Published : 04 Jan 2024, 09:25 AM
এ মনোরম, মনোটোনাস শহরে অনেক দিন পর আজ আমরা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে আলোচনাতে বসেছি। কথা হচ্ছে তার গল্পের বিষয় নিয়ে। তার পাঁচটা গল্পের বইতে প্রকাশিত হয়েছে মাত্র বত্রিশখানা গল্প। পঞ্চাশ দশক থেকে সত্তর দশকের প্রথিতযশা লেখকেরা যখন মানিক বন্দোপাধ্যয়ের প্রেরণাতে সমাজমনস্ক উপন্যাস লিখছেন তখন একই আদর্শে ছোট ও বড় গল্প রচনা করছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসসহ হাসান আজিজুল হক, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, আব্দুল মান্নান সৈয়দ প্রমুখ। ‘একই আদর্শ’-- আমরা বলছি এ কারণে যে আলোচ্য গল্পকারেরা স্বল্প পরিসরে তীক্ষ্ণ সমাজবীক্ষণের কাজটা করেছিলেন যা কিনা উপরোক্ত ঔপন্যাসিকেরা দীর্ঘাকারে সম্পন্ন করছিলেন। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, যারা তখন গল্পের মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন তারা সকলেই পরে উপন্যাসে নিজেদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছেন, যেমন, চিলেকোঠার সেপাই (১৯৮৬) এবং খোয়াবনামা (১৯৯৬)-- এ দু’টো কালজয়ী উপন্যাস রচনা করেছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সময়ের প্রয়োজনেই। বলে রাখি, তার যে পাঁচটা গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে তার তালিকাটা এমন: অন্য ঘরে অন্য স্বর (১৯৭৬), খোঁয়ারি (১৯৮২), দুধভাতে উৎপাত (১৯৮৫), দোজখের ওম (১৯৮৯) এবং জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল (১৯৯৭)। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পের ভুবনকে চিহ্নিত করবার জন্য এ পাঁচটা গল্পগ্রন্থ থেকে আমরা কিছু প্রতিনিধিত্বমূলক গল্প বেছে নিয়েছি।
আলোচনাতে ঢুকবার আগে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পের বিষয় নিয়ে আমরা ক’টা সূত্র রেখে যেতে চাই। এ সূত্রগুলো সম্পর্কে ইতোমধ্যেই অনেক আলোচকই একমত প্রকাশ করেছেন। উদাহরণত, খালিকুজ্জামান ইলিয়াস বলছেন-- ‘ইলিয়াস তাঁর গল্পের বিভিন্ন বিচিত্র মানুষের জীবনযাত্রা, তাদের বিশ্বাস, সংস্কার, দুঃখ, শোক, আনন্দ, আহ্লাদ, অনুভূতি, উপলব্ধি, ভঙ্গি, সংলাপ ইত্যাদি’ চিত্রণ করেছেন। এ কাজ করতে গিয়ে তিনি কথাসাহিত্যে তীর্যক আবহ তৈরি করেছেন, কখনও সাহায্য নিয়েছেন কৌতুকময়তার যেটা কিনা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে আমরা আগেই একমত হয়েছি। খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের মতে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের এই নিজস্বতাই জীবনের একটা সামগ্রিক ও পূর্ণবৃত্ত বাস্তবতা প্রকাশ করতে সাহায্য করেছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথাসাহিত্যের এই স্বকীয় বৈশিষ্ট্যই এ দেশের মধ্যবিত্ত মানুষদের অন্তর্গত দোলাচল, গোপন বা নগ্ন সুবিধেবাদ, চিন্তার বৈপরীত্য ইত্যাদি আচার-আচরণকে ক্ষমাহীনভাবে আক্রমণ করে চলেছে। তা’তে করে সত্যিই অস্বস্তি হয় এ দেশের মধ্যবিত্তদের!
