Published : 09 Jan 2020, 09:57 PM

আন্তোনিও মাচাদো ২২ শে জুলাই ১৮৭৫ সনে স্পেনের সেভিলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নানারঙের পোঁচওয়ালা পাতাবাহারের সামিল- শিল্পযাত্রায় নানা ঘরানার চিহ্নঅঙ্কিত এক কবি। মাচাদো আধুনিক- তারমধ্যেই আবার প্রতীকবাদিতা, রোম্যান্টিকতা, এবং তাওবাদী স্থিতধী ধ্যানমগ্নতাও দুর্লক্ষ্য নয়। অনেক বিদ্যার জাহাজ, জ্ঞানী লোকেরা মেধার ঔদ্ধত্যে সবকিছু নির্দিষ্টভাবে জেনে ফেলে; কিন্তু মাচাডোর জানা ছিল না- নির্দিষ্টতা কী! মাচাদো কোন বোঝকে আগাম ধরে নিতে পারতেন না, তাঁর জিজ্ঞাসায় শিশুচিত্তের ঝকমকানি থাকতো। তাঁর যদি মনে জাগতো যে, একটি চিনাবাদামের পাতা কীভাবে সকালের দমকা হাওয়ার সঙ্গে ভাববিনিময় করে- এই কথাটি লিখবেন- তাহলে তিনি বিহানকালে একটি বাদাম ক্ষেতের আল ধরে হেঁটে যেতেন।
মার্কিন কবি আয়রন জনখ্যাত রবার্ট ব্লাই উত্তর অ্যামেরিকার কবিতার বাইরে ভিনদেশি কবিতায় আগ্রহ, মনোযোগ ও সম্মাননার কারণে রীতিমতো প্রবাদপ্রতিম। মাতস্যু বাশো, ইয়োসা বুসন, মাসাউকা শিকির হাইকু থেকে উমর খৈয়ামের রুবাই, জালালউদ্দিন রুমির সুফী প্রগাঢ়তা কী আন্তোনিও মাচাদোর জগত- সবখানেই রবার্ট ব্লাইকে পাওয়া যাবে।
হাওয়া, প্রসন্ন দিন
হাওয়া, আর একটি প্রসন্ন দিন
ছুঁঁয়ে গেল আহা ফুলের সুবাস!
আমি দিয়েছি জুঁই মৌমৌ শোভা
আমাকে দাও সকল গোলাপ।
গোলাপ যে নেই আমার কানন
রুক্ষ শুকনো পুষ্পে কুসুমে বারণ।
নিষ্প্রাণ চারা-ই আমি নেবো ছলছল
মরা হলুদ পাতা, আর এক আঁজলা জল।
বাতাস বহে শনশনে দূর বহুদূর
আমি শুধাই বিচলিত নিজেরে ঘোর-
খুঁজে দেখো কী এমন করেছো তুমি
যে মুখ ফিরিয়ে নেয় ফুলের দয়াল ভূমি?
Antonio Machado: The Wind, One Brilliant day
ঘুমে খোয়াবের জাল
ঘুমের নিগূঢ়ে গতরাতে স্বপ্ন খোলে তার কপাট
মনউচাটনের ভ্রান্তিবিলাস,
বসন্ত ফুটতে থাকে- পরাণের গহীন অজানায়
জয়জয়ন্তী হৈহৈ বসন্ত আমার।
ক
হৃদয় উছলি বইতে থাকে
আচানক প্র¯্রবণের খচিত ধারা
নয়া পানির দৈবাৎ ফোয়ারা যেনবা
মন কেমন-করা আনন্দধ্বনি!
এমন কাউসারি জল আগে কখনো চেখেও দেখিনি!
ঘুমের নিগূঢ়ে গতরাতে স্বপ্ন খোলে নিজ পাট
মন গুনগুন ভ্রান্তিবিলাস-
হৃদমন্দিরে উলুধ্বনি- মধুক্ষরা চাক
সোনালি ডানার মৌমাছি ঘরামী
উড়েঘুরে বানায় রূপালি কাঁকই
আর অমৃত মধুরস।
এমনি ঘুমঘোর গতরজনীর আনন্দ ভুল-
আলোক উদ্গাতা সূর্যদেব 'প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন'
রৌদ্র মদিরা ধ্বনি
আর আঁখিবন্ধনে জমে ওঠে জলবিন্দু স্ফটিক।
নিদ্রার গুমরে
বিগত নিশি খোয়াবের বিচ্ছুরণে ফুটতে থাকে,
আর
প্রাণের ভিতর হিয়ার ভাঁজে লুকিয়ে থাকে মাবুদ!
