Published : 11 Mar 2026, 11:19 PM
সারা পৃথিবীতে পুঁজিবাদী আমেরিকা-ইউরোপের সাথে মিলিত হয়ে কমিউনিজমের প্রধান শত্রুর ভূমিকা পালন করে আসছে ইসলামপন্থিরা। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে পুঁজিবাদী বিশ্বের চাইতেও বেশি খুশি হয়েছিল কট্টর মুসলিমরা। তারা তাদের নগ্ন উল্লাস গোপন করার চেষ্টাও করেনি। অবশ্য কয়েক বছরের মধ্যেই তাদের উল্লাস বিষাদে পরিণত হয়েছিল। যখন দেখা গেল, সোভিয়েত ইউনিয়নের পরে পশ্চিমা পুঁজিবাদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে ইসলামপন্থিরা। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে একের পর এক হামলা, দখল আর লুটপাটের ঘটনা ইসলামপন্থিদের এই বাস্তবতা স্বীকারে বাধ্য করল যে সোভিয়েত ইউনয়ন যতদিন ছিল ততদিন বিশ্বে ক্ষমতার একটি ভারসাম্য ছিল। সেই কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা খুশি করতে পারেনি। সোভিয়েতের উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোকে এক ধরনের নিরাপত্তা প্রদান করে যাচ্ছিল। অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন তৃতীয় বিশ্বের দুর্বল দেশগুলোর পাশাপাশি মুসলিম দেশগুলোর জন্যেও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
০২.
অবাক ব্যাপার হচ্ছে, ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব কিন্তু ব্যাপকভাবে অভিনন্দিত হয়েছিল মুসলমানদের দ্বারা। বিশেষ করে পাক-ভারত-বাংলাদেশের মুসলমানরা রুশ বিপ্লব বা বলশেভিক বিপ্লবের মধ্যে নিজেদের মুক্তির ইঙ্গিত খুঁজে পেয়েছিল। অখণ্ড ভারতের মুসলিম বিপ্লবীরা দলে দলে ভিড় জমাচ্ছিলেন সোভিয়েত রাশিয়ায়। তুলনায় হিন্দু বা অন্য ধর্মের লোকের সংখ্যা ছিল খুবই কম।
কেন এমন ঘটনা ঘটেছিল? ভারতীয় ইতিহাসবিদ জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায় এমন একটি কারণ খুঁজে বের করলেন, যা এখনকার দিনের মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হবে। তিনি ইসলামি বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে-- পবিত্র কোরআন যেসব নীতিমালার কথা উল্লেখ করেছে, পরবর্তীতে কমিউনিস্টরা তা থেকে ধার নিয়েছে। রুশ বিপ্লবের প্রবল বিরোধী এই ইতিহাসবিদ বললেন-- কেবলমাত্র কিছুসংখ্যক ভারতীয় মুসলমান অক্টোবর বিপ্লবকে অভিনন্দিত করে। অর্থাৎ সবচাইতে পশ্চাৎপদ, অজ্ঞ এবং কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠী (যারা একান্তই সংখ্যালঘু) মাত্র এই দলের অন্তর্গত। কিন্তু হিন্দুদের মধ্যে জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায় তেমন কাউকে দেখতে পাননি। (যদিও এই কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়)।
সোভিয়েত রাশিয়ায় হিজরতকারী ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে ছিলেন খেলাফত আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা, ব্রিটিশ সেনাবাহিনী থেকে দলত্যাগী মুসলিম সৈনিকরা, এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত ছাত্র ও প্রবাসীরা। এই হিজরতকারীদের প্রথম নেতা ও মুখপাত্র হিসাবে আবির্ভূত হলেন বরকতউল্লাহ।
০৩.
