Published : 20 Oct 2025, 04:40 PM
ফররুখ আহমদের (১৯১৮-১৯৭৪) মৃত্যু অনেক দিন হয়ে গেছে, এখনও তাঁর কাব্যশক্তির পরাক্রমতা প্রায় প্রশ্নহীন, বলা চলে কালের কষ্টিপাথরেও খানিকটা যাচাইকৃত, কিন্তু তাঁর বিষয় সৌন্দর্য নিয়ে সংশয় কাটেনি। কোন মানদণ্ডে ফররুখ আহমদের কাব্য-বিচার হওয়া উচিত, তা এখনও অনির্ণিত। তিনি একজন শুদ্ধরূপের রোমান্টিক ধারার কাব্য-নির্মাতা, না একজন ইসলাম বিশ্বাসী বাঙালি মুসলমান কবি? তাঁর কালের সামাজিক ও রাজনৈতিক পট বিচার না করে ফররুখ সাহিত্যের প্রকৃত মূল্যায়ন প্রায় অসম্ভব ও অসম্পূর্ণ।
একটু অন্যভাবে বিবেচনা করা যায়, ফররুখ আহমদ যা বলতে চেয়েছিলেন তাঁর সমকালে তা আর কিভাবে বলা সম্ভব ছিল? তখনও স্ফীতোদর বর্বর সভ্যতা'র বিরুদ্ধে বৈষম্যহীন মানবতাবাদী সাহিত্য রচনার প্রধানত দুটি পথ খোলা ছিল, যথা মস্কোমুখী মার্কসবাদী বৈষম্যহীন সমাজ এবং মক্কামুখী শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার পক্ষাবলম্বন করা। পথ ভিন্ন হলেও দুটি পথের গন্তব্য ছিল প্রায় অভিন্ন--দুটির লক্ষ্যই ছিল শোষণহীন, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা। তবে সোভিয়েট ইউনিয়নে সদ্য প্রতিষ্ঠিত সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার প্রতি আধুনিক শিক্ষিত সুধীজনের দৃষ্টি বেশি আকৃষ্ট ছিল।
এ দু’ধারার মাঝামাঝি একটি উদার মানবতাবাদী ধারা আগে থেকেই চালু ছিল, যার প্রতিনিধি রবীন্দ্রনাথ নজরুল বা অধিকাংশ বাঙালি কবি সাহিত্যিক। তার অন্যতম কারণ বিশ শতকের আগে যেহেতু মার্কসবাদের অস্তিত্ব ছিল না, সেহেতু মানবতার কথা বলার জন্য মার্কসবাদী হওয়ার দরকার পড়তো না, আবার বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের আগে যেহেতু এ উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইসলামের সূচনা হয়নি সেহেতু কবিদের খাঁটি ইসলামি কবি হওয়ারও দায় ছিল না তখন। বিষ্ণু দে এবং ফররুখ আহমদের আগে রবীন্দ্রনাথ একাই যার উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন। তবে স্মরণযোগ্য যে, ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন তখনও জার-শাসিত রাশিয়ায় শ্রমিক শ্রেণির (তথাকথিত) শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সুতরাং ভারতবর্ষে তখনও এই প্রপঞ্চ সম্পূর্ণ অজানা ও অনাক্রান্ত। কিন্তু ১৯১৭ সালের কিছুদিন পরে ভারতবর্ষে বুঝি একজন কবি সাতিহ্যিকও ছিলেন না- যিনি মার্কসবাদে বিশ্বাস স্থাপন না করে মানবতাবাদী লেখক হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। মার্কসবাদী এই প্রপঞ্চের প্রতি আকর্ষণের প্রধান কারণ তখন পর্যন্ত মার্কসই ছিলেন পৃথিবীতে ইউটোপিয়া প্রতিষ্ঠার সর্বশেষ মতবাদের প্রবক্তা। জ্ঞানবিজ্ঞানের সৌধের ওপর মার্কস তার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। কিন্তু মার্কসবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অর্ধশতাব্দী অতিক্রম না করতেই মার্কস কোথাও অপসৃত, কোথাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেলেন। আর ইসলাম প্রায় দেড় হাজার বছর অতিক্রম করা সত্ত্বেও সামাজিক রাজনৈতিক না হলেও অন্তত তার আধ্যাত্মিক কারণে অনেক প্রশ্নকেই এখনও পাশ কাটিয়ে যেতে পারছে বলে অনেকে মনে করেন। তবে অপপ্রয়োগ হয়েছে সর্বত্র, এমনকি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর মাত্র চল্লিশ বছর না যেতেই ইসলাম তার মাঙ্গলিক বা কল্যাণমুখী রাষ্ট্রীয় কাঠামোটি হারিয়ে ফেলে, এবং নানা মিশ্র ধারার শাসনতন্ত্র গড়ে তোলে। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনে নিষ্পেষিত ভারতবর্ষের মুসলমানদের জন্য সেই হাজার বছর আগে মরুভূমিতে প্রতিষ্ঠিত স্বর্গরাজ্যের স্বপ্ন দেখা পুনরায় শুরু হয়েছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। তবে তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা সাংগঠনিক রূপ ছিল বলে মনে হয় না। যাঁরা পাকিস্তানকেন্দ্রিক ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন কিংবা যাঁরা গীতার কর্মবাদ ও উপনিষদের আধ্যাত্মিকবাদকে রাষ্ট্রযন্ত্রে সংযুক্ত করতে চেয়েছিলেন, তারা বি-উপনিবেশের কথা বললেও ঔপনিবেশিক শিক্ষা তাদের প্রধান সহায় হয়েছিল। কিন্তু রাজনীতির সূক্ষ্ণ সূত্রগুলো কবির কাছে অনেক সময় অনুন্মোচিত থেকে যায়।
কবি মূলত মানবতার মুখপাত্র, তবে রুডিয়ার্ড কিপলিং-এর মতো কলোনিয়াল মুখপাত্র দু’একজন ঔপনিবেশিক স্বার্থ এবং কল্যাণকে মিলিয়ে দেখতেন, কিন্তু কবি শেষ পর্যন্ত শুভবোধের কাছে অবনত, কিপলিংও। সৎ কবির পুঁজি কোন মতবাদ এমনকি কবিতাও নয়, মানুষ। সেই মানুষের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক মুক্তির কথা ফররুখ আহমদ ভেবেছিলেন। কিন্তু মার্কসবাদী বলি, আর ফররুখের ইসলাম শুভ রাষ্ট্রই বলি, দুটোই ছিল তখন সমকালীন বিষয়। ইসলামের চিরকালীনতা ও শাশ্বতরূপ প্রশ্নাতীত হলেও, ফররুখ আহমদ কিন্তু সমকালীন প্রপঞ্চে প্রভাবিত হয়ে কাব্য রচনা করেছেন। কারণ ব্রিটিশ থেকে আলাদা হবার কালে কারও কারও ধারণা মুসলমানদের ঐক্য সেই সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল। ফররুখের আগে কিংবা পরে কোনো করিব জন্য এই বিষয়টি প্রাসঙ্গিক ছিল না। সুতরাং, একটি নিরপেক্ষ এবং নৈর্ব্যক্তিক অবস্থানের মধ্যে তার বিষয়গুরুত্ব স্থাপন করতে পারলে তাঁর কাব্যের রসাস্বাদন সহজ হতে পারে। বিষয় হিসাবে আর মার্কসবাদও অক্ষত নয়, বরং কবিতায় অনেক বেশি পরিত্যক্ত। কবিরা শোষণহীন বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বললেও, মার্কসীয় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা আজ আর কোনো কবি পবিত্র জ্ঞানে বলেন না। সুতরাং বিষয় নিরপেক্ষতায় কোনো ইজম আক্রান্ত কবি কেবল মানবতাবাদের অক্ষয় কাঠামো এবং কাব্য নির্মাণের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন। কবিতার জন্য ইসলাম যদি একটি মধ্যযুগীয় বিষয় হয়, তবে মার্কসবাদী সমাজতন্ত্রও এখন আগের মতো অক্ষত নেই। ফলে বাংলা কবিতায় বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং সুকান্তের সঙ্গে একই পংক্তিতে ফররুখের বসবার সময় এসেছে। এঁদের কবিতা থেকে গন্তব্যের নির্দেশনা ঝরে পড়লেও মানবতাবাদের সুদৃঢ় কাঠামো তাঁদের আটকে রেখেছে। আর কবিতার শক্তিতে কেউ কি কারও চেয়ে কম? সুভাষ আর ফররুখ বন্ধু ছিলেন। শুনেছি একই ক্লাশে পড়েছেন। কিন্তু তাদের মত ভিন্ন হলেও পথ ছিল এক। তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কও অটুট ছিল।