স্পেনিশ থেকে ইংরেজি ভাষান্তর: রবার্ট ব্লাই। Antonio Machado: Last night as I was sleeping

আমরা যেভাবে কোন কোন চতুষ্কোণী লেখককে সব্যসাচীর শিরোপায় ধার্য করি মিসরে সালাহ আবদেল সোবুর সেইরকম একজন লেখক। তিনি কবি, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, সম্পাদক- এই সবকিছুর যৌগ। সোবুরের নিজের প্রতীতি ছিল তিনি প্রধানত কবি, কিন্তু স্যামুয়েল বেকেটের কায়দায় লেখা নাটক- নিশি সওদাগর: কৃষ্ণ প্রহসন বিপুল পরিসরে তাঁর নাম চাউর করে দেয় নাট্যকার হিসাবে। তাঁর সাহিত্যশৈলী সালাহ আবদেল সোবুর-এর জীবনের গতিমুখের সাথে তিনটি প্রধান বাঁকে বিন্যস্ত: ক. মার্কসবাদী বিচার ও জীবনবোধ খ. অস্তিত্ববাদী রোখ গ. মধ্যপ্রাচ্যীয় সুফি মরমীবাদলগ্নতা।
সালাহ আবদেল সোবুর শিল্পান্বেষায় তুরস্কের ওরহান পামুকের ন্যায় পূর্ব ও পশ্চিমের মেলবন্ধনকারী এক ডুবুরি অন্বেষাকারীর নাম যিনি জন্মেছিলেন মিসরে ১৯৩১ সনের মে মাসে, আর ১৯৮১ সনে দৃশ্যমান দুনিয়া থেকে নাই হয়ে যান।
রজনী ও দিবস
দিবাকরের কোল ঘেঁষে দিবস
গড়ায় ঢালুর দিকে
হুড়মুড় ভেঙে নামে সন্ধ্যার আলোয়ান।
আসমান আর তামাম দুনিয়া
মিলায় এক আঞ্জার ভিতর।
নীরবে ব্রিজের পাটাতনে আলোর ফুটকি
স্তব্ধ পাথরের ছাউনি
মিনার চূড়ায় দ্যুতির স্ফটিক।
জিন্দেগি গম্ভীর
দরজার মুখে স্তুপাকার কৃষ্ণনিধি
কালো পাথরে স্তম্ভিত দরজার শিথান।
পাহাড়ের শীর্ষ থেকে নেমে আসে
পাকা কবরের ভাঙাভাঙা চাঁই;
অতঃপর কী নির্বাক বেজে চলে
গোলাপি মেঘের মিহি নিক্কন!
দিবসের পাপড়ি সংরাগে উদ্ভাস
আড়মোড়া ভাঙে রাত্রির উন্মুখ।
এ-আবীর লাল- জীবনের দানা
যামিনী তার দেখা পায় নাকো,
দিবস তার পরশ পায় না যে!
জীবনের লুকানো আভা
কেবলই স্মৃতি সত্ত্বায় আবার আসে ফিরে।
এভাবেই রাত্রি নিঃশেষে হারায়
সূর্য উদ্বাহু আকাশের শাখায় উত্তরণে জাগে;
তেরসা আলো পাথরের জমাট ফুঁড়ে
বানায় আলোছায়ার সঙ্কেত।
রৌদ্রের আশীর্বচনে দুপুর বুদবুদ
আমার হৃৎপি- ভরে ওঠে শঙ্কায়, দয়ার্দ্রতায়।
তোমাকে অভিবাদন সূর্যনিধি:
তুমিই চোখে সুই ফোটাও- আনো ভ্রান্তি,
গড়ো স্থাপনা- মানুষ, নোতুন বিন্যাসের পাথরে!
এভাবেই জমা হয় প্রসন্ন ধূসরতার পাড়
দিনের শিরা-উপশিরায় সূর্যরেখা ঢোকে
সব বিপত্তি যায় মিলিয়ে-
বিমূর্ততার রঙে বর্ণে মিলনে
গভীর নির্বাণি ভাবে ধূসরতায় আলোড়ন।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে
পাহাড়ের বুকে হেলান দিয়ে সূর্য ঘুমায়-
গড়িয়ে গড়িয়ে আশার বসতি আশা যায়,
বসত গড়ে স্থির বসতি অনড় অক্ষয়;
অতঃপর অন্ধকারে ফুটে ওঠে জ্যোতি,
শোরগোলে ঘনায় নৈঃশব্দ্যের খনি।
Salah Abdel Sabour: Night and Day
শীতের গান
আমাকে শীতঋতু বলে-
আমার প্রয়াণ হবে হিমার্ত একা,
এই যে এমন হিমলাগা শীতকাল
আমি খোয়াবো এমনই একা সঙ্গীবিহীন।
বয়ে যাওয়া বিগত দিন ক্ষয়ে যায় নি কিছু
সবই আছে জমা আমার মনীষায়
আমি পাতাপল্লবহীন ঝরা পাতার দিন।
শীতঋতু কহে, আমার আত্মা কাঁপে
হিমের শাসনে।
বিগত হেমন্ত দিনে আমার হিয়া বিলীন
ঝরে পড়া পাতার সনে,
আর তোমার প্রাণ খুলে পড়ে প্রথম বৃষ্টির
আষাঢ়স্য দিনে।
শীতার্ত প্রতিরাত
আরো কাটা শীতের সকাশে নত হয়ে নামে
পাথরের নিশ্চিদ্র জমাট- তোমার হিমাঙ্ক।
গ্রীষ্মের উষ্ণতা বিছানো শীতের হিমের ভিতর;
বরফে ডানার আড়ালে ঘনীভূত জড়তা ঠা-া
ঢেকে রোদের হাওয়াই- স্ফূরিত ঝালর।
সব আয়োজন বাঁয়ে ফেলে
নির্দয় শীত যামিনীর রায়: আমার শরীর খেয়েছে
কুসুম পোকায়, আর শ্বাস আটকে যায়
হাওয়ার গোড়ায়।
অনুভবি আমার মৃত্যু কতো কাছে-
পায়ের গোড়ালির রাখীবন্ধনে বাঁধা।
নগরে হাজার দুয়ারী চিৎকার হুল্লোড় মাঝে
আমার বিলয় কতোটাই না নেহায়েত, কপর্দকহীন, তুচ্ছ;
কেউ একফোঁটা চোখের জল ফেলবে না- জানি!
অতি আকস্মিক আড্ডার ফাঁকে
আমার নাম আসবে ক্ষণিকের ভিড়ে,
আঙুল উঁচিয়ে বলবে- ও ওখানটায় বসতো, তাই না?
ঈশ্বর ওর আত্মা গুছিয়ে রাখুক!
আমি যাকে ভেবেছিলাম নিরাময়
আসলে সে যে ঘাতকতা,
আমি ক্ষত বয়ে বেড়াবো আর কতোদিন?
আমি ইশকুল পালানো ডাব্বামারা ছাত্র
কতো নিরুপায়, আতঙ্ক ভঙ্গুর।
আমার পা সরে না;
মাছির পা বুঝি দুধের সরে আটকে যায়।
শীতে বাঁচতে লাগে
বরফের রৌদ্রোজ্জ্বল স্মৃতি, আলোড়ন
লাগে হেমন্তের সম্ভার, সুসময়, যব, নয়াশস্য, নবান্ন।
মৃত্যুর কেশরে শীতের মহীয়ান সহিস-
তার সুতীব্র নিথরতায় আমি মরে পড়ে র'বো!
শীত, শীত- মৃত্যুর লাগোয়া কারিগর
আমি মরে বিছিয়ে থাকি শীতের বাহুর পাশে
নিস্তরঙ্গ একা, নিঃসঙ্গ, সখাহীন!
