Published : 10 Dec 2024, 11:19 PM
এক.
বাতাসের বেগ আলোর বেগের চেয়ে কম, তাই কানকথার আগে চেহারা ও চরিত্রের সৌন্দর্য হতে ঠিকরে পড়া আলো পৌঁছে যাবে যথাস্থানে। তোমার চিন্তা করতে হবে না।
―এ আবার কেমন কথা? যেখানে আলো পড়ে, সেখানেও কি খারাপটা থাকে না! কারো ক্ষতি করতে রাত লাগে না, দিনেদুপুরেও করা যায়।
যায় তো। কিন্তু সুন্দর স্বভাব ও মনের যে মানুষ, তার অন্তরের যে আলো তা সবার আগে পৌঁছে যায়, তার সম্পর্কে উদ্দেশ্যমূলক আলাপ ও গুজবের চেয়ে।
গিটারের ছেঁড়া তার সারাতে গিয়ে বসে বসে ‘নাই কাজ কথা ভাজ’ অবস্থায় আছে নিবিড়। দোকানভরতি বাদ্যযন্ত্র কিন্তু যন্ত্রী নেই; আছে কেবল মেরামত মিস্ত্রি। এ শহরের সেরা মিস্ত্রি, অঘোর মণ্ডল নাম তার, হেন কোনো যন্ত্র নাই, যা সে সারাতে পারে না। নিজের সম্পর্কে এত আত্মবিশ্বাস যে, সুযোগ পেলেই মানুষকে বলে,
―কেবল যন্ত্র নয় দাদা, মানুষের অন্তরের তারও সারাতে পারি!
নিবিড়কেও এ কথা সে কতবার বলেছে, তা গুনে বের করা সম্ভব নয়; নিবিড় এখানে বসে চুপচাপ গিটার সারিয়ে নেয় যখনই প্রয়োজন পড়ে। অঘোর মণ্ডলের আবার এক বিশেষ গুণ আছে, যে তার কথা চুপচাপ শোনে তার কাছে টাকা রাখে কম, যার মনোযোগ থাকে না তাকে দিতে হয় ডাবল প্রাইস; বলে,
―মনোযোগের পরীক্ষায় যে ফেল করে, বাদ্যযন্ত্রে সে কখনো ভালো করবে না।
এই রকম আপদজনক অবস্থায় কত তরুণ-তরুণী-প্রৌঢ় পড়েছেন তার হিসাব নেই। সমস্যা একটাই, তার মতো যন্ত্রসারানি এ শহরে আর দ্বিতীয়টি নেই।
নিবিড়ের গিটারের কাজ প্রায় শেষ, অঘোরমণ্ডল ঠিক তখনই কাজ বন্ধ করে তাকে বলল বিকেলে একবার ঘুরে যেতে, তখন হয়ে যাবে। নিবিড় ভালো করে জানে এটা তার চালাকি, আরেকবার তাকে এনে বসিয়ে আলাপ গেলানোর ফন্দি। কিন্তু নিবিড় এও জানে, বিকেলে যদি সে আসে আর এভাবে মন দিয়ে তার আলাপ শোনে, তবে এমন হতে পারে সারাই বিলও মওকুফ হয়ে যেতে পারে। কেবল এ কারণেই সে চলে আসে অঘোরমণ্ডলের দোকান থেকে এবং পয়সা বাঁচানোর খোশমেজাজে পা বাড়ায় বাড়ির পথে।
দুই.