এমনকি কাব্য নির্মাণে এবং শৈল্পিক বোধে ও বিশ্বাসে বিষ্ণু দের সঙ্গে ফররুখ আহমদের এক নিবিড় অন্বয় ছিল। দু’জনই বিশ্বাসের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে বৈপ্লবিক হাতিয়ার হিসাবে শব্দকে নির্বাচন রেছেন। দু’জনই পুরাণের জগৎ থেকে শব্দ তুলে এনে সমকালের নিরাভরণ কাব্য-ঘাটলার শোভা বর্ধন করেছেন। মানবিক কল্যাণের বাণীবন্ধনে উভয়ই ব্রতী ছিলেন। উভয়ই নিঃসঙ্গ হৃদয় থেকে জনসমুদ্রে যাত্রা করেছেন। বিষ্ণু দে বামপন্থী, ফররুখ আহমদ ততোধিক রোমান্টিক। বিষ্ণু দে মার্কসবাদে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। ফররুখ ইসলামকে জীবনের অন্বিষ্ট জেনেছিলেন। পরিণামে দু’জনই মানবতাবাদী। একজন নিরীশ্বর, মানবিক সাম্য প্রতিষ্ঠা যার লক্ষ্য, অন্যজন স্রষ্টার ন্যায় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছেন। তাছাড়া এলিয়ট ছিলেন উভয়েরই প্রিয় কবি। মার্কসিস্ট হয়েও তথাকথিত অবক্ষয়ী ও খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাসী এলিয়টের কবিতায় বিষ্ণু দে আপ্লুত ছিলেন, এটি ছিল আশ্চর্যের। ফররুখ ছিলেন বিশ্বাসের দিক দিয়েও এলিয়ট এবং ডবিøউ বি ইয়েটসের কাছাকাছি। এলিয়ট যখন ‘দত্ত’ ‘দয়ধ্বম’ এবং ‘দামতো’র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন কিংবা ইয়েটস যখন বাইজেন্টাইনের দিকে যাত্রা করেন, তখন তাদের সহযাত্রী হতে আমাদের আপত্তি থাকে না। অন্য কিছু না হলেও অন্তত ভ্রমণের আনন্দ অনুভব করি। তাহলে সাত সাগরের মাঝি’র। সঙ্গে সমুদ্র ভ্রমণে আমাদের সংকোচ কেন? হয়তো গায়ের যোগী বলে আমরা ভিক্ষার হাত গুটিয়ে রেখেছি।
ফররুখ আহমদ বাংলা কবিতার ভূগোল একখণ্ড ভূমির মালিক হতে পেরেছিলেন। তাঁর সে এলাকা যত ছোটই হোক, চলনে-বলনে ভাষায় ভঙ্গিতে সে ভূমি তাঁর একান্ত নিজের। অন্যের প্রবেশাধিকার সেখানে সংরক্ষিত। কাব্যের আঙ্গিকে তিনি নজরুলের মতো প্রশস্ত ও বিক্ষিপ্ত নন। সীমাবদ্ধ কিন্তু সীমার মধ্যে বড় পরিপাটি। এমন সাজানো বাগান বাংলা কাব্যে খুব সামান্যই আছে। তাঁর নারঙ্গী বন’ আর নারকেল বনের হাতছানি, লবঙ্গ ফুল আর এলাচের মৌসুমী আমাদের জিন্দেগী আর মউতের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দেয়। ফররুখের জগৎ তাই প্রায়ই আমাদের ব্যবহৃত প্রতিদিনের কদর্য পৃথিবীতে রূপান্তরিত হয় না। তাঁর ভূমিতে লাল পোখরাজ আর ইয়াকুত ভরা দিন। তিনি সমুদ্র ঘুরে তুলে এনেছেন মার্জান মর্মর। তবু ফররুখ সারাজীবন তাঁর কাব্যে শৃঙ্খলমুক্ত পূর্ণচিত্তে জীবন-মৃত্যুর পরিপূর্ণ সুর তুলেছেন।
পরিশেষে, কাব্য মূলত রসাগ্রহীর, রাজনৈতিক ব্যক্তি খোঁজে কাব্যবর্জিত পক্ষের শ্লোগান। ফররুখ আহমদ হয়ত মানবমুক্তি এবং বৈষম্যহীনসমাজ গঠনে ইসলামকে উপায় হিসাবে দেখেছেন। কিন্তু ফররুখ সেই বিষয়ের কারণে আমাদের আলোচ্য নয়, ফররুখ কিভাবে তাঁর শব্দ গেঁথে তুলেছেন, চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন, বাণীর দ্যোতনা সৃষ্টি করেছেন এবং তা কীভাবে আমাদের চিত্তকে প্রশান্তি দেয় সেটিই আমাদের আলোচ্য। আর সে আলোচনায় ভালো লাগায়- ফররুখ উত্তীর্ণ- এ ব্যাপারে বড় একটা বিতর্ক নেই। উপরন্তু ফররুখ আহমদ মানবিক কল্যাণের শুভ উদ্বোধনের প্রতীক নির্মাণে সদা প্রয়াসী ছিলেন। ফররুখ নানা বিতর্ক সত্ত্বেও সৌভাগ্যবানও বটে কারণ বিগত পঞ্চাশ বছরে নানা রাজনৈতিক উত্থান পতনেও ফররুখের কবিতা কখনো স্কুল পাঠ্য থেকে বাদ হয়ে যায়নি। বাংলা কবিতার এক শক্তিশালী এবং স্বতন্ত্র প্রতিভা হিসাবে ফররুখ সব সময় সক্রিয় রয়েছেন।