‘কীটনাশকের কীর্তি’ নামের গল্পে কিশোর রমিজ আলী ঢাকা শহরের জনৈক শিল্পপতির বাসায় কাজ করে। তার পিতার চিঠিতে খবর আসে, রমিজের বড় বোন কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। এই খবরের পরে রমিজের মনে বিকলন দেখা দেয়। সে স্থির করে, সাহেবের তরুণী কন্যার মুখে বিষ ঢেলে সে তার বোনের হত্যার বদলা নেবে। বিফলে যায় তার প্রচেষ্টা। উল্টো তাকে আটকে রাখা হয় গ্যারাজে। পরবর্তী পদঃক্ষেপ নিয়ে সাহেব এবং মেমসাহেব তখন ভাবছে। দরিদ্র মানুষজন এ সমাজে আসলে সহায়হীন। তাদের প্রতি বৈষম্যের কোনও সমাধান নেই এখানে। তাদের ঘরের মেয়েদের প্রতি সহিংসতারও বিচার নেই কোনও। এমন একটা অবস্থা দরিদ্রদেরকে বিক্ষুব্ধ করতেই পারে, তাদের ভেতরে প্রতিশোধস্পৃহারও জন্ম দিতে পারে, যদিও তা নিষ্ফল হয়ে যাওয়াটা বিচিত্র নয়।

‘যুগলবন্দী’ গল্প অবসরপ্রাপ্ত পোস্ট মাস্টারের ছেলে আসগর হোসেন নামের একজন বেকার যুবককে ঘিরে গড়ে উঠেছে। আসগর হোসেনের একখানা চাকরি চাই। এ কারণে সে সরকারি কর্মকর্তা সারোয়ার কবিরের সাথে লেগে আছে। সে সারওয়ার কবিরের বাসার নানান কাজ করে দেয়, যেমন, গভীর রাতে সারোয়ার কবিরের স্ত্রীর জন্য শহর তন্ন তন্ন করে কমলা খুঁজে আনে, সারোয়ার কবিরের অ্যালশেশিয়ান কুকুর আরগসের সে যত্ন নেয় ইত্যাদি। এর কারণ একটাই-- সারোয়ার কবিরকে সন্তুুষ্ট করতে পারলে নির্ঘাৎ একটা চাকরি মিলবে তার। এই প্রক্রিয়াতে ম্যাকডোনাল্ড এ্যান্ড রবিনসন নামের একটা ফার্মের হয়ে সারোয়ার কবিরের কাছে তদ্বির করতে মনস্থ করে আসগর। সুবিধেটা হলো এই যে ফার্মটার কাজ পেলে তারা আসগরকে চাকরিতে নেবে। এদিকে কুকুরের কোষ্ঠ পরিষ্কার হচ্ছে না জেনে চিন্তিত হয় সারোয়ার কবির। তাই সেই সমস্যার সমাধান করবার জন্য এগিয়ে আসে আসগর। সকালে সিগারেট খেয়ে নিজের কোষ্ঠ পরিষ্কার করে বলে আসগর সেই উপায়টা ব্যবহার করে- সে কুকুরটাকে ইটের গাঁদায় নিয়ে গিয়ে নিজেই একটা সিগারেট ধরায়। মজার ব্যাপার হলো, তখন কুকুরটার কোষ্ঠ পরিষ্কার হতে থাকে-- এমনই মিল আসগর হোসেনের মতো তোষামোদকারী মানুষ ও কুকুরের মাঝে! মানুষ সেখানে কুকুরের মতোই ইতর প্রাণীরই পর্যায়ে পড়ে যায়।
‘অপঘাত’ ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রামের গল্প। ইউনিয়ন কাউন্সিলের কেরানি মোবারক আলির কলেজ-পড়ুয়া ছেলে বুলু দেবডাঙ্গা গ্রামে শহীদ হয়। সে একটা ব্রিজের ওপরে উঠতে থাকা সৈন্যদের জিপে গ্রেনেড ছুঁড়েছিল। তখন গুলাগুলির সময় বুলুর বুকে দু’টো গুলি বেঁধে এবং সাথে সাথেই বুলু মারা যায়। এ খবর বুলুর জনৈক সহযোদ্ধা মোবারক আলির কাছে পৌঁছে দিতে গেলে শোকে কান্নাকাটি করেই চলে বুলুর মা, ‘একবার চোখের দ্যাখাটাও দেখবার পারনু না গো! কোটে কোন পাথারের মধ্যে একলা দাপাদাপি কর্যা মরলো, মুখোত এ্যানা পানিও পালো না গো। হামার ব্যাটার উপরে ইঙ্কা গজব কিসক পড়লো গো? আল্লার বিচার ক্যাঙ্কা কও তো? তার মাটিও হয় না, কোটে কোন কাদোর মধ্যে পড়্যা থাকে, কও তো!’ কিন্তু সশব্দে কান্নাকাটি করা চলবে না যেহেতু তখন ইউনিয়ন কাউন্সিলের অস্থায়ী ক্যাম্প থেকে এসে পাকিস্তানি সৈন্যরা বাড়ি বয়ে তদন্ত করতে আসতে পারে, সবার জানও চলে যেতে পারে। তবে বুলুর মা’র এই অবরুদ্ধ অশ্রু মুক্ত হয় যখন চেয়ারম্যানের ছেলে শাজাহান জ্বরে ভুগে মারা যায়। সেটা ছিল স্বাভাবিক মৃত্যু-- বুলুর মতো অপঘাতে মরণ নয়। শাজাহানের লাশের সামনে গিয়ে বিলাপ করবার সুযোগ পায় বুলুর মা যেন সে তার মৃত সন্তান বুলুর মৃত্যুর জন্যই আহাজারি করছে! শাজাহানের লাশ পাকিস্তানি সৈন্যদের বাঁধার মুখে গোর দেয়া হয়। তারপরে ভয় কেটে যায় মোবারকের। সে জনে জনে ডেকে তার ছেলের গৌরবান্বিত মৃত্যুর কথা বলতে থাকে। সে এ-ও ভাবে, ‘ছেলের জন্য হামলে কেঁদে মা যদি সারা গ্রাম মাথায় না তুললো তো বুলু এরকম মরা মরতে গেছে কোন দুঃখে?’