দরজা খুলে ঘরে যখন ঢুকল নিবিড়, তখন শুনতে পেল তার বাবা ছাদের ওপর বসে গান গাইছেন। আখতার সাহেব খুব ভালো গাইতে পারেন না কিন্তু সুর ধরেন দারুণ! তাল কাটে না ছন্দ কাটলেও। নিবিড় জামাকাপড় বদলাতে বদলাতে ছাদে বসে গাওয়া তার বাবার গান শুনে হাসতে থাকে।
আখতার সাহেব যখন বেশ আনন্দে থাকেন, তখন গান গান। যেকোনো গান হলেই হলো, আবার যখন খুব বেশি আনন্দে থাকেন, তখন একটা গানের ভেতর অন্য আরেকটা জুড়ে দিয়ে প্রাণখুলে গাইতে থাকেন। ছাদে যেখানে কামরাঙা গাছটা লম্বা ছায়া ফেলে আছে, সে ছায়াতে শুয়ে-বসে গান গেয়েই চলেন তিনি।
অঘোরমণ্ডলের দোকানে আখতার সাহেব একসময় খুব যেতেন। যন্ত্র সারাবার জন্য নয়, ওর কাছ থেকে পাথর আনতে। আখতার সাহেব পাথর পছন্দ করেন, হাতজুড়ে থাকা বেশ কয়েকটা আংটিতে সুন্দর সব পাথর শোভা পায় তার। একটাও কোনো বিশেষ উপকারে লাগাননি, কেবল ভালো লাগে বলেই তিনি পাথর পরেন।
অঘোরমণ্ডলের কাছে আসলে গল্প করতেই যাওয়া, এখন অঘোরমণ্ডলই দোকান ফেলে বাসায় চলে আসে, ছাদে বসে আলাপ করে ওরা বেশ সময় নিয়ে। অঘোরমণ্ডল একবার একটা পাথর দিয়ে বলেছিল যে এটা বিখ্যাত লেখক মাহমুদুল হক সাহেবের কাছ থেকে নেয়া। মাহমুদুল হক সাহেবের সাথে তার খাতির বেশ। হক সাহেবের নিজেরও বেশ ভালো পাথরের ব্যবসা ছিল; জহুরি ছিলেন, খালি চোখেই চিনে ফেলতেন আসল-নকল গুণাগুণ!
একবার নাকি মাহমুদুল হক সাহেব তার কাছে এমন এক যন্ত্র সারাতে এসেছিলেন, যা দুনিয়ায় আর দ্বিতীয়টি নেই। কী সেই যন্ত্র? একটা সোনার একতারা, তার রুপার লাউয়া! কেমনে বাজে? ওপরে গিল্টি করা হীরার চাবিতে টাইট দিয়ে। কে বাজায় আর কেই-বা গান করে এতে!
―কেন আখতার ভাই! আপনি বাজান আর আমি গান করি!
এই হলো তাদের আলাপের নমুনা। নিবিড় প্রায়ই এসব আলাপ শুনে থাকে এবং আগে হাসত এখন আর হাসে না, মজা লাগে।
আখতার সাহেবের সাথে অঘোরমণ্ডলের আজব সব আলাপ। কখনো শহীদুল জহির নিয়েও কথা হয়। তা কেমন?
―এই ধরা যাক, একদিন জহির ভাই আমার এখানে একটা মাউথ অর্গান নিয়ে এসে বললেন, এটাতে আওয়াজ কম আসে। আমি তো আসলে তারবাদ্য সারাই, যে যন্ত্রে তার নাই, তা কেমন করে সারাই?
তাই তো!
―জহির ভাইকে একটা হারমোনিকা দিয়ে বলি, আপাতত এটা ব্যবহার করতে থাকুন, আমি ঠিক করে আপনাকে পাঠিয়ে দেব। তো, জহির ভাই এটা মুখে নিয়ে বাজাতে লাগলেন। তিনি যে খুব ভালো বাজাতেন তা নয়, কিন্তু তার লেখালেখির মতোই নিজস্ব সুরে-তালে কিংবা ভাঙা ভাঙা জাদুবাস্তবতায়! আমি বলি, আমি আপনার বাসায় গিয়ে ভালো করে শিখিয়ে দেব। এভাবে কতবার যে তার বাসায় গেছি, একসময় হারমোনিকা আর বাজানো হয় না, ওনার সাথে গল্প করেই সময় পার হয়।
আখতার সাহেব অঘোরের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় করে প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, মাউথ অর্গান আর হারমোনিকা তো একই বস্তু, তুই এটাকে আলাদা করলি কোন হিসেবে?
―যে হিসেবে একই প্রসঙ্গ ও আলাপটা উনি কয়েকবার বলতে থাকেন এবং তা মোটেও এক মনে হয় না! এটাই তো জাদু, তাই না!
