রাতে হাঁটার সময় তা-ই হয়তো হয়ে উঠত চাঙা, সতেজ। জীবন বাস্তবতা তাঁকে কি আর সুখে রেখেছিল! সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা বা রাত, যখনই হেঁটেছেন তিনি, দেহের সাথে সাথে আসলে হেঁটেছে তাঁর চিন্তা, হেঁটেছে তাঁর স্পর্শকাতর মন। জানা যায়, সন্ধ্যা বা রাতেই হাঁটতেন তিনি। ভোর হলো আলোর অভিযাত্রা, আলো কীভাবে অন্ধকারকে ভেঙে রূপায়িত করে বস্তু-অবয়ব, তা ধরা পড়ে সকালে হাঁটার সময়, আর সন্ধ্যা হলো আলোর অপস্রিয়মাণতা, অন্ধকারের মূর্ততা--বস্তুরাশি যেন অন্য রূপে প্রকাশিত হতে থাকে তখন; আর রাত হলো প্রগাঢ় নিবিড়তা যখন অন্ধকারের স্থিরতায় ভাবনারা রহস্যগ্রস্ত হয়। এটা স্বাভাবিক ঠেকে যে সন্ধ্যা আর রাতই জীবনানন্দর হাঁটার ঠিক সময়, কেননা তিনি তো অন্ধকারেরই প্রতিভাসনির্মাতা। সে যা-ই হোক, কিন্তু মানসিক জীবনানন্দ হেঁটেছেন আরও বেশি। তাঁর মানসিক পয়দল ছিল সার্বক্ষণিক। কিন্তু কোথায় ছিল এই ভ্রমণ? এ জগৎ এক রহস্যময় জাদুঘর, এখানে জীবন্ত সত্তারা ঘুরে বেড়ায় আপন খেয়ালে, কেউ কেউ ঘুরে বেড়ায় জীবন্মুক্ত হয়ে; অপ্রাণ বস্তুরাও এখানে ঘোরার জন্য হয়ে পড়ে উদ্যত, কোনো অজানার তরে যেন তারা গমনোন্মুখ, সমগ্র মাধ্যাকর্ষণকে পেরিয়ে যাবার জন্য যেন তারা এক মুক্তবেগ পেতে আকাঙ্ক্ষী। জীবনানন্দ হেঁটেছেন এই আশ্চর্যলোকে, হেঁটে হেঁটে আত্মসংবেশে মায়াবলোকন করেছেন এই অন্তর্বাহী জাদুঘর, এই নিশীথচিত্রের শোভা ও অন্তর্ঘাত, তাতে আত্মভূত হয়েছেন, যেন তিনিও তা-ই। আমরাও হাঁটি এখন তাঁর শব্দ-নিঃশব্দময় ভুবনে।
৬.
এর পর আমরা দেখব কীভাবে তিনি বাংলা ভাষার মৃত্যুর শিল্পস্রষ্টা হয়ে উঠলেন! জীবনানন্দে আমরা পাই মৃত্যু-সাহিত্যের দেখা, বা বলা যায় অন্ধকার সাহিত্যের সূচনাবিন্দু। কিন্তু কী এই মৃত্যুসাহিত্য? মরিস ব্লাঁশো বলেছেন, সাহিত্য এমন এক অঞ্চলের দিকে যায় যাকে বলা যায় মৃত্যু পরিসর বা the space of death, যেখানে ভাষা আর স্থির অর্থ বহন করে না, সবকিছু অনিশ্চয়তার মধ্যে ভাসে। রবীন্দ্রনাথ মৃত্যু নিয়ে অনেক লিখেছেন কিন্তু তিনি মৃত্যু-সাহিত্য রচনা করেননি। জীবনানন্দ জীবন নিয়ে অনেক লিখেছেন কিন্তু সবই যেন এক মৃত্যুসাহিত্যে অন্তঃস্যূত হয়ে যায়! এর কারণ হলো, মৃত্যু অমর, তাই মানুষকে অমরত্ব অর্জন করতে হলে মৃত্যুকে তার পেতে হবে। এটা কোনো লায়ার প্যারাডক্স নয়। কান্টের ঘুঘু ভাবে আকাশে আরও জোরে ওড়া যেত যদি না থাকত বাতাসের বাঁধা, কিন্তু সে জানে না বাতাস না থাকলে সে উড়তেই পারত না। তদ্রুপ মানুষ ভাবে মৃত্যু না-থাকলেই সে অমরত্ব পেয়ে যেত, কিন্তু অমর মৃত্যু না থাকলে মানুষ অমরত্বকে খুঁজে পেত না, বরং অমর জরার শিকার হতো। মালার্মে ও রিলকের মতো জীবনানন্দও এক দুর্মর অনুপস্থিতির সঙ্গে এক দুর্মর সম্পর্ককে বিনির্মাণ করেছেন তাঁর লেখায়। এই অনুপস্থিতি এক শক্তিমান ‘নেতি’কে উপস্থিত করে জীবনের কেন্দ্র ও পরিধিতে। অনুপস্থিতিই উপস্থিতি, উপস্থিতি আসলে অনুপস্থিতির রঞ্জনরশ্মি; মৃত্যুই জীবন, অন্ধকারই আলো। মালার্মের ইগাতুর, রিলকের মাল্টে আর জীবনানন্দর মৃণালিনী ঘোষাল বা সুবিনয় মুস্তফিরা একে উদ্ভাসিত করে চলেছে অন্ধকার ও স্তব্ধতার ভাষায় infinitely transmutes death itself: মৃতুকে অনন্তরূপে রূপান্তরিত করে চলেছে। যে কবি জীবনপথিক সে আসলে মৃত্যুরও পথিক, যে আলোর যাত্রী সে তো অন্ধকারেরও যাত্রী। কারণ অন্ধকার স্বাধীনসত্তা, আলো পরাধীন; অন্ধকারের প্রভাবে আলো ন্যূন, আলোর প্রভাবে অন্ধকার ন্যূন নয়। অন্ধকার আদি উপস্থিতি। যে কবি রূপসী বাংলা বা মহাপৃথিবীর কবিতা লেখেন, লিখে উঠতে পারেন, যিনি অন্ধকারকে লেখেন, অন্ধকারকে জ্বালান, তাঁর শুধু আধুনিক হওয়া হাস্যকর, তিনি বাংলা কবিতার অকাল্ট ফিগার, এক কিয়ারসকিউড প্রতিভা। এই ভাবেই আধুনিকতার সব পালক ঝরে যাওয়ার পর, জীবনানন্দর ‘মিনার্ভার পেঁচা’ কেবল গোধূলি নেমে এলে তার ডানা মেলে, হেগেলের ভাষায়: the owl of Minerva spreads its wings only with the falling of the dusk.
এই গোধূলির আগমন তো অন্ধকারের জীবনের সূচনা যা হয় পেঁচার ডানাবিস্তারের জন্য, শিল্পের মৃত্যু-অন্ধকারের উন্মোচনের জন্য। এজন্যই জীবনানন্দ বলতে পারেন যা ওফেলিয়ার মৃত্যুছবিকে স্মরণ করিয়ে দেয়: এইখানে মৃণালিনী ঘোষালের শব/ভাসিতেছে চিরদিন: নীল লাল রুপালি নীরব। জীবনানন্দই আমাদের জানান দেন সেই অন্ধকারকে চিনতে ‘যে আঁধার আলোর অধিক’।