Published : 23 Jan 2024, 11:17 PM
১.
ডায়াসপোরা, নির্বাসন, অভিবাসী জীবন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সমাজবিজ্ঞানে অনেক গবেষণা হয়েছে। সাংস্কৃতিক দিক থেকে এর অনেক দিক আছে, বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী তা বিভিন্নভাবে দেখেছেন। আমার এসব সমাজবিজ্ঞানীদের তাত্ত্বিক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি প্রিয় রেমন্ড উইলিয়ামস এবং স্টুয়ার্ড হল। তবে মার্কসীয় ব্যাখ্যার বাইরেও অভিবাসী সংস্কৃতি এবং এর অন্যান্য অভিঘাত নিয়ে ভাবা যায়। আমি রেমন্ড উইলিয়ামের লেখা পড়েছি, চাক্ষুষ তাঁকে দেখিনি, কিন্তু হলকে আমার ছাত্রজীবনে দেখেছি, বক্তৃতা শুনেছি নিউ স্কুলে। তাঁকে ভাল করে পড়লে বোঝা যায় যে অভিবাসী সংস্কৃতিতে ঔপনিবেশিক রাজনীতির বাইরে ভাবা সত্যিই কঠিন। যদিও গত কয়েক দশকে ঔপনিবেশিক রাজনীতির ধরন বদলে গেছে পুঁজিবাদের বিবর্তনের ফলে। কিন্তু হল বা উইলিয়ামস পঞ্চাশ দশক এবং তারও আগের ঔপনিবেশিক রাজনীতিকে লক্ষ রেখে তাদের সাংস্কৃতিক রাজনীতির গবেষণা করেছিলেন। বারমিংহাম স্কুলের যে সাংস্কৃতিক চিন্তার তাঁরা জনক তা অনেকটাই মার্কসীয় আদর্শ, বা নিওমার্কসীয় আদলের মাচার ওপর নির্ভর করে গবেষণা পরিচালিত। কিন্তু পুঁজির গোলোকায়নের পর যেহেতু অর্থনৈতিক নতুন উপনিবেশের উদ্ভব হয়েছে, আর এর ফলে এই নতুন উপনিবেশের সংস্কৃতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তাই উইলিয়ামস বা হলের সংস্কৃতি চিন্তা বা অভিবাসীদের জীবনে সেটা কেমন করে কাজ করে, তাদের সংস্কৃতির পরিবর্তন ও বিবর্তনের ফলে তা ভেবে দেখার বিষয়।
সবার আগে হলের চিন্তাকে দেখতে হয় একজন রেডিকেল বুদ্ধিজীবীর লেখা বা গবেষণা হিশেবে, যদিও তিনি কখনও কোন রেডিকেল বাম বা মার্কসীয় রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না (তিনি কিছুদিন ব্রিটিশ লেবার পার্টির সদস্য ছিলেন, এবং খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ব্রিটিশ কম্যুনিস্ট পার্টিতেও যোগ দিয়েছিলেন)। কিন্তু তাঁর অন্তর্গত বৌদ্ধিক সত্তা উইলিয়ামসের মতোই ভীষণ মার্কসীয় চিন্তা দ্বারা তাড়িত থাকতো, কিন্তু তা ভিন্নভাবে।
হল সংস্কৃতি, অভিবাসী সংস্কৃতি নিয়ে ভাবার আগে রেমন্ড উইলিয়ামসের লেখা পড়ে মুগ্ধ হন। কিন্তু মার্কসীয় দর্শন সংস্কৃতিকে কীভাবে প্রভাবিত করে সেসব তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখার চেষ্টা করেন। উইলিয়ামসের Culture and Society নামক কালজয়ী বই হাতে আসার আগে তাঁর অন্য লেখাগুলো হলকে দারুণভাবে ভাবায়। শ্রমিকের সংস্কৃতি, উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত নগরবাসীর সংস্কৃতি আর শ্রমিকের বা অভিবাসী শ্রমিকের সংস্কৃতি কেন এবং কোথায় আলাদা সে বিষয়ে উইলিয়ামস হলের হৃদয় ও মস্তিষ্ক দুটোকেই তীব্রভাবে আলোড়িত ও চিন্তিত করে। অনেক সংস্কৃতির গবেষকের ধারণা উইলিয়ামসের লেখাই হলকে সকল একাডেমিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে পরিহার করে দ্রুত New Left- এর দিকে ঝুঁকে পড়তে প্রভাবিত করে।
স্টুয়ার্ড হল জ্যামাইকা থেকে বৃত্তি নিয়ে পড়তে এসেছিলেন যুক্তরাজ্যে বেশ একটা টালমাটাল সময়ে, বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য। টালমাটাল এ জন্য যে সেসময়ে ক্যারিবিয়ান এবং আফ্রিকান ছাত্র এবং রাজনীতিকদের উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন প্রায় তুঙ্গে। বিলেতে বা ইউরোপে এসব কালোদের দেশ থেকে যারা উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়েছিলেন, তাঁরা অনেকেই ‘স্বদেশে’ ফিরে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছিলেন। ১৯৫৭ সালে ঘানা স্বাধীন হয় এবং পাডমোর, যিনি ঘানায় ফিরে গিয়েছিলেন তিনি ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরে ঘানায় All People’s Conference সংগঠন করার উদ্যোগ নেন। এছাড়া ১৯৫৮ সালে জেমস ছিলেন ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে এবং West Indian Federal Labour Party- দলের সাধারণ সম্পাদক। এই পদে নির্বাচিত হন ও The Nation পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। সুতরাং বলা যায় হল পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় এক ক্রান্তিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণ হিশেবে লন্ডনে বৃত্তি নিয়ে আসেন। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন ১৯৪৫ সালে অনুষ্ঠিত ম্যানচেস্টারে বিখ্যাত প্যান এফ্রিকানিজম কনফারেন্সের মাত্র ছয় বছর পর তিনি যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেন। তিনি জ্যামাইকার এলিট স্কুল জ্যামাইকা কলেজের ছাত্র তখন। এছাড়া তিনি ‘রোড স্কলার’, যা সে সময়ে শাদা কালো নির্বিশেষে ‘শাসক’ শ্রেণীর স্বাক্ষরচিহ্ন বহন করে। সেই প্যান এফ্রিকানিসজম কনফারেন্স সংগঠিত হয়েছিল জর্জ প্যাডমোর ও কোম নক্রুমার উদ্যোগে। এসময়ে প্যারিস, লন্ডন ও লিজবনে বেশ কয়েকটা উপনিবেশবিরোধী পত্রিকা প্রকাশ করে এসব কৃষ্ণাঙ্গ উপনিবেশ থেকে আসা তরুণ যোদ্ধা ছাত্ররা।
কিন্তু সংস্কৃতি এবং অভিবাসী রাজনীতি নিয়ে রেমন্ড উইলিয়ামসের জগত বিখ্যাত Culture and Society প্রকাশিত হওয়ার আগে এবিষয়ে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী বইটি লিখেছিলেন জর্জ ল্যামিং, সেটি ছিল Pleasures of Exile, যা সেসময়ের উপনিবেশবিরোধী তরুণ চিন্তাবিদ ও রাজনীতিমনস্ক সকল ছাত্রদের মধ্যে প্রভাব ফেলে। স্টুয়ার্ড হল এসময়ে সাহিত্য পড়তে অক্সফোর্ডে এলেও তিনি এসব লেখা দ্বারা নিশ্চয় প্রভাবিত হন, কিন্তু তিনি গবেষণা করার দিকে এগোন মার্কসীয় ভাবনা দ্বারা যখন উজ্জীবিত হন উইলিয়ামসের লেখার মাধ্যমে। এমনকি তিনি নিজের ক্যারিবিয়ান শেকড়ের সঙ্গে চিন্তার দিক থেকে ভিন্নভাবে জড়িয়ে পড়েন। একবার সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে হল তীব্র এক মনোযাতনার কথা উল্লেখ করেন, ‘You and I are different. When I speak, I always have in the back of my mind that once you owned me on a plantation.’
স্টুয়ার্ড হল সে সময় ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করেন এবং তাঁর অভিসন্দর্ভ লেখার কাজ করছিলেন, যা অবশ্য তিনি পরে আর লেখেননি। এসময়ে তাঁর হাতে আসে উইলিয়ামসের Culture and Society গ্রন্থটি, যা তাঁর জীবন বদলে দিয়েছিল এবং ডায়াসপোরা সাহিত্য বা সংস্কৃতির রূপ বদলে দিয়েছিল পরবর্তী কয়েক দশক ধরে। Marxism Today নামক বিখ্যাত জার্নালের সম্পাদক এসময়ের হলের চিন্তা বা সাংস্কৃতিক তত্ত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘Hall saw Britain differently; not as a native, but as an outsider.’ প্লান্টেসন নিয়ে হলের মন্তব্য কোন ক্ষণিকের ভাবনা নয়, বরং উপনিবেশ বা শ্বেতাঙ্গদের অত্যাচার, পুঁজির ভয়াবহ নির্যাতন কীভাবে তাঁর চিন্তাকে গড়েছিল তারই ইঙ্গিত বহন করে। এছাড়া এসময়ের দুটো ঘটনা হলের চিন্তাকে ভীষণভাবে বিলোড়িত করে, এর একটি হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের হাঙ্গেরী আক্রমণ ও মিসরের সুয়েজ খাল নিয়ে রাজনৈতিক বিভ্রাট। এসময়ে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে ক্যারিবীয় বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের অনেককেই ব্যথিত করে সোভিয়েত ইউনিয়নের এই আচরণ। প্যারিসে অবস্থানরত মারটিনিকের বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী কবি এমি সিজার ফরাসী কম্যুনিস্ট পার্টি থেকে এই ঘটনার পর পদত্যাগ করেন এবং পদত্যাগ পত্রে লেখেন, ‘পদত্যাগের অন্যতম কারণ সোভিয়েত ইউনিয়নের হাঙ্গেরী দখল।’ সিজার এও মনে করতেন যে ফরাসী শ্রমিকের সেদেশের পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আর উপনিবেশবিরোধী কালোদের শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম সমার্থক নয়।’ এভাবেই সিজার বা হলসহ সকল উপনিবেশ থেকে আসা অভিবাসী বৌদ্ধিক সমাজের কাছে সেদিন সংস্কৃতির স্বরূপ বদলে গিয়েছিল।
