'শস্যের চেয়ে টুপি বেশি, ধর্মের চেয়ে আগাছা বেশি'

আনিসুর রহমানআনিসুর রহমান
Published : 10 Oct 2023, 09:23 AM
Updated : 10 Oct 2023, 09:23 AM

লালসালু কাপড়ে ঢাকা কবর বা মাজার তিনি দেখেছেন তাঁর পিতৃভূমির অনেক প্রান্তে। বাবার চাকরিসূত্রে দেশের নানা জায়গা দেখা, সেসব জায়গার মানুষের জীবনের বেদনাবিধুর বাস্তবতা জানা ও বোঝার সুযোগ তাঁর হয়েছিল। এসবের ভেতর দিয়ে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। তিনি 'লালসালু'খ্যাত লেখক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ।

লেখকের নামটির সঙ্গে আমার পরিচয় বানান করে অক্ষর মিলিয়ে পড়বার বয়সে, একেবারে  হাতেখড়ির বয়সেই। যৌথ পারিবারিক বলয়ের কলেজ পড়ুয়া আমার এক  চাচাত ভাইয়ের পড়ার টেবিলে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ'র 'লালসালু' এবং মুনীর চৌধুরী'র 'রক্তাক্ত প্রান্তর' ছেঁড়াখোড়া পাতার বই দুটো দেখে চুপি চুপি পাতা উল্টে বানান করে কয়েক শব্দ পড়েও ছিলাম। বড়দের বই বলে কথা, তাই চুপিচুপি  বানান করে কয়েক শব্দের বেশি পড়তে পারি নি, কেউ যদি দেখে ফেলে, এই ভয় সঙ্গে ছিল যেন।  বই দুটোর কোনটারই মাথামুন্ডু কিছু অই বয়সে আমার বোঝার কথা না, বুঝিও নি।  তবে 'রক্তাক্ত প্রান্তর' নামটির সঙ্গে 'রক্ত' ব্যাপারটি থাকায় ভেতরে আমার ভয় জাগানিয়া একটা অনুভূতি হয়েছিল।

এরপর শৈশব পার হয়ে কৈশোরের শেষে তারুণ্যের শুরুর দিকে উচ্চমাধ্যমিকে পাঠ্য হিসেবে পেয়ে গেলাম শৈশবে পাতা উল্টে দেখা 'লালসালু'  বইটি।   আমাদের জনপ্রিয় লেখকদের এক একটা বই মুড়িমুড়কির মত দেদারছে পড়ে ফেলা যায়, কিন্তু এই 'লালসালু' উপন্যাসের এক পৃষ্ঠা পড়তেই খবর হয়ে যায়।  এতে ভাষা শব্দকল্প উপমা জীবন জমিন দর্শন গাঁথা ছবির রিলের মত।  ছোট রিলে ছবির পর ছবি আর কল্পগল্প। 'লালসালু' উপন্যাসটি সবাই চানাচুর চিপসের মত কিনেও না, পড়েও না।  কিন্তু সবাই বইটির নাম জানে, নাম নেয়।  কী এই রহস্য?

একবার কথা প্রসংঙ্গে  উচ্চমাধ্যমিকে বাংলা ক্লাসে আমার এক শিক্ষক বললেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ'র 'লালসালু' উপন্যাসের প্রথম ১০ পাতার যে সাহিত্যমূল্য রয়েছে, আমাদের প্রতিষ্ঠিত অনেক লেখকের সামগ্রিক লেখালেখিতেও সেই সাহিত্যমান  নাই। 

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সম্পর্কে এরকম ধারণা নিয়েই বড় হয়েছি, কৈশোর পার করেছি। পাঠ্যসূচির অংশ হিসেবে 'লালসালু' পড়েছি। এর আগে বা পরে স্বদেশের গ্রামেগঞ্জে লালসালুতে মোড়ানো কবর দেখেছি, সেইসব কবর নিয়ে কত গল্প শুনেছি। কিন্তু সেইসব গল্পের কিনারা কেউ খোলাসা করে বলতে পারেনি।  সেই 'লালসালু' উপন্যাস পড়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর যেমন পরীক্ষার জন্যে জানতে হত, বুঝতে হত। সেরকম একটি প্রশ্ন ছিল, 'শস্যের চেয়ে আগাছা বেশি, ধর্মের চেয়ে  টুপি বেশি',  সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ রচিত 'লালসালু' উপন্যাসে বর্ণিত কথাটি ব্যাখ্যা কর।  এরকম একটি সাহসী উচ্চারণ জন্মভূমির জনগোষ্ঠীর বিদ্যমান বাস্তবতাকে চিহ্নিত করে উচ্চারণ করার মত কোনো কথাশিল্পী ওয়ালীউল্লাহর আবির্ভাবের আগেও আসেনি, এমন কি পরেও আসেনি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ অন্যদের থেকে আলাদা।