‘দোজখের ওম’ গল্পে আমরা দেখি, কামালউদ্দিন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানাতে পড়ে আছে। ইসলামপুরের ছাতা ও খেলার সরঞ্জামের দোকানের বারান্দায় সেলাই-মেশিন বসিয়ে সে লুঙ্গি, বালিশের অড় এবং মশারি সেলাই করেছে একদা। এখন তার প্রস্রাব পেলে তার নাতি লুঙ্গির ভেতরে পাত্র ধরে, তার দাড়িটাড়ি থুতুতে লেপ্টে গেলে মুছে দেয়, এমনকি রাতে সে পায়খানা করলে তার শৌচকর্মও করিয়ে দেয়। এই নির্ভরশীলতার জীবন কামালউদ্দিনের ভাল লাগে না। কামালউদ্দিনের মৃত পিতা, তার মৃত স্ত্রী এবং মৃত দু’জন সন্তান তাকে যেন ডাকে এই আজাবের জীবন ফেলে পরপারে চলে যেতে। তার মৃত স্ত্রী তাকে কোনও দিন ভর্ৎসনাও করে: ‘যাইবা না? খালি দুইটা খাওন আর নিন্দের লাইগা তোমার এমুন লালচ ক্যালায়? বুইড়া জইফ মরদ একখান, হাগামোতা ভি ঠিক মতোন করবার পারো না, তয় কিসের টানে পইড়া থাকো, এ্যাঁ?’ কিন্তু হায়াত-মউত তো আর তার হাতে নেই-- একি মার্কিন কাপড়ের বালিশের অড় সে সুঁইয়ের দু’টো ফোঁড় দিয়ে সে একটা কিছু করে ফেলতে পারবে? সকাল হলে সে আশ্চর্য হয়েই দেখে যে সে বেঁচেই আছে-- মরেনি। তখন তার মনে হয়-- এগুলো শয়তানের খেলা! দুনিয়াতে মানুষের দোজখের মেয়াদ বাড়ানোই হলো ইবলিসের এক নম্বরের চাকরি। কিন্তু দোজখের ওমের ভেতর মৃত্যুশয্যায় লেপ্টে থাকলেও জীবন থেকে সে বিযুক্ত হবার কথা ভাবতে পারে না-- এত কষ্টের দুনিয়ার ওম তার ভালই লাগে। তার জনৈক আত্মীয়া তার বাসায় এসে বিস্মিত হয়-- ‘তুমি অহন তরি বাঁইচাই আছো?’ কামালউদ্দিন বিড়বিড় করে উত্তর দেয়, বাঁচুম না ক্যালায়?’ তার ছোট ছেলে যখন তার মৃত বড় ছেলের পরিবারকে বাড়িতে জায়গা দিতে চায় না তখন সে তার নাতনিকে হুঙ্কার ছেড়ে বলে, ‘তর চাচারে কইস, দাদায় অহন তরি বাঁইচা আছে।’
‘খোঁয়ারি’ নামের গল্পটা মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর অরাজক পরিস্থিতি নিয়ে রচিত হয়েছে। সমরজিতদের পুরোনো বাসাটার নিচ তলাটা ভাড়া নিতে চায় যুদ্ধফেরত তরুণরা। তারা বলে, সেখানে তারা তাদের ইউথ ফ্রন্টের অফিস বসাতে চায়। তারা বলে, এটা কেবল ইউথ ফ্রণ্ট এটা কোনও রাজনৈতিক সংগঠন নয়। তবে ভয় কি? কিন্তু সমরজিতের বাবা অমৃতলাল এ প্রস্তাবে রাজি নয়, সমরজিতও নয় কেননা ভাড়া নেবার প্রস্তাবটাকে তাদের বাড়ি জবরদখল করে নেবারই প্রাথমিক পর্ব বলে ধারণা হয় তাদের। এ দোলাচলের কারণে তরুণরা তাদেরকে ভয়ও দেখায়। গল্পটাতে ইফতিখার নামের উর্দুভাষী একজন তরুণকেও দেখা যায়। বাড়ি এবং চাকরি উদ্ধার করবার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে মরছে ইফতিখার। অরাজকতার এই খোঁয়ারি শেষ হবার নয়! এখানে সমরজিত বা ইফতিখারের অসহায়ত্বই জেগে থাকে কেবল।
