২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮ কার্তিক ১৪৩৩

প্রকাশ বিশ্বাসের অণুগল্প: চক্ষুদান

কিন্তু তার ভিতরের যে বালকটি একা একা আমের চালা হিজল আর গাবের সারি পার হয়ে পুজামণ্ডপে যেত, সে আজও ফেরে নাই। হয়তো সে এখনো দাঁড়িয়ে আছে প্রতিমার সামনে, মহালয়ার সেই আবছা আলোয়। দেবীর চোখ আঁকা শেষ হওয়ার অপেক্ষায়।

প্রকাশ বিশ্বাস প্রকাশ বিশ্বাস

Published : 23 Oct 2026, 11:49 AM

Updated : 23 Oct 2026, 11:49 AM

দেবীর সেই চক্ষুদান বছর ঘুরে একবার ফিরে আসে। কাশফুলও একবার করে ফোটে—পৃথিবীর বুকে শরতের নীরব পদধ্বনি মেখে। বড়দি দুই ভাগ্নের হাত ধরে ক্ষ্যাতের আইলপথ ধরে গাংডুবি থেকে জোকা আসতে থাকে। আর বিকাশ গ্রামের প্রান্তের তাল গাছের বাদাড়ের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের অপেক্ষায় থাকে। গ্রামে মহাসড়কের পাশে ডাক্তার বাড়ির দুর্গা পুজার ষষ্ঠী লগ্নের ঢাক বেজে উঠে। আশ্বিনের নীল আকাশের নিচে সকালের সাদা আলোয় কাশবনের ধারে ঢাকের শব্দে পা দুলে উঠে বিকাশের। কাশফুল দেখে বড় ভাগ্নে বলতো, “ঐ ভাইসা যায় রবীন্দ্রনাথের দাড়ি।”

ষষ্ঠীর আগে মহালয়া আসতো। ভোরে রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলায় মহিষাসুরমর্দিনী শোনার জন্য সতীশদা, পরেশদা আসতেন বিকাশদের কাচারিঘরে।

জগৎ-সংসারে সেই ভাগনেরা ছাড়া সবাই আজ মহাকালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, স্মৃতির রংও হয়েছে ধূসর, বর্ণহীন। তবু সেই বালকটি কি আজও বেঁচে নেই স্মৃতির সেই ঘরবাড়িতে, ফেলে আসা শৈশবের উঠোনে?

এখনো আমের ঐ চালার নতুন গছে আম ধরে, নতুন তালগাছের মাথায় রোদ পড়ে, সুপারির সারি বর্ষায় কালো হয়, শীতের কুয়াশায় আবার ঝাপসা হয়ে যায়। পুজামণ্ডপের টিনের চাল বদলায়, প্রতিমার মুখ বদলায়, ঢাকির দল বদলায়। শুধু মহালয়ার সেই ভোরটা বিকাশের ভিতরে একই রকম রয়ে যায়। বহু বছর পরে, জীবনের কত আলো অন্ধকারের পথ পার হয়ে আসে, হয়তো তখন সে আবার তাদের গ্রামের কোনো এক পুরোনো পুকুর পাড় বসে থাকবে, তখনো হয়তো তার মনে পড়বে সেই বালকটির কথা—আমের চালা, হিজল তাল-সুপারির সারি পার হয়ে যে একা একা দেবীর চোখ দেখতে যেত। তখন বিকাশ বুঝতে পারবে, সে আসলে দেবীর চোখ দেখতে যেত না। সে খুঁজতে যেত এমন কাউকে, যিনি তার দিকে তাকাবেন—কোনো প্রশ্ন করবে না, কোনো উত্তর চাইবে না, শুধু বুঝবে। কারণ গ্রামের সেই নিঃসঙ্গ বালকটির জীবনে মানুষের অভাব ছিল না; অভাব ছিল এমন এক জোড়া চোখের, যে চোখের সামনে নিজের সমস্ত নীরবতা নিয়ে দাঁড়ানো যায় সেই গোপন কিছুটা জানা আর কিছুটা অজানা প্রকৃতি বা মহাকালিক অনুভূতির সামনে।

বালকটি এ সবের ব্যাখ্যা শুনতে পেতা তার যোগেশ দাদুর কাছে। সেই হ্যাজাক বাতির আলোয় মৃন্ময়ী, নিস্তব্ধ, অপেক্ষমাণ সেই দুর্গা দেবীর চ্ক্ষুদানের স্মৃতি আজ বিকাশকে কাঁদায়। এটা কি সে বালকবেলায়ই জানতো যে দেবীর চক্ষুদান আসলে জ্ঞানদান? এটা কি জানতো যে, তাঁর তৃতীয় নয়ন কী মনে করিয়ে দেয়—জগতের যা কিছু দৃশ্যমান, তার বাইরেও সত্যের একটি বিস্তৃত ভূমি রয়েছে? সেখানে পৌঁছতে হলে শুধু চোখের আলো যথেষ্ট নয়; চাই বিবেকের আলো, জ্ঞানের আলো, অন্তরের ঔজ্জ্বল্য?

আজও বিকাশের মনে হয়, মহালয়ার ভোরে মাটির মুখে যে দৃষ্টি জেগে উঠত, তার ভিতরে কোথাও একটা রহস্য ছিল। শিল্পীর তুলি কি কেবল রং ছুঁইয়েছিল, না কি কোনো অদৃশ্য জগৎ থেকে সামান্য আলো ধার করে আনছিল? সে জানে না। শুধু জানে, সেই চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা বালকটি একদিন বড় হয়ে গেছে। কিন্তু তার ভিতরের যে বালকটি একা একা আমের চালা হিজল আর গাবের সারি পার হয়ে পুজামণ্ডপে যেত, সে আজও ফেরে নাই। হয়তো সে এখনো দাঁড়িয়ে আছে প্রতিমার সামনে, মহালয়ার সেই আবছা আলোয়। দেবীর চোখ আঁকা শেষ হওয়ার অপেক্ষায়।