মাটির ঢিবিকে লালসালুতে ঢেকে, সেটিকে মাজার বলে চালিয়ে দিয়ে ধর্মের নামে ব্যবসা পেতে বসা মজিদদের তত্ত্বতালাশ করে গেছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ।

তিনি আত্মপরিচয় থেকে বিচ্যুত হন নি, আত্মঅনুসন্ধান থেকেও নিবৃত্ত হন নি। চলনে বলনে ভাবে ও প্রকাশে আধুনিক ব্যক্তিমানুষ হিসেবে চূড়ায় তিনি অবস্থান করেছেন। ঠিক তিনি এসবের মধ্যে দেশ, দেশের মানুষ, নিপীড়িত নিগৃহীত বঞ্চিত ধর্ম রাজনীতি ও সমাজের নানা মোড়কে ভণ্ডামি আর ঠগবাজির কবলে থাকা মানুষের জীবনের সত্যকে চিহ্নিত করেছেন, চিত্রিত করেছেন, একইভাবে এক একজন ঠগবাজ, বিভ্রান্ত, বোকা কিংবা  চতুর আদমসন্তানদের মনের মানচিত্র উন্মোচন করেছেন  তাঁর রচিত উপন্যাস, গল্প এবং নাটকে।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ নির্মিত এরকম একজন যেমন 'লালসালু' উপন্যাসের ভণ্ডপীর মজিদ। 'অন্যদিকে 'চাঁদের আমাবস্যা' উপন্যাসের গ্রামের মোড়ল পরিবারের আশ্রয়ে থাকা  অসহায় দরিদ্র শিক্ষক আরেফের মনের অবস্থা চিত্রায়নের মাধ্যমে দেশের গোটা সমাজব্যবস্থার ভেতরের অসহায় কাপুরুষোচিত বাস্তবতার চিত্র এঁকেছেন। মোড়লের লম্পট ছোটভাইকে দরবেশ হিসেবে চালিয়ে দেবার তৎপরতার মাঝে আরেফের চোখে ধরা পড়ে আশ্রয়দাতা মোড়লের ছোটভাই কাদের বাঁশঝাড়ে একটি মেয়েকে খুন করে।  পরে জানা যায় মেয়েটি ওই গ্রামেরই করিম মাঝির বউ।

এইভাবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ধর্মীয় কুসংস্কার মোল্লা আর সমাজপতিদের হাতে গরিব মানুষের শোষণকে আক্রমণ করেছেন। প্রকারান্তরে গোটা সমাজব্যবস্থাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন।

গোটাব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এই কথাশিল্পী জন্মেছিলেন চাটগাঁয়ে। পড়াশোনা করেছেন দেশের নানা জায়গায় ঢাকা এবং কলকাতায়। অবস্থাপন্ন বনেদি মুসলমান পরিবারের সন্তান তিনি। জীবনধারা ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার নিরিখে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার ছাঁচে গড়া। কিন্তু মুসলিম সত্তাকে ধর্মবিশ্বাস বলে নয়, এটিকে বরং তাঁর গর্বিত  সাংস্কৃতিক পরিচয় হিসেবে তুলে ধরতেন। কর্মসূত্রে বিচরণ করেছেন এশিয়া আফ্রিকা ইউরোপের দেশে দেশে। এসবের মধ্যে বার্মা, ইন্দোনেশিয়া ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড, স্পেন, ফরাসি, পর্তুগাল, আলজেরিয়া উল্লেখযোগ্য। লেখালেখির অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ পেয়েছিলেন তার চাচা সিরাজুল ইসলামের কাছে, যিনি 'এক গর্দভের স্মৃতি' নামে একটি আত্মজীবনী লিখেছিলেন।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ জন্মেছিলেন পূর্ববঙ্গে। বিচরণ করেছেন ভারতবর্ষের নানা জায়গায়।  পড়াশোনার সুবাদে কলকাতায় ছিলেন ১৯৪৩সালে থেকে ১৯৪৮ অবধি। এই সময়ে অর্থনীতিতে  স্নাতকোত্তর করেছেন। দেশভাগ এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখেছেন নিজের চোখে। কলকাতায় থাকাকালীন দুটি সাময়িকীর সম্পাদনা করেছেন।  সাময়িকী দুটো হচ্ছে 'কনটেমপোরারি' এবং 'মিস্স্যালানি', লেখালেখি করেছেন 'স্ট্যাটসম্যান'-এ।  কমরেড প্রকাশনা সংস্থায় প্রধাননির্বাহী হিসেবে কাজ করেছেন।  এরপর কর্মসূত্রে থেকেছেন করাচি এবং দিল্লি।  ফরাসি নাগরিক আন মারির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। আন মারির লেখা 'আমার স্বামী ওয়ালি' গ্রন্থে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ জীবনের নানা ঘটনার পাশাপাশি তাঁর জীবনদর্শন, লেখালেখির ভেতরের তাৎপর্য, লেখালেখির প্রক্রিয়াসহ বিবিধ প্রসঙ্গ তুলে এনেছেন। আন মারির বরাতে  সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর প্রারম্ভিক জীবনে দেখা ভারতবর্ষের ধর্মসম্প্রদায় আর বর্ণ ঘিরে দুই একটি মজার ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। 

