Published : 14 Apr 2026, 12:20 PM
আমাদের জীবনে এমনও বাংলা নববর্ষ আসবে, যখন আমাদের গলা চেপে ধরা হবে কিংবা হবে না, কিন্তু তারপরও এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হবে যেখানে আমাদের দমবন্ধের মতো একটা অনুভব থাকবে, আমাদের মনে হবে আমরা যা যা করতে চাই তা পারছি না, আমাদের ভেতর থেকেই ‘কেন যেন’ তা আসছে না। কেন যে আসছে না, কেন স্বতঃস্ফূর্ততা নাই, তা আমরা জানি এবং আঁচও করতে পারি, তারপরও আমরা বলব, ‘কেন যেন’ আসছে না। আর সেই ‘না আসাই’ আমাদের ভেতরে গুনগুন করে, বিড়বিড় করে বলতে থাকবে ‘আসুক আসুক’—আনন্দ আসুক, উৎসব আসুক, নববর্ষ আসুক, বৈশাখ আসুক। এই রকম এক দ্বিধাদীর্ণ বৈশাখী উৎসব, এমন এক অস্বস্তির নববর্ষ এবার এসেছে বোধহয়।
বাংলা নববর্ষ ও পহেলা বৈশাখে এবার একটা স্বস্তি আছে। এবার প্রকৃতি বেশ ফুরফুরে। চরম গরম নেই, আছে বাদলা দিনের স্নেহ। কোথাও আছে বৃষ্টির রিমঝিম। প্রকৃতির এই স্বস্তিই সব নয়, অস্বস্তি এবার অন্যখানে। এবার নববর্ষে একটা কাকতালীয় ব্যাঙ্গও আছে। মূল আয়োজনের নাম ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ না থাকলেও বৈশাখ ঠিকই মঙ্গলবারে হাজির।
শুরুতে যে অস্বস্তির কথা বলছিলাম, বাংলা নববর্ষ ঘিরে অস্বস্তির এই ডামাঢোল শুধু এবার নয়, চলছে বহু বছর ধরেই। ২০০১ সালে রমনা বটমূলে ছায়নটের বর্ষবরণের আয়োজনে জঙ্গিদের নৃশংস বোমা হামলায় ১০ জন নিহত এবং অনেকে আহত হয়েছিলেন। সেই মামলার বিচার শেষ হয়নি গত ২৫ বছরেও। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা অবিচার বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে।
বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ পরিসরে একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ (আধুনিকতাবাদী ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণার জন্মেরও আগে যার জন্ম) উৎসব নববর্ষকে বানচাল করে দেওয়ার জন্য প্রতিক্রিয়াশীল পক্ষগুলোর অতৎপরতা সাম্প্রতিক সময়ে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সূত্রে পৌঁছে গেছে একটা বিপজ্জনক মাত্রায়। জাতীয় মর্যাদায় অভিষিক্ত বাংলা নববর্ষের কেন্দ্রীয় আয়োজন মঙ্গল শোভাযাত্রা যখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে স্বীকৃত ও সনাক্ত হয়ে দেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করছে তখন প্রতিক্রিয়াশীল পক্ষগুলো উন্মত্ত হয়ে উঠেছে তাদের ধর্ম, বর্ণ ও ভেদ পরিচয়ের রাজনীতির হীন স্বার্থে সর্বজনীন এই গৌরবের মহিমা ও গরিমাকে ম্লান করে দেওয়ার জন্য। আবহমান বাংলার সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে ধারণ করে যে উৎসব হয়ে উঠেছে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততার সেটির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রতিক্রিয়াশীল পক্ষগুলো ক্রমাগত চিৎকার করে যাচ্ছে বৈচিত্র্য নির্মূলের মাধ্যমে একক ধারার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায়। তাদের অস্ত্র হলো ভয় দেখানো, তাদের অস্ত্র হলো হত্যা। যেন এক সাংস্কৃতিক গণহত্যার অভিযান চলছে চারদিকে।