১৯৫৭ সালে এই সুয়েজ সমস্যা এবং হাঙ্গেরির রাজনীতি হলের সকল পরিকল্পনা বদলে দেয়। তিনি হেনরি জেমসকে নিয়ে তাঁর পি এইচ ডির অভিসন্দর্ভ লেখা বাতিল করে রেমন্ড উইলিয়ামস এবং রাফায়েল সেমুয়েলসকে সঙ্গে নিয়ে একটি রেডিকেল পত্রিকা বের করেন, তার নাম Universities and the Left Review, যা সে-সময়ের রাজনীতি, উপনিবেশ, পুঁজি এবং নির্বাসিত মানুষদের সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক করণীয় বদলে দেয়। এই পত্রিকা তাঁর দিনের সবটুকু সময় কেড়ে নেয়, বদলে দেয় সচেতন তরুণদের রাজনীতির সংস্কৃতি। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা যায় যে অনেক বছর আগে হলের মতোই, সি এল আর জেমস বা সিরিল লিওনেল রবার্ট জেমস ত্রিনিদাদের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ সাংবাদিক মার্কসবাদী আন্দোলনে ট্রটস্কীপন্থী হিশেবে সে-সময়কার রাজনীতির সংস্কৃতিকে একইভাবে বদলে দিয়েছিলেন। মার্কসবাদী দলের মধ্যে থেকে তিনি তাঁর আন্দোলন চালিয়ে যান, কিন্তু স্টুয়ার্ড হল একটু ভিন্নপথে রাজনৈতিক দলের বাইরে থেকে একটি পত্রিকা এবং লেখা ও গবেষণার মাধ্যমে তাঁর লক্ষে পৌঁছবার পরিকল্পনা করেন এবং অনেকটাই সফল হন। তফাৎ শুধু জেমস নিজেকে নিজের ঐতিহ্য ও মৃত্তিকা-সংলগ্ন ট্র্যাডিশনের সঙ্গে যুক্ত রাখেন, কিন্তু হল ‘ঐতিহ্য’ বা শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত থেকেও বিরামহীন তার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন, যার মধ্য দিয়ে নতুন সংস্কৃতির জন্ম দেয়া সম্ভব হয়! কিন্তু বিষয়টা খুব সহজে হয়নি। এটা বলতে গিয়ে হল একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। এটি ছিল বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আইজ্যাক ডয়েটৎসারের একটি বক্তৃতা বিষয়ে। এই সেই জগৎ বিখ্যাত তিন খণ্ডে ট্রটস্কির জীবনী লেখক ইতিহাসবিদ আইজ্যাক ডয়েটৎসার। হল বলেন, ‘এটা ছিল নিউ লেফট ক্লাব আন্দোলনের শুরু। আমরা শুরু করেছিলাম একটা ব্লুমসবারি হোটেলে, সাধারণ অনানুষ্ঠানিক সভার মতো করে, জনা ষাটেক মানুষ শুনছিলেন ডয়েটৎসারের বক্তৃতা। আমরা ভাবছিলাম অনেকটা প্যারিস লেফট ব্যাঙ্কের মতো করে। কিছুক্ষণ পর অর্থাৎ দুপুরের আহারের পর ফিরে দেখি সভাকক্ষের দরোজার সামনে ঢোকার জন্য প্রায় সাত শত লোক অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে বক্তৃতা শুনবে বলে।’ স্টুয়ার্ড হল ভাবতে থাকলেন যে তাঁরা যেটা শুরু করেছেন সেটা ভিন্ন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিতে যাচ্ছে। জন্ম নিলো New Left Review, হল হলেন যার সম্পাদক। অভিবাসী রাজনৈতিক সচেতন মানুষের, শ্রমজীবী মানুষের ইতিহাস নির্মাণে বৌদ্ধিক জগতে এই পত্রিকার ভূমিকা সম্পর্কে সবাই জানেন। এর পরের মার্কসবাদী বুদ্ধিবৃত্তির ইতিহাস এবং অভিবাসী মানুষ যারা উপনিবেশ থেকে এসেছিলেন পুঁজির দেশে, তাঁদের সংস্কৃতির ইতিহাস অন্বেষণও বদলে গেলো।
কিন্তু স্টুয়ার্ড হল ১৯৯০ সালে ‘ডায়াসপোরা’ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা লেখেন ‘Thinking the Diaspora: Home-Thoughts from Abroad শিরোনামে, যেখানে তিনি তাঁর আগের সংস্কৃতি বিষয়ক তাত্ত্বিক অবস্থান থেকে সরে আসেন নি, কিন্তু বিষয়টিকে একটু অন্যভাবে দেখারও চেষ্টা করেন। এই গবেষণা প্রবন্ধে তিনি বলতে চান যে সকল ক্যারেবীয় জনগণ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং ক্যানাডাসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে বাস করেন, তাঁরা ক্যারিবীয় ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন কোন কিছু নন। অর্থাৎ সরাসরি কিছু পশ্চিমা ডায়াসপোরা বিষয়ক তাত্ত্বিক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ না করলেও বেশ আলাদা। অর্থাৎ এই জনগোষ্ঠীর ইতিহাসবিদরা যেভাবে তাঁদের ইতিহাসের বয়ান দেন, তার থেকে আলাদা। এর আগে দেখা যায় ইতিহাসবিদরা এদের জাতীয়তা নিয়ে এমন কিছু কন্সট্র্যাক্ট করার চেষ্টা করেন যে, ডায়াসপোরা বিষয়ক প্রশ্নটা প্রাথমিকভাবে তোলাই হয় এভাবে যে এর মাঝে এমন কিছু বক্তব্য থাকে, যা জটিল, নিয়ত পরিবর্তনশীল, কিন্তু ভিনদেশে বাসরত এসব মানুষের আইডেন্টিটি বা জাতীয়তা এই গোলকায়নের যুগে সরাসরি বিশ্বপুঁজির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু ইতোমধ্যে সমাজবিজ্ঞানী বেনেডিকট এনডারসন এক গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হাজির করেছেন এবং একাডেমিক মহলে যা খুবই শ্রদ্ধার সঙ্গে গৃহীত। সেটি হল জাতীয়তা বা আইডেন্টিটি আসলে ‘Imagined Communities’, যার আসলে কোন Sovereign political entity নেই। তাই এই প্রশ্নটি মৌলিক প্রশ্ন হয়ে সামনে আসছে শুধু মাত্র এসব নির্বাসিত মানুষ বা অভিবাসীদের কাছেই নয়, বরং তাঁদের সৃষ্ট সংস্কৃতি, সাহিত্য শিল্প এবং ভাষার ক্ষেত্রেও। যে ক্যারিবীয় দেশগুলো তিরিশ বছর আগে স্বাধীনতা লাভ করেছে, বা আফ্রিকান দেশগুলো, ইংরেজ বা অন্যান্য উপনিবেশিক দেশগুলো থেকে, তারা বা তাদের জাতীয়তা এখন ‘Imagined’ কী করে বিবেচনা করা হবে! তাহলে ভাবতে হবে তাঁদের জাতীয়তা বা আইডেন্টিটির সীমানা (Boundary) বা ‘সংস্কৃতির সীমানা’ নির্ধারণ করা হবে কীভাবে! সেটা ঐতিহাসিকভাবে, সাংস্কৃতিকভাবে, এবং সমকালীন গোলকায়িত পুঁজির প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকেও। হল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উত্থাপন করেন, সেটি হল ক্যারিবীয় এবং আফ্রিকান বা কখনও কখনও তাঁদের প্রতিবেশী দেশগুলোর ভাষা এবং সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁদের এতো বিষয়ে সাযুজ্য রয়েছে, সেগুলোকেই বা কীভাবে আংশিক বা সম্পূর্ণ পরিহার করা সম্ভব? আর সেক্ষেত্রে এক ধরনের মিশ্রণ বা ফিউশন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায় সংস্কৃতি এবং শিল্পের ক্ষেত্রে। এ বিষয়ে স্টুয়ার্ড হল সমাজবিজ্ঞানী মেরী চেম্বারলেইনের বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থ Narratives of Exile and Return এর উল্লেখ করেন এবং দেখানোরও চেষ্টা করেন যে এসব অভিবাসী বা নির্বাসিত মানুষজন কোনদিনই তাদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারেন না। যেমনটা দেখা অনেক Transnational Communities বা সম্প্রসারিত পরিবারগুলোর মধ্যে। বিশেষ করে খুব ভাল গবেষণা হয়েছে এ বিষয়ে খোঁজা, দাউদী, বা আগা খানের অনুসারী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা মুসলিমদের মাঝে। এঁদের মাঝে Umblical সংযোগ অক্ষুণ্ণ থাকে তাদের মাঝে, যাকে এই লেখক বলেন ’Associational identifications’ যা তাদের ফেলে আসা দেশ বা ভূমির সঙ্গে সংযুক্ত। চেম্বারলেইন বলেন, ‘The strength of the Umblical ties also reflected in growing numbers of retired Caribbean returnees.’ এই গবেষক আরও জোর ডিয়ে বলেন যে, ‘A determination to construct autonomous Barbadian identities in Britain…..if current trends continue, is likely to be enhanced rather than diminished by time.’ তবে এই ধারাকে একমাত্র এবং অপরিহার্য ভাবাও হয়তো ঠিক হবে না। আরেকটি কথা না বললেই নয়, সেটা হলো ডায়াসপোরা সংস্কৃতি বহুস্রোতে বহু ধারায় বিভক্তও দেখা যায়। কোন একটি দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক বা সংস্কৃতির অন্তঃস্রোতের সম্পর্ক, সাযুজ্য থাকলেও তাকে ‘দেশ’ বা ‘Home’ ইংরেজি শব্দ দিয়ে যা বোঝানো হয়, তা সম্পূর্ণ অর্থে নাও হতে পারে, কারণ সংস্কৃতির অন্যান্য Centripetal forces-এর গুরুত্ব সেখানে বিবেচনায় রাখা জরুরি। যেমন একটি উদাহরণ উল্লেখ করেন স্টুয়ার্ড হল যে তাঁর পূর্বসূরি সমাজবিজ্ঞানে জর্জ লেমিং বলেছিলেন তিনিও হলের মতো অবশ্যই ওয়েস্ট ইনডিয়ান, কিন্তু ক্যারিবীয় দ্বীপপুঁজে নন, লন্ডনে।
আহমাদ মাযহারের স্বদেশী সকল বাঙালিদের সম্পর্কেও বলতে গিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি মনে রাখা প্রয়োজন তারাও বাঙালি, অবশ্যই বাঙালি, কিন্তু বাংলাদেশে নন, যুক্তরাষ্ট্রে!
২.
মানুষের ঘরবাড়ি বা আবাস বদলের ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে প্রয়োজন থেকে। আদিম সমাজে বিশেষ করে সেই প্রস্তর যুগেরও আগে ‘শিকার ও সংগ্রহ’- এর কাল থেকে যাকে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন Hunting and Gathering Stage, সেই স্থান বা আবাস বদল মানুষ করতেন খাদ্য সংগ্রহের তাগিদে। আজকের সভ্যতায় যে দেশ বা জন্মভূমি ছেড়ে বিভূঁইয়ে যাত্রা তাও অনেকটাই ভাগ্য বদলের জন্য। কিন্তু এই বদল বিপুল পরিবর্তন নিয়ে আসে প্রবাসী বা অভিবাসীদের জীবনে। তবে বিষয়টি এখানেই শেষ নয়, পরিবর্তন ঘটায় অভিবাসীর নিজের ফেলে আসা জন্মভূমিতে। তবে এই দুই পরিবর্তনের ধরন আলাদা। এই দুই ভূমিই একে অপরের ওপরে বিশেষ রকম প্রভাবের চিহ্ন রেখে যায়। সমাজবিজ্ঞানীরা এই দুই ভিন্ন পরিবর্তনের বা বিবর্তনের রূপ নিয়ে গবেষণা করেন। কী কী পরিবর্তন, বা কেমন করে পরিবর্তন ঘটে সেটাই তাদের বিশ্লেষণের বিষয়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যা অদৃশ্য থেকে যায় তা হলো সমাজবিজ্ঞানীর সেই পরিবর্তন দেখার চোখ আর সৃষ্টিশীল লেখকের দেখার চোখ আলাদা, এবং তাঁরা এসব পরিবর্তনের গুরুত্ব বিচার করেনও আলাদা পদ্ধতিতে। কিন্তু গবেষণা করেন শুধু আলাদা নিয়মে, তাই নয়, গবেষণার ফল বিশ্লেষণও করেন আলাদা করে। এর মাঝে আবার পশ্চিমা সমাজবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে সমাজবিজ্ঞানী যদি নারী পুরুষ আলাদা হন তাহলেও তাঁদের গবেষণায় গুরুত্ব দেয়ার বিষয়ও আলাদা হয়ে যায়। যেমন অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে নারী সমাজবিজ্ঞানীরা নারী অভিবাসী শ্রমিকদের জীবনের প্রতিবন্ধকতাগুলোকে দেখেন পুরুষ গবেষকদের থেকে একেবারে ভিন্ন চোখে। ঠিক তেমনি সংস্কৃতি, শিক্ষা বা অর্থনীতিতে যে বিশাল পরিবর্তন ঘটে, সেটার গুরুত্বও তাঁরা দেন ভিন্নভাবে!