কলকাতায় সেন্ট পল কলেজ থেকে বনভোজনে গিয়ে দুজন মুসলমান ছাত্রকে আলাদা খেতে হয়েছিল।  রেল স্টেশনে পানির কল থাকত দুটি, একটি মুসলমাদের আরেকটি হিন্দুদের জন্যে। একবার দিল্লিতে পাকিস্তান দূতাবাসে কর্মরত থাকার সময় রেলগাড়িতে ভ্রমণ করছিলেন। একই কামড়ায় মা ও মেয়ে দুই যাত্রীর সঙ্গে আলাপ জমে ওঠে।  ওই যাত্রীদ্বয়ের গন্তব্যে ট্রেন এসে যায়।  ওখান থেকেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকে পরের ট্রেন ধরতে হবে।  ওয়ালীউল্লাহর জন্যে পরের গন্তব্যের নির্ধারিত ট্রেন আসতে ঘন্টা দুয়েক বাকি। মহিলা যাত্রীদ্বয় প্রস্তাব করলেন অপেক্ষার সময়টুকু স্টেশনের কাছেই তাদের বাসায় অতিথি হতে।  ওয়ালীউল্লাহ রাজি হলেন। খাবারদাবারের আয়োজন হয়ে গেল।  খাবার পরিবেশনের আগে বিনয়ের সঙ্গে অই দুই নারী জানতে চাইলেন ওয়ালীউল্লাহর বর্ণ কী। 

ওয়ালিউল্লাহ যা বোঝার বুঝে গেছেন। তিনি চিন্তা করে দেখলেন তিনি যদি বলেন, 'আমি মুসলমান' তাহলে আর তার খাওয়া হবে না, উল্টো এই মানুষ দুটির উটকো বাড়িঘর ধোয়ামোছার কাজ বেড়ে যাবে। তিনি বললেন, 'আমি ব্রাহ্মণ'। নারীদ্বয় ছিলেন ক্ষত্রিয়। একজন ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণের সঙ্গে তো একসঙ্গে বসে খেতে পারে না। তাই ওয়ালীউল্লাহ খেলেন, আর উনারা দাঁড়িয়ে থেকে খাবার পরিবেশন করলেন।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ইংরেজি বা ফরাসিতে লেখার বাড়তি তোড়জোড় দেখান নি। যদিও সেই সুযোগ এবং যোগ্যতা তাঁর ছিল। উপন্যাস, ছোটগল্প এবং নাটক মিলিয়ে বেশকটি কালজয়ী গ্রন্থ তিনি লিখে গেছেন।

তিনি ছিলেন মেধায় এবং প্রতিভায় একজন তুখোড় লেখক। তার পড়াশোনার পরিধি ছিল বহু বিস্তৃত; ইতিহাস দর্শন সমাজ রাজনীতি ধর্ম বিজ্ঞান চিত্রকলাসহ তাবৎ বিষয়। তিনি আন্তমহাদেশীয় লেখালেখির ধরনধারণ রপ্ত করেছিলেন। কিন্তু লিখেছেন বাংলায় এবং বাংলার মানুষের কথা। বিষয়টা এরকম দুনিয়ার তাবৎ রেসিপি তার জানাশোনার মধ্যে থাকলেও রেঁধেছেন বাঙালির সাধের মসলার আর উপাদানের যুৎসই ব্যবহার করে। যে কারণে আমার শিক্ষক দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পেরেছেন, কোনো কোনো লেখকের সামগ্রিক লেখালেখি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ'র 'লালসালু' উপন্যাসের প্রথম দশ পৃষ্ঠার সাহিত্যমানের ধারে কাছেও না। 

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৫ আগস্ট ১৯২২ - ১০ অক্টোবর ১৯৭১)