Published : 12 Dec 2025, 02:05 PM
এলিফ শাফাক বর্তমান সময়ের অনেক জনপ্রিয় একজন কথাসাহিত্যিক। ‘দ্য ফোরটি রুলস অব লাভ’ উপন্যাসটি তাকে এনে দেয় তুমুল পাঠকপ্রিয়তা। এটি একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস যা ২০০৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি মূলত দুটি সময়রেখায় লেখা। একটি হল ত্রয়োদশ শতাব্দী যেখানে এলিফ শাফাক মাওলানা জালাল-উদ্-দীন-রুমী ও শামস-ই-তাবরিযীর আধ্যাত্নিক সাহচর্যের কথা তোলেন যা পরবর্তীতে রুমীকে কবিতা লেখার অনুপ্রেরনা দিয়েছিল। দ্বিতীয় সময়রেখাটি হল একবিংশ শতাব্দী যেখানে আমরা বস্টনে নিজের স্বামী ও তিন সন্তানদের নিয়ে বসবাসরত এলা রুবিনস্টেইন নামক একজন মধ্যবয়স্ক নারীর কথা জানতে পারি।
প্রায় ৫ বছর আগে আমি ‘দ্য ফোরটি রুলস অব লাভ’ বইটি প্রথমবারের মত পড়েছিলাম। সেই সংস্করণটি আমার কাছে এখনও আছে। বই খুললেই হলুদ হাইলাটারের রঙে দাগানো কিছু লাইন দেখতে পাই। বিশেষ করে ভালোবাসার সেই চল্লিশটি নিয়ম। প্রথমবার যখন নামটা শুনেছিলাম, অদ্ভুত লেগেছিল খুব। তখনও রুমীকে জানতাম না। শামস-ই-তাবরিযীকেও না। বইটা পড়ে ভালো লেগেছিল। কিন্তু যতটা বোঝা দরকার ছিল ততটা বোধহয় বুঝিনি।
খুব প্রচলিত একটা উদ্ধৃতি আছে যে—“Re-read your favorite books at different stages of your life. The plot never changes but your perspective does.” কথাটির মানে দাড়ায়—‘’জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নিজের প্রিয় বইগুলো পুনরায় পড়ুন। বইয়ের কাহিনি ঠিকই থাকে, বদলে যায় আপনার দৃষ্টিকোণ’’। এ কথাটি আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি। এমনকি নিজেকে বোঝার জন্য হলেও, প্রিয় বইগুলো আবারও পড়া দরকার। নিজেকে অনেকটাই নতুন রূপে খুঁজে পাওয়া যায়।
‘দ্য ফোরটি রুলস অব লাভ’ বইটি আবারও পড়লাম। এবং এই উদ্ধৃতিটি আরোও ভালোভাবে বুঝতে পারলাম। আমার মনে আছে প্রথমবার যখন বইটি পড়েছিলাম তখন রুমি ও শামসের অধ্যায় গুলোর চেয়েও এলার অধ্যায়গুলোতে বেশি মনোনিবেশ করেছিলাম। প্রথম কারণ রুমি বিষয়ে জানাশোনা একদমই ছিলনা। দ্বিতীয়ত, রুমি ও শামসের অধ্যায়গুলোর গভীরতা কতটুকু বুঝতে পারছিলাম—এটাও একটা বিষয় ছিল।
কিন্তু দ্বিতীয়বার যখন পড়লাম, তখন অনেককিছুই পালটে গেল। এরমধ্যে রুমি ও শামস নিয়ে যে খুব বেশি জেনে ফেলেছি তা নয়, বলতে গেলে এখনও কিছুই জানি না। তবে সেই আগের পড়া ও পরবর্তীতে আমার পড়া রুমির কবিতাগুলো থেকে সামান্য যে জানাশোনা তা নিয়ে ‘দ্য ফোরটি রুলস অব লাভ’ বইটি আবার পড়লাম। এবং আমার মনে হয়, আমি এই বইটাকে এই সময়টাতে আগেরবারের তুলনায় ভালোভাবে আত্নস্থ করতে পেরেছি। এলিফ শাফাক যেভাবে দুইটি সময়রেখা—দূর অতীত ও বর্তমানকে সমান্তরালে রেখে বিশ্বাস, ভালোবাসা, আত্নসম্মান, মানবিকতা, সৃষ্টিকর্তা কে জানা ও বোঝা এবং সুফিজমকে তুলে ধরেছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তার গদ্য চমৎকার। চরিত্রায়ন অসাধারণ।
বারবার সম্পূর্ণভাবে না পড়লেও আমরা আমাদের প্রিয় বইয়ের কাছে বারবার ফিরে আসি। হুট করে সেই বইটার কথা কারোও কাছে শুনি কিংবা অনলাইনে ওই বইয়ের কোনো উদ্ধৃতি দেখি বা অন্যদেরকে বলতে শুনি কিভাবে বইটা তাদের জীবনে পরিবর্তন এনেছে। এভাবে আমরা সময়ে সময়ে আমাদের প্রিয় বইয়ের কাছে ফিরি। কখনো আবারও পড়ি। কখনো শুধু পাতাগুলো উল্টেপাল্টে দেখি। ইউটিউবে একটা পডকাস্ট চ্যানেলে দেখেছি যে এক বাবা ও মেয়ে(মেয়েটার নাম লায়লা কে সালেহ, চ্যানেলের নামও এটাই) এই চল্লিশটা নিয়ম ব্যাখা করে। দেখে এত ভালো লেগেছিল যে বইটা আবার পড়তে শুরু করেছিলাম। খুব সময় নিয়ে পড়েছি। শামসের কথাগুলো বারবার পড়েছি। বিশেষ করে ভালোবাসার সেই চল্লিশটা নিয়ম। সুন্দর সুন্দর রঙের কলমে দাগিয়ে ও বিভিন্ন ধরনের স্টিকি নোটস আটকে আমি আমার এই বইটিকেই যেন একটা শিল্প করে তুলেছি। এলা রুবিনস্টেইনকে বুঝতে চেষ্টা করেছি। এক মধ্যবয়স্কা নারী যে তার সম্পূর্ণ জীবন কাটিয়েছে একটা বাবলের মধ্যে, নিজের সাধ্যমত স্বামী ও সন্তানদেরকে ভালোবেসেছে কিন্তু হঠাত করে এসে তার বোধদয় হয় সে যেন ভালোবাসার এক মিথ্যা জালে আটকে ছিল। তার স্বামী তাকে ঠকিয়েছে। সন্তানরাও কি তাকে বুঝতে পারে? জীবনে তো আসলে কিছুই করল না এলা। তবে এই কঠিন সময়ে তার কাছে একটু পাণ্ডুলিপি আসে। একটি লিটারেরি এজেন্সীর হয়ে কাজ করছিল সে। তাকে একটি পাণ্ডুলিপি পড়ে তার ওপর রিপোর্ট লিখতে হবে। পাণ্ডুলিপির নাম ‘Sweet Blasphemy’। লেখকের নাম আজিজ যিনি নিজেও একজন সুফি। এবং পাণ্ডুলিপির বিষয়বস্তু রুমি ও শামস। বলা যায় ‘দ্য ফোরটি রুলস অব লাভ’ হল উপন্যাসের ভেতর আরেকটি উপন্যাস(A novel within a novel)। এলা ও আজিজের মধ্যে একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একদিকে এলা, তার পরিবার, ও আজিজ।
অন্যদিকে আছে রুমি ও শামস। কোনিয়ার সাধারণ মানুষ। রুমির পরিবার। রুমি ও শামসের অধ্যায়গুলো রুমি ও শামস ছাড়াও বিভিন্ন মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণিত। কখনো আমরা ভিক্ষুক হাসানের দৃষ্টিকোণ জানতে পারি। কখনো বা আমরা শামস ও রুমি কে দেখি নিষিদ্ধ পল্লীর এক নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে যে শামসের সাহায্যে নতুন জীবন শুরু করেছিল। রুমিকে কখনো কোনো আলোচনা-সমালোচনা সহ্য করতে হয়নি, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন সম্মানিত। তার কথা শোনার জন্য কত মানুষ এসে জড়ো হত মসজিদে। হঠাত করে একদিন রুমির জীবনে এল শামস। তার বন্ধু হয়ে, তার আধ্যাত্নিক সঙ্গী হয়ে, সাথে করে নিয়ে এসেছিল চল্লিশটি নিয়ম। শামস রুমির জীবনে এসেছিল তার আয়না হয়ে। রুমিও শামসের জন্য একটা আয়না ছিল। কিন্তু রুমি যেভাবে শামসকে বুঝতে পেরেছিল সেভাবে কি আর বাকিরা বুঝতে পেরেছিল? পারেনি। চারপাশে তার শত্রু তৈরি হয়েছিল। কিন্তু, এতে করে রুমি ও শামসের মধ্যকার এই সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন হয়নি। রুমি নিজেকে জেনেছিল আরও গভীরভাবে। নেমে এসেছিল সাধারণ মানুষের কাতারে। এক সময় যারা রুমির কাছে পৌঁছাতে পারেনি, পরবর্তীতে তারাও এসেছিল রুমির কাছে। রুমি ভালোবেসেছিল সবাইকে।
রুমি ও শামসের এই সম্পর্কটিকে এলিফ শাফাক অত্যন্ত সূক্ষ্ণভাবে এই বইয়ে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে, একইসাথে এতগুলো চরিত্রের চিত্রায়ন খুব সহজ কিছু তো নয়, কিন্তু তিনি সেটি করেছেন। আমরা শিক্ষক, শিক্ষানবিশ, ভিক্ষুক, মাতাল—এরকম ভিন্ন ভিন্ন মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে রুমি ও শামসকে দেখেছি। রুমির দুই পুত্র, পালক কন্যা, স্ত্রীর ভাবনাও পড়েছি। সবমিলিয়ে ‘দ্য ফোরটি রুলস অব লাভ’ আমার কাছে ভীষণ প্রিয় একটা বই। বিষয় হিসেবে ‘রুমি ও শামস’ খুবই গভীর। একটা বই দিয়েই তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে বোঝা যায়না। তাও যদি তা হয় একটি উপন্যাস। তবে, রুমি ও শামসকে নিয়ে পড়তে চাওয়া, জানতে চাওয়া মানুষদের জন্য ‘দ্য ফোরটি রুলস অব লাভ’ হতে পারে দারুণ একটি সূচনা। সুনিপুণ ভাষাশৈলী, অসাধারণ সব চরিত্র, এবং একই সাথে অতীত ও বর্তমানের পদযাত্রায় এ বইটি সমসাময়িক সাহিত্যের একটি দারুণ সংযোজন হয়ে উঠেছে। এবং আমি বিশ্বাস করি, বইটা পড়ার পর পাঠক শান্তি খুঁজে পাবে কারণ এই সময়টাতে আমরা সবাই ই যেন কেমন একটা দিশেহারা(we all are lost souls) এবং শামস যে চল্লিশ টা নিয়ম আমাদেরকে দিয়েছে সেগুলো আসলে আমাদের জীবনে চলার পথে দিক নির্দেশনা হতে পারে। ‘দ্য ফোরটি রুলস অব লাভ’ কে আমি জীবনের খুব কঠিন এক সময়ে আবারও খুঁজে পেলাম। খুঁজে পেলাম রুমির নীরবতা ও শামস কে। (Silence—নীরবতা ও শামস: এই দুটো বিষয় রুমির কবিতায় অনেক পাওয়া যায়।) শামসের শিক্ষা, অনুপ্রেরণা ও সাহচর্যই রুমিকে কবি করে তুলেছিল এবং রুমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার জীবনে ও পদ্যে শামসের থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো ধারণ করেছিল।