বাঙালিদের যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হওয়ার পর তাদের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য যে পরিবর্তন ঘটে তাদের বাহ্যিক এবং মনোজগতে সে-বিষয় নিয়ে, বিশেষ করে তাদের সার্বিক চিন্তাজগৎ নিয়ে বিশিষ্ট গবেষক এবং প্রাবন্ধিক আহমাদ মাযহার একটি গ্রন্থ লিখেছেন সম্প্রতি। গ্রন্থটির নাম ‘আমেরিকান বাঙালি মন’। বইটির বিষয় একেবারেই সাহিত্যের বিষয় নয়, বরং একাডেমিক সমাজবিজ্ঞানের বিষয়। মার্কিন দেশে ইউরোপ বা অন্যান্য মহাদেশ থেকে আসা অভিবাসীদের নিয়ে এধরনের বই আগে অনেক লেখা হয়েছে, কিন্তু বাঙালিদের জীবন নিয়ে বই আমার চোখে আগে পড়েনি। হয়তো কেউ কেউ লিখেছেন। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের গবেষণা পত্রিকায় ইংরেজিতে কিছু লেখা হয়েছে, সেগুলো সবই গবেষণা প্রবন্ধ। কিন্তু এই বইটির বিষয় বস্তু এবং লেখার বা গবেষণার মেথডলজি কিছুটা ভিন্ন ধরনের। ছয়টি অধ্যায়ে বইটিকে বিন্যস্ত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে আমেরিকার বাঙালি জীবন, ডায়াসপোরা, প্রবাসী নাকি অন্য বাংলাবোধের সাহিত্য, বাংলার বাইরে বাংলার বইমেলা, বাংলাদেশের বাইরে বাঙালি সংস্কৃতি, থিয়েটারে আমাদের জনসমাজ ও অন্যান্য, সাহিত্য পত্রিকা ও শিল্পকলার চর্চা। এই অধ্যায়গুলোতে লেখক বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর গবেষণা এবং দেখা বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে আহরিত তথ্যগুলোর অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছেন সমাজবিজ্ঞানীর চোখ দিয়ে নয় পুরোপুরি, এতে তিনি একজন সৃজনশীল লেখক-গবেষকের তৃতীয় দৃষ্টির এক প্রাজ্ঞ চোখ নিবদ্ধ করেছেন।
আহমাদ মাযহার আমেরিকায় অভিবাসী হয়েছেন যখন তিনি প্রায় মধ্য পঞ্চাশে। তাঁর আগে প্রায় কিশোর বয়স থেকে তিনি সৃষ্টিশীল লেখক, ছড়াকার, মনশীল প্রাবন্ধিক এবং গবেষক। আমাদের সাহিত্য সমাজে কিছুটা নীরব বা সুশৃঙ্খল মানুষ থেকে এবং সাহিত্যকর্মে সৎ ও রুচিশীল থেকে যে যৎসামান্য খ্যাতি পাওয়া সম্ভব তা তিনি পেয়েছেন, কিন্তু মননশীল প্রবন্ধ সাহিত্য যে ভিন্ন চারিত্রিক দৃঢ়তা দাবি করে, সেটা তিনি সব সময়ই দেখিয়েছেন তাঁর লেখা এবং ব্যক্তিজীবনে। আমেরিকায় অভিবাসন নেয়ার আগে তিনি সাধারণ চাকুরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, কিন্তু তাঁর মস্তিষ্ক ছিল সার্বক্ষণিক লেখকের চিন্তা দ্বারা আচ্ছন্ন। তাই লেখাকেই তাঁর জীবনের মূল লক্ষ বা পেশা হিশেবে বিবেচনা করা যায়। প্রায় তিরিশ বছরের লেখক জীবনে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ষাটের অধিক। তাই এই গ্রন্থ লেখার শুরুতেই দেখা যায় মার্কিন সমাজ তাঁর মাঝে যে লেখক সত্তা রয়েছে সেই সত্তার কাছে কীভাবে ধরা পড়েছে তার বয়ান। প্রথমেই তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন আমেরিকায় আসার আগে ও পরে তাঁর দেখা জীবন এবং সেই জীবনের সংস্কৃতি এবং তার অন্তর্নিহিত অর্থ, যেভাবে তিনি পর্যবেক্ষণ এবং অনুধাবন করেছেন।
নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত বইমেলায় তিনি প্রথম একজন আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে এসেছিলেন। সেবার বেশ কিছু মিউজিয়াম এবং গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ভালো করে দেখা এবং বোঝার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তবুও তা ছিল বিহঙ্গ দৃষ্টিতে দেখা। কিন্তু এর বছর দুয়েক পর স্থায়ী ইমিগ্রেনট হয়ে আসার পর তাঁর দেখার চোখ এবং দেখার পদ্ধতিও বদলে যায়। সেই পরিবর্তিত চোখের পর্যবেক্ষণও কিছুটা ভিন্ন হয়েছে। কিন্তু পাঠকদের জন্য যেটা বড় প্রাপ্তি তা হলো বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতি এবং সেই একই মানুষ যখন অভিবাসী হয়ে আমেরিকায় এসে বসবাস শুরু করার পর তাদের সংস্কৃতিতে বিরাট পরিবর্তন ঘটে তার স্বরূপ দেখতে পান মাযহারের লেখায়। কিন্তু দুটি যেমন আলাদা করে দেখান লেখক, সঙ্গে সঙ্গে তিনি একটি তুলনামূলক ছবি এঁকেও বোঝানোর চেষ্টা করেন। এর মধ্যে সমাজে শক্তির বিন্যাসহেতু যেসব সাংস্কৃতিক ছবি দেখা যায় তা অনেক সময় তির্যক চোখ না থাকলে ধরা পড়ে না, কিন্তু লেখক তা দেখান। যেমন এর সঙ্গে মনোজগতের সম্পর্কটিও তাঁর লেখায় ধরা আছে। একটি উদাহরণ দিচ্ছি, ‘মনোজগতের ওপর এখানকার সাংস্কৃতিক প্রভাবের ভিন্নতায় বিপর্যস্ত হবার কথা আমাদের মতো যারা এসেছেন তাঁরা প্রায় সবাই বলেছেন। এখনকার জীবনযাত্রা আমাদের তুলনায় নিয়মতান্ত্রিক। যারা বাংলাদেশের ক্ষমতা কাঠামোর সুবিধাভোগী তাঁরা এই পরিস্থিতিতে বেশি অস্বস্তিতে পড়েন। বাজার করা, ঘর ঝাঁট দেয়া, নিয়মিত টয়লেট পরিষ্কার করা, লন্ড্রিতে কাপড় ধুতে দেয়া অথবা বাড়িতে ওয়াশিং মেশিন থাকলে নিজেই সেটা ব্যবহার করে কাপড় ধোয়া, কাপড় ইস্ত্রি করা, বরফের দিনে নিজ বাড়ির সামনে ফুটপাথের বরফ সরানো, রান্না করা- এই ধরনের দৈনন্দিন সব কাজ করতে হয় নিজেদেরই। মোটামুটি মেনে চলতে হয় সকল নাগরিক আইন। আমাদের দেশের মানুষরা প্রায় প্রত্যেকে এতটাই ক্ষমতার অনুশীলন করেন যে তাঁরা তাদের সামাজিক প্রভাব দিয়ে আইন ভঙ্গ করার যোগ্যতা অর্জন করেন।’ এই সামান্য কয়েকটি বাক্যে একই জনসমষ্টির দুটি সমাজে বসবাসের ফলে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের একটি ছবি দেখা যায়। সাধারণ বাঙালি দেশে একটি শ্রেণীবিন্যস্ত ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে জীবন চর্চা করেন, ক্ষমতার অনুশীলন করেন এবং সংস্কৃতির জায়মান চিত্র সৃষ্টি করেন। সেই মানুষরাই আমেরিকায় এসে অস্বস্তিতে পড়েন এবং সময়ের দীর্ঘ পরিসরে তাঁর সংস্কৃতি বদলে যেতে থাকে। মাযহারের এই পর্যবেক্ষণ সমাজবিজ্ঞানীর পর্যবেক্ষণ, কিন্তু তিনি মূলত সাহিত্যিক, তাই তাঁর পর্যবেক্ষণে সমাজবিজ্ঞানীর উপাত্ত যেমন আছে, তেমনি আছে সাহিত্যিকের মানবিক এবং সৃষ্টিশীল চোখ, তাই পর্যবেক্ষণের ফল দাঁড়াচ্ছে কিছুটা আলাদা। আলাদা এই অর্থে যে এর মধ্যে উপাত্ত বা তথ্যের বিশ্লেষণ যেমন আছে, তেমনি সাহিত্যিকের হৃদয়ের এম্পেথি জড়িয়ে আছে। অধিকাংশ সমাজবিজ্ঞানীর বিশ্লেষণ এম্পেথি-বিবর্জিত, কিন্তু এই লেখা সেদিক থেকে ভিন্ন, এবং মানবিক।
‘আমেরিকান বাঙালি মন’ বইটির প্রথম অধ্যায়ের একটি উপ-অধ্যায় বা উপবিভাগ বলা যায় ‘মিস ইনগেববর্গ লাসটিংয়ের জীবনচর্চা’। এই অধ্যায়টি আমাকে খুব মুগ্ধ করেছে ভিন্ন কারণে। এটিতে একজন জর্মন বংশোদ্ভূত মহিলার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কিছু অন্বেষণ করেছেন লেখক তাঁর রেখে যাওয়া ব্যবহৃত দ্রব্যাদি, যেখানে তাঁর জীবনের কিছু অভ্যাস, ভালোলাগা মন্দলাগা, বা বইপত্র পাঠের, সঙ্গীত শোনার অভ্যাসের স্মৃতিচিহ্নের মাঝে লেখক তাঁর সাংস্কৃতিক ঝোঁক, লক্ষণ বা বলা যায় জীবনের চিত্র দেখতে পান। এর মধ্য থেকে খুঁজে দেখার চেষ্টা করেন অজানা এক সংস্কৃতি। একজন বাঙালি অভিবাসী তাঁর নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে, কখনও তুলনা করে পশ্চিমা সংস্কৃতির কিছু অজানা প্রদেশের খোঁড়াখুঁড়ির সাহায্যে আমাদেরকে জানান আমাদেরও অজানা কিছু জীবন চিহ্ন। সমাজবিজ্ঞানের গবেষকরা সংস্কৃতির স্বরূপ বোঝার জন্য যে ধরনের গবেষণা পদ্ধতি অবলম্বন করেন, এটি তার থেকে অনেকটাই আলাদা। আমরা এথনোগ্রাফিক গবেষণা বা পার্টিসিপ্যাটিরি অবজারবেশন পদ্ধতির কথা জানি, জানি একেবারেই লাইব্রেরি বা প্রকাশিত গ্রন্থাদি বা গবেষণালব্ধ জ্ঞানের পুস্তকাদি নির্ভর উপাত্তের কথা, যার সাহায্যে সংস্কৃতির তাত্ত্বিক পণ্ডিতরা এ বিষয়ে লিখেছেন। কিন্তু কারো রেখে যাওয়া জীবনের স্মৃতিচিহ্ন থেকে বা তাঁর মধ্যে বাস করে নিজের দেখা বিষয় নিয়ে ভিন্ন পর্যবেক্ষণ আমরা কম পেয়েছি। দ্বিতীয় বিষয়টি হল এসব স্মৃতিচিহ্নকে দেখে তাঁর জীবনকে বোঝার একটা নতুন চোখের ছায়া এই লেখায়, সেটা শুধু একজন সংস্কৃতি গবেষকের চোখই নয়, সেখানে একজন মানবিক ভাষা-শিল্পী বা সাহিত্যিকের চোখ রয়েছে। ফলে লেখাটি বা অন্বেষণের ফলটুকুকে একেবারে ভিন্নরকম মনে হবে পাঠকের।
একটি বাড়ি, সেই বাড়িতে পুরনো বাসিন্দা এবং তার জীবন পরিচালিত হতো যে বাঁধা নিয়মে, যে জিনিসপত্রে এমনকি Harman Peck & Co নির্মিত পিয়ানোটিতেও যে সংস্কৃতির চিহ্ন আছে, সেটিও এই গবেষক-লেখকের কাছে মূল্যবান! বাড়ির নতুন বাসিন্দা হিশেবে তাঁর চলাচলের পরিবহন ব্যবস্থা, প্রতিদিনের কাজকর্মের বা ব্যবহার্য জিনিসপত্র কেমন করে তাঁকে সাংস্কৃতিক বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ এই লেখকের অন্বেষণকে বোঝার জন্য। এখানে দুটি বিষয় বিশেষ মনোযোগের দাবি করে, একটি এই পরবাসী জীবনের সংস্কৃতি বিষয়ে গবেষণা, দ্বিতীয়ত গবেষণার ধরন ও পদ্ধতি এবং তৃতীয়ত যেসব সমাজবিজ্ঞানীরা সাংস্কৃতিক পরিবর্তন বা ডায়াসপোরা সংস্কৃতি বা জীবন নিয়ে গবেষণা করে লিখেছেন তাঁদের থেকে এই লেখকের পর্যবেক্ষণ এবং সিদ্ধান্তের তফাৎ।
৩.
এই অধ্যায়ে লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করেছেন। সেটা হলো ভিন্ন দেশে স্বদেশের সমাজ এবং সাংস্কৃতিকতার মাত্রা বা অবস্থা। এখানে লেখকের পর্যবেক্ষণ এবং ভাবনার বিষয় কী করে বাঙালিরা তাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কেমন করে চর্চা করেন যার ফলে এর ধ্বনি-তরঙ্গ অন্য সমাজের মানুষরাও বুঝতে পারে। লেখকের মতে ‘ভিন্ন রাষ্ট্রিক পরিস্থিতিতে এই সাংস্কৃতিক ধারা একটা স্বতন্ত্র স্বভাবও অর্জন করেছে। এই সাংস্কৃতিকতার মূলে আছে বাংলাদেশকে ভুলে না-থাকার সংগ্রাম।’ অর্থাৎ তিনি মনে করেন, ‘বাংলাদেশের সামগ্রিক বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন স্থানে ভিন্ন এক বাস্তবতায় জীবন যাপন করেও বাংলাদেশের মনোজাগতিক আবহকে বাঁচিয়ে রাখা এই সংস্কৃতি চর্চার মূল প্রেরণা।’ সম্ভবত এই পর্যবেক্ষণটি অনেকাংশে সঠিক হলেও এর মাঝে একটি আধুনিক প্রযুক্তির সময়ে একটা বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে এই চর্চা, সেটি আবশ্যিকভাবে ‘ডায়াসপোরা’ সাহিত্যে বা সংস্কৃতি সম্পর্কে সমাজবিজ্ঞানীরা শনাক্ত করেন, আর সেটি হলো যে-সমাজে এই অভিবাসীরা বাস করেন এবং তাদের জন্মভূমির সংস্কৃতিতে ‘না-ভুলে’ থেকে চর্চা করেন সেখানকার সাংস্কৃতিক উপাদানকে তাদের আদি সংস্কৃতিতে মিশ্রিত হওয়ার সম্ভাবনাকে প্রতিহত করতে ব্যর্থ হওয়া। আর এই একটি শঙ্কা বা ব্যর্থতা লেখকের পর্যবেক্ষণ থেকে সৃষ্ট সিদ্ধান্তকে একটু টলাতে পারে। যদিও লেখক সঙ্গে সঙ্গে সেই শঙ্কা বিষয়ে সম্ভবত সজাগ থেকেই প্রশ্ন করেন , ‘এই সংস্কৃতির আন্তর-শক্তি কতোটা জোরালো?’ এই প্রশ্নের উত্তরের মাঝেই নিহিত আছে তাঁর বর্ণিত ‘ভবিষ্যৎ বা এর অভিমুখ।’
লেখক আহমাদ মাযহার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসা সাংস্কৃতিক সত্তা, বা সৃজনশীল সত্তা, বিভূঁইয়ের জীবন-বাস্তবতার কারণে সংকটে পড়ে ‘চেতনার গতিপথ থেকে খসে পড়েন।’ কিন্তু এই খসে পড়ার কারণ এবং এবং কীভাবে সেটা ঘটে তাঁর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে লেখক বাংলাদেশ এবং অভিবাসের দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে যে সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটেছে বলে এরা একেবারেই আলাদা তার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেছেন। যেটা সাধারণত সমাজবিজ্ঞানীরা করে থাকেন। সংস্কৃতির তাত্ত্বিক পণ্ডিতরা সংস্কৃতির স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাধারণত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে মাচা হিশেবে দেখে বিষয়টি আলোচনা করেন। বিশেষ করে মার্কসীয় তাত্ত্বিকরা এই পথ অবলম্বন করেন। আহমাদ মাযহার বলেন বিষয়টি ভালো করে বুঝতে গেলে ‘এর জন্য প্রয়োজন বাংলাদেশের মানুষের কৃষিভিত্তিক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা থেকে আধুনিক বুর্জোয়া জীবনের সংস্কৃতিতে উত্তরণের অভিজ্ঞতাকে বিশ্লেষণ করে দেখা। সাধারণ পর্যবেক্ষণেই টের পাওয়া যায় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক সাংস্কৃতিক মনোভঙ্গির সঙ্গে বুর্জোয়া মনোভঙ্গির এখনো রয়েছে বিস্তর দূরত্ব ও দ্বন্দ্ব। এখনও পর্যন্ত সম্পন্ন অর্থে সেখানকার অধিবাসীদের মানসজগত পুরোপুরি নাগরিক হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু তাহলেও বাংলাদেশের নগরগুলোর চলমান রূপান্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে নগরের অধিবাসীরা যুক্ত থেকে একে তরান্বিত করে চলেছেন। যদিও জীবন যাপনের ধরন এখনও দীর্ঘকালের অভ্যস্ত গ্রামীণতা-প্রভাবিত রয়ে গেছে।’ দুই সংস্কৃতির এই দূরত্বের কারণ সন্ধানে এই ব্যাখ্যা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য, কিন্তু এটিকে যারা অন্যান্য তাত্ত্বিক মাচায় রেখে ব্যাখ্যা করতে চান, যেমন বিশ্বায়নের ফল হিশেবে, বা অন্য কোন তত্ত্বের আলোকে যারা বিচার করতে চান, তাঁরা আহমাদ মাযহারের ব্যাখ্যাকে কিছুটা মার্কসীয় তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত ভাবতে পারেন।
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যে অনুশীলন দাবি করে সেটা বাংলাদেশের শিল্পী বা সংস্কৃতিকর্মীদের পক্ষে করা অভিবাসীদের চেয়ে বেশি সম্ভব। কারণ লেখক বলেন যে বাংলাদেশে নিজের পেশাজীবন চালিয়ে শিল্পীরা গৃহ ও অন্যান্য কাজের জন্য কোন সহায়ক হাত নিয়োগ করতে পারেন, যা অভিবাসীদের পক্ষে একেবারেই সম্ভব নয়, শুধুমাত্র গুটিকয় বড় আয়ের মানুষ ছাড়া। তাই অভিবাসী শিল্পী বা সংস্কৃতি কর্মীদের পক্ষে চাইলেও তা সম্ভব নয়। তাই সাহিত্য শিল্পকলা, নাটক অন্য যে কোন সাংস্কৃতিক অনুশীলনই শিল্পীদের পক্ষে করা কঠিন। এই পর্যবেক্ষণ লেখকের শতাংশে সত্যি। বিশেষ করে লেখক অন্যান্য সংস্কৃতির সঙ্গে ধ্রুপদী সঙ্গীতের কথা উল্লেখ করেছেন। আহমাদ মাযহার লিখেছেন, ‘নিজেদের জনসমাজের বাইরে যথার্থ রসিক শ্রোতৃমণ্ডলীর কাছে এখনো পৌঁছতে পারেনি বলে সঙ্গীত চর্চার প্রেরণা বাঁচিয়ে রাখা খুব কঠিন।’ এটা সম্ভবত চিত্রকলা এবং সিনেমার বেলায়ও সত্যি। তবে সঙ্গীত, বিশেষ করে ধ্রুপদী সঙ্গীত, ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীত যেহেতু গুরুমুখী এবং তা দীর্ঘদিন গুরুর কাছে চর্চার বিষয়, সেটি অভিবাসীদের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব হয়ে ওঠে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে অনেকটা তাই, কিন্তু সাহিত্যিকের গুরু-নির্ভর না হলেও চলে। আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ যেটি লেখক খুব সঠিকভাবেই উল্লেখ করেছেন, তা হলো, ‘একথা না মানলে তো চলবে না যে সাহিত্যিককে বসবাস করতে হয় একটা গতিশীল সমাজচৈতন্যের মধ্যে। প্রকৃতপক্ষে সমাজের সঙ্গে টানাপড়েন নিয়েই সাহিত্যিকের ক্রিয়াশীলতা।’
অভিবাসী জীবনে শিল্প এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন গতিপ্রকৃতি বিচার করে লেখক দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে সংস্কৃতি চর্চার বৃত্ত খুব ছোট এবং লেখকের মতে কারণেই শিল্পীর দৃষ্টি প্রসারিত হয় না। তিনি বলেন, ‘ছোট্ট জনসমাজের মধ্যে কর্মকাণ্ড সীমিত বলে যশ অর্জন খুব সহজ হয়ে পড়ে। ফলেই অল্পেই সন্তুষ্টি অনেকের আকাঙ্ক্ষাকেই সীমিত করে ফেলে। বাংলাদেশের বৃহত্তর সমাজে কোন অবদানকে চিহ্নিত করা অনায়াসসম্ভূত নয় বলে দৃষ্টিসীমা কিছুটা প্রসারিত থাকে। কিন্তু আমেরিকার মহাজীবনের মধ্যে থেকেও বাংলার সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ বা সংস্কৃতির স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যকে নিজের বলে মনে না হওয়ায় এখানকার জনসমাজ আরেক ধরনের ক্ষুদ্র অভিবাসী জীবনের মধ্যেই বসবাস করতে থাকেন।’ লেখকের এই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ আমেরিকায় বাঙালিদের সংস্কৃতি চর্চার দীনতার কারণ বুঝতে।
লেখক দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘ডায়াসপোরা’ জীবন এবং তাদের সংস্কৃতি বিষয়ে যে সংজ্ঞা দিয়েছেন সেটি সমাজবিজ্ঞান বা ইতিহাসের ছাত্রদের কাছে পরিচিত এবং সঠিক। কয়েক হাজার বছর আগে রোমানদের দ্বারা জেরুজালেম থেকে উৎখাত করা হয় ইহুদীদের। সেই থেকে তারা পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েন। কিন্তু ধর্ম হিশেবে ইহুদী একটি সামস্টিক কল্যাণকামী ধর্ম, তারা Collective Wellbeing বা সামস্টিক কল্যাণকে নিশ্চিত করতে নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্মের বিভিন্ন আচার পালন এবং একে অপরের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর নিমিত্তে নিজেদের মাঝে এক অটুট বন্ধনের নীতি মেনে চলেন, ফলে তাদের মাঝে এক ধরনের নিয়মনীতি পালনের রীতি লক্ষ করা যায় যেখানে যে-দেশে তারা অভিবাসী তাদের সংস্কৃতি তাদের জীবনে কম প্রভাব ফেলতে পারে। যে সামান্য প্রভাব ফেলে তার মিশ্রণে এই ইহুদী জনগোষ্ঠীর মাঝে একটি ভিন্ন সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে যাকে পশ্চিমা সমাজবিজ্ঞানীরা ‘ডায়াসপোরা’ হিশেবে অভিহিত করেন। কিন্তু গত হাজার খানেক বছর যাবৎ ইউরোপের নৌবাণিজ্য বৃদ্ধি এবং সমুদ্র বিজয়, এবং ম্যাপ দেখে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার বিজ্ঞানের উদ্ভব এবং আধুনিকীকরণের ফলে ইহুদী ছাড়াও বিভিন্ন দেশের মানুষের ভিন্ন দূরদেশে বসতি স্থাপনের সংখ্যা বেড়ে যায়। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দীতে ইউরোপের দেশগুলোর হাতে যখন নৌবিজ্ঞান আসে তখন পুঁজি এবং বিজ্ঞান মিলে তাদের মাঝে এশিয়া এবং আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে লুণ্ঠনের ক্ষুধাও বেড়ে যায় এবং তারা উপনিবেশ স্থাপন করে। ফলে দেখা যায় এসব দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ উপনিবেশিক শাসকদের দেশে পাড়ি দেয় উচ্চশিক্ষা বা ভাগ্য বদলের জন্য। বিশেষ করে শিল্প বিপ্লব এবং পুঁজিবাদের উদ্ভবের ফলে তার সংখ্যা এবং বিস্তার অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু গত শতাব্দীর মাঝামাঝিতে পুঁজিবাদের রূপ বদলে যেতে থাকে। জাতীয় পুঁজি যে নিজেদের দেশে শিল্পের বিস্তার ঘটায় সেটা তার পরিধি বদলায় এবং সস্তা শ্রমিকের উদ্দেশ্যে পুঁজিবাদী দেশগুলো দরিদ্র দেশেগুলোতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। ফলে নতুন করে বিপুল সংখ্যক মানুষ পুঁজির দেশে যেমন শ্রমিকের কাজ নিয়ে যায়, তেমনি পুঁজিবাদী দেশগুলো থেকেও ব্যবস্থাপনার জন্য নিজেদের বিনিয়োগকৃত অর্থ হেফাজতের জন্য দরিদ্র দেশগুলোতে যেতে থাকে। এর ফলে দুই দিকেই ‘ডায়াসপোরা’ সংস্কৃতি বাড়তে থাকে। তবে বর্তমান লেখক আহমাদ মাযহার তাঁর পর্যবেক্ষণে অভিবাসী মানুষদের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে আগে অভিবাসীরা যে বাংলাদেশের গ্রামের দরিদ্র এলাকা থেকে আসার ফলে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা সীমিত এবং ‘দৃষ্টিসামর্থ্যকে হারিয়ে ফেলেন’ বলে উল্লেখ করেছেন, তিনি তার থেকে পরিত্রাণের একটি উপায়ও বলেছেন তাঁর লেখায়। তাঁর মতে ‘এর থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা খুব সুদূরের ব্যাপার নয়’। তাঁর মতে ‘বাংলা জনসমাজের সাংস্কৃতিক নিজস্বতার নবপটভূমিক উত্তরণের জন্য দৃষ্টিকে রাখতে হবে প্রসারিত। এখানকার সাংস্কৃতিক মহাজীবনের কাছ থেকে যেমন রসদ নিতে হবে আমাদের তেমনি অবগাহনও করতে হবে উৎসসংস্কৃতির মনস্তত্ত্বকে ধারণ করেই।’ সম্ভবত এই ‘মনস্তত্ত্বকে ধারণ’ বিষয়টিই অভিবাসী লেখক বা সংস্কৃতি কর্মীদের জীবনে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের বিষয়। যদিও সেটি আপাতভাবে খুব সহজ মনে হয়, কিন্তু বাস্তবজীবনে সেটি ভীষণ দুরূহ!
বাইবেলকে ডায়াসপোরা সাহিত্যের প্রথম লেখা উল্লেখ করে লেখক আমাদের জানান যে ধর্মগ্রন্থ লেখা হয়েছে বিভিন্ন ধর্মের পয়গম্বরদের বিভিন্ন অবস্থা এবং ‘দর্শনগত’ চিন্তার বিভিন্নতার কারণে। কিন্তু ইহুদীদের নির্বাসিত হওয়ার বেদনার সঙ্গে ডায়াসপোরা সাহিত্যের লুকানো বেদনা জড়িয়ে আছে, নির্বাসিত মানুষদের বেদনার কথা মনে করিয়ে দিয়ে লেখক সেটাকেই সামনে নিয়ে আসেন। নির্বাসিত মানুষদের সবাই ভাগ্য বদলের জন্য জন্মভূমি ত্যাগ করেন না, আধুনিক সময়েও অনেক মানুষ রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় কারণে দেশান্তরী হতে বাধ্য হন, আর তাঁদের দ্বারা সৃষ্ট সাহিত্য একেবারে ভিন্ন, অনেকটাই বেদনায় জর্জর। কিন্তু এই সাহিত্য-চরিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন, ‘বিশ্বায়নের কারণে এখন আর প্রবাসজীবন সম্পর্কে মানুষের আগের মত বিচ্ছিন্নতা নেই।’ এই ‘বিচ্ছিন্নতা’ বলতে লেখক যা বলেছেন তা বোধ করি শিল্পীর ‘বিচ্ছিন্নতা’ নয়, যা আধুনিক ইউরোপীয় সাহিত্যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কিছু আগে থেকে শুরু হয়ে পরে কিছুদিনদের সৃষ্টিতে দেখা যায়, যাকে আমরা alienation হিশেবে বুঝে থাকি। তা শিল্পীর এক ধরনের মনোজাগতিক অবস্থা বা চিন্তার ধরন। কিন্তু লেখক এখানে যে বিচ্ছন্নতার কথা উল্লেখ করেছেন সেটি সম্ভবত ভৌগোলিক।
এই অধ্যায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লেখক যা লেখকের এই গ্রন্থের মূল প্রতিপাদ্যের বীজও বলা যায়, তাহলো সাহিত্য সৃষ্টির ‘পরিপ্রেক্ষিত’। লেখক মনে করেন অভিবাসী মানুষ এতো ‘নতুন তাৎপর্যের মুখোমুখি হয়েছেন, যে নতুন পরিপ্রেক্ষিত পেয়েছে।’ অর্থাৎ এই নতুন পরিপ্রেক্ষিতই তাকে ভিন্নদেশে নিজের দেশের সীমানাকে বর্ধিত কলেবরে সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছে। তিনি তাই জোর দিয়ে বলেন, ‘অন্য দেশেই এখন তার স্বদেশ।’ এই অন্য দেশকে স্বদেশরূপে গণ্য করার প্রক্রিয়াতেই ‘আমেরিকান বাঙালি মন’ সৃষ্টির আঁতুড় ঘর। কিন্তু প্রক্রিয়াটা খুব সহজ বা মসৃণ নয়, আর সেখানেই এর বিপরীত বক্তব্যের শুরু হওয়ার সম্ভাবনা। কারণ সেই ‘প্রক্রিয়ার’ মাঝে ‘অন্য দেশের’ সংস্কৃতির কিছু আবশ্যিক উপাদান অদৃশ্যভাবে জায়গা করে নেয়। সেখানেই সমাজবিজ্ঞানী স্টুয়ার্ড হলের সেই বিখ্যাত তত্ত্বের ছায়া দেখা যায়। তিনি জানান যে কোন ডায়াসপোরা সংস্কৃতিই অবিমিশ্র আদি কোন সংস্কৃতি নয়। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে আহমাদ মাযহারও সম্ভবত বলেন যে বাঙালি এখানে শুধু ‘বাঙালি’ নন, তিনি ‘আমেরিকান বাঙালি’। এই আমেরিকান বাঙালির সঙ্গে বদরগঞ্জ বা কিশোরগঞ্জ বা শরীয়তপুরের বাঙালির সংস্কৃতির কিছুটা তফাৎ রয়েই যায়। সেকথা বোঝানোর জন্যই মাযহার বলেন, বাংলাদেশ উৎস-দেশ বলে, ‘বাঙালি জাতির নানা ঘটনাপ্রবাহ তাদের জীবন যাপনে প্রাসঙ্গিক থাকে; আবার যে-দেশে বাস করছেন সেদেশের রাজনীতি অর্থনীতি বা সমাজের চাহিদা সেই সব লেখকদের চৈতন্যে প্রবেশ করে।’ এখানে মাযহার যা বোঝাতে চান তা প্রায় সমাজবিজ্ঞানী হলের চিন্তার কাছাকাছি। তিনি আমাদের আরও মনে করিয়ে দেন যে বিদেশে বসবাসরত বাংলাভাষী লেখক ‘নিজেকে কেবল ‘ডায়াসপোরা লেখক না ভেবে অভিবাসী মূলধারার বাংলা সাহিত্যের লেখকই ভাবতে পারেন।’ এই ভাবতে ‘পারাটা’র সম্ভাব্যতা নির্ভর করে লেখকের মানসচৈতন্য মূলধারার জীবনকে কতোটা আত্মস্থ করতে সক্ষম এবং সেই অভিজ্ঞতাকে সৃজনকাজে কতোটা ব্যবহার করতে পারেন তার ওপর।
নিজের গবেষণা পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে লেখক আহমাদ মাযহার মনে হয়, আমরা যারা পাঠক, তাদের চেয়ে বেশি সচেতন। কারণ গবেষণা বা অন্বেষণের ভিত্তি বা পদ্ধতি লেখককে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসতে সাহায্য করে, আর তাই গবেষণালব্ধ উপাত্ত সম্পর্কে তিনি খুব সচেতন বিশ্লেষণের পথে এগোন। এ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি একটি মূল্যবান মন্তব্য করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘বর্তমান রচনাটি কোন পদ্ধতিগত গবেষণার ফল নয়; ফলে এই অভিমুখের চিহ্ন এতোটা স্পষ্ট করে হয়তো তুলতে পারবে না যাতে এর সূত্রগুলো প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য হিশেবে পাঠকদের কাছে হাজির হবে। কিন্তু বাঙালি বা বাংলাদেশি এই অন্য সত্তার অভিমুখের ইশারা কারো কারো অন্তর্দৃষ্টির কাছে আভাসিত করতে পারে- কী সেই ইশারা; তার ভিত্তি কী তা এখানে পরীক্ষা করে দেখার আকাঙ্ক্ষা বা প্রত্যাশা এর প্রয়াসে যে নিশ্চয় অন্তঃশীল রয়েছে তা জোর দিয়েই বলে নেয়া যায়।’ লেখকের এই বয়ান আসলে তিনি যাকে অভিহিত করেন ‘অন্য এক বাংলা বোধ’ তাকে বোঝানোর জন্য। সেটিকে আরেকটু পরিষ্কার করে তিনি তুলনা করেন ভারত বিভাগের সঙ্গে সঙ্গে যে বাংলা ভাগ হয় এবং নতুন এক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভবের ফলে এখানে ভিন্ন সংস্কৃতিই শুধু নয়, নতুন রাষ্ট্রবোধের জন্ম হয় তাকে তিনি উপস্থাপন করেন। তাঁর ভাষ্য পাঠককে রাষ্ট্রচিন্তা কী করে সংস্কৃতিরও অবিভাজ্য অঙ্গ হতে পারে বিখ্যাত সংস্কৃতির তাত্ত্বিক রেমন্ড উইলিয়ামসের চিন্তাসূত্রের মতোই তা মনে হতে পারে। আহমাদ মাযহার লেখেন, ‘বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত ফল হিশেবে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাও ভাগ হয়ে গেলে ঢাকাকেন্দ্রিক এক নতুন মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে উঠতে শুরু করে। এই সমাজের মূলধারা বাংলার মুসলমান সমাজ। এই সমাজের প্রগতির অভিমুখের কেন্দ্র হয়ে ওঠে অসাম্প্রদায়িক মনোভঙ্গি, অর্থাৎ ব্যক্তির ধর্মীয় প্রশ্নের চেয়ে মানবিক সত্তাকে বড় করে দেখা। আর নতুন জায়মান মধ্যবিত্তের সঙ্গত প্রধান আগ্রহ নগরসংস্কৃতি অর্জন। ফলে কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যের বাইরে বাংলাবোধের নতুন যে নগরকেন্দ্রিকতা দেখা দেয়, তারই আওতায় সাহিত্য ও সংস্কৃতির সার্বত্রিক এক জাগরণ দেখা যায়। এই সার্বত্রিক জাগরণের প্রতিভূদের চেতনায় জন্ম নেয় আধুনিক এক নতুন রাষ্ট্রবোধ। এরই ফলে জায়মান হয় শেখ মুজিবের ছয়দফা-যথাক্রমে বাংলাদেশের স্বাধিকার , স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।’ একটি জনগোষ্ঠীর অভিবাসী জীবনে সম্ভাব্য সংস্কৃতির জন্মবৃত্তান্ত বোঝার সঙ্গে এই তুল্যমূল্য আলোচনা সত্যিই পাঠকের মনে চিন্তার উদ্রেক করবে কীভাবে রাষ্ট্রবোধ সংস্কৃতি চিন্তা বা সংস্কৃতির আঁতুড় ঘরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য! এটি এই অধ্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ লেখকের!
লেখকের অন্য একটি পর্যবেক্ষণ আপাতভাবে অনেকের চোখে নাও পড়তে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং অস্তিত্বের ইতিহাসে খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো ‘৭৫ সালের পনেরোই আগস্টের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের জীবনের এবং ভাগ্যের অবিভাজ্য যে সম্পর্ক তা শুধু যে আমাদের বাহ্যিকভাবে প্রভাবিত করেছিল তাই নয়, বরং তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা মানুষের চিন্তা এবং ভাগ্যকেও বড় রকমভাবে প্রভাবিত করেছিল। এর মধ্যে অভিবাসী জীবনের গতি-প্রকৃতির রূপবদলের ছবিও লক্ষ করা যায়। মাযহার লিখেছেন, ‘নতুন করে সংকটের আবর্তে পড়ে বাংলাদেশ। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মানুষের জাগরনাকাংখা দমিত হয় না। পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পরিচয় বড় হতে থাকে। শ্রমবাজারে বাংলাদেশের মানুষের ছড়িয়ে পড়া এবং ক্রমশ রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রধান ভূমিকা রাখতে থাকার মধ্য দিয়ে এই পরিচয় আন্তর্জাতিক পরিসর পেয়েছে। কিন্তু অন্য দেশে ছড়িয়ে থাকা এই বিপুল সংখ্যক মানুষের অবদান যে কেবল অর্থনৈতিক নয়, এর যে একটা বড় সাংস্কৃতিক তাৎপর্য রয়েছে তা আমরা সচরাচর ভাবনায় রাখি না।’ এখানেই রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে আহমাদ মাযহারের পর্যবেক্ষণের তফাৎ। অভিবাসী জীবন নিয়ে এবং আমাদের স্বভূমিতে তাদের অবদান নিয়ে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বা সমাজবিজ্ঞানীরা তাদের পাঠানো বিপুল অর্থের কথাই ভাবেন, কিন্তু সাংস্কৃতিক বিবর্তনে যে ভিন্ন অবদান তারা রাখছেন এবং সেটা যে দীর্ঘমেয়াদী ও সচরাচর সাধারণভাবে কোয়ানটিফাই করা সম্ভব নয়, সেটা মাযহারের লেখায় ও পর্যবেক্ষণে পরিস্ফুট। এই পর্যবেক্ষণের চোখ সাহিত্যিকের বা শিল্পীর ও যুগপৎ সমাজবিজ্ঞানীর!
এই অধ্যায়ে লেখক আমাদেরকে কিছু মূল্যবান কথা জানিয়েছেন প্রবাসে বাঙালিদের সাংস্কৃতিক অনুভব সম্পর্কে। কিন্তু একটি নতুন অভিধা তিনি সৃজন করেছেন, সৃজন এই অর্থে যে শব্দদ্বয়ের একটু ভিন্ন অর্থ সংযোজন করে। সেটা হলো ‘বাংলা বোধ’। এই শব্দযুগল আমরা ব্যবহার করি, কিন্তু মাযহার এখানে বুঝিয়েছেন অভিবাসী বাঙালিরা তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা তাদের সত্তার সঙ্গে মিশিয়ে দেখতে নতুন রূপে অনুধাবন করেন। তিনি লেখেন, ‘তাদের সত্তা এই বাস্তবতা মেনে নিয়েছে যে আর স্থায়ীভাবে বসবাস করতে বাংলাদেশে ফিরে যেতে পারবে না; কিন্তু অন্য দেশে, অন্য সংস্কৃতিতে, অন্য ভাষার আবহে বসবাস করেও তাদের বাঙালি সত্তাকে নতুন বাস্তবতায় নতুন রূপে গড়ে তুলবে।’ দীর্ঘ কয়েক দশক সময় ধরে আগত বাঙালি অভিবাসীরা মার্কিন সমাজে স্থায়ীভাবে বাস করেন, কেবল থাকেনই না, লেখকের মতে তারা ‘ভবিষ্যৎ জীবনের সমৃদ্ধি অর্জনের কল্পনা নিয়ে’ থাকেন। এই ‘বাংলা বোধ’ শব্দযুগলের ভাবের ধারক এদেরকেই মনে করেন লেখক!
‘আমেরিকান বাঙালি মন’-এর লেখক বাংলাদেশের বাইরে সবচেয়ে বৃহৎ বইমেলার একটি ছবি এঁকেছেন, এই ছবি আমাদের আর দশজনের এই বইমেলা দেখার পদ্ধতি থেকে কিছুটা আলাদা। ‘মুক্তধারা’ আয়োজিত এই মেলাকে সাধারণ বাঙালি অভিবাসীরা দেখেন একটি বিনোদন, সাংস্কৃতিক, কিছুটা সাহিত্য ও ‘স্বাধীনতা-চেতনাসমৃদ্ধ ‘ একটি আয়োজন হিশেবে। কিন্তু লেখক এটিকে চিত্রিত করেন একটি সুদূরপ্রসারী সাংস্কৃতিক- সৌন্দর্য-নির্মাণ-বীজ-আঁতুড়ভূমি হিশেবে। এটি বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়। এই অধ্যায়ের একটি উপ-অধ্যায় ‘ ‘দূর স্বদেশে’ বাংলা বইয়ের পাঠক সমাজ’, সেখানে লেখক বইয়ের ও লেখকের ভূমিকা সমাজে কীভাবে ‘প্রগতি’ আনতে পারে, সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটাতে পারে সেটা বলেছেন। এই মতের বা পর্যবেক্ষণের সঙ্গে জার্মান সমাজবিজ্ঞানী জারগেন হ্যাবারমাসের ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ তত্ত্বের কিছু সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। সপ্তদশ শতাবীদের শেষদিক থেকে বিলেতের বড় শহরগুলো থেকে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে সরাইখানা, সুরিখানাগুলোতে বিকেল বা সন্ধ্যায় দেখা যেতো খদ্দেরদের মাঝে রাজনৈতিক কথাবার্তা, বিশেষ করে তাদের মাঝে শাসক রাজা বা সামন্ত প্রভুদের বিষয়ে আলাপ আলোচনা হত। সেখানে শুধু তাদের অত্যাচার বা অতিরিক্ত কর বা খাজনা বিষয়েই কথা হত তা নয়, দেশের বিভিন্ন চিন্তাবিদদের লেখাজোখা নিয়েও আলোচনা হত। এখান থেকেই রাজনৈতিক চিন্তার বিস্তার ঘটে সাধারণ জনমানুষের মধ্যে। এটি বিখ্যাত জার্মান সমাজবিজ্ঞানী জারগেন হ্যাবারমাস তাঁর কমুনিকেসন্স থিওরি ও ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ থিওরিতেও উল্লেখ করেন। তাঁর মতে যেখানে সাধারণ জনগণ জমায়েত হয়, মাঠঘাট, হাটবাজার, রেস্তোরাঁ, শুঁড়িখানা/পাব বা সরাইখানা, সেখানেই রাজনৈতিক চিন্তার আদানপ্রদানের মাধ্যমে জনগণের সচেতনতার সৃষ্টি হয়, এর একটি সুদূরপ্রসারী বিস্তার ঘটে জনচিত্তে। আধুনিক গণতন্ত্র এবং একটি সমাজে এভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার বিষয়ে সচেতনতার সৃষ্টি হয়, তাই গণমানুষের মনোজগতে বড় পরিবর্তন বা চিন্তার রূপান্তরের ক্ষেত্রে ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হ্যাবারমাসের এই তত্ত্ব আমরা সকলেই জানি, কিন্তু বই বা সাংস্কৃতিক কোন সূত্র, কর্মকাণ্ড বা আমাদের সমাজে ‘পাবলিক স্ফিয়ারের’ মতোই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে কিনা বা পারলেও তা কীভাবে সেটা ঘটতে পারে আমরা খুব গুরুত্ব দিয়ে তা কখনও ভেবে দেখি নি সম্ভবত। বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক এবং গবেষক আহমাদ মাযহার সম্প্রতি এই উল্লেখযোগ্য গ্রন্থটি রচনা করেছেন প্রবাসী বাঙালি, বিশেষ করে মার্কিন দেশে বসবাসরত বাঙালিদের সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্ব ও মনোজাগতিক চিন্তার রূপান্তর ও বিবর্তন বিষয়ে। সেখানে এই পর্যবেক্ষণ তিনি উল্লেখ করেছেন যা হ্যাবারমাসের ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ তত্ত্ব বিষয়ে আমাদেরকে নতুন করে ভাবাতে পারে। মাযহার লিখেছেন:
‘প্রকৃতপক্ষে পাঠক তাঁরাই যাঁদের চিত্ত কৌতূহল নিবৃত্তির জন্য সদা জাগ্রত থাকে, অথবা সব সময় তৃষ্ণার্ত থাকে আনন্দ লাভের জন্য। তাঁর পাঠলব্ধ অভিজ্ঞতা মনকে চিন্তা ও প্রতিচিন্তায় দ্বন্দ্বময় করে চলে বলে সবসময় তাঁদের চিত্ত সংস্কৃত হতে থাকে। তাঁরাই লেখকদের ভরসাস্থল হবার কথা। এই পাঠকসমাজই সমাজের অভ্যন্তরে প্রকৃত জনমত গড়ে তোলেন। তাঁদের গ্রহণকৃত মতই সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাঁদের অনেকেরই হয়তো নিজেদের লেখক হিশেবে প্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগ নেই; সমাজে তাঁদের পাঠলব্ধ জ্ঞানের প্রয়োগ দেখেই তাঁরা খুশি। এঁরাই হাটে বাজারে, চায়ের আড্ডায় নিজেদের মধ্যে মতামতের ঝড় তোলেন। তাঁদের চূর্ণিত মতের বিবর্তনই কালে সমাজের প্রগতিশীল মত হয়ে ওঠে।’
আহমাদ মাযহারের কথাগুলোকে হ্যাবারমাসের ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ তত্ত্বের কাছাকাছি মনে হতে পারে, কিন্তু মাযহার বলেছেন কথাগুলো ‘বই’ এবং লেখক সম্পর্কে বলতে গিয়ে, আর হ্যাবারমাস বলেছেন ইউরোপের গণতন্ত্রের উন্মেষকালে রেস্তোরাঁ, পাব, সরাইখানা বা অন্যান্য সাধারণ মানুষের জমায়েত হওয়ার জায়গাগুলোতে যেভাবে চিন্তার আদান-প্রদান হওয়ার ফলে সমাজে নিজেদের অধিকার চিন্তার বিস্তার লাভ করে সে বিষয়ে। মাযহার এবং হ্যাবারমাস দুজনেই উল্লেখ করেছেন এই আদান-প্রদান হওয়ার ফলে ‘অভিজ্ঞতা মনকে চিন্তা ও প্রতিচিন্তায় দ্বন্দ্বময় করে চলে বলে তাঁদের চিত্ত সংস্কৃত হতে থাকে।’ আসলে এই ‘চিন্তা প্রতিচিন্তা’ দ্বন্দ্বময় করে বলেই সংস্কৃতির বিরামহীন কর্ষণ ঘটে এবং তাকে উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যায়। মাযহার নিজে হয়তো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র নন বলে হ্যাবারমাসের এই চিন্তার সঙ্গে ক্লাসরুমে পরিচিত নন, কিন্তু একজন পশ্চিমা দার্শনিক যা ভাবলেন, তার কাছাকাছিই তিনি ভাবলেন একজন বাঙালি ‘বই প্রেমিক’ লেখক প্রাবন্ধিক হয়ে, আমাদের লেখকদের মতামত বিষয়ে, কী করে ‘তাঁদের চূর্ণিত মতের বিবর্তনই’ সমাজে প্রগতিশীলতার আকর হয়ে উঠতে পারে! ‘আমেরিকান বাঙালি মন’ গ্রন্থটির অনেক মূল্যবান পর্যবেক্ষণের এটি একটি!
জগতের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত বইমেলার সঙ্গে তুলনা করে নিউ ইয়র্কের বইমেলার গুরুত্ব বিশ্লেষণ করেছেন মাযহার। তবে এই মেলার দুর্বলতার দিকগুলো নিয়েও মাযহার কথা বলেছেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতা বা দিল্লী বইমেলার চারিত্র এবং ঢাকার বইমেলার বিভিন্ন দিক তুলনা করেছেন। কলকাতার বইমেলার উল্লেখ করে লেখক বলেন,’বাংলা একাডেমির বইমেলার সঙ্গে কথায় কথায় ঐ বইমেলার তুলনা করা হতেও দেখি। কিন্তু যারা তুলনা করেন তারা অনুভব করেন না যে সেই বইমেলা চারিত্র্য বৈশিষ্ট্যে ঢাকার বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলার চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন। ভিন্ন এর স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের কারণে । কলকাতা বইমেলার আয়োজক সেখানকার ‘পাবলিশার্স এন্ড বুকসেলারস গিলড’। পশ্চিমবঙ্গের ঐ বইমেলা কেবল বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের দিকে তাকিয়ে থাকা বইমেলা নয়, তাদের ঐ বইমেলা আয়োজনের উদ্দেশ্যের মধ্যেই রয়েছে সর্বভারতীয় বইয়ের সমাহার ঘটানো। ভারত একটি বহুজাতিক ও বহুভাষিক রাষ্ট্র বলে বাংলা ভাষা চেতনা ও বাংলা বোধের প্রেরণা সেখানে গৌণ। এই বিশাল যজ্ঞের উদ্দেশ্য কেবলই বই বিক্রি, সব ধরনের, সব ভাষার বই বিক্রি। আর বাংলা একাডেমির বইমেলার উদ্ভব একাডেমি আয়োজিত অমর একুশের অনুষ্ঠানমালাকে কেন্দ্র করে। অমর একুশের অনুষ্ঠানমালার চেতনার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় মননচেতনার যোগ ঘটাবার ফলে বাংলা একাডেমির ‘অমর একুশের বইমেলা’ জমজমাট হয়ে উঠছে ক্রমশ। এর কেন্দ্রীয় চেতনায় বাঙালিত্বের বোধ ক্রিয়াশীল।’ বাঙালির মননচেতনার সঙ্গে কেমন করে এই মেলা সম্পর্কিত তা বোঝাতে লেখকের বই থেকে উদ্ধৃতির আকার একটু দীর্ঘ হল, কিন্তু এখানেই লেখকের এই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যটি রয়েছে যা অন্যান্য বইমেলার সঙ্গে বাংলা একাডেমি আয়োজিত মেলার তাৎপর্য বুঝতে সহায়ক। অধিকাংশ বইমেলাই জগতে বই বিক্রি এবং বইয়ের প্রসারের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু বাংলা একাডেমির বইমেলার সঙ্গে বই বিক্রির সম্পর্ক গৌণ, মূলত এটি বাঙালির মননচেতনার ও বাঙালিত্বর পরিচয় বহনকারী একটি আয়োজন। এটি যদি এই চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য হারায়, তাহলে বাঙ্গালিত্ব হুমকির সম্মুখীন হবে।
৪.
আহমাদ মাযহার বইয়ের পাঠকদের সঙ্গে আমাদের সমাজের আরেকটি বিষয়ের তুলনা করেছেন, ভাল এনালজি, কিন্তু বিষয়টি রাজনৈতিক, কেউ কেউ ভুলও বুঝতে পারেন। তিনি জানিয়েছেন পাঠক থাকলে তাঁদের অন্তরে লেখকের ‘সার-অসারের’ তরঙ্গ দেখা যেত। এই বিষয়টির সঙ্গে লেখক আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন। আমাদের পাঠকদের মতো আমাদের জাতীয় নির্বাচন ব্যবস্থা আছে, ভোটারও আছে, কিন্তু ভোটারের ইচ্ছার বা মতের প্রতিফলন নেই বলে লেখক মনে করেন। ছোট এই বাক্যটি অনেক গভীর অর্থ ধরন করে বলে আমি মনে করি।
অভিবাসী মানুষদের অনেকে ‘প্রবাসী’ বলে অভিহিত করেন, তবে লেখক এই শব্দের মাঝে জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার একটি নিঃশব্দ ইঙ্গিত লক্ষ করেছেন। কিন্তু তাঁর মতে ‘দূরস্বদেশে’ যে-সাংস্কৃতিক সম্প্রসারিত রূপ অন্বেষণের চেষ্টা করছেন তা সত্যিই হয়তো সম্ভব একদিন, কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গোলকায়িত পুঁজি এবং তার দ্বারা সৃষ্ট আরও কিছু বিষয়, তা শুধু সংস্কৃতিই নয়, বরং প্রযুক্তি এবং শিক্ষার সম্প্রসারিত চিত্রটি কী দাঁড়াবে অভিবাসী মানুষদের জীবনে, তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই বইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বাংলাদেশের বাইরে বাঙালি সংস্কৃতি। এ বিষয়ে বলতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন লেখকের গবেষণা এবং পর্যবেক্ষণ বিষয়ে নির্দিষ্ট আলো ফেলার চেষ্টা করেছেন, সেটি হলো প্রথম বা দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী খুব বেশী চেষ্টা করেন মাতৃভাষা এবং জন্মভূমির সংস্কৃতিকে অবিকল আঁকড়ে থাকার, আর এই চেষ্টা তারা করলেও কেন তা সম্পূর্ণ অবিকল ধরে রাখা যায় না, তা বিশ্লেষণ। এর কারণ, সীমাবদ্ধতা এবং কিছু বৈষয়িক বিষয় প্রতিকূল হয়ে দাঁড়ায়, যা লেখকের বিশ্লেষণে গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক কিছু আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ কিছু বিষয় নিয়ে লেখক কথা বলেছেন, যেমন বিভূঁইয়ে বাঙালির সংস্কৃতি চর্চার মনস্তত্ত্ব এর আগে কোন বাঙালির লেখায় এভাবে আসেনি। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সিসহ মার্কিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় প্রভাব সৃষ্টি করেছে সাধারণ বাঙালির মনোজগতে, যা সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণায় এর আগে কম এসেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে বাঙালির থিয়েটার, সাহিত্যপত্রিকা, সাহিত্যচর্চা, বা সংস্কৃতির অন্যান্য শাখার বিভিন্ন বিষয়-নির্ভর ওয়ার্কশপও বাঙালির জীবনে কিছু অভিঘাত সৃষ্টি করেছে।
৫.
আহমাদ মাযহার এরপর সাংস্কৃতিক আরও দুয়েকটি সংগঠন কীভাবে প্রবাসে, বিশেষ করে, নিউ ইয়র্কে কাজ করে সে বিষয়ে আলোচনা করেন। এদের মধ্যে সন্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কুড়ি বছর পূর্তি নিয়ে লেখক কিছু পর্যবেক্ষণ জানান। যেমন আমাদের সমাজ বুর্জোয়া সমাজ হিশেবে গড়ে না ওঠার কারণে সংস্কৃতিচর্চার মাঝে এক ধরনের গ্রামীণতার ছোঁয়া থাকে। তিনি লেখেন, ‘বাঙালির সাহিত্যই হোক বা হোক পরিবেশকলা- সবকিছুরই মূলে রয়েছে গ্রামীণ জীবনযাত্রার ধরন। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা এই উৎস থেকেই উৎসারিত। বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীরাও এরই উত্তরাধিকার বহন করে চলছেন। একথাও মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, আধুনিক বাঙালি রাজনীতিকেরাও তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করেছেন সংস্কৃতির এই উৎসমূল থেকেই।’ লেখকের এই পর্যবেক্ষণ একজন সমাজবিজ্ঞানীর। সামান্য এই কথাক’টি থেকেই আমাদের রাজনীতিকদের মনোজগৎ বোঝা অনেকটা সহজ। রাষ্ট্রচিন্তা বা তাঁদের সমাজচিন্তা এর আলোকে বিশ্লেষণ করা সহজতর। লেখক আরও বলেন যে চল্লিশের দশকে পাকিস্তান আন্দোলনের সময়ও লেখক সাহিত্যিকদের মনে প্রশ্ন উঠেছিল কেন রাষ্ট্রভাষা কী হবে তা নির্ধারণ করা জরুরি এবং কেন তা বাংলা হওয়াই জরুরি। এছাড়া তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে পাকিস্তান সৃষ্টির পরও একই চিত্র দেখা যায়। ষাটের দশকে পাকিস্তানী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদ যখন দানা বাঁধতে শুরু করে তখনও বাঙালি মধ্যবিত্ত মনে জাতীয়তার বোধ জাগিয়ে তুলেছিল বলে তিনি মনে করেন। সাহিত্যিক চোখ এই বিষয়গুলো ভাবেন নিশ্চয়, কিন্তু এগুলো মূলত সমাজবিজ্ঞানীর গবেষণার বিষয়।
আমেরিকায় বা ইউরোপের কোন কোন দেশে দেখা যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর শাখা খুলে অনেকে রাজনীতি করেন বা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালান। আইনের দিক থেকে এটা বেআইনি, কিন্তু তবুও বাঙালিরা করে। যেমন নিউ ইয়র্কে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কুড়ি বছর উদযাপন উপলক্ষে আহমাদ মাযহার তাঁর লেখায় কিছু মূল্যবান পর্যবেক্ষণ দেন। তিনি লেখেন, ‘বাংলাদেশের বাইরে বসবাস করে ভিন্ন রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশভাগী হওয়ার কী তাৎপর্য থাকতে পারে এমত প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলে হয়তো এখানকার মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশি জনসমাজের অংশগ্রহণের অগ্রাধিকারের পাশাপাশি বাংলাদেশিদের সাংস্কৃতিক সংগ্রামের গুরুত্ব অনুভূত হবে।’ এছাড়া মাযহার এই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বের বিষয়টি বোঝাতে গিয়ে জানান যে আধুনিক প্রযুক্তির অকল্পনীয় উন্নতির ফলে প্রবাসীদের জীবন যে সম্পূর্ণ বদলে গেছে একদিকে, অন্যদিকে নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে প্রতি মুহূর্তের যোগাযোগও সহজতর রূপ ধারণ করেছে। তাই ‘নিজের’ থেকে ‘নিজেকে’ বিচ্ছিন্ন করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাযহার লিখেছেন, ‘ উত্তর আমেরিকার সন্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে মনে হবে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাংস্কৃতিক যে উৎসকে ধারণ করে আমরা বাঁচব সেই প্রশ্নেই এখানে সাংস্কৃতিক জোটের কর্মধারা চলমান। আরও উপলব্ধির বিষয়, বাঙালির সাংস্কৃতিক সামর্থ্যেরই উচ্চায়ত রূপকে বহন করে চলে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট’, আমার বিবেচনায় এটি একটি মূল্যবান পর্যবেক্ষণ, কারণ এযাবৎ কাল বিভিন্ন শিল্পী সাহিত্যিকদের মধ্যে প্রবাসে সাংস্কৃতিক জোটের কর্মকাণ্ডকে অনেকেই সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখে থাকেন। এটাকে মাযহার ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার ও বিশ্লেষণের প্রয়াস নিয়েছেন।
সংস্কৃতির নানা বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে মাযহার আমেরিকার কবিতা পাঠের আসর বিষয়ে নিজের অধীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কিছু মন্তব্য জানিয়েছেন।
প্রবাসে রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বা দলীয় কর্মকাণ্ড বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ জানিয়ে আহমাদ মাযহার প্রবাসী বাঙালিদের মনোজগতের বা চিন্তাসূত্রের কিছু ছবি দিয়েছেন যা সমকালীন আধুনিক চিন্তাজগৎ থেকে কতোটা দূরে বা কেন দূরে অবস্থান করছে তার একটা নকশা এঁকেছেন, যেটি গুরুত্বপূর্ণ। এই একই বিষয়ে কয়েকজন একাডেমিক গবেষক সমাজবিজ্ঞানীও গবেষণা সন্দর্ভ লিখেছেন। তাঁদের চিন্তার সঙ্গে কেন মাযহারের চিন্তার বেশ পার্থক্য রয়েছে এবং কোথায় সেই পার্থক্য তা কিছুটা তুলনা করে বিশ্লেষণ করলে গবেষক হিশেবে মাযহারের দৃষ্টিকোণটা অনেক বেশি পরিষ্কার বোঝা সম্ভব। এই লেখাটা সীমিত পরিসরের, এখানে দীর্ঘ তুল্যমূল্য আলোচনা বেশ কঠিন, কিন্তু আমি দুয়েকটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে কিছুটা তুল্যমূল্য আলোচনার চেষ্টা করবো। কিন্তু তার আগে মাযহারের গ্রন্থটিতে প্রবাসে কবিতা চর্চা নিয়ে যে দীর্ঘ ও গভীর আলোচনা করেছেন তার গতিপ্রকৃতি এবং বৈশিষ্ট্য নিয়ে সামান্য আলোকপাত করা জরুরি মনে করি!