বরকতউল্লাহ প্রথমে ছিলেন কংগ্রেসের সদস্য। পরে যোগ দিয়েছিলেন মুসলিম লীগে। কিন্তু দুই দলের কোনোটার ওপরেই তাঁর যথেষ্ট ভরসা ছিল না। দুই দলকে তাঁর কাছে ভারতের স্বাধীনতার জন্য যথেষ্ট মনে হয়নি। অন্তত মানুষের সার্বিক মুক্তি বলতে তিনি যা বুঝতেন, তার সাথে বিদ্যমান দলগুলোর চিন্তার পার্থক্য তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন। তিনি সাহিত্য ও দর্শনের অধ্যাপনা করেছেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। পরে দেশত্যাগ করে প্রবাসী বিপ্লবীদের সংগঠন ‘গদর পার্টি’তে যোগ দেন। বার্লিনের ভারতীয় বিপ্লবী কমিটির সদস্য হয়েছিলেন। রাশিয়াতে আসার আগে কাবুলে গঠিত ‘প্রবাসী অস্থায়ী ভারত সরকারের’ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। (সেই সরকারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন মহেন্দ্র প্রতাপ)।
বরকতউল্লাহ ১৯১৯ সালের প্রথম দিকে তাসখন্দে পৌঁছান। মস্কোতে লেনিন তাঁকে সাক্ষাৎ প্রদান করেন ৭ মে। বরকতউল্লাহর সাথে লেনিন যথেষ্ট সম্মান এবং আন্তরিকতা নিয়ে কথা বলেন। বরকতউল্লাহ চেয়েছিলেন লেনিনের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত সরকার প্রবাসী ভারতীয় সরকারকে সমর্থন দান করুক। লেনিন উত্তরে জানান যে সময়মতো সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিঞ্চিৎ হতাশ হলেও বরকতউল্লাহ জানতেন যে লেনিনের বিচারবুদ্ধির প্রতি আস্থা রাখা যায়। তিনি পরবর্তীতে রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ, আব্দুর রহমান বার্ক এবং প্রতিবাদী আচার্যকে রাশিয়ায় এনে লেনিনের সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেন।
সেই প্রবাসী সরকারের মন্ত্রীসভার সদস্য মহম্মদ আলী এবং মহম্মদ শফিকের সাথে ইব্রাহীম এবং আবদুল মজিদ রাশিয়াতে এসে পৌঁছান।
বরকতউল্লাহ সোভিয়েত রাশিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন ‘রাশিয়া ও প্রাচ্যের সকল শ্রমজীবী মুসলমানের প্রতি’ শিরোনামের একটি দলিল পাঠ করে। ১৯১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত এই দলিলে আহ্বান জানানো হয়েছিল-- ‘যখন গোটা দুনিয়া সাম্রাজ্যবাদী দস্যুদের বিরুদ্ধে ক্ষোভে উত্তপ্ত, যখন ঘৃণার প্রতিটি স্ফুলিঙ্গ বিপ্লবের প্রচণ্ড শিখাতে রূপ নিচ্ছে, যখন এমনকি ভারতীয় মুসলমানগণ যারা বিদেশি জোয়ালে নির্যাতিত ও নিপীড়িত-- তাদের প্রভুদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে জেগে উঠছে, তখন নিশ্চুপ বসে থাকা অসম্ভব। কালক্ষেপন নয়, আপনাদের দেশের পুরনো অধিকর্তাদের আপনাদের কাঁধের ওপর থেকে ঝাঁকি মেরে ফেলে দিন!.. এ আপনাদেরই অধিকার, ভাগ্যের নির্ধারক আপনারাই।’
বরকতউল্লাহ পরবর্তীতে কয়েকবার কাবুলে যাওয়া-আসা করলেও বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন রাশিয়াতেই। তিনি এটুকু অন্তত বুঝেছিলেন যে রুশ বিপ্লব সারা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের কাছে একটি উৎসাহের উদাহরণ হিসাবে কাজ করবে। তাই তিনি রুশ বিপ্লবকে সুসংহত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি বিভিন্ন সম্মেলন, জনসভা এবং মসজিদে মুসলমানদের মধ্যে বলশেভিকদের সপক্ষে প্রচার চালান। তাঁর একটি বিখ্যাত বক্তৃতার সারমর্ম হচ্ছে-- ‘কমরেডগণ! ইংরেজ, ফরাসি ও আমেরিকান পুঁজিপতিরা মুসলিম বিশ্বের রাজধানী কনস্তান্তিনোপলকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে এবং তাদের পবিত্র নগরী মক্কা ও মদীনাকে বিধ্বস্ত করেছে। তারা রাশিয়ার প্রতিবিপ্লবীদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে এবং অবরোধ সৃষ্টি করে সোভিয়েত দেশের সকলকে হত্যা করতে চায়।