আখতার সাহেব অঘোরমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে আবারও প্রশ্ন করেন, আচ্ছা, অঘোর, তার সে মাউথ অর্গানটা তুই ফেরত দিয়েছিলি? ওটা কি সারাতে পেরেছিস?
লাজুক হেসে সে বলে, না-না, জহির ভাই এটা ভুলেই গেছিলেন পরে। আমি আর মনে করিয়ে দেই নাই। ঠিক করার আগেই মাহমুদুল হক ভাই ওটা আমার কাছ থেকে জোর করে নিয়ে যান! তিনি বাজাতে পারতেন না কিন্তু এত সুন্দর একটা মাউথ অর্গান, যার পিতলের পাতগুলোতে ছিল নানান রঙের ছোট ছোট পাথর খোদাই করা। আর মাহমুদ ভাই তো পাথরের জহুরি; হয়তো দামি পাথর হবে, তাই জোর করে নিয়ে যান।
তখন নিবিড় এ আলাপের ভেতর দিয়ে হঠাৎ এসে ঢুকে পড়ে। নিবিড়কে দেখে আলাপ আরও চাঙা হয়ে ওঠে, আলাপের আকাশে ঘনকালো মেঘ আর বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করে; কারণ, নিবিড় খুব ভালো শ্রোতা এসব আলাপের।
কেন, সে এত ভালো শ্রোতা কেন হতে যাবে?
কারণ, সে ভালো করেই জানে, মাহমুদুল হক বা শহীদুল জহিরের সাথে অঘোরমণ্ডলের কোনোদিন দেখা হয়নি। আরও ভালো করে জানে, এ দুজন অঘোরের প্রিয় লেখক; এদের লেখালেখির প্রতিটা লাইন তার মুখস্থ বলতে গেলে কিন্তু কোনোদিন অঘোরমণ্ডলকে একটা লাইনও কাউকে বলতে শোনেনি নিবিড়।
কেবল দুজনকে নিয়ে নানান গল্প, যা সে দারুণভাবে বানাতে পারে, কেউ শুনে ঠিক অবিশ্বাস করতে পারবে না আবার বিশ্বাস যে করবে, এমনও নয়; এমনকি আখতার সাহেবও তার এসব গল্প ও আলাপ শুনতে পছন্দ করেন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের তোয়াক্কা না করে। অঘোরের কল্পনা ও স্মৃতিশক্তির তারিফ না করে পারা যায় না মোটেই।
নিবিড়ের হাতে ছিল একটা পুরোনো বই, মাহমুদুল হকের লেখা। বইটার নাম, ‘জীবন আমার দুঃসম্পর্কের বোন’! এ নামে তাঁর কোনো বই আছে বলে জানা যায় না। কিন্তু এ বইটি অঘোর তাকে অনেক আগে দিয়েছিল আর বলেছিল, এটাই আসলে মাহমুদুল হক লিখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তা না লিখে তাকে বলে গিয়েছেন কাহিনিটা।
‘জীবন আমার বোন'-এর পরের বই, ‘জীবন আমার দুঃসম্পর্কের বোন’ সম্পর্কে আখতার সাহেবও জানেন। এটা মাহমুদুল হকের রিভাইভ―পুনর্জন্ম বা প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত বহি! যা আসলে রচনা করেছে অঘোরমণ্ডল নিজেই, যে বই পড়ে আসল মাহমুদুল হককে বের করা যাবে।
কিন্তু আসলেই কি তা সম্ভব?
নিবিড় বইটা পড়েছে, তন্ন-তন্ন করে খুঁজেছে মাহমুদুল হককে; সেখানে কেবল এক সাধারণ, খুব সাধারণ ব্যক্তি মাহমুদুল হকের কথা, যার জীবন সম্পর্কে, মানুষ সম্পর্কে―কাম, প্রেম, মায়া, করুণা, দয়া কিংবা লাম্পট্য সম্পর্কে কোনো আগ্রহই নেই!
সেখানে আছে এক নৃত্যপর নটরাজন, তাঁর পায়ের তলায় প্রকাণ্ড আরেক মাহমুদুল হক, যে বিগত, খণ্ডিত, দহনগ্রস্ত! তার শবের ওপর দাঁড়িয়ে প্রলয়নাচন নাচছেন স্বয়ং তিনি মাহমুদুলেশ্বর...।
তিন.
যে ভোরে কাক ডাকে না, সে ভোরের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল অঘোরমণ্ডল। কাকের আওয়াজ তার কানে বিরক্ত লাগে। মনে হয় ভোরের স্নিগ্ধ ও শান্ত পল্লবের ধীরে জেগে ওঠা ধ্যানকে ঠেলে ভাঙানো। প্রায় সকালে তাকে দেখতে পাওয়া যায় কাক তাড়াতে, চলিষ্ণু কাকতাড়ুয়া যেন! কাক কি তার তাড়া খেয়ে ভয় পাবে, ছুটে পালাবে? মোটেই না, বরং দলবেঁধে আরও আরও হাজারো কাকের মচ্ছব বসাবে।
সেদিন সকালেও অঘোরের কাক খেদানোর ব্যর্থ অভিযান দেখে পেছন থেকে ঘাড় ধরে টেনে আনেন আখতার সাহেব। কামাল মিয়ার চায়ের দোকানে বসিয়ে এক কাপ চা খেতে খেতে তাকে বলেন,
―তুই যে মাহমুদুল হকের নামে নিজের বইটা চালিয়ে যাচ্ছিস, সে তো বুঝলাম, এরপর শহীদুল জহিরের ক্ষেত্রেও কি একই ব্যাপার ঘটবে!
আপনি এ প্রশ্ন করবেন আমি জানতাম। তাই আগেই উত্তরটা মুখস্থ করে রেখেছি, যাতে ভুল না হয় বলতে।
―কী উত্তর?
আমি অনেক অনেকবার চেষ্টা করেও জহির ভাইকে ধরতে পারি নাই। মাহমুদুল হকের আছর সহজে ছাড়ে না, যখনই জহির ভাই একটু দেখা করতে আসেন, ঠিক তখন হক ভাই এসে সামনে দাঁড়ান! কোনো কথা বলেন না, খালি হাসি মারেন। ওনার হাসি তো আপনি জানেন, কী রহস্যময়!
―আর কেউ আসেন না তোর সাথে দেখা করতে?
আসেন তো, আপনিও আসেন।
―সে কী কথা! আমাকে বেঁচে থাকতেই ভূত বানিয়ে ফেললি? তুই তো মহা গোলমেলে ব্যাপার দেখছি।
না-না গোলমেলে না কিছু। আপনি আগাগোড়াই এক রহস্যময় চরিত্র, জীবন্ত ভুতুড়ে ব্যাপার! আমার মনে হয়, আপনি মরলেই আসল আপনাকে পাওয়া যাবে।
আখতার সাহেব অঘোরের এমন আজব কথা শুনে অবাক হন!
―আমার সাথে চলে এই উন্নতি হয়েছে তোর, বোঝা গেল! তুই যে আস্ত এক পাগল, সেটা মানুষ বোঝে কিন্তু উপভোগ করে তোর এসব পাগলামি-টাগলামি।
আপনারই তো শিষ্য, তাই না? আপনিই তো আমাকে বলেছেন, কেবল পাগলই ঠিকঠাক আছে পৃথিবীতে। আমি পাগল হলে তা আপনার কারণে, নয়তো কবেই দুনিয়ার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে বেতাল হয়ে যেতাম।
―চা-টা শেষ কর। হাঁটতে হবে একটু। আমি ভাবছি, তুই আরও মহান কিছু মানুষের সাথে কেন দেখা করতে পারিস না, তুই এতটাই মাহমুদুল হক দ্বারা আক্রান্ত কেন?