মার্কিন দেশে, বিশেষ করে নিউ ইয়র্কে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কবিতা বা শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতায় কী ভূমিকা পালন করে এবং তা চাক্ষুষ করার কারণে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তার আলোকেই লেখক কিছু মন্তব্য ও পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন। আহমাদ মাযহার নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সির বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গিয়েছেন এবং প্রাচ্যের সাংস্কৃতিক-শহরগুলোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এই অনুষ্ঠানগুলোর তফাৎ অনুধাবনে সক্ষম হয়েছেন। তিনি বুর্জোয়াসাংস্কৃতিক গুণাবলির মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলোর বর্ণনা বিস্তারিত করেন নি, কিন্তু সংক্ষেপে এর উজ্জ্বলতা জানিয়েছেন তাঁর লেখায়। একটি পুঁজিবাদী সমাজ কয়েক শতাব্দী পুঁজি ও সাংস্কৃতিকতার কর্ষণের ফলে কোন উচ্চতায় নিয়ে যায় তাদের শিল্পের মানকে এবং তাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা কী তা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এখানেই সংস্কৃতির অনুশলীন কেমন হয় এবং একজন সাহিত্য গবেষক সমাজবিজ্ঞানের একটি শাখার সৌন্দর্যবৃদ্ধির সুষমাকে গভীরভাবে অবলোকন করেছেন। মাযহার বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন নিউ ইয়র্ক শহরের ল্যান্ডমার্ক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘লিঙ্কন সেন্টারের’ কথা। কিছুটা ইঙ্গিতার্থে বা মেটাফরিকেলি এই প্রতিষ্ঠানটিকে চিহ্ন হিশেবে ব্যবহার করে লেখক সংস্কৃতির উন্নতিকল্পে বুর্জোয়াভারচুর কথাই বলেছেন। মাযহার লিখেছেন, ‘লিঙ্কন সেন্টার ১৬৩ একরের বিশাল এক অঙ্গন। নিয়মিত এখানে যাতায়াত না থাকলে এর ভেতরের বিচিত্র লক্ষ্যস্থলগুলো খুঁজে পাওয়াটাই একটা ঝকমারি। এত বড় একটা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন আকার ও প্রকারের মিলনায়তনের বিন্যাসের সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলাদেশ বা নেপাল-ভুটানের মতো দেশের আধুনিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সীমিত অভিজ্ঞতা আলোকে তুলনা করে ঠিকমতো অনুধাবন করা সম্ভব না। হয়তো সেকারণের সুবিন্যস্ত বিশাল অঙ্গনের এলিস টালি হলের ঠিকানা থাকা সত্ত্বেও আমাদের কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করতে হলো। বাইরে থেকে এই মিলনায়তনের জাঁকজমক তেমন চোখে পড়ে না, ফলে আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি আয়োজনের বড়ত্বকে!’ উদ্ধৃতিটি একটু বড় হল, কিন্তু আমার ধারনা এটা লেখক শুধু আক্ষরিক অর্থে বুর্জোয়া সংস্কৃতির সীমানাকে না বুঝিয়ে একটু রূপকার্থে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।
এখানে জানিয়েছেন মার্কিন কবিদের কবিতা শোনার স্মৃতি, বিশেষ করে বিপুল অর্থ দিয়ে টিকিট কিনে। কিন্তু লেখক কেন এই কবিতাপাঠ বিষয়ে অনুপুঙ্খ আলোচনা করেছেন, তার কিছু কারণ রয়েছে। যেমন এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ‘একাডেমী অফ আমেরিকান পোয়েটস’ বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান আয়োজিত অনুষ্ঠানের সম্পর্ক বা তুলনামূলক আলোচনাও করেছেন। এদের গুনগত মান সম্পর্কে বিস্তারিত অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করে মাযহার প্রবাসী বাঙালি কবিদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং কবিতাপাঠ বিষয়ে একটি ছবি নিজেই বুঝতে পারেন। এর সঙ্গে তুল্যমূল্য বিচার করা তখন তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় বাঙালি কবিদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে। বিচিত্র এসব প্রতিষ্ঠান বিষয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পর লেখকের স্বচ্ছ ধারনা ঝুলিতে আসে সার্বিক মার্কিন কবিদের, এমনকি একবারে বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের স্টুডেন্ট পোয়েটদের কাব্যকর্ম সম্পর্কেও, যা একেবারে ‘দি একাডেমী অফ আমেরিকান পোয়েটস’ আয়োজিত নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বা গ্রিনিচগ্রাম অনুষ্ঠানাদি অবধি। কবিতা, নাটক, মঞ্চনাটক, সাহিত্য পত্রিকা, সৌখিন শিল্পীদের গানের আসর থেকে যাবতীয় শিল্পকর্মের গভীর বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা স্থান পেয়েছে মাযহারের এই দীর্ঘ লেখাতে। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান দিক হল লেখক কোন উপাত্তই সেকেন্ডারি কোন সূত্র থেকে আহরণ করেন নি। সবটাই নিজস্ব অভিজ্ঞতা বা প্রায় এথনোগ্রাফিক মেথোডোলজির কাছাকাছি পদ্ধতিতে আহরিত। তাই এর মূল্য সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আহমাদ মাযহারের বইটির শেষ অধ্যায়টি হলো ‘সাহিত্য পত্রিকা ও শিল্পকলার চর্চা’। এই অধ্যায়টি ভীষণ শ্রমসাধ্য গবেষণার ফসল।
‘আমেরিকান বাঙালি মন’ বইটির গবেষণা ও প্রাপ্ত উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে আহমাদ মাযহার প্রবাসী, বিশেষ করে মার্কিন দেশে বাঙালিদের পেশা, জীবিকা, শিল্পকলার সকল শাখা ও সাহিত্য বিষয়ে এমন এক ধরনের বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেছেন যার ধমনীতে রয়েছে লেখকের গভীর মমতা-জড়ানো অভিব্যক্তি, কিন্তু জন্মভূমি থেকে এতো দূরে এসেও বাঙালি সমাজ তাদের উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত অনেক বৈশিষ্ট্যই হারায়নি। লেখাটার শুরুতে ডায়াপোরা জীবন বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের তাত্ত্বিক যে-লিটারেচারগুলোর কিছুটা আভাস দেয়া হয়েছে সেখানে স্টুয়ার্ড হলের তত্ত্বের আলোকণার বিচ্ছুরণ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। অনেক নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যই হারায় না বাঙালিরা, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাদের সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিকতায় নতুন অনেক কিছুরই সংযোজন ঘটে, যে বিষয়টাই ভিন্নভাবে বলার চেষ্টা করেছেন মাযহার। পাঠকের মুগ্ধ হওয়ার উপাদান রয়েছে তাঁর ভাষা ও বিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণের মাঝে। একটি জনগোষ্ঠীর জীবনের প্রায় সবগুলো দিক স্পর্শ করেছেন এই লেখক তাঁর গবেষণায়, শিল্প সাহিত্য অর্থনীতি, দিনানুদৈনিক সংগ্রামের অনুবিন্দুও সেখানে বাদ পড়েনি! সেকারণেই লেখকের গবেষণা ও বিশ্লেষণে ভিন্ন সৌন্দর্য প্রতিভাত!
৬.
প্রবাসী বাঙালিদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের লেখা গ্রন্থাদি রয়েছে। এগুলোকে মোটা দাগে দুটি ভাগ্যে ভাগ করা যায়। একটি ভাগে রয়েছে কোন কোন লেখকের স্মৃতিকথা বা পেশা বিষয়ে লেখা। দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে একাডেমিক গবেষণা-নির্ভর লেখা। স্মৃতিকথা বা নিজেদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যারা লিখেছেন তাদের বইয়ের উপাত্ত সংগ্রহের পদ্ধতিতে অনেক সময় ত্রুটি রয়েছে, সেদিক থেকে সমাজবিজ্ঞানীরা যারা এথনোগ্রাফিক লেখা লিখেছেন সেগুলোর গবেষণা অনেকটা বিজ্ঞানভিত্তিক। সেরকম বেশ কিছু বই বা গবেষণা সন্দর্ভ রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জহির আহমেদের উত্তর-পিএইচডি বা পোস্টডকটোরাল গবেষণার ফসল বিখ্যাত রাটলেজ প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত বই Little Bangladesh: Voices from America. এই বইটি ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাস করা বাঙালিদের জীবন নিয়ে লেখা। এটি একটি সম্পূর্ণ একাডেমিক পদ্ধতিতে লেখা বই-এর গবেষণা প্রকল্প। এতে ক্যালিফোর্নিয়ার কয়েকটি স্থানে এথনোগ্রাফিক গবেষণা চালানো হয়েছে এবং বিভিন্ন উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। যে-অধ্যায়গুলো বইতে বিন্যাস করা হয়েছে তাতে সার্বিকভাবে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে যে বাঙালিদের অভিবাসন রয়েছে তাদের সংস্কৃতি ও জীবন যাপন পদ্ধতি নিয়ে বিবরণ রয়েছে। এছাড়া লস এঞ্জেলেস ও যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর পশ্চিম তীরে যারা বাঙালি অভিবাসী তাদের জীবন ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়েই মূলত বিবরণ রয়েছে। এছাড়া আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিবিধ বাঙালি অভিবাসী সম্প্রদায়ের মাঝে যে পার্থক্য রয়েছে তাদের সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকা বা অন্যান্য দেশ থেকে আগত প্রবাসীদের সংস্কৃতি নিয়েও পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য জানানো হয়েছে। পশ্চিম তীর বা লস এঞ্জেলেসের বাঙালিদের জীবন ও জীবিকার বিশ্লেষণসহ রয়েছে নিউ ইয়র্ক ও আরও দুয়েকটি বৃহৎ শহরে বসতি স্থাপনকারী বাঙালিদের নিয়ে আলোচনা।
এছাড়া বইটিতে অধ্যাপক জহির আহমেদ একটি অধ্যায় লিখেছেন Movement Across Desh and Bidesh, এই অধ্যায়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রবাসে কেমন করে আত্মীয় স্বজনদের খুঁজে বের করা এবং তাদের সম্পদ বা ব্যবসার মাধ্যমে নিজেদের সম্পর্ক পুনস্থাপন হয় তা বর্ণনা করেন। এ অধ্যায়ে লেখক সমাজবিজ্ঞানী জেমস ক্লিফোর্ডের তত্ত্ব ব্যবহার করে প্রবাসীদের নিজেদের মধ্যেকার সম্পর্কের গুরুত্ব বিশ্লেষণ করেছেন। কর্মজীবনে যারা তরুণ অভিবাসী তারা বিদেশে কাটালেও প্রবীণ বা বৃদ্ধ বয়সে যে অনেকে দেশে ফিরে যায় অবসর জীবন যাপনের জন্য তার বিবিধ কারণও ব্যাখ্যা করেন।
অধ্যাপক জহির আহমেদের গ্রন্থটির আরেকটি মূল্যবান অধ্যায় Islam and Transnationalism. এটি বইয়ের শেষ অধ্যায়। এ শতাব্দীর গোড়া থেকে বা গত শতাব্দীর শেষ দিক থেকে ইসলাম বা মৌলবাদী সন্ত্রাসের বিস্তার কীভাবে ঘটেছে উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপে, বিশেষত মুসলিম প্রধান দেশগুলো থেকে তার বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেদিক থেকে এই বইটির সঙ্গে গুণগত দিক থেকে আহমাদ মাযহারের বইটি সম্পূর্ণ আলাদা। দুজনের গবেষণার পদ্ধতি ও উপাত্তও আলাদা। অধ্যাপক জহির আহমেদের বই পাঠ্যবইয়ের আদলে লেখা, তাই এতে খুব বেশি সৃজনী পর্যবেক্ষণ নেই বললেই চলে। যে উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে তাই কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। কিন্তু আহমেদ মাযহারের বইটি সৃষ্টিশীল সাহিত্যিকের চোখ দিয়ে অন্বেষণ ও অভিবাসী জীবন পর্যবেক্ষণ করে লেখা। এই জায়গায় তাঁদের পার্থক্য, তাছাড়া তাঁদের লেখার সৌন্দর্য, এমনকি ভাষাও সম্পূর্ণ আলাদা। মাযহারের ভাষা ভীষণ মননশীল লেখকের ভাষা!
৭.
‘আমেরিকান বাঙালি মন’ বিভিন্ন কারণে পাঠকের কাছে প্রশংসার দাবিদার। এর মধ্যে অন্যতম হলো সংস্কৃতি সমাজবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হওয়ার পরও একজন সাহিত্যিক-গবেষক তাঁর সৃষ্টিশীল দরদী মন নিয়ে প্রবাসী বাঙালিদের সংস্কৃতিকে দেখার চেষ্টা করেছেন এবং একেবারে অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর স্বরূপকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন।
বইটি পড়তে গিয়ে আমার একটি ক্ষুদ্র বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে, সেটি বইটির একটি ন্যূনতার দিক। সেটি হলো গত শতাব্দীর সত্তর দশকের শেষ দিক থেকে পুঁজিবাদের ধরন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পে বড় ছাপ রাখে এবং বিশ্ব জুড়ে অর্থনীতির ‘উন্নয়ন-প্রক্রিয়া’ বদলে যায়। পুঁজি জাতীয় বাজার থেকে আন্তর্জাতিক বাজারকে গ্রাস করে এবং দরিদ্র দেশগুলোর কম মূল্যের শ্রমিকদের ব্যবহার করে মুনাফার আয়তন অকল্পনীয় আকারে বৃদ্ধি করে। পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রবাসী বা ইমিগ্রেনটদের সংস্কৃতির বিরামহীন রূপান্তরের পেছনে পুঁজির গোলকায়নের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন। তবে এই গ্লবালাইজেশনের বা গোলকায়নের বিপরীতধর্মী তত্ত্ব রয়েছে একাডেমিক জগতে। অধিকাংশ তাত্ত্বিকরা মনে করেন পশ্চিমা দেশগুলো থেকে প্রাচ্যে ‘সংস্কৃতি’ রপ্তানি হয়েছে যেহেতু সেখানে পশ্চিমা পুঁজির বিনিয়োগ হয়েছে। কিন্তু বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী অর্জুন আপ্পাদুরাই তত্ত্ব দিয়েছেন যে এটা একমুখী নয়, বরং দ্বিমুখী। প্রাচ্যের শ্রমিকরাও প্রতীচ্যের পুঁজির মালিকদের, তাদের প্রযুক্তি, রাজনীতি, অর্থশাস্ত্র ও সর্বোপরি তাদের সংস্কৃতির ব্যাপক রূপান্তর ঘটিয়েছে। তাই আহমেদ মাযহার বাঙালির, বিশেষ করে আমেরিকান বাঙালিদের সংস্কৃতির রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে তাদের স্বদেশের পরিবার বা রেখে আসা পরিজনদের সংস্কৃতির কোন পরিবর্তন ঘটিয়েছে কিনা, বা ঘটালেও তার স্বরূপ কেমন সে বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করতে পারতেন।
সার্বিকভাবে বলতে গেলে ‘আমেরিকান বাঙালি মন’ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গবেষণা গ্রন্থ। এর সৃজন-সৌন্দর্য সত্যিই বিরল, তার মূল কারণ হয়তো এর প্রণেতা-গবেষকের সৃজনী-অন্বেষণী মন ও মননশীল তীব্র তীক্ষ্ণ ভাষার শক্তি যা ইতিহাস রচয়িতা ও সমাজবিজ্ঞানীদের মাঝে কম চোখে পড়ে!
আমেরিকান বাঙালি মন
অনন্যা প্রকাশনী
৩৮/২ বাংলা বাজার, ঢাকা
প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি, ২০২২
দাম : ৩০০.০০ টাকা