কমরেড মুসলমানগণ! মনে রাখুন, সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের সাথে একত্রে লড়াই করা আপনাদের নৈতিক কর্তব্য, কারণ যদি তাদের পতন ঘটে, তাহলে প্রাচ্যসহ সারা বিশ্বের মুক্তিলাভের শেষ আশাটি আপনাদের হারাতে হবে। রেড আর্মিতে যোগদান করুন-- তারা আপনাদের মুক্তির জন্য, আপনাদের স্বার্থের জন্যই যুদ্ধ করছে।’
একথা আমরা জানি যে, অনেক ভারতীয় মুসলমান লালফৌজে যোগ দিয়েছিলেন। তারা যুদ্ধ করেছেন শ্বেত প্রতিবিপ্লবীদের বিরুদ্ধে সমগ্র রাশিয়াজুড়ে। কেউ কেউ ২০ হাজারী লালফৌজ ব্রিগেডের নেতৃত্বও দিয়েছেন যুদ্ধে। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন রফিক আহমেদ। লালফৌজের হয়ে যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে মস্কোতে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা পদক প্রদান করা হয় ১৯৬৭ সালে, রুশ বিপ্লবের ৫০তম বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে।
রাশিয়ার সর্বত্র বিপ্লবের সপক্ষে প্রচারকাজ চালিয়েছেন বরকতউল্লাহ। পাশাপাশি লিখেছেন অনেকগুলি বইও। যেমন ‘বলশেভিক আদর্শ ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র’, ‘এশিয়ার সকল মুসলমানের প্রতি’, ‘ওরিয়েন্টাল পলিসি’, এবং ‘বলশেভিকবাদ ও ইসলাম’।
বলশেভিক বা রুশ বিপ্লবের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন সত্ত্বেও বরকতউল্লাহ কখনোই কমিউনিস্ট হননি। কমিউনিস্ট হবার জন্য বা পার্টির সদস্য হবার জন্য তাকে কখনো চাপ প্রয়োগ করাও হয়নি। ইজভেস্তিয়া পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বরকতউল্লাহ বলেন-- ‘আমি কমিউনিস্ট নই, সোশ্যালিস্টও নই... কিন্তু আমার রাজনৈতিক প্রোগ্রাম হচ্ছে ব্রিটিশকে এশিয়া থেকে তাড়িয়ে দেওয়া। এশিয়াতে ইউরোপীয় পুঁজিবাদের আমি এক আপোসহীন শত্রু, বিশেষভাবে ইংরেজ পুঁজিবাদের। এই অর্থে আমি আছি কমিউনিস্টদের কাছাকাছি এবং এই ক্ষেত্রে আমরা আপনাদের স্বাভাবিক মিত্র।’
বরকতউল্লাহ বলতেন-- সকল ধর্মের হাতে এবং মার্কসবাদের হাতে সৃষ্টিকর্তা তুলে দিয়েছেন দরিদ্র ও অভাবীদের রক্ষা করা, সকল মানুষকে ভরসা দেওয়া, এবং মানুষে মানুষে মানবিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার ভার।
ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে ‘সকল অনাচারের মূল’ বলতেন বরকতউল্লাহ। ইউরোপীয় পার্লামেন্টারি পদ্ধতির অসারতা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য ছিল পরিষ্কার-- ‘এটা হলো লোক-ঠকানো শিশু খেলনার মতো; একমাত্র সম্পত্তিবান শ্রেণিগুলোর জন্যেই এখানে নির্বাচিত হবার অধিকার আছে’।
আমি এই বক্তব্যটি বার বার হাজির করি। বলি যে সংসদীয় গণতন্ত্র কোনো গণতন্ত্রই নয়। এখানে গার্মেন্ট মালিক সংসদে যায়, শ্রমিক যেতে পারে না। ভূস্বামী যায়, কৃষক যেতে পারে না। পরিবহন মাফিয়া যায়, পরিবহন শ্রমিক যেতে পারে না। এই ধরনের সংসদকে কখনোই জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক সংসদ বলা যায় না। যারা সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য প্রাণপাত করে, সেই বুদ্ধিজীবী, কবি-সাহিত্যিকদের মনে এই ধরনের চিন্তা কোনো রেখাপাতই করতে পারে না।
এখন দেখছি আমার একশো বছর আগে বরকতউল্লাহ এটি হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন।