Published : 21 Nov 2020, 04:11 PM

তানহা রাত্রি
সমুদ্র নিঃসঙ্গতায় গিলে ফেলে নিজেরই বোয়াল মাছের পেট। রাত্রি কালো পর্দার আড়ালে নিজেকে লুকায়- এ রাত্রি উন্মূল তুমুল মীনা কুমারী- নিজেই রজনী নেকাব, পাহাড়ের খাড়া ঢালু বেয়ে গহবরে নূরান্ধকারে উল্লাসে, আর্তনাদে মাহফিলে নামে।
স্তব্ধতার দেয়ালে এক তানহা রাত্রির কবি পয়ারে, গীতে, রক্তজবার পরাগে ফোটেন। তাঁর আসরে, মহলে আলো ঝলমল- তমসার সিরিঞ্জে ফোঁটা ফোঁটা রঙিন বুদ্বুদ। মীনা কুমারী নাজ জীবনভর নিজেরই কান্না নাকের নোলকে পরেন, কানে ঝুমকায় বাঁধেন, তোলেন শিকলের ইশকে।
মেনোপজ-হওয়া নারীর ঋতুরক্তের বিনাশে, জ্যোৎস্নার এসফল্টে, ধুতরাফুলের উদ্যত বিনাশে স্রোতস্বিনী কাউসার, অবিরল ঝরে খুনী রজনীর শিশির। সব নীরবতা গোঙায়, সকল অমানিশা রক্তবমি করে; কেননা নিকষ যামিনীর অবগুণ্ঠনের নিচে মীনা কুমারীর কবিতায় জীবনেরই কাটা দাগ আঁকা, একবার দহনে আরেকবার বরফে নাম বদল করে:
কুছ আজিব সা মালুম হো রাহা থা, আবর আলুদ আসমান কি মোহুম রশনি, মোহুম ছায়ে পাহারো কে হালে, তারাহ্- তারাহ্ কি খুশবুয়েন- সাব কুছ বদলা- বদলা সা থা।
পদ্মবীমা
জীবন চলে গেল সিথানে পৈথানে। জানা-ই হলো না- জলপদ্মের আরেক ভাই আছে স্থলে ফুটে রয়। আমিই সেই স্থলপদ্ম- ঘোড়াউত্রা গাঙ্গের পাড়ে যে যাচিয়া যাচিয়া বয়। আমি আর জলপদ্ম দুই সোদ্দর ভাই- পিঠাপিঠি বোন। জলে যে ফোটে পদ্ম পানির তৃষ্ণায় কথা কয়, আমি তো স্থলের ডুবসাঁতার, বাতাসের ব্যাঙ্কে জমা করি মায়ার সঞ্চয়।
আনার দানা
তামাম দুনিয়া বুঝি একটা আনার ফল, হঠাৎ ফেটে গিয়ে আকাশ ভরে ফুটে উঠেছে তারা- আনার ফলের দানা।
এতো তারার ঝিলমিল নীরবতার নিচে, নক্ষত্রখচিত কোটি শিশুর মহল্লায় ঘোর লাগে- নিজের বুকের ভিতর সাত তবক আসমানের শিবনাথ ইশকুলে কখন যে অনূদিত হয় সরিষাপুর গ্রাম, ঢাকা শাহবাগ উপন্যাসের মোড়, আর ফিলাডেলফিয়া লিবার্টি বেল অঞ্চলে তুমুল জেনট্রিফিকেশনের উন্নয়ন উচ্ছেদ।
এতো হৈ-হুল্লোড়, ঝকমারির ভিতর আমার ভুবনপুরে এসে ছাউনির ঘর তোলে আমার নানু- সূর্যের মা- একাত্তরের যুদ্ধ থেকে যার ছেলে আর কোনদিন ফিরে আসেনি; কৌরালের সঙ্গে তার রাত্রিদিন জেগে থাকা সংসার- ঘুম নাই, জমজমের পানি নাই : জীবন বুঝি পলিথিনের ব্যাগ- কান্নায় গলে না, অপমানে টলে না।
নির্ঘুম নানুকে দেখি- কী অপার মমতায় জায়নামাজের পাটি ভাঁজ করে রাখে; মনে হয়- যুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া তার ছেলে মিজু বুঝি জায়নামাজের ভাঁজে ভাঁজে মিশে আছে!
নানু কী আমার উপর এসে ভর করে? না হয় আমিও কেন পালা কেটে কেটে জমা রাখি লাটিমের ঘুন্নি, উষ্ণা বাড়ির পিছনে খালের করচনা ঢালুতে পড়ে থাকা ভূতলবাসী হামিদের বুকে জমাট রক্তজবা, সেই খালের ঢালুর উপরেই হঠাৎ দুইবেণী কিশোরী এক আমার ইনসমনিয়ার ভাঁজে ভাঁজে আজও ফুটে থাকে!
