Published : 06 May 2026, 09:49 PM
মাটির রঙিন হাতি-ঘোড়া-বাঘের পুতুল, বাঁশের সুনিপুণ বুননে তৈরি ঝুলন্ত মুখোশ, পটচিত্র, রিকশাশিল্প কিংবা দেয়ালজুড়ে নকশাচিত্র, খনার বচন, জীবনানন্দ দাশের চিরায়ত পঙক্তি–একসঙ্গে এতকিছু দেখা গেল শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় চিত্রশালায়।
সেখানে এখন চলছে 'ধারণ' নামের এক লোকশিল্প প্রদর্শনী। সেখানে একত্র হয়েছে পাঁচটি ভিন্ন লোকশিল্পধারা নকশিকাঁথা, বাঁশশিল্প, পটচিত্র, মাটির পুতুল ও রিকশাচিত্র।
পুরো গ্যালারি যেন হয়ে উঠেছে বাংলার শেকড়ছোঁয়া এক জীবন্ত ক্যানভাস; যেখানে প্রতিটি শিল্পকর্ম নিজেই বলে ওঠে এই মাটি ও মানুষের শত বছরের গল্প।
গ্যালারিতে ঢুকতেই চোখ আটকে যায় বিভিন্ন উচ্চতায় সাজানো তাকে। সারি সারি মাটির টেপা পুতুল, হাতি, ঘোড়া, বাঘ, পাখি, ময়ূর, কিষানি ও গরু, পেঁচা, পায়রা, মা ও শিশুর অবয়ব। কোনোটি প্রাকৃতিক মাটির বর্ণে সরল, কোনোটি চকচকে রঙে উজ্জ্বল।
এই পুতুলগুলো সংগ্রাহক ইমরান-উজ-জামানের সংগ্রহ থেকে নেওয়া হয়েছে, তিনি এগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সংগ্রহ করেছেন। অঞ্চলভেদে এই পুতুলের গল্প, শৈলী, সৌন্দর্য এবং নকশায় রয়েছে স্বাতন্ত্র্য।
রিকশাচিত্র: রাজপথ থেকে গ্যালারির দেয়ালে

গ্যালারির একটি দেয়াল জুড়ে সারি সারি রিকশাচিত্র। রংচঙে বাঘ, ময়ূর, নৌকা, গ্রামীণ দৃশ্য এসব তো পরিচিত। কিন্তু 'ধারণ'-এর রিকশাচিত্র একটু আলাদা।
এখানে রয়েছে 'প্রতিবাদ', 'আমার রক্তে স্বাধীনতা', 'দেশ কার আমার আপনার সবার', 'শোষণ মুক্ত সমাজ চাই', 'মুক্তি চাই' এমন সব স্লোগান লেখা ছবি।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এই শিল্পকর্মগুলো। ধর্মদাস, গিয়াস, তপন দাস, আ. গফফার-সহ ১৬ জন রিকশাশিল্পীর কাজ স্থান পেয়েছে এই প্রদর্শনীতে।

নকশিকাঁথার ঐতিহ্যবাহী সুতোর বুননে এবার উঠে এসেছে আগ্নেয়াস্ত্রের ফাঁকে ফুল ধরা হাতের ছবি, লেখা রয়েছে 'এনাফ'। একটি কাঁথায় দেখা যাচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থানের দৃশ্য, আরেকটিতে লেখা 'লাখো শহীদের রক্তে কেনা দেশটা কারো বাপের না'।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে শিল্প মেয়েদের হাতে জীবনের গল্প বুনে এসেছে, সেই নকশিকাঁথায়ও এ প্রদর্শনীতে এসেছে প্রতিবাদী ভাষা নিয়ে।
পটচিত্র ও বাঁশশিল্প
গ্যালারির একপাশে রয়েছে পটচিত্রের সমাহার। বাংলার শিল্প-ঐতিহ্য বহন ও সংরক্ষণের প্রধান মাধ্যম ছিল পটশিল্প। পটচিত্রে তুলির সূক্ষ্ম আঁচড়ে, রঙের বিন্যাসে, গল্প বা কাহিনী ধারাবাহিকতায় জীবন্ত হয়ে উঠে। কাপড়ের উপর অঙ্কিত এই চিত্রধারায় মানুষের ধর্ম, বিশ্বাস ও কল্পনার দৃশ্যমান অভিব্যাক্তি হিসেবে গড়ে উঠছিল।

গাজীর পাট, বৌদ্ধ জাতকের কাহিনী এবং হিন্দু পুরাণ এখানে বিশেষভাবে এসেছে। পাশাপাশি ব্যাঙ্গ, রসিকতা ও সামাজিক বাস্তবতাও স্থান পেয়েছে।
এ প্রদর্শনীতে কৃষ্ণলীলা, পৌরাণিক কাহিনি, নৃত্যরত মানবঅবয়ব জীবন্ত হয়ে উঠেছে গ্রামীণ পটুয়াদের তুলির টানে। তাপস সরকার, পারীসা মঞ্জুর, চৈতী, নিখিল চন্দ্র দাসসহ বিশজনের বেশি পটশিল্পীর কাজ এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে।
গ্যালারির আরেক পাশে ছাদ থেকে ঝুলছে বাঁশের তৈরি মুখোশ। কোনোটি মানবিক অবয়বে, কোনোটি বিমূর্ত।
গ্যালারির একটি দেয়ালে বিশালাকৃতির নারী ও পুরুষের মুখোশের পাশে লেখা রয়েছে খনার বচন 'বৈশাখ রাজা আগুন রথে আসে, ধুলির হাসি রাণীর মুখে ভাসে। পুরাতন সব স্মৃতি পুড়ে ছাই, নতুন দিনের আলো ফুটে তাই', 'যদি বর্ষে আগনে, রাজা যায় মাগনে'।
আরেক পাশের দেয়ালে জীবনানন্দ দাশের পঙক্তি ' আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়ির তীরে এই বাংলায়'।

প্রদর্শনী দেখতে আসা এক দর্শক বললেন, "এখানে এসে এক অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করছে। অনেক এক্সিবিশনে গিয়েছি, সেখানে অনেকটা ভিড় ধাক্কাধাক্কি থাকে, এটা অনেকটা নীরব।"
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায় চারুকলা বিভাগের আয়োজনে হচ্ছে এই লোকশিল্প প্রদর্শনী। লোকশিল্পের চিরায়ত রূপটিকে কেবল অতীতের ফ্রেমে বন্দি না রেখে, সমকালীন প্রেক্ষাপটে তাকে নতুন করে উপস্থাপন এবং এর শিল্পমূল্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

প্রদর্শনীর কিউরেটর জিন্নাতুন জান্নাত এবং সহ-কিউরেটর আয়শা নাজমিন অত্যন্ত নিপুণভাবে অতীত ও বর্তমান, গ্রাম ও শহর এবং শিল্পী ও দর্শকের মাঝে একটি অর্থবহ মেলবন্ধন তৈরির প্রয়াস চালিয়েছেন।
প্রদর্শনী শুরু হয়েছে গত ১৩ এপ্রিল, চলবে আগামী ১৫ মে পর্যন্ত।
প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এবং শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সকলের জন্য উন্মুক্ত এই আয়োজন।