‘অসুখ-বিসুখ’ গল্পে বৃদ্ধা আতমন্নেসা সারা জীবন ধরে তেমন বড় কোনও রোগে ভোগেনি। অল্পবিস্তর যেসব রোগ হয়েছে তার অথবা সন্তান জন্ম দেবার সময় শরীর যা খারাপ করেছে তখন সে নিজের স্বামী বা বাড়ির কারও কোনও মনোযোগ পায়নি। কেউ তার জন্য কোনও দিন ওষুধপত্রও নিয়ে আসেনি! এই দুঃখ তার রয়েই গেছে। এক দিন আতমন্নেসা সত্যিই ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডাক্তারের পরামর্শ মতো আতমন্নেসাকে মেডিকাল হাসপাতালে পরীক্ষা করতে নিয়ে গেলে আবিষ্কৃত হয় যে তার ক্যান্সার শেষ-পর্যায়ে পৌঁচেছে, রেডিও থেরাপি দিয়ে যত দিন মরণ আটকানো যায় আরকি! ডাক্তার তাকে টিকে থাকবার জন্য একগাদা ওষুধও খেতে দেয়। এতে খুশি হয়ে ওঠে আাতিমুন্নেসা কেননা শেষপর্যন্ত তার দিকে পরিবার মনোযোগ দিল! ডাক্তারের পরামর্শমতো ওষুধ কিনে আনা হয়। টুলের ওপরে ওষুধপত্তরের শিশিবোতল, ট্যাবলেটের পাতা, টয় গ্লাস, থার্মোমিটার, হটওয়াটার ব্যাগ, আইস ব্যাগ ইত্যাদি রাখা আছে। মৃত্যু পথযাত্রী আতমন্নেসা ভাবে-- ‘ঐ একপাশের শিশিটা কি সুন্দর! ওটা একবারে ধারে রেখে দিলো কে? কার হাত লেগে পড়ে যাবে, দ্যাখো তো। তবু সারি সারি ওষুধ কি সুন্দর দ্যাখায়! না, সব ঠিক আছে।’ আনন্দে সে তার মেয়ে নুরুন্নাহারকে বলে-- ‘অ নুরু! দামানরে আইতে কইস। কইস আমার বহুত কঠিন বিমার হইছে, একদিন আইয়া দেইখা যাইবো। বহুত কঠিন বিমার।’
‘তারা বিবির মরদ পোলা’ গল্পে রমজান আলীর স্ত্রী গত হলে সে ফের বিয়ে করে তারাবিবিকে। তখন রমজানের বয়স ৬০, তারাবিবির ২৫। বয়সের এই ব্যবধানের কারণে স্বামীর সাথে তারাবিবির ঠিকমতো যৌনতা বিনিময় করা হয়নি, যদিও তাদের সন্তান জন্মেছে-- গোলজার যার নাম। এমন অবদমন নিয়েই জীবন পার করেছে তারাবিবি। এখনও সে অসুস্থ বৃদ্ধ রমজান আলীকে খোঁটা মারতে ছাড়ে না-- ‘অ গোলজারের বাপ! এক্কেরে লাশ হইয়া রইছো, না? আরে বুইড়া মরদ, খাটিয়ার লাশটাভি লড়েচেড়, তোমার লড়ন নাই? বিছানা জুইড়া ভ্যাটকাইয়া রইছো অ গোলজারের বাপ!’ কালে কালে দেখা যায়, বিভিন্ন নারীর সাথে গোলজারের গোপন সম্পর্ক রয়েছে-- এমন সন্দেহ তারাবিবি প্রকাশ করতে থাকে গোলজারের স্ত্রী সখিনার কাছে। সেই তালিকায় রয়েছে গোলজারের বন্ধুর বউ রাবেয়া, গোলজারের বন্ধুর বোন দিপালী আর গোলজারের বাসার মাতারি সুরুজের মা। এসব কথা বিশ্বাসও করে গোলজারের বউ সখিনা। তারাবিবির অমুলক সন্দেহের কারণে এদিকে খামোখা বিপদে পড়ে যায় গোলজার। একদিন ফাঁকা বাসায় সত্যিই সে সুরুজের মা’র শরীরের মজবুত বাঁধুনি দেখে নিজের ওপরে নিয়ন্ত্রণ হারায়। ঠিক তখনই বাইরে থেকে বাড়িতে ফিরে আসে তারাবিবি। তার কাছে অভিযোগ জানায় গোলজারের বাবা রমজান আলী-- ‘নিজের বাপেরে বগলের কামরায় রাইখা দুয়ার লাগাইয়া খানকি লইয়া বইয়া থাকে আমার নিজের পোলায়! আমারে তোমরা মাইরা ফালাও!’ রমজানের এ অভিযোগকে পাত্তাই দেয় না তারাবিবি। তার যুক্তি-- এটাই জোয়ান-বয়সের মানুষের শারিরীক ধর্ম যে তারা একে অন্যের সাথে যৌনতায় লিপ্ত হবে। রমজান আলীকে সে বলে, ‘এমুন চিল্লাচিল্লি করো ক্যালায়? গোলজারে কি করছে? পোলায় আমার জুয়ান মরদ না একখান? তুমি বুইড়া মরাটা, হান্দাইয়া গেছো কব্বরের মইদ্যে, জুয়ান মরদের কাম তুমি বুঝবা ক্যামনে?’ এভাবে যৌন-অবদমনের শিকার তারাবিবি তার মরদ পোলার জন্য খুশি হয়, জোর গলায় তা জানান দেয়-- যেন পক্ষান্তরে তারা বিবির কামনারই মুক্তি ঘটছে!
