Published : 07 Oct 2025, 11:21 AM
মার্কিন লেখক এডগার অ্যালান পো'র জন্ম (১৮০৯) আমেরিকার বোস্টন শহরের এক সাংস্কৃতিক পরিবারে। অল্প বয়স থেকে পো'র স্বাধীন চিন্তাশক্তি বিকশিত হয়। কাছাকাছি সময়ে বাবা-মা দুজনই মারা যাবার কারণে ভার্জিনিয়ার রিচমন্ডে জন আ্যালান-এর পরিবারে আশ্রিত ছিলেন তিনি।
ছোটবেলা থেকে অনেকটা নিঃসঙ্গতার মধ্যে বেড়ে ওঠেন পো। তখনই তাঁর মধ্যে এক অন্তর্লীন জটিল মনস্তত্ব দানা বেঁধে ওঠে। চারদিকের অবক্ষয়, মনোবিকলন, আর্থিক দৈন্যদশার চিত্র তাঁকে এতটাই বিমূঢ় করে রেখেছিল, তিনি যেন হয়ে উঠেছিলেন অনেকটা নিস্পৃহ স্বভাবের। হয়ত এই মনোবিকলনই স্পর্শকাতরতা বাড়িয়ে দিয়েছিল আর তাই তিনি মানুষের অন্তর্গত যন্ত্রণার গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম হতেন।
বিপুল প্রতিভাধর এই মার্কিন কবি, ছোট গল্পকার, সম্পাদক, সমালোচকের প্রথম সাহিত্য প্রকাশ কবিতার মাধ্যমে। ১৮২৭ সালে তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘টেমারলেন অ্যান্ড আদার পোয়েমস’ প্রকাশিত হয়। তবে ততদিনে তিনি নানান ধরনের ভাষা শিখতে থাকেন। কবিতায় তিনি বিশ্বসাহিত্যে স্থায়ী আসন লাভ করেছেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতা হেলেন, দ্য র্যাভেন। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৮৪৯ সালের ৭ অক্টোবর। আজকে তাঁর প্রয়াণদিবস। বিশ^সাহিত্যের এই অসামান্য সাহিত্য-প্রতিভাকে স্মরণ করে তাঁর কয়েকটি ছোটগল্পের দিকে এখানে দৃষ্টিপাত করা হল।

দ্য টেল-টেল হার্ট
গল্পটির বর্ণনাকারী একজন নামহীন মানুষ। সে শুরুতেই পাঠককে বোঝাতে চায় যে সে পাগল নয়, বরং অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও সচেতন। কিন্তু আসলে তার কথাবার্তাই তার মানসিক অস্থিরতা প্রকাশ করে।
সে একটি বৃদ্ধ লোকের সঙ্গে থাকে। বৃদ্ধের কোনো দোষ নেই, তার আচরণও কোনো সমস্যা নয়, কিন্তু বর্ণনাকারীর চোখে একটাই অসহ্য জিনিস হল বৃদ্ধের ফ্যাকাশে নীলচে চোখ। সেই চোখ তার মনে ভয়, ঘৃণা ও অস্বাভাবিক অনুভ‚তি তৈরি করে। সে চিন্তা করে বৃদ্ধকে হত্যা করলেই তার মুক্তি মিলবে।
প্রতিদিন রাতের আঁধারে সে নিঃশব্দে বৃদ্ধের ঘরে ঢুকে তার চোখ খোলা আছে কি না দেখে। কয়েক রাত পর এক রাতে যখন বৃদ্ধের চোখ খোলা অবস্থায় চকচক করতে থাকে, তখন বর্ণনাকারী ভয়ানক রাগে ফেটে পড়ে এবং তাকে হত্যা করে। তারপর মৃতদেহটি টুকরো টুকরো করে কাঠের মেঝের তলায় লুকিয়ে রাখে।
সে ভাবে অপরাধটি কেউ ধরতে পারবে না।
কিছুক্ষণ পর পুলিশ আসে কারণ প্রতিবেশীরা কোনো একটা চিৎকারের শব্দ শুনেছিল। লোকটি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পুলিশকে ঘরে বসিয়ে চা খাওয়ায় এবং আশেপাশে ঘুরিয়ে দেখায়। পুলিশ কিছুই বুঝতে পারে না।
কিন্তু হঠাৎ তার মনে হতে থাকে, মেঝের নিচ থেকে একটা শব্দ ভেসে আসছে, সেটি যেন ধপধপ করে বাজতে থাকা বৃদ্ধের হৃদস্পন্দনের শব্দ। সেই শব্দ ক্রমে তার কানে প্রচÐ জোরে বেজে ওঠে।
সে আর সহ্য করতে পারে না। মনে হয় পুলিশ নিশ্চয়ই সব শুনছে এবং তাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে। ভয়ে, উন্মাদনায় ও অপরাধবোধে ভেঙে পড়ে সে। চিৎকার করে স্বীকার করে নেয়, ‘হ্যাঁ, আমি করেছি! মেঝের নিচে তাকাও, সেখানে লাশ!’ এভাবেই সে ধরা পড়ে যায়।
এই গল্পটি কি একটি অপরাধ কাহিনি? নাকি ভয়ের গল্প? আসলে দুটোই। একই সঙ্গে এটি শরীর শীতল করা গল্প, যেখানে পো অনবদ্য কুশলতায় অপরাধের এক অন্ধকার সীমানায় ঘুরে বেড়ান। ভয়ংকরভাবে স্নায়বিক এক বর্ণনাকারীর বর্ণনায় এক বৃদ্ধের ধূসর নীলচে চোখ তাকে হত্যার দিকে ঠেলে দেয়। এখানে পো দেখিয়ে দেন কীভাবে আবহ তৈরি করতে হয়, কীভাবে সাসপেন্স ধরে রাখতে হয়, আর কীভাবে গতি বজায় রাখতে হয়। একই সঙ্গে তিনি এখানে আলো ও শব্দের সূ²তম বৈচিত্র্য দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। শুধু চমৎকারভাবে নির্মিত ছোটগল্পের একটি মডেলই নয়, ‘দ্য টেল- টেল হাট’ আসলে প্রায় নিখুঁত এক স্বগতোক্তি, যেখানে পো নাটকীয়তার প্রতি তার তীক্ষè অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। তিনি আমাদের ঠিক ততটুকুই বলেন যতটুকু জানা দরকার, আর বাকি অংশকে ব্যাখ্যাতীত রেখে দেন।

দ্য কাস্ক অব অ্যামন্টিলাডো
গল্পটির বর্ণনাকারী মন্ট্রেসর। সে বলে, অভিজাত ফরচুনাটো বহুবার তাকে অপমান করেছে। প্রথমে মন্ট্রেসর সবকিছু সহ্য করলেও একদিন ফরচুনাটো তাকে অপমান করলে সে প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ করে।
ফরচুনাটো ছিল অত্যন্ত আত্মম্ভরী এবং মদের প্রতি তার দুর্বলতা ছিল প্রবল। মন্ট্রেসর এই দুর্বলতাকে কাজে লাগায়। সে ফরচুনাটোকে বলে, তার কাছে নাকি বিরল এক ধরনের মদ আছে, অ্যামন্টিলাডো। ফরচুনাটো সেই মদ পরীক্ষা করার লোভ সামলাতে না পেরে মন্ট্রেসরের সঙ্গে যায়।
মন্ট্রেসর তাকে নিয়ে যায় তার পরিবারের ভূগর্ভস্থ কবরঘরে। পথে সে ফরচুনাটোকে আরও মদ খাওয়ায়, যাতে সে আরও মাতাল হয়ে যায় এবং কিছুই বুঝতে না পারে।
অবশেষে তারা পৌঁছে যায় এক গভীর গোপন চেম্বারে। সেখানে মন্ট্রেসর ধূর্ততার সঙ্গে ফরচুনাটোকে দেয়ালের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলে এবং ইট-সুরকি দিয়ে দেয়াল তুলে তাকে জীবন্ত কবর দেয়।
শেষ মুহূর্তে ফরচুনাটো ভয় ও মাতলামির মিশ্রণে চিৎকার করতে থাকে, কিন্তু কেউ তাকে বাঁচাতে আসে না। মন্ট্রেসর ঠান্ডা মাথায় প্রতিশোধ নেয়। গল্পটি শেষ হয় তার ভীতিকর স্বগতোক্তির মাধ্যমে।
এটি একটি প্রতিশোধের গল্প। মন্ট্রেসর নামের বর্ণনাকারী আমাদের জানায় যে, সে অভিজাত ফরচুনাটোর হাজারো অবমাননা যতটা সম্ভব সহ্য করেছে। কিন্তু যখন অহংকারী ও আত্মম্ভরী ফরচুনাটো সীমা ছাড়িয়ে তাকে অপমান করে বসে, তখনই তার পরিণতি নির্ধারিত হয়ে যায়।

দ্য মাস্ক অব দ্য রেড ডেথ
এক ভয়াবহ মহামারীর নাম ছিল রেড ডেথ। এটি মানুষকে ভেতর থেকে রক্তক্ষরণে মেরে ফেলত। পুরো রাজ্যে এই প্লেগ ছড়িয়ে পড়লে ধনী ও ক্ষমতাবান শাসক প্রিন্স প্রসপেরো নিজেকে বাঁচানোর জন্য এক হাজার অভিজাত ও আনন্দপ্রেমী বন্ধুকে নিয়ে তার দুর্গের ভেতর আশ্রয় নেন।
দুর্গে ছিল সাতটি আলোকোজ্জ্বল ও ভিন্ন রঙের কক্ষ, প্রতিটিই ভিন্ন ভিন্ন প্রতীক বহন করত। সেখানে আনন্দ, ভোজ, নৃত্য ও মুখোশধারীর উল্লাস চলতে থাকে। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎসবের স্বপ্নময় আবহ ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত আতঙ্কে রূপ নেয়।
সেখানে হঠাৎ লাল পোশাক পরে এক রহস্যময় অচেনা ব্যক্তি প্রবেশ করে। সে যেন মৃত্যুর প্রতীক। প্রিন্স প্রসপেরো ক্রোধান্বিত হয়ে তার মুখোমুখি হতে ছুটে যান, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তিনি মারা পড়েন। এরপর একে একে সবাই রেড ডেথের শিকার হয়। অবশেষে দুর্গে আর কেউ জীবিত থাকে না।
পো, যিনি প্রায়ই আচ্ছন্ন ও কখনো অবিশ্বাস্য এক বর্ণনাকারী এখানে ব্যবহার করেছেন। এখানে আছে নিন্দিত, নির্ভীক প্রিন্স প্রসপেরো, যে রেড ডেথ নামের এক মহামারীর চূড়ান্ত সময়ে নিজেকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে তার এক হাজার প্রফুল্ল বন্ধুর সঙ্গে। কিন্তু শেষে সকলেই মারা পড়ে।
এই গল্পে পো তার অসাধারণ বর্ণনাশক্তির চূড়ান্ত ব্যবহার দেখিয়েছেন, যেখানে প্রিন্স প্রসপেরোর মুখোশধারী নৃত্যানুষ্ঠান প্রথমে স্বপ্নময় মনে হলেও পরে তা রূপ নেয় এক বিকৃত ও ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে।
সাতটি আলোকোজ্জ্বল প্রাসাদকক্ষের প্রতিটি কক্ষে প্রতীক লুকিয়ে আছে, যাতে আছে অসংখ্য সুন্দর জিনিস, কিছু কামোদ্দীপক বিষয়, কিছু অদ্ভুত, কিছু ভীতিকর, আর সামান্য নয় এমন অনেক কিছু যা ঘৃণা জাগাতে পারে।
বস্তুত পো এই গল্পে মানবাচরণ সম্বন্ধে এমন এক বাস্তববাদী মনোভাব গ্রহণ করেছেন যা আজকের অনেক ঘটনাপ্রবাহ ও জনপ্রতিক্রিয়ার সঙ্গে মিলে যায়। পরাবাস্তববাদী এই গল্প গতানুগতিক গল্পের বেড়াকে ডিঙিয়ে আমাদের দৃষ্টিকে বহুদূরে নিয়ে যায়। যারা লোভ বা আত্ম-অহংকারের বশবর্তী হয়ে কাজ করেন, ইতিহাস কখনো কখনো তাদের মরণশীলতা আর শালীনতার পরীক্ষা নেয়। ধ্রæপদী এই সাহিত্য এবং পো-র ছোটগল্প থেকে জীবনের অনেক শিক্ষাই নেয়া যায়, কয়েকবছর আগে ঘটে যাওয়া করোনা মহামারি নামে পৃথিবীজুড়ে যে অনিশ্চিত অবস্থা দেখা দিয়েছিল তা যদি পূনরায় ফিরে আসে সেক্ষেত্রে এটি সতর্কবাণীরও কাজ করবে।

দ্য ফল অফ দ্য হাউস অব উশার
গল্পের নামহীন বর্ণনাকারী তার বন্ধু রডরিক উশার-এর কাছে যায়, যিনি একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ও ভয়ঙ্কর প্রাসাদে বসবাস করেন। রডরিকের মানসিক অবস্থা অস্থির। তার যমজ বোন ম্যাডেলিন অসুস্থ এবং প্রায় মৃত্যু শয্যায়।
রডরিকের অবস্থা দিনদিন খারাপ হয়। প্রাসাদটি আগের মতোই ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। এক রাতে, রডরিকের কল্পিত ভয়ে তাকে এতোই আক্রান্ত করে সে তার বোনকে মৃত ভেবে সমাধিস্থ করে। পরবর্তীতে দেখা যায়, ম্যাডেলিন জীবিত অবস্থায় সমাধি থেকে বের হয়ে আসে, এবং এই আতঙ্কে রডরিক মারা যায়, সেই সঙ্গে প্রাসাদও ধসে পড়ে। এভাবে গল্পটি শেষ হয়।
গল্পটির অকাল মৃত্যু ও অস্থির মানসিক অবস্থা নিয়ে একধরনের আবহ তৈরি করে। ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদ দেখা দেয় মানবমনের ভয় ও অন্ধকারের প্রতীক হিসাবে। গল্পটির মাধ্যমে এডগার এলান পো পাঠককে ভয়ের সঙ্গে প্রতীকী ও মনস্তাত্তি¡ক চিন্তায় নিমজ্জিত করেন।
১৮৩৯ সালে প্রকাশিত হওয়ার সময় এই আকর্ষণীয় গল্পটি প্রশংসিত হয়েছিল। পো সম্ভবত নিজের ব্যক্তিত্বের কিছু দিক ব্যবহার করেছেন গল্পের চরিত্র রডরিক উশার এবং নামহীন বর্ণনাকারীর মাধ্যমে, তবে সমালোচকের মতে, এটিকে আত্মজৈবনিক রচনা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত হবে না।