এতোদিন পর আমি হই আম্বিয়া খালা- ভাসতে থাকি আশার জাজিমে; আমারও চারপাশে স্তুপ হয়ে জমে ওঠে ইসিমের দানা- রইন্না গুডা, বুড়ি দাদী আয়নার মা'র এক প্যাঁইচ্চা শাড়ি- মৌলাধুনিক এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম; ও আমার অন্তর কানা, আকাশভরা সূর্য-তারা, আনার দানা।
পুরুষ
পুরুষ কাঁদে না- এই দুর্বলতা তাকে মানায় না। পুরুষ এভাবেই নিজেকে একটি ফাঁপা, মেকি, ভারী ব্যূহের অন্তরালে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এবেলায়, আমার নিরীহ বাবাকে মনে পড়ে : উদ্বেগের মেঘভারে তাঁর খাঁটি মুখখানি মনে আসে। তাকে আমি তাবৎ দুনিয়ার শিরে বসাই। বাবাকে কাঁদতে দেখতাম- আমাদের শুকনা মুখ দেখলে ঝপঝপ করে কেঁদে ফেলতেন, বিদেশে থাকা ছেলের জন্য আম্মা সিফারার অসহায়তায় রাত নাগাড়ে বুক ভাসাতেন আমার বাবা।
মইদর ভাই- শম্ভুগঞ্জ থেকে বৈশাখ মাসে আমাদের অঞ্চলে ধান কাটার মুনিষি করতে আসতো; বলতো- নারী সোমবার, পুষ্যালোক মঙ্গলবার; বেডি মানুষ দুধ, আমরা বেডাইন দুধ রাখার বাডি; একজন মা ফাতেমা- আরেকজন আলী- এই দুইয়ে সংসার- বড় ছোডো নাই।
পাকা মন্দিরে, অতিশক্ত গির্জায়, সুকঠিন মসজিদে হুঙ্কার শাসানি আছে- ওখানে প্রাণের স্ফূরণে ফাটা বাঙ্গি নাই; যে-বাবার মধ্যে তেমন একজন মায়ের কান্না কম্পন নাই- তার মধ্যেও পাক্কা, মোজাইক করা ফাদার থাকতে পারে, কিন্তু বাবা, বাজান থাকার সম্ভাবনা নিতান্ত কম।
এভাবেই পুরুষেরা অর্ধেক মানুষ- কেবল জয়ের সিনাজুরিই সামগ্রিক সম্বল, পরাজয়ে জয়ী হবার আনন্দ তার জানা নাই।
বড় মনে হয়, কী এক ফরমালিনমাখা দেমাগে প্রকাণ্ড অয়োময়ের ভিতর পুরুষ নিজেকে সিন্দাবাদের দৈত্যে পরিণত করে, প্রাচীরের ঘেরাটোপে থাকার ফলে তার হাহাকারকেও গণ্ডারের হুঙ্কার মনে হয়।
কেঁদে নিজেকে হালকা করতে পারলে পুরুষ হয়তো ধর্ষক দানবের বদলে বেরিয়ে আসতে পারতো তীর্থযাত্রার ভরসাসুন্দর কোমলতায়, বন্ধুত্বের আস্থায়।
বাবা আমাদের মাঠভর্তি ফসলি জমি দেন নাই- কেঞ্চিকাটা দালানকোঠা দেবার সাধ্য তাঁর ছিল না। কিন্তু তিনি যা দিয়েছিলেন তার জন্য আমাদের আর কোনকিছুকে ভয় করে না, প্রচণ্ড ঠাণ্ডায়ও শীত লাগে না- আমাদের মাথায় পড়েছিল তাঁর বুকভাঙা চোখের জল।
চোখের জলে ওম ওম লাগে, কেননা তাতে যে প্রাণের তাইস- হৃদয়ের রোদ্দুর মিশানো থাকে।
ভাঙাহিয়া পাঠ
রুমি বলেন- তুমি আমার মন ভেঙে দিয়েছো- আমি সে হৃদয় আর রিফু করি না- আমার ভাঙা হিয়াই তোমার আমাতে প্রবেশের দরোজা- আমার মনমনুরা আঘাতে ফাটা না হলে তুমি সেখানে ঢুকবে কীভাবে?
রবীন্দ্রনাথের অন্ধকারে রইনু পড়ে স্বপন মানি,ঝড় যে তোমার জয়ধ্বজা তাই কি জানি! সকালবেলা চেয়ে দেখি, দাঁড়িয়ে আছ তুমি কি, ঘর-ভরা মোর শূন্যতারই বুকের 'পরে- একই মর্সিয়া।
মানুষ নিসর্গের অয়োময়ে কুমারপোকার অন্ধতায় লকড ডাউন হয়ে আছে- যেখান থেকে বেরুবার আর কোন ফোকর নেই, দরোজা লোপাট; অথবা বাজার বিজ্ঞাপনের উঁচু ও শক্ত বিলবোর্ডের বাইরে লকড আউট হয়ে আজ মাথাকুটে মরে!
চরের নিদয়া হাওয়ার নিচে ফেটে থাকে যে বাঙ্গি তার থেকে মনফকিরি আর কী-ইবা হতে পারে! পুড়ে ছিদ্র হয়েছে বলেই তো বাঁশির সুরে আমাদের মনে এমন জোয়ারভাটা ও চন্দ্রকানা লাগে।