Published : 17 Jul 2016, 03:10 PM

"ডাকে পাখি খোল আঁখি
দেখ সোনালী আকাশ/ বহে ভোরের বাতাস"…
এই অসাধারণ গানের শিল্পীর নাম সবাই জানলেও সিংহ ভাগ মানুষ জানেন না রচয়িতার নাম, নজরুল ইসলাম বাবু। একটি স্নিগ্ধ, শান্ত, শীতল, কোমল, মিষ্টি সকালের আমেজে ভোরের গানের আড়ালে হারিয়ে গেছে গানের জনক। শুধু এই গানের ক্ষেত্রেই নয়; অধিকাংশ গানের ক্ষেত্রেই এই ঘটনা ঘটছে।
কবিদের যেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয় এবং মূল্যায়ন করা হয়, গীতিকবিদের ক্ষেত্রে তা হয়না। তাই আমাদের অনেকেই গান লেখায় উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। এখন গান লেখা সহজ এবং লিখে সন্মানীও মেলে। কিন্তু এক সময় রেডিও-টিভিতে গান লেখার জন্য তালিকাভুক্ত হওয়া ছিল বাঞ্চনীয়। তাই গীতিকার হতে হলে বাধ্যতামূলক পঁচিশটি গান জমা দিয়ে বোর্ড কর্তৃক অনুমোদনের পর 'ওয়ার্সি' জুটতো। আর বেতারে এ বি সি গ্রেডের গীতিকারদের সন্মানি দেয়া হতো প্রতি গান যতবার বাজবে; তত বার এক, দুই, তিন টাকা করে।
বাবু শুধু গীতিকবিই নন; বীর মুক্তিযোদ্ধাও
বৈরী পরিস্থিতির ভেতরও আশির দশকে আমাদের বেশ কয়েক জন বন্ধু গান নিয়ে মেতে ছিলেন। তাঁরা নানাভাবে গানের ভুবনকে স্বচ্ছল করেছেন, সমৃদ্ধ করেছেন এবং নিজেরাও গীতিকার হিসেবে যথেষ্ট সন্মান ও স্বীকৃতি অর্জন করেন। তারা হলেন- মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান, মুন্সী ওয়াদুদ, মাহফুজুর রহমান মাহফুজ, নুরুজ্জামান শেখ, নজরুল ইসলাম বাবু প্রমুখ।
যে গান দিয়ে এই লেখাটি সূচনা করেছি, সেই গানের গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু। বাবু শুধু গীতিকবিই নন; একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাও। একাত্তরে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। ১৯৭০ সালে তৎকালীন সরকার আশেক মাহমুদ কলেজের ছাত্রনেতা হিসেবে তাঁর উপর গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করলে তিনি আত্মগোপন করে চলে যান ভারতে। ট্রেনিং শেষে দেশে ফিরে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীন হলে তিনি আবার লেখাপড়া, সাহিত্য ও সংগীত চর্চা শুরু করেন।
১৯৭৩ সালে আশেক মাহমুদ কলেজ থেকে বিএসসিতে ডিগ্রী লাভ করেন এবং সেই বছরেই তিনি রেডিও বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে গীতিকার হিসাবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৭৮ সালে সুরকার শেখ সাদী খানের সাথে তিনি প্রথম চলচ্চিত্রে গান লিখতে শুরু করেন। আঁখি মিলন, দুই পয়সার আলতা, মহানায়ক, প্রতিরোধ, উসিলা, পদ্মা মেঘনা যমুনা, প্রেমের প্রতিদান-এর মতো দারুণ সব চলচ্চিত্রের দারুণ দারুণ গান রচনা করেছেন বাবু। ১৯৯১ সালে 'পদ্মা-মেঘনা-যমুনা' চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসাবে জাতীয় চলচ্চিত্র ও বাংলাদেশ প্রযোজক সমিতির পুরষ্কারে পুরষ্কৃত হন।
১৯৮৬ সালে যৌথ প্রযোজনায় সমষ্টি চলচ্চিত্রের ব্যানারে একটি চলচ্চিত্র তৈরিতে হাত দেন। তিনি এ ছবির চিত্রনাট্য, সংলাপ ও গান রচনা করেছেন। নিজের প্রতি যত্ন না করে হঠাৎ ১৯৯০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৪৯ সালের ১৭ জুলাই জামালপুরের মাদারগঞ্জের চরনগর, নানাবাড়িতে। কিন্তু তাঁর পৈত্রিক নিবাস অর্থাৎ বাবা বজলুল কাদের আর মা রেজিয়া বেগম, ঠিকানা হেমাড়াবাড়ি গ্রামে। ১৯৮৪ সালের ২৩ নভেম্বর তিনি শাহীন আক্তারকে বিয়ে করেন। তাঁদের দু'টি কন্যা নাজিয়া ও নাফিয়া। এই হচ্ছে বাবুর সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত। (তথ্যসূত্রঃ হারিয়ে যাওয়া মেধাবী গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু/ ফজলে এলাহী)
আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন তিনি
নজরুল ইসলাম বাবুর গানের সংখ্যা দুই শতাধিকও নয়; মাত্র দেশের গান ১১৩, আধুনিক গান ৫২ এবং ধর্মীয় গান ৯টি। এই তালিকার বাইরে হয়তো আরো দু'চারটি গান রয়েছে। যেমন, আমার কাছে আছে তাঁর লেখা দু'টি গান। জানিনা, সে গান দু'টির সুর এবং গীত হয়েছে কিনা।
বাবু ভাইয়ের 'প্যাট্রিয়ট প্রিন্টার্স' নামে একটা প্রেস ছিলো ১০৮ মৌচাক-মালিবাগ রেলগেটে। সেখানে ছিলো আমাদের আড্ডা এবং লিটল ম্যাগের মুদ্রণ। সেই প্যাট্রিয়ট থেকে আমি লিটল ম্যাগ 'প্রচ্ছদ' বের করতাম, কম পয়সায়; তা-ও আংশিক বাকীতে। বিটিভিতে কিংবা খিলগাঁও খালার বাসায় যাবার পথে 'মুড়ির টিন' থেকে মৌচাক রেলগেটে নেমে যেতাম একটু 'মধু'র জন্য; অর্থাৎ বাবু ভাইয়ের সাথে আড্ডা মারার জন্য।
ঢাকায় আসার পর আমরা জামালপুরের লেখকেরা খন্দকার আশরাফ হোসেন, শাহ খায়রুল বাশার, মাহবুব বারী, হামিদুল ইসলাম, আহমদ আজিজ প্রমুখ বাবু ভাইকে কেন্দ্র করে একত্রিত হয়ে আড্ডা দিতাম। সেই আড্ডা আমার মিরপুর বাসা পর্যন্ত গড়িয়েছিলো। একবার আমি, খন্দকার আশরাফ হোসেন এবং বাবু ভাই আমরা মিলে 'ব্রহ্মপুত্র' নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা বের করার সিদ্ধান্ত নিই। তার জন্য আশরাফ ভাই আর বাবু ভাইয়ের জন্য আমার মিরপুরস্থ বাসায় খিচুরি আয়োজন করা হয়। সেদিন দুপুরে আমাদের আড্ডালোচনার পর আশরাফ ভাই চলে এলেও বাবু ভাই ছিলেন সন্ধ্যা পর্যন্ত এবং আমার ডাইরিতে দু'টি গান লিখেন, যা এখনো আমার সংগ্রহে আছে। সেদিন গান নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছিলো। সুজ্যয় (শ্যাম) দা তখন আমার একটা গান ভোরের গান কমার্শিয়াল সার্ভিসে রেকর্ড করেছিলেন, 'নিশি রাতে এসেছিলে/ স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে'…। তা শুনে বাবু ভাই বলেছিলেন, 'কবিদের গানে অনেক বেশি কাব্যিকতা থাকে। আপনাদের আরো বেশি করে লেখা উচিৎ'।
সেই সময় কবি জাহিদুল হক, নাসির আহমেদ, আবিদ আনোয়ার, আমরা গান লেখায় কিছু দিনের জন্য মন দিয়েছিলাম। পরে প্রায় সবাই থেমে গেছেন।
৭১ বিসিসি রোডে থাকার সময় আমি আর ফরিদ কবির 'ছোটকাগজ' নামে একটি ভাজকরা সাহিত্য সংবাদের বুলেটিন বের করেছিলাম। প্রথম সংখ্যায় বাবু ভাইয়ের মিনি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিলো। দুঃখের বিষয়, সেই সংখ্যাটি কোথাও খুঁজে পেলাম না। শাহীন ভাবীর কাছে একটি কপি ছিলো, তিনিও তা খুঁজে পাচ্ছেন না। এ ভাবেই বাবু ভাই আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন, ম্লান হয়ে যাচ্ছেন।
বাবু ভাইয়ের সাথে সেই সময়ের স্মৃতির শেষ নেই। তাঁর মৃত্যু পর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে আমরা কবর দেয়ার জন্য তৎকালীন মেয়র আবুল হাসনাতের কাছে দৌড়াদৌড়ি করি। অনেক ঝামেলা জটিলতার পর এরশাদ শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে দাফনের অনুমতি দেয়। এখন সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত নজরুর ইসলাম বাবু।
তিনি নেই, আছে তাঁর হৃদয়ছোঁয়া গান, আছে তাঁর নামানুসারে একটি স্কুল এবং একটি স্মৃতি পুরষ্কার। তবে, সেই 'নজরুল ইসলাম বাবু উচ্চ বিদ্যালয়টি'তে চলছে চরম দৈন্যদশা। বাবুর নিজ গ্রাম জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার আদারভিটা গ্রামের পার্শ্ববর্তী পোড়াবাড়ি গ্রামে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়টি। বাবুর ভাগ্নে বর্তমান বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম ১৯৯৬ সালে নিজ উদ্যোগে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কর্তৃপক্ষের অবহেলার শিকার হয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
অপর দিকে 'গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু সম্মাননা পদক'টি আর নিয়মিত চালু নেই। কথাসাহিত্যিক ও ব্যাংক কর্মকর্তা আতা সরকার সাহিত্যে অবদানের জন্য প্রয়াত গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু সম্মাননা পদক লাভ করেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবুর ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক স্মরণসভায় ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা এ পদক প্রদান করেন। পরবর্তীকালে আর সেই সম্মাননা পদকের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে দীর্ঘ দিন ধরে। কিন্তু তার গতি খুবই মন্থর। তবে এবার আশার আলো দেখিয়েছেন, মাদারগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং কবি ওবায়দুর বেলাল। এই হচ্ছে, নজরুল ইসলাম বাবুর মরণোত্তর চিত্র।
গানে গানে শ্রোতাদের মন ছুঁয়েছেন
আমাদের দেশাত্বকবোধ গান পৃথিবীর সেরা গান। এতো বহুমাত্রিক দেশের গান আর কোথাও নেই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের গানগুলো পর্যালোচনা করলে তার যথার্থ দৃষ্টান্ত মেলে।
নজরুল ইসলাম বাবু যেহেতু নিজে মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন, সেই মমত্ববোধের ছাপ পাওয়া যায় তার গানে গানে। যেমনঃ সবকটা জানালা খুলে দাওনা/ আমি গাইবো বিজয়ের গান, একটি বাংলাদেশ / তুমি জাগ্রত জনতার, আমায় গেঁথে দাও না মাগো/ একটা পলাশ ফুলের মালা, ও আমার আট কোটি ফুল রেখো গো মালি প্রভৃতি বাণীপ্রধান গানগুলো সুরে এবং কন্ঠ মিলিয়ে ত্রিমাত্রিক ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ। আবদুল আহাদ, সমর দাস, খোন্দকার নূরুল আলম, শেখ সাদী খানের মত দেশের সেরা সুরকার আর রুনা-সাবিনা-সুবীর-হাদী, হৈমন্তী-মিতালীদের মতো সেরা-সেরা শিল্পীরা তাঁর গানকে অলঙ্কৃত এবং আলোকিত করেছেন।
তৎকালীন বাংলাদেশ টেলিভিশনের বাংলা ও ইংরেজি সংবাদের আগে আবহ সঙ্গীত হিসেবে সংবাদের টাইটেলে প্রচার করা হতো কখনও সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে আবার কখনও শুধু বাদ্যযন্ত্রে। তার নেপথ্যের মানুষটি ছিলেন নজরুল ইসলাম বাবু।
আবার আধুনিক গানেও তিনি শ্রোতাদের মন ছুঁয়েছেন দারুণভাবে। এখনো তাঁর গানগুলো জনপ্রিয়তার শীর্ষে। কয়েকটি গানের চরণ উল্লেখ করছি-
* দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা বন্ধু চিরকাল/ রেললাইন বহে সমান্তরাল,
*কথা বলবো না/ বলেছি, শোনবো না শুনেছি/ মনে মনে চুপি চুপি তোমারে ভালোবাসেছি,
*কাল সারারাত ছিল স্বপ্নের রাত, স্মৃতির আকাশে বহুদিন পর মেঘ ভেঙ্গে উঠেছিল পূর্ণিমার চাঁদ,
*কাঠ পুড়লে কয়লা হয় আর কয়লা পুড়লে ছাই/ আমি পুড়ে শেষ হইলাম আবশিষ্ট নাই,
*পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই/ হাজার মনের কাছে,
* সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী, সুখে থাকো হয়ে কারো ঘরণী,
*আমার গরুর গাড়িতে/ বউ সাজিয়ে,
* আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়, তবু কেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়,
*এই অন্তরে তুমি ছাড়া নেই কারো,
*কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো, সে কথা তুমি যদি জানতে/এই হৃদয় চিরে এ যদি…
*আমার মনের আকাশে আজ জ্বলে শুকতারা/তোমার প্রেমের আবেশে আজ হৃদয় দিশেহারা,
*ডাকে পাখি খোলো আঁখি…
কিন্তু তিনি আর কখনোই প্রিয় পাখির ডাকে খুলবেন না আঁখি, দেখবেন না স্বাধীনতার সোনালী আকাশ, প্রাণ ভরে নিবেন না ভোরের বাতাস।…
দুঃখের বিষয়, আমরা এই মানুষটির যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারিনি। না মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, না গীতিকবি হিসেবে। অথচ তাঁর অবদানে দেশ ও জাতী নানাভাবে ঋণী।
১৭ জুলাই নজরুল ইসলাম বাবুর জন্মদিন। তাঁকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।