জানি না, হতে পারে তার চরিত্রগুলি আামাকে নাড়ায় কিংবা আমিই এসব চরিত্রসমষ্টি! চরিত্রের বর্ণনায় কোনোরকম চালাকি থাকলে সেটা বেশিদূর যেতে পারে না, মেকি বর্ণনার ভেতর প্রাণ থাকে না, আমি যেখানে প্রাণ খুঁজে পাই, সেখানেই আমাকে দেখতে পাই।
চা পান শেষ করে সামনের দিকে এগিয়ে চলে ওরা। আখতার সাহেব অঘোরের কথায় বেশি কথা বলেন না। অঘোর গভীরভাবে অন্যমনস্ক এক মানুষ, তার সাথে বেশিদূর কথা বলা যায় না, কিন্তু তার কথা শোনা যায়, শুনতে মজা লাগে। বানানো কথা হলেও এসব কথার ভেতর একটা সারসত্য থাকে যা বোঝার জন্যও এলেম লাগে।
―প্রাচীন যুগে এমন কিছু মানুষ ছিলেন যারা গ্রিসের পথে, ব্যাবিলনের পথে, উর বা আলেকজান্দ্রিয়ার পথে, বাগদাদের পথে হেঁটে বেড়িয়েছেন আর বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলেছেন। পাগলের বেশে জনপদ হতে জনপদ চষে বেড়িয়েছেন। তাদের কেউ কেউ শূলে চড়েছেন আবার কারও ঘটেছে খ্যাতি। আমি কি খুব একটা অন্যায় করছি?
অঘোরের এমন প্রশ্ন শিশুতোষ নাকি দার্শনিকতাপূর্ণ, তা বের করতে গিয়ে একটু সময় নিলেন আখতার সাহেব।
চার.
কাকতাড়ানো ভোর যে কখন শেষ হয়ে সকালটাও বাসি হবার পথে, সেদিকে কোনো তোয়াক্কা না করে অঘোর আখতার সাহেবের সাথে হেঁটে চলেছে শহরতলির দিকে, যেখানে নদীর ঘাটে শতশত নৌকা দুলে উঠছে ঢেউয়ের তালে আর ঠোকাঠুকি লাগছে। ওপার হতে প্রতিটি ঢেউ এপারে এসেই এত এত নৌকার ঠোকাঠুকি, অদ্ভুত শব্দ করে চলছে!
নদীর ঘাটে একটা দোকান থেকে অঘোর সিগারেট ধরিয়ে আখতার সাহেবকে দেবার পর তিনি তা ঠোঁটে চেপে সামনে পা বাড়াতেই দেখতে পেলেন, মাহমুদুল হক আর শহীদুল জহির একসাথে একটা নৌকায় উঠছেন।
―অঘোর দেখতে পেয়েছিস?
ও মা, আপনিও দেখছেন? কেবল আমিই কথা বানাই? আপনি এখন দেখছেন কী করে!
―আহ্ কথা বাড়াস না, চল তো, গিয়ে নৌকায় উঠি!
দ্রুত পেছন পেছন নৌকাতে উঠে বসলেন তারা। এক মাথায় হক সাহেব বসেছেন আর তাঁর পাশে শহীদুল জহির। তাঁরা একে অপরের অচেনা মনে হলো, কথা বলছেন না, কেবল একটু পর পর একজন আরেকজনের দিকে আঁড়চোখে তাকিয়ে দেখছেন!
অঘোর একটু কাছে গিয়ে হক সাহেবকে বলল, আপনার কথা যে আমি বলি, সেটা লোকে বিশ্বাস করে না একটুও, কিন্তু মজা পায়। এই দেখেন, আমার গুরু আখতার সাহেব, তিনিও মজা নেন আর আমারে বকেন।
আখতার সাহেব অবাক হয়ে শুনছেন অঘোরের কথা। অঘোর আবারও হক সাহেবকে বলছে,
―‘জীবন আমার দুঃসম্পর্কের বোন’ যখন লিখে শেষ করি, তখন আপনি তা সম্পাদনা করে দিতে গিয়ে বলেছিলেন, এ গল্প আপনি আমাকে দিয়ে লিখিয়েছেন; তার কারণ, আপনি আপনাকে নিয়ে এভাবে লিখতে পারছিলেন না, আমাকে দিয়ে যা সহজ করে লেখানো যায়। আমি আপনার অস্তিত্বের অনুভবে এতটাই ঘোরগ্রস্ত ছিলাম যে, আমাকেই মাহমুদুল হক মনে করতে শুরু করি।
পাশ থেকে শহীদুল জহির বলেন,
―আচ্ছা, আপনিই মাহমুদুল হক! বেশ চেনা চেনা লাগছিল বলে বারবার তাকাচ্ছিলাম। আমি তো বাইরে খুব একটা বেরুতাম না, আপনার সাথে দেখা হয়েছিল কি না, তাও ঠিক মনে নেই আমার। কিন্তু এ কথা শুনে বেশ মজা লাগছে যে, একজনের গল্প অন্যজন রচনা করছেন!
জবাবে মাহমুদুল হক বললেন,
― ‘কালো বরফ’ এর ভেতর দিয়ে যে ঘাতচিহ্ন শুকায়নি, সেখানে আবারও ‘জীবন আমার বোন’ এসে নতুন করে কীটদংশন করে গেছে। কিন্তু আমার ঘা যে আর শুকায়নি! অঘোর চেষ্টা করেছে তাতে মলম লাগাতে। বেঁচে নেই আর―এ যেমন সত্য, মরেই যে গেছি একেবারে―তাও নয়। অঘোর আমার ঘা-কে আরো গভীরে খুঁচিয়ে আক্রান্ত করে মলম লাগিয়েছে। হোমিও চিকিৎসায় মূল ধরে রোগনির্ণয় করার মতো!
―আপনার ঘা কি শুকিয়েছে? আখতার সাহেবের প্রশ্ন।
এটা অঘোর না চাইলে শুকাবে না। সে চালাক, একেবারে শুকাতে চায় না। তাতে কথা আর বানানো যাবে না।
শহীদুল জহির হা হা করে হেসে ওঠেন। অঘোরের কাছে তার সেই কত আগের দেয়া মাউথ অর্গানটা ফেরত চান। কিন্তু হক সাহেব তা নিয়ে যাওয়ার কথা বলাতে তিনি আরও হাসতে থাকেন।
―আপনার মাউথ অর্গানটাতে বেশ কিছু দামি পাথর খচিত ছিল। তার একটি আমি বিক্রি করেছিলাম পঞ্চাশ হাজার টাকায়। আপনার জন্যই তা কিনে নিয়েছিল আপনার অফিসের পিয়ন।
হক সাহেবের কথা শুনে একটু অবাক হয়েই নিজের ডান হাতের মধ্যমায় তাকিয়ে দেখতে পান একটা সোনার আংটিতে চকচক করছে নীললোহিত পাথর। নামটা মাহমুদুল হকের দেওয়া। এ পাথরের দুর্নাম আছে ঢের। যার কাছেই থাকে, তার দশা ঘটে।
পাথরটির দিকে বিস্মিত মনে তাকিয়েই প্রশ্ন করলেন শহীদুল জহির,
―তবে আমাকে এ পাথর কেন দিয়েছিলেন?
আপনি পাথরে বিশ্বাসী নন, তাই এ পাথর আপনার কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারে না। এ নীললোহিতই পরে আপনার প্রিয় জিনিসে পরিণত হয়েছে বলে জেনেছি। আপনার সেই পিয়ন প্রায়ই আসত আমার দোকানে। ও আমার বই পড়ত। সে বলেছিল, পাথরটার দিকে তাকিয়ে আপনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন। আপনাকে বেশ গভীর ও দৃঢ় মনে হত। আপনার লেখালেখিও পাথরটা পরার পর ভালো হতে থাকে। যদিও এ পাথর আপনার লেখা লিখে দেয়নি, আপনিই লিখেছেন।
―এ পাথরটি আমাকে অদ্ভুত এক শক্তি দিত। পরশপাথরের মতো যেন শুষে নিত আমার লেখা হতে অপাঠ্য যা―সব।
তাদের কথা চলতে থাকে দীর্ঘক্ষণ। অঘোর এবং তার গুরু আখতার সাহেব বসে শুনতে থাকে, নদীতে বড় বড় ঢেউ হতে থাকে, আকাশ ঘন মেঘে ছেয়ে যেতে থাকে, বাতাস বইতে থাকে জোরে। একটি বড় ঢেউয়ে একসময় নৌকাটি এতটাই দুলে ওঠে যে, হঠাৎ করে মাহমুদুল হক পড়ে যান নদীতে, তাকে তুলতে গিয়ে শহীদুল জহিরও ঝাঁপ দেন।
তখন আখতার সাহেব আর অঘোর বসে থাকেন নৌকায়।
―আচ্ছা অঘোর, তুই নামছিস না কেন? ওরা তো ডুবে মরবে!