পিতৃবিয়োগ গল্পে পোস্ট মাস্টার আশরাফ আলি মারা গেছে খুলনায়। তার ছেলে ইয়াকুব গোপালপুর সুগার মিল থেকে সেই খবর পেয়ে বাবার কর্মস্থলে গেছে। সেখানে গিয়ে এলাকার মানুষজনের আহাজারি আর কথাবার্তা শুনে নিজের বাবা সম্পর্কে ইয়াকুবের নিজস্ব উপলব্ধি হোঁচট খায়। সে আবিষ্কার করে, তার বাবা আসলে ভীষণ জনপ্রিয় একজন মানুষ ছিলেন। আশরাফ আলির দিলখোলা মন, হাস্যরস, জনদরদ, আড্ডাবাজী ইত্যাদি গুণের সাথে কোনও পরিচয়ই ছিল না তার সন্তান ইয়াকুবের! সে বরং ছোট থেকে দেখেছে যে তার বাবা গম্ভীর এক জন মানুষ, তার ভেতরে কোনও আতিশয্য নেই, স্নেহের প্রকাশ নেই সন্তানের জন্যও। এভাবে ধন্ধে পড়ে যাচ্ছে ইয়াকুব-- এই মৃত মানুষটাকে তো সে চেনে না!
‘ফেরারী’ গল্পে আজকের ইব্রাহিম ওস্তাগার যখন তার তারুণ্যে ঘোড়াগাড়ি চালাত তখন একরাতে ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশ দিয়ে যাবার সময় সে ধন্ধে পড়ে ভেবেছিল, পার্কের রেলিং ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে এক রূপসী। সে যেন এ-ও দেখেছিল, কবন্ধ একজন পুরুষ সেই শাহজাদীকে পঁজাকোলা করে তুলে পার্কের ভেতরে একটা পামগাছের ঝাঁকড়া মাথায় মিলিয়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্যটা, পুরোনো ঢাকার পথে পথে চলতে চলতে, বারবার দেখে ইব্রাহিম ওস্তাগার। এমন কি তার মৃত্যুর আগমুহূর্তে তার মনে হয়, তার খাটের নিচে লুকিয়ে আছে ভিক্টোরিয়া পার্কের সেই পরী, সে খুঁজছে পরীকে। এছাড়া সে দেখতে পায়, ঘরের দেয়ালে বা ছাদে ঝুলছে সেই পরী। পরীকে দেখে ভয় পায় না ইব্রাহিম ওস্তাগার। সে খুশি তা’তে। কখনও অবশ্য সে পরীকে ‘যা, যা!’ বলে তাড়াতেও বসে। ডাক্তার আসে, মৌলভি আসে, কিন্তু তার বিভ্রম কাটে না। এভাবেই মৃত্যু হয় ইব্রাহিম ওস্তাগারের, পরীর সাথে তার আর মোলাকাত ঘটে না কখনও।
‘মিলির হাতে স্টেনগান’ মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তি জটিল বাস্তবতার গল্প। মুক্তিযোদ্ধা আব্বাস মাস্টার যুদ্ধ-পরবর্তী লুটপাট, ব্যাংক ডাকাতির মতো বিচ্ছিন্ন কিছু অরাজকতা দেখবার পরে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়ে। সে তার শত্রæদেরকে শায়েস্তা করবার জন্য একটা স্টেনগান খুজে বেড়ায়। কিন্তু অবৈধ অস্ত্রধারীরা কি তাকে আর স্টেনগান দেবে? দেয়ও না। আব্বাস মাস্টারের হল্লাপাল্লা, গালাগালি ইত্যাদি বেড়ে গেলে পাড়ার মুক্তিযোদ্ধা রানা তাকে ভর্তি করে দেয় পিজি হাসপাতালে। এদিকে রানার বোন মিলিও দেশে বিচ্ছিন্ন অরাজকতা প্রত্যক্ষ করে উত্তেজিত হয়ে যেতে থাকে। তার ভাই রানার লুকিয়ে রাখা স্টেনগান খুঁজে বের করে সে। যখন আব্বাস মাস্টারের হাতে স্টেনগানটা তুলে দেয় মিলি তখন দেখা যায়, সুচিকিৎসার কারণে আব্বাস মাস্টারের পাগলামি ভাল হয়ে গেছে। মিলি তখন দেখতে থাকে, দেশকে রসাতলে টেনে নিয়ে যাবার জন্য চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেশের শত্রুরা। তাই রানার স্টেনগানটা সে নিজের হাতেই ধরে রাখে। এভাবে নিস্ফল বিদ্রোহ প্রকাশ করে মিলি। এ বিদ্রোহ নিস্ফল কেননা তা সঙ্গবদ্ধ কোনও পদক্ষেপ নয়-- সেই ক্ষণের একটা রোমান্টিক অবস্থান মাত্র।
‘দুধভাতে উৎপাত’ গল্পে পাঁচ সন্তানের জননী জয়নাবের সংসারে দারিদ্রই নিত্যসঙ্গী। পৌষমাসে নতুন চাল উঠবে, সেই চালের ভাত দুধ, কলা আর গুড় দিয়ে সন্তানদেরকে খাওয়াবে-- এটাই তার একমাত্র বিলাসিতা। কিন্তু অভাবের তাড়নায় তার কালো গরুটা আধা মণ চালের বিনিময়ে হাশমত মুহুরির কাছে বিক্রি করে দিতে হয়েছে এক বছর আগে। এ কারণে এ বছরে আর জয়নাব তার সন্তানদেরকে দুধভাত খাওয়াতে পারেনি। এর মাঝে পেটের ব্যাথায় অসুস্থ হয়ে পড়ে জয়নাব। তার ইচ্ছে হয়, সে তার সন্তানদেরকে দুধভাত মেখে খাওয়াবে। কাজেই সে তার বড় ছেলে ওহিদুল্লাকে হাশমত মুহুরির বাড়িতে পাঠায় একটু দুধ ধার করে আনবার জন্য। হাশমত মুহুরিরা তাদেরকে দুধ ধার দেয় না। অসুস্থতার ঘোরে জয়নাব যখন এসব নিয়ে প্রলাপ বকছে তখন জয়নাবের জা হামিদা বিবি তার বাড়িতে গিয়ে চালের গুঁড়ো জলে দিয়ে নিয়ে আসে। দুধভাত মনে করে জয়নাবের সন্তানেরা তা মা’র দুর্বল হাতেই চালের গুঁড়ো চেটেপুটে খায়। জয়নাবের মুখে চালের গুঁড়োর জাউ দিলে বমি করে ফেলে জয়নাব। একটু সুস্থির হয়ে সে বুঝতে পারে, আসলে বস্তুটা দুধভাত ছিল না। মৃত্যুপথ-যাত্রী জয়নাব এবার তার বড় ছেলে ওহিদুল্লাহকে ডেকে হুঙ্কার দিয়ে বলে, ‘বুইড়া মরদটা! কী দেহস? গোরু লইয়া যায়, খাড়াইয়া খাড়াইয়া কী দেহস!’ এর পরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে জয়নাব।
‘প্রেমের গল্প’ জাহাঙ্গীর আর তার বউ বুুলার গল্প। জাহাঙ্গীর সুযোগ পেলেই তার বউ বুুলাকে বিভিন্ন মেয়েদের সাথে তার নিজের ঘনিষ্ঠতার গপ্পো দেয়। বুলাকে সে বানিয়ে বলে শাহীন বা শাহনাজের কথা, হিপ হিপ হুররে নামে তার একজন সহপাঠিনীর কথা যে কিনা পুলিশ-সার্ভিসে যোগ দিয়েছে। গল্পে গল্পে বুলাকে সে বলে, হিপ হিপ হুররের সাথে একবার মালিবাগ মোড়ে তার দেখা হয়েছিল। শাহনাজ এবং হিপ হিপ হিপ হুররের সাথে ঘনিষ্ঠতার গল্পের বিভিন্ন সংস্করণ তৈরি করে ফেলতে থাকে জাহাঙ্গীর। বুলা ঈর্ষন্বিত হচ্ছে না দেখে অবাকই হয় জাহাঙ্গীর! এর ভেতরে বুলার ভাইয়ের গায়ক বন্ধু মুশতাক তাদের বাড়িতে বেড়াতে এলে জানা যায়, মুশতাক আর বুলা কুমিল্লায় থাকবার সময় সুনীল সেনগুপ্তের কাছে গান শিখেছিল। মুশতাক এবং সুনীলের সাথে বুলার ঘনিষ্ঠতা লক্ষ করে ঈর্ষায় জ্বলে যায় জাহাঙ্গীর। বুলাকে সে বিষণ্ণ কন্ঠে বলে, ‘তোমাদের ঐসব গান-বাজনায় আমার ইন্টারেস্ট নাই। ধরো ঐ লাইনের মানুষকে বিয়ে করলে তোমাকে হেলপ করতে পারত, মানে একই লাইনে হাজব্যান্ড-ওয়াইফ হলে।’ এ কথায় সচকিত হয়ে যায় বুলা। সুনীল সেনগুপ্ত অসুস্থ হলে তাকে দেখবার জন্য মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে যায় বুলা, সাথে নিয়ে যায় জাহাঙ্গীরকে। সেখানে বুলা সুনীলের শরীরের হাল দেখে লুকিয়ে কাঁদতে থাকে আর মুশতাক রুমাল দিয়ে নিজের চোখ মোছে। এতে করে ঈর্ষাতুর হবার বদলে বিষণ্ণই হয়ে পড়ে জাহাঙ্গীর। দৃশ্যপট থেকে ভেগে যাবার জন্য বুলাকে সে বলে ‘বুলা ভুল কইরা আমার অফিসের চাবি নিয়া আসছি। যাই, পিওনটারে দিয়া আসি। না হইলে কাল ওরা বিপদে পড়বে।’ এই বলে মনের দুঃখে জাহাঙ্গীর তার ভেসপায় চেপে শহর ঘুরতে ঘুরতে থাকে খামোখাই। সে ভাবে, শাহনাজ এবং হিপ হিপ হুররে-- এদের সাথে বাস্তবে তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠতে পারত। মন্দ হতো না ব্যাপারটা। সত্য এই যে শাহনাজ বা হিপ হিপ হুররের সাথে জনমেও সে কোনও কথা বলেনি, ঘনিষ্ঠতা অর্জন করতে পারাটা তো দূরের ব্যাপার!

‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ গল্পে তাঁতিবাজারের বস্তিবাসী ইমামুদ্দিন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। অন্যান্য গেরিলাদের সাথে রথখোলার ইলেকট্রিক ট্রান্সফর্মার উড়িয়ে দিয়ে পালাবার সময় পাকিস্তানী সৈন্যদের গুলিতে সে মারা যায়। সে যে বস্তিতে থাকে সেখানে পাকিস্তানী সৈন্যদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় তাঁতিবাজারের ব্যবসায়ী নাজির আলি। সেখানে আগুন দেয়া হয়, খুন করা হয় ইমামুদ্দিনের বাবাকে, তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ইমামুদ্দিনের মা’কে। দেশ স্বাধীন হবার পরে ইমামুদ্দিনের কিশোর ছেলে বুলেট নানা জায়গাতে ভাসতে ভাসতে আশ্রয় নেয় ইমামুদ্দিনের বাল্যবন্ধু তাঁতিবাজারের লালমিয়ার কাছে। ততদিনে আত্মগোপনে থাকা রাজাকার নাজির আলি তাঁতিবাজারে ফিরে এসেছে এবং সে নানান ব্যবসার পাশাপাশি তৈরি-পোশাকের ফ্যাক্টরিও খুলেছে। নাজির আলির যে বিরিয়ানির দোকান রয়েছে তাঁতিবাজারে সেটা চালায় লালমিয়া। সেখানে ফুটফরমাস খাটে শহীদ ইমামুদ্দিনের ছেলে বুলেট। মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ে লালমিয়া ও বুলেট দু’জনেই দুঃস্বপ্ন দেখতে থাকে-- সারা মহল্লা ভরে গেছে পা’র পাতা উল্টো করে চলা মানুষ দিয়ে। তাদের লম্বা-সাদা দাড়ি আছে, প্রত্যেকের গায়ে লম্বা আলখেল্লা, মাথায় মস্তবড় পাগড়ি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলবার সময় এমন পোশাক আর চেহারার মানুষজনই পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে হাত মিলিয়েছিল বলে স্মরণ করতে পারে তারা। পাকিস্তানিদের সেসব দোসর দীর্ঘ দিন গা ঢাকা দেবার পরে মহল্লায় ফিরে এসেছে। লালমিয়া এবং বুলেট এসব শক্তিধর রাজাকারদেরকে বাস্তবেও দেখে, আবার খোয়াবেও দেখতে পায়। মহল্লাতে পা’র পাতা উল্টো করে চলা মানুষদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে বিচলিত হয় শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বুলেট। কিন্তু তার কিছু করার নেই বলেই সে অক্ষম খোয়াব দেখে, উল্টানো পা-ওয়ালাদের নেতার পা লক্ষ্য করে সে তীব্র বেগে প্রসাব করছে। কার্যত দেখা যায়, ভিজে গেছে বুলেটের বিছানা-- বাস্তবে কিছু হয়নি সেই নেতা বা তার অনুসারী নাজির আলি বা অন্যদের।
‘কান্না’ গল্পে বাকেরগঞ্জের আফাজ আলি ঢাকার কোনও গোরস্থানের খাদেম। দোয়া পড়া, কুরানশরিফ খতম করে মুর্দার নামে বকশানো এবং কবরের তদারকি করতে হয় তাকে সংবৎসর। আফাজ আলি দোয়া পড়ার সময় মুর্দার আত্মীয়-স্বজনদের শোক বাড়িয়ে দেবার জন্য নকল কান্নাও কাঁদে। কিন্তু আফাজ আলির ছেলে হাবিবুল্লাহ মারা গেলে আফাজ আলির বাস্তবতা বদল হয়ে যায়। জনৈক মুর্দার গোরের সময় নিজের মৃত সন্তানের কথা মনে করে সে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে-- ‘আল্লা, আল্লা রাব্বুল আলামিন, শহতাব কবিররে তুমি বেহেস্ত নসিব করো আল্লা। কিন্তু, পাক পরওয়ারদিগার, তার বাপটারে কি তোমার নজরে পড়লো না? বাপটা কি তামাম জীবন খালি গোরস্তানে গোরস্তানেই থাকবো?’ আফাজ আলির কান্না থামে না, মোনাজাত চাপা পড়ে যায় তার ভেউভেউ কান্নার নিচে।