ইংরেজি অনুবাদ: লেনা জয়াসি, জন ইলেথ স্টুবিস। Salah Abdel Sabour: Winter Song

কার্লোস পেইয়িসির সর্বার্থেই প্রাতিস্বিক- নিজের মত; তবে আরো কিছু মেধাবী মৌলিক শিল্পকারিগরের সঙ্গে একই সময়ে বেঁচেছিলেন তিনি, স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের সঙ্গে পেইয়িসিরের সহমত, ও মতের ভিন্নতাও ছিল। অক্তাবিও পাস, দিয়েগো রিবেরা, ফ্রিদা কালো ছিলেন অন্যতম- যাঁদের সঙ্গে তাঁর শিল্পতীর্থের মোহন মুশকিল পথে দেখা হয়েছিল। মেহিকোর চিত্রকলা ও সাহিত্যের অভিব্যক্তিকে একটি সংহত রূপরেখায় বিন্যস্ত করার ক্ষেত্রে কবি ও শিল্পজ্ঞ কার্লোস পেইয়িসিরের অবদান অবশ্য স্মরণীয়। অক্তাবিও পাস তাঁর সম্পর্কে খুব ঠিকভাবেই বলেছেন যে, কার্লোস পেইয়িসারের কবিতা দারুণভাবে সংহত, তাঁর হাতে ছিল এক অদেখালোকের মনস্তত্ত্ব ফুটিয়ে তোলার ভাষা, উপস্থাপনা ছিল বৈচিত্র্যে ভরা, আর কবিতা সদা চিত্রকল্পময়। চরিতে দক্ষিণ অ্যামেরিকা- ভূগোলে উত্তর অ্যামেরিকান দেশ মেহিকোর কবি কার্লোস পেইয়িসিরের দক্ষিণ অ্যামেরিকান অনেক লেখকের মতোই কিছুটা রাজনৈতিক প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন- তিনি তাবাস্কো রাজ্যের সিনেটরের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
৮০ বছর দৈর্ঘে্যর জীবন পেয়েছিলেন কার্লোস পেইয়িসির : জন্মেছিলেন ১০ই জানুয়ারি ১৮৯৭ সনে, মৃত্যুবরণ করেন ২রা ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৭ সনে।
নিশিপদ্য সূত্র
পিঁপড়ার দল সারা দিনমান শেষে কাজ থেকে বেরুবে,
আর চৌকাঠ পেরিয়ে প্রাণভরে শ্বাস নেবে টেনে-
মৃত্যু আমাকে খুঁজেও পাবে না দেখো।
সে আমাকে পাগলের মতো গাছগাছালির আড়ালে
আবডালে তালাশ করবে- এখানে নীরবতা ঘন আর নিবিড়,
পরতে পরতে বিন্যস্ত নির্জনতা;
মৃত্যু আমাকে পাবে না দেখো-
আমি বরং দেখবো প্রাণে এমন শিস দিয়ে বেজে ওঠে
কোন গোলাপের ঘ্রাণ!
আমি তারই মাঝে আমার জখমী হাতে ফালি ফালি
করে কেটে যাচ্ছি ইনসোমনিয়ার রাঙা ফল!
আমার ঘর হাট করে খোলা- সব সুনসান নিটোল দেখা যায়।
মৃত্যু আমাকে পাবে না, আমাকে খুঁজেও পাবে না দেখো!
সে আমাকে তন্নতন্ন করে তালাশ করবে-
গাছগাছালির মগডালে, মেঘেদের কালো খুপরির ভিতর;
আমি তার অপেক্ষায় বসে থাকতে পারি না-
আমি বরং উদগ্রীব হয়ে থাকবো খিলিপান হাতে-
জীবনের সাথে বাঁধিনু গানের তরী- পানচিনির খেলায়!
এ-বেলা অতিদূর থেকে একা ও একসঙ্গে পায়ের আওয়াজ বুঝি ভেসে আসে?
এখনও যে হারিয়ে যাবার নেই মানা- রাতের হাতে
আজও সময় রয়েছে বাকি,
নক্ষত্রের শ্বাস আর বুটকিতে ভরে ওঠে কেমন আকাশগঙ্গা
কোন অজানা থেকে আকুল ধ্বনির নীরবতা আছড়ে পড়ে
সাগরের পাট ও সংসারে।
আমার নিবিড় হৃৎপিণ্ডের ঘরে ফেটে পড়ে রক্তের ডালিম
রেণু ও পরাগে সাজে ঋতুবতী সন্ধ্যার ভঙ্গুর তনু,
আমিও তাই হতে পারি কৃত্যে সামিল-
আলগা করে রাখতে পারি আমার দেহের বসন।
তাই হোক তবে- মৃত্যু আসুক আমার খোঁজে,
আমাকে পাবে না- নিয়ে যাক আমার স্খলিত বসন!
ইংরেজি ভাষান্তর: রেইচল বেনসন। Carlos Pellicer: Theme for a nocturne
অধিগ্রহণ
তোমাকে যতদূর দেখি আমার দৃষ্টির সীমায়
তুমি তার সবটুকু নও,
তোমার গোটা জীবনের অসীম আমার চোখে তুলে রেখেছি,
ফলে আমার জন্য আমি অন্ধ, তোমার অগ্নি আমাকে
চক্ষুহীনতার মর্মে বুনে দিয়েছে।
আমার অনায়াস শ্রবণশক্তি তোমাকে শোনার জন্য যথেষ্ট নয়।
তোমার কন্