তাদের এই আস্ফালনের চাপে এই সেদিনের তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকার জঘন্যতম সিদ্ধান্ত নেয়। তারা মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পাল্টে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ করে দেয়। ইউনেস্কোর ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ হয়ে আমার দেশের গৌরবের বিশ্বপরিচয় বিশ্বজনস্মৃতিতে যে চিহ্ন ও সংকেত হয়ে থাকে তাই হারিয়ে যায়। এই হারিয়ে যাওয়াটাই চেয়েছিল প্রতিক্রিয়াশীল পক্ষগুলো। শুধু আন্তর্জাতিক পরিসরে নয়, দেশের মানুষের স্মৃতি থেকে জাতীয় পরিচয়ের, জাতীয় ঐতিহ্য ও গৌরবের এই স্মৃতিচিহ্ন মুছে দেওয়ার জন্য তারা বিভিন্নভাবে সবসময় সচেষ্ট। সর্বশেষ সরকারও এসে তাদের সেই আকাঙ্ক্ষাকেই জোরদার করেছে ভিন্নভাবে। তারা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’য় বদলে দিয়েছে। যদিও মঙ্গল ‘শোভাযাত্রা’কে ‘আনন্দ’ কিংবা ‘বৈশাখী’ শোভাযাত্রায় বদলে দিলেও সেটির গা থেকে হিন্দুয়ানি গন্ধ ঘোচে না। যে যুক্তিতে এসব করা হচ্ছে তা নিতান্তই বেকুবের যুক্তি। ‘মঙ্গল’ শব্দটি নাকি হিন্দুয়ানি। ‘মঙ্গল’ যদি হিন্দুয়ানি হয়, তবে তো ‘আনন্দ’ এবং ‘বৈশাখ’ও হিন্দুয়ানি। বিশাখা নক্ষত্রের নাম থেকেই তো এসেছে ‘বৈশাখ’, অর্থাৎ সেই ইন্দ্র, সেই অগ্নি, সেই বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্র।
হিন্দুয়ানি বলে খারিজ করতে চাইলে নিজের পরিচয় ও ভাষার প্রায় ১৬ আনাই তো খারিজ হয়ে যায়। এই সরল সত্য যে নববর্ষ ও বৈশাখের আয়োজনের বিরোধিরা বোঝে না তা নয়। তারা বোঝে বলেই তা করতে চায়। অথচ, গুটিকয় বহিরাগত বাদে চারশ বছর আগেও তাদের পরিচয় তারা হিন্দু, তারা বৌদ্ধ এবং তারা এখানকার আদিবাসী।
বাঙালের এই এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট। সারা বিশ্বেই আত্মপরিচয় হারিয়ে নতুন পরিচয়ে পরিচিত হওয়াদের মধ্যে কমবেশি এই সংকট দেখা যায়। তারা যখন স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় নতুন পরিচয় গ্রহণ করে তখন পুরনো পরিচয় মুছে ফেলার জন্য তারা মরিয়া হয়ে ওঠে। তাদের এই মরিয়াভাব অসুস্থতার পর্যায়ে পৌঁছে। তারা পরিচয় মুছতে গিয়ে নিজের গা থেকে ঘষে ঘষে পুরনো চামড়াও খসিয়ে ফেলতে চায়। বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে নওমুসিলম কিংবা নওখ্রিস্টানদের দিকে তাকালে। তারা আরবের মুসলিমদের চেয়ে বেশি মুসলিম এবং আদি খ্রিস্টানদের চেয়েও মারাত্মক খ্রিস্টান হয়ে উঠতে চায়।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা আত্মপরিচয়ের এই মনস্তাত্ত্বিক সংকট সম্পর্কে সচেতন ছিলেন বলেই তারা এমন এক জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তাদের কলোনিগুলোয় যারা হবে ব্রিটিশদের চেয়েও ব্রিটিশ এবং ব্রিটিশ শাসকদের স্বার্থ রক্ষায় জীবন দিতেও প্রস্তুত। যে কারণে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ, রাজনীতিবিদ ও কবি লর্ড মেকলে ১৮৩৫ সালে এমন শিক্ষানীতি দিয়েছিলেন যাতে ভারতীয়দের ‘রক্তে ও বর্ণে ভারতীয় হলেও রুচি, মতামত, নৈতিকতা ও বুদ্ধিতে ইংরেজ’ হিসেবে পাওয়া যায়। এই সংকটে হাত দিয়েই হালের ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক হোমি কে. ভাবা বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করে আরো দূর নিয়ে গিয়েছেন? ভারতীয়-আমেরিকান এই তাত্ত্বিক দেখতে পেয়েছেন, মেকলের এই ‘বাবু কালচারে’র কলোনিপুত্ররা ‘মোটের ওপর এক, কিন্তু পুরোপুরি এক নয়’। তারা একটা কার্টুন বা ব্যাঙ্গ—ভাবার ভাষায়—‘মিমিক্রি’। এই ‘মিমিক্রি’র দল একসময় বুঝতে পারে যে তারা আসল নয়, আসল হতে পারবেও না কোনোদিন, তখন তাদের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয়, ধীরে ধীরে তা একটা প্রতিরোধে রূপ নেয়। শুধু কি তাদেরই অস্বস্তি থাকে? না, নকলকে দেখে আসলেরও একটা অস্বস্তি তৈরি হয়, আসল ময়ূরও তার পুচ্ছধারী কাককে দেখে, কাকের আচরণে বিরক্ত হয় এবং তাকে পরিত্যাগ, ঘৃণা ও প্রতিরোধ করার বোধ তৈরি হয়। পশ্চিমা উপনিবেশগুলোতে সেই অস্বস্তি ও প্রতিরোধের ফলাফল আমরা দেখেছি, কিন্তু ধর্মীয় উপনিবেশগুলোতে সেই ফলাফল দেখিনি, কারণ, ধর্মীয় বাতাবরণ এবং পরোক্ষ শাসন। পরোক্ষ শাসন এই অর্থে যে, শাসক ও শাসনব্যবস্থা অনুপস্থিত, কিন্তু তা পরোক্ষভাবে চলমান।
নববর্ষ ও পহেলা বৈশাখ নিয়ে যত সমস্যা বাংলায়, ইসলামি সংস্কৃতির কারণে নওরোজ উদযাপন নিয়ে তত সমস্যা কিন্তু ইরানেও নেই। পহেলা বৈশাখের মতোই একই সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশকিছু জাতি ও জনগোষ্ঠী একই ধরনের উৎসবে মাতে। মিয়ামনার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো এই সময়ে একই ধরনের উৎসব হয়ে থাকে। পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু, কেরালা, আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরামসহ বিভিন্ন অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন নামে এই ধরনের এই উৎসব চলে। আমাদের পার্বত্য জেলাগুলোর আদিবাসীদের মধ্যে তো আছেই। থিঙইয়ান (মিয়ানমার), সংক্রান (থাইল্যান্ড), পি মাই (লাওস), খেমার (কম্বোডিয়া), বৈশাখী (পাঞ্জাবি), পুথানডু (তামিল), বিষু (কেরালা), বিহু (আসাম), গারিয়া (ত্রিপুরা), সাজিবু (মণিপুর), চাপচার কুট (মিজো), বিজু (চাকমা), সাংগ্রাই (মারমা), বৈসাবি (ত্রিপুরা)—এসব যেন আমাদেরই আশেপাশের সমজাতীয় সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অভিন্ন উৎসবের নাম। এসব উৎসব ও সংস্কৃতির দিকে তাকালেই বোঝা যায়, বাংলা নববর্ষের জন্য মুঘল আমলে ফসলি সনের আকবরি ব্যাপার না থাকলেও বাংলা নববর্ষ ও বৈশাখের কিছু যেত আসত না। বাঙালি জাগলে বৈশাখ জাগতই। বরং বাঙালির মধ্যে কিংবা এই অঞ্চলের মানুষের এই সময়ে বর্ষশুরুর প্রবণতা, চর্চা ও সংস্কৃতি ছিল বলেই মুঘল বাদশা ও নবাবরা তা গ্রহণ করে একটা দাপ্তরিক ফয়সালায় এসেছিলেন। এখন এসে আমরা বাংলার নববর্ষ ও বৈশাখের জন্য মুঘল বাদশাহদের কৃতিত্ব দিলে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর নববর্ষের উৎসবের জন্য কাদের কৃতিত্ব দেব?
বৈশাখ আমাদের বংশগতিবাহিত যৌথস্মৃতির উৎসব। শত শত বছরের সচেতন, অচেতন, অবচেতন স্মৃতি ও চিহ্নের ধারায় এই উৎসবের রঙ ও রক্ত বয়ে চলেছে এই জনপদের মানুষের শিরায় শিরায়। কোনো রাষ্ট্রীয় আয়োজন থাকুক বা না থাকুক তাতে কিছু যায় আসে না। কারো বিরোধিতায় সেই উৎসব হারিয়ে যাওয়ার দিন ছিল সেই কাল যখন মানুষকে তার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জন্য নির্ভর করতে হতো মৌখিকতা ও লৌকতার ওপর। মুখে মুখে নানা কথা ও কাহিনিতে স্মৃতি বয়ে নেওয়া এবং সংরক্ষণ ছাড়া তখন আর উপায় ছিল না। সংরক্ষণের এই বাড়বাড়ন্তের যুগে, এই ডিজিটাল ডকুমেন্টেশনের যুগে এসে আমাদের সেই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মৃতি, সেই সংস্কৃতির উত্তরাধিকার মুছে দেবে সেই সাধ্য কার? বরং যত বিরোধিতা হবে, যত ভয় ও বাধা আসবে ততই সহজাত স্বভাবে মানুষ আঁকড়ে ধরবে তার অন্তর্গত বোধকে, সাড়া দেবে তার আত্মার আর্তিতে, আঁকড়ে ধরবে বাংলা নববর্ষ ও পহেলা বৈশাখকে। যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেবে না, সে মরমে মরবে এক অন্তর্গত বিরোধে, অন্তর্গত এক অসুখে, অন্তর্গত এক পীড়নে।