এবার আমরা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পের বিষয় নিয়ে খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের পর্যবেক্ষণ স্মরণ করব। খালিকুজ্জামান ইলিয়াস বলছেন: (ক) পরিচিত অভিজ্ঞতার প্রায় সবগুলো স্তরের জীবনকে নির্মোহভাবে দেখেছেন ইলিয়াস; (খ) মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী ব্যবহার করেছেন তিনি-- ‘খড়খড়ে শুষ্ক চোখে ইলিয়াস বিশ্ব দেখেননি। চোখে কেবল খরা নিয়ে সম্ভবত খুব বেশি দূর এগোনো কি খুব বড় মাপের শিল্প রচনা করা যায় না। চোখ তাঁর সিক্তই, কিন্তু সেই সজল চোখ বহির্বিশ্ব এবং অন্তর্বিশ্বকে ঝাপসা না করে বরং আলোর দ্যুতিতে উজ্জ্বলতর করেছে এবং তার উজ্জ্বল, স্বচ্ছ দৃষ্টিপথে যা-ই পড়েছে তা জীবন্ত এবং সরস হয়ে উঠেছে...’; (গ) অন্তর্লীন হাস্যরসকে বিষয়ের বর্ণনাতে কাজে লাগিয়েছেন তিনি; এবং (ঘ) ‘ঐন্দ্রজালিক এবং অতিপ্রাকৃত আবহে লালিত’ স্বপ্নচারিতাও প্রযুক্ত করেছেন তিনি। আমরা খালেকুজ্জামান ইলিয়াসের পর্যবেক্ষণের সাথে সহমত হই।
আমরা দেখছি, বিষয়ের বৈচিত্র দিয়ে সেজেছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পের ভুবন-- বিষয়ের দিক থেকে এক ফোঁটাও পুনরাবৃত্তি ঘটছে না। পুনরাবৃত্তির ব্যাপারটা উল্লেখ করতে হলো এই কারণে যে উচ্চপ্রজ লেখকেরা একই বিষয় বা কাছাকাছি বিষয়কে, নিজের অজান্তে হলেও, আশ্রয় করে ফেলেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মাঝে আমরা এই ক্ষতিকর প্রবণতা দেখি না। তিনি তো দ্যর্থহীন কন্ঠে আমাদেরকে জানিয়েই দিয়েছেন-- লেখার সংখ্যাবৃদ্ধি আসলেই প্রয়োজনহীন কেন না, খালেকুজ্জামান ইলিয়াসের ভাষাতে-- ‘...এক জন লেখকের বলার কথা তো খুব বেশি নয়। একই কথা অবশ্য নানাভাবে, নানা ঢঙে বলা যায়, নানা ভঙ্গিতে কথার ওপর কথা চড়িয়ে গড়ে তোলা যায় ফানুস, কিন্তু তার তো একটা সীমা আছে!’ আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতো সৎ ও একনিষ্ঠ লেখক তাই লেখার সংখ্যাবৃদ্ধিতে আগ্রহী হননি। লেখার সংখ্যাবৃদ্ধি না করে তিনি বরংচ লেখার মান নিয়ন্ত্রণেরই চেষ্টা করেছেন। বিষয়-বৈচিত্রের পাশাপাশি প্রকরণের ব্যবহার এবং গল্প প্রকাশের জন্য ভাষা নির্মাণের নতুনত্বের দিক থেকেও তিনি নিজেকে ছাড় দেননি। এ কঠিন পথে হেঁটেছেন বলেই তিনি মাত্র বত্রিশখানা গল্পের মাধ্যমে আমাদের সামনে সমাজের নানা কীটনাশকের কীর্তি-- বৈষম্য, অসঙ্গতি, অনাচার, জাড্যতা ইত্যাদি নগ্নভাবে তুলে ধরেছেন। এখানেই ক্ষান্ত হননি তিনি--এসব উৎপাত প্রকাশ করে ফেলবার পরে লেখনি দিয়েই মধ্যবিত্ত পাঠককে চাবুক মেরেছেন তিনি নির্মমভাবে। খুবই অন্য স্বরে তিনি বলতে চেয়েছেন-- দিনের পর দিন এই ভাগাড়ের ওমে, জাল স্বপ্নে, এই অসম্ভব খোঁয়ারিতে পড়ে থাকতে লজ্জা করে না! মুক্তির একটা যথাযোগ্য পথ তো খুঁজে পেতে হবেই, নাকি?