Published : 30 Jun 2026, 12:35 PM
বাবা গোলাম মোস্তফা ছিলেন প্রখ্যাত কবি। ইসলামি গানসহ লিখেছেন হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন-চরিত বিশ্বনবী। কিন্তু তারপরও মুস্তাফা মনোয়ারকে কোনোরকম গোঁড়ামির ভেতর দিয়ে বড় হতে হয়নি। পরিবারে গান-বাজনা, ছবি আঁকা আর আবৃত্তিচর্চার অবারিত সুযোগ তো ছিলই-সঙ্গে ছিল নজরুল ও সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো বড় কবি-সাহিত্যিকদের আনাগোনা। ফলে শিল্পী হয়ে ওঠার জন্য তাঁকে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি।
ছোটবেলাতেই আঁকাআঁকিতে পাকা হতে গিয়ে কখন যে গণিতে কাঁচা হয়ে বসে আছেন-টেরই পাননি। কিন্তু যাঁর মাথায় ছবি আঁকার নেশা তাঁর গণিত নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে কেন! পাশে দাঁড়ালেন রসরাজ সৈয়দ মুজতবা আলী। বললেন, তোমার গণিতের সূত্র মুখস্থ করে কাজ নেই বাপু, তুমি আর্ট কলেজের পথ ধরো। মুস্তাফা মনোয়ার তাই করলেন। তিনি বিজ্ঞান ছেড়ে কলকাতার চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন এবং সবাইকে চমকে দিয়ে স্নাতক পাস করলেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে। শুধু তাই নয়, ছাত্রাবস্থায় দুটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে শ্রেষ্ঠ চিত্রকর্মের জন্য জিতে নিলেন দুটি স্বর্ণপদক। ভাগ্যিস সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো পণ্ডিতের সঙ্গে তাঁর চেনাজানা ছিল, না হলে জীবন অন্যদিকেও বাঁক নিতে পারত!
স্নাতক শেষে মুস্তাফা মনোয়ার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ঢাকা আর্ট কলেজে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ)। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ছাত্রকালেই তাঁকে এখানে আসার অনুরোধ করে রেখেছিলেন। ঢাকা আর্ট কলেজে তিনি শিক্ষকতার কাজই করেননি, নির্দেশনা দিয়েছেন মঞ্চ নাটকের, নেতৃত্ব দিয়েছেন চিত্রপ্রদর্শনীর। এককথায় ছাত্রছাত্রীদের শিল্পসত্তা নির্মাণের জন্য যা করা দরকার তিনি তাই করেছেন।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। তাঁর প্রতিভার খবর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কানেও পৌঁছে গিয়েছিল। ফলে ঢাকা টেলিভিশনের সূচনাতেই তাঁকে ডাকা হলো। তিনিও সাতপাঁচ না ভেবে চারুকলা ছেড়ে টেলিভিশনে যোগ দিলেন। তখন পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের শীতল যুদ্ধ চলছে। রেডিও ও টেলিভিশনে সব ধরনের রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুল সংগীত বাজাতে দেওয়া হচ্ছে না। সেই বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেই মুস্তাফা মনোয়ার বেশি করে তুলে ধরেন বাঙালি সংস্কৃতির নানাদিক। শিল্পীর অভাব ছিল, তাই নতুন শিল্পী তৈরির জন্য চালু করলেন শিশু-কিশোর প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রম ‘নতুন কুঁড়ি’, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো হিসেবে খ্যাতি কুড়ায়। এর বাইরে তিনি ‘আজব দেশ’ অনুষ্ঠানে বাঘা ও মেনি নামে দুটি পাপেট চরিত্রের মাধ্যমে টানা তিন বছর পাকিস্তানিদের বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী অবস্থানকে ব্যঙ্গ করে গেছেন।
সময় গড়াতে থাকে আর পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে বাঙালিদের দ্বন্দ্বও বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে চলে আসে ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ। বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। সাতই মার্চের সেই তেজোদীপ্ত ভাষণে সারাদেশের মুক্তিকামী জনতার সঙ্গে উদ্দীপ্ত হন মুস্তাফা মনোয়ারও। আর তাই ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান শেষে রীতিমাফিক পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানো হয়নি তাঁর পরিকল্পনাতেই। এই দুঃসাহসিক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের পরই তাঁর জীবন হুমকির মুখে পড়ে। কাছের মানুষদের সহযোগিতায় কলকাতায় পাড়ি দিয়ে শেষাবধি নিজেকে বাঁচাতে সক্ষম হন। কলকাতায় পৌঁছেই লক্ষ করেন শরণার্থী শিবিরে কোনোরকম আনন্দ নেই। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন পাপেট শোর আয়োজন করে সবাইকে উজ্জীবিত করবেন। তাঁর এই মহতী উদ্যোগের সঙ্গে যোগ দিলেন আরও কয়েকজন। শুরু হলো শরণার্থী শিবির আর ক্যাম্পে ক্যাম্পে পাপেট শো। সীমাহীন দুঃখের ভেতর এই পাপেট শো বয়ে আনল অনাবিল আনন্দধারা।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুস্তাফা মনোয়ার দ্রুতই ফিরলেন ঢাকায়। ঝাঁপিয়ে পড়লেন নতুন শৈলীতে টেলিভিশন অনুষ্ঠান তৈরির কাজে। ১৯৭২ সালে আবার শুরু করলেন ‘নতুন কুঁড়ি’; নির্মাণ করলেন রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী আর শেকসপিয়ারের টেমিং অব দ্য শ্রু অবলম্বনে মুনীর চৌধুরীর অনুবাদকৃত মুখরা রমণীবশীকরণ-এর মতো নাটক। রক্তকরবী নাটকটি দেখে সত্যজিৎ রায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদকে বলেছিলেন, ‘ মোস্তফা মনোয়ারের নাম শুনেছি, জলরঙে ভালো ছবি আঁকেন, কিন্তু তিনি যে এত সুন্দর নাটক বানাতে পারেন তা জানা ছিল না, এই নাটক কলকাতায় এভাবে কারও পক্ষে বানানো সম্ভব না।’ তারেক মাসুদের মুখে এই খবর শুনে মোস্তফা মনোয়ার বলেছিলেন, আমার নোবেল পাওয়া হয়ে গেছে!
নাটকে খ্যাতি কুড়ালেও নিজের আবিস্কৃত পাপেট শিল্পকে তিনি ভুলে যাননি। স্বাধীনতার পর বাংলার রূপকথা থেকে তৈরি করেন পাপেট চরিত্র পারুল। বাংলায় এমন একটি রূপকথা আছে যেখানে পারুল নামের একটি বুদ্ধিমতী মেয়ে তার ঘুমন্ত সাত ভাইকে জাগিয়ে তোলে। দেশের অমূল্য লোকসাহিত্য বহু মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই তিনি পারুল চরিত্রটিকে পাপেটের জগতে নিয়ে আসেন। পারুল, বাউল ভাই আর ষাঁড়কে নিয়ে নির্মিত তাঁর ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানটি নব্বই দশকের শিশু-কিশোরদের কাছে এক নান্দনিক অভিজ্ঞতার নাম। এই অনুষ্ঠান এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে, রাস্তায় তাঁকে দেখলেই শিশুরা বলে উঠতো-‘শিল্পী ভাই, ও শিল্পী ভাই’। ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানে শিল্পীর চরিত্রে অভিনয় করারর সুবাদে তিনি নিজেও এই জনপ্রিয়তা লাভ করতে পেরেছিলেন। অনেকের হয়ত ধারণা নেই যে, ‘মীনা’ ও ‘সিসিমপুর’ কার্টুন সিরিজ নির্মিত হয়েছে ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানের আদলে।
কবি পূর্ণেন্দু পত্রী বলেছিলেন, ‘একটি দেশের জন্য একজন মুস্তাফা মনোয়ারই যথেষ্ট’। মুস্তাফা মনোয়ারের জীবনের দিকে তাকালে কথাটির সত্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে সহজেই। তিনি কী করেননি দেশের জন্য? সেই ১৯৫২ সালে নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন ভাষা আন্দোলনের ওপর কার্টুন আঁকার অপরাধে একমাস জেল খাটলেন। তারপর থেকে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে নিজেকে এমনভাবে যুক্ত করলেন, যার কোনো তুলনা হয় না। অস্ত্র হাতে তিনি কখনোই যুদ্ধ করেননি। কিন্তু তাঁর মতো মুক্তিযোদ্ধা কজন আছে? মৃত্যুহীন এই মহাপ্রাণ সবসময়ই বলতেন, আমাদের লালন আছে, রবীন্দ্রনাথ আছে, নজরুল আছে, বঙ্গবন্ধু আছে; আমরা কেন পিছু হটবো? দেশকে অন্তর থেকে ভালো না বাসলে এভাবে নিজেকে প্রকাশ করা যায় না। এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, আমরা মনে করি ছবি আঁকা, গান গাওয়া, কবিতা লেখা, অভিনয় করা কোনো কাজ নয়, এগুলো সবই অকাজের-সত্য হলো এই যে, যা কিছু সুন্দর তার সবই অকাজের, তারপরও আমাদের সুন্দরের চর্চা করে যেতে হবে, কারণ পৃথিবীটা চলছে এই সুন্দর দিয়েই। সৃষ্টিশীলতার অমরত্ব সম্পর্কে বুঝাতে গিয়ে তিনি একটি গল্পের উদাহরণ টেনে বলেছিলেন-একবার মাটি একজন জীবন্ত মানুষকে বলল, শোনো, আমার শরীর থেকেই তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, এবার আমিই তোমাকে নিয়ে যেতে চাই-তোমার হাত, কণ্ঠ, পা সব নিয়ে যাবো। মানুষটি বলল, দেখ মাটি, তুমি আমার হাত, কণ্ঠ, পা সবই নিয়ে যেতে পারবে কিন্তু যে হাত দিয়ে আমি কবিতা লিখেছি, ছবি এঁকেছি সেটা কীভাবে নিবে, যে কণ্ঠ দিয়ে আমি গান গেয়েছি, কবিতা আবৃত্তি করেছি সেটা কীভাবে নিবে?-এগুলো তো তোমার সৃষ্টি নয়! সবই আমার সৃষ্টি! মানুষের এমন কথা শুনে মাটি তো হতবাক! সে ভগবানের কাছে গিয়ে বিস্তারিত বলল। কিন্তু ভগবান আজও এর সমাধান দিতে পারেননি!
মুস্তাফা মনোয়ার এই গল্পের মাধ্যমে বুঝাতে চেয়েছেন, ভগবান মানুষকে মেরে ফেলতে পারে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্ম অমর। আর তাই শত শত বছর আগে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া কবির কবিতা, চিত্রশিল্পীর চিত্রকর্ম, সংগীত শিল্পীর গাওয়া গান এখনও কোটি কোটি মানুষের কাছে প্রিয়। মৃত্যুর হাজার বছর পরও নিজের সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে মুস্তাফা মনোয়ারও যে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অভিবাদন পারুলদের ‘শিল্পীভাই’!