অঘোর কিছুক্ষণ হাসতে থাকে। দুজনের কাউকেই দেখা গেল না উঠে আসতে। আখতার সাহেবের অবাক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে নৌকার ভেতর থেকে মাহমুদুল হকের আধখাওয়া একটা সিগারেটের অংশ তুলে মুখে পুরে বলল,
―হয়েছে অনেক, আর বানানো কথার ফাঁদে পড়ে কাজ নেই। বাসায় চলুন, আপনার আর ডুবে মরতে হবে না। আজ একটা নতুন বইয়ে হাত দেব, ‘ডলু নদীর অপ-হাওয়া’!
যেখানে শহীদুল জহির ঝাঁপ দিয়েছিলেন, মাহমুদুল হককে নিয়ে, আর লোকে এটা বিশ্বাস করবে?
―বিশ্বাসের কী দরকার? শুনলেই হলো। মজা পেলেই হলো। আপনি বলেন না যে, মজা করে জীবন কাটাও, বেদনাকেও মজার গজা বানিয়ে খাও।
খেয়েছে তো, ‘অনুর পাঠশালা’য় সরুদাসীর ক্ষেত্রে যা হলো! খুব খেয়েছে না লোকে?
―আপনার কথা বুঝেছি। আপনিই আমাকে প্রথম ‘অনুর পাঠশালা’ পড়তে দিয়েছিলেন। আমি যে ধাক্কা খেয়েছিলাম, তা হতে বেরুতে আমার সময় লেগেছে খুব। কিন্তু একটা কথা কি আমায় বলবেন?
কী কথা?
―শহীদুল জহির আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন কেন?
মাহমুদুল হকের ধাক্কা হতে সহজে যেন বের হতে পারিস। ওর লেখায় সবকিছুকে সহজ করে দেখার প্রবণতা আছে।
―আপনার এ বুদ্ধিই আমাকে ঘোর পাগলে পরিণত করেছে। ওরা দুজনই আজ ডুবে মরেছে। আমি তুলে আনিনি। অনেক হয়েছে। এখন আমি আমার কথাই লিখব। আমার নাম অঘোরমণ্ডল গড়াই। আমি আপনার ভক্ত। আপনি আমাকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিন।
আয়, এত দিন পর তুই একটা কাজের কথা বলেছিস। চল, বিষ্ণুপরে যাই একদিন।
―কী আছে সেখানে?
আমি আছি, আমার জীবন্ত অতীত! তুই দেখবি না?
―দেখতে চাই। আপনার ভেতর দিয়ে আমাকে বুঝতে চাই।
নারে, আমি আমার আসল আমিকে দেখিয়ে আরেকটা নৌকায় উঠে ঠিক ওদের মতোই ডুবে মরব। তখন তুই একা হয়ে যাস। নিজের মতো করে বেঁচে থাকিস, ভাবিস, বলিস।
অঘোরের হাত ধরে হেঁটে চলছেন আখতার সাহেব। তারা খুব শিগগিরই হয়তো বিষ্ণুপরে পৌঁছে যাবেন। আখতার সাহেবের শৈশব কেটেছে যেখানে। যেখানে এখনো হিজল গাছের নিচে হয়তো খরিশ সাপদুটি একে অপরকে জড়িয়ে ধরে; হয়তো তার পাশে গভীর সেই শামুক-ঝিনুকের পুকুরে কিশোরী মেয়েটি তার সকল আভরণ খুলে ডুব দেয় জলেশ্বরী হয়ে; হয়তো থেঁতলে যাওয়া শরীর নিয়ে ঢোঁড়াসাপটি তার শেষ বিষটুকু রেখে যাবার গোবর খুঁজতে থাকে এখনো―হয়তো না…।
অঘোর আখতার সাহেবেরই এক দারুণ চরিত্র, যাকে তিনি মুক্তি দিতে চান খুব শিগগির, তাই তিনি বিষ্ণুপুরে যেতে চান শেষবারের মতো―সেই জলে, গভীর সোনালি জলে, এখনো অপেক্ষা করছে তার জন্য যে, তার সাথে ডুবে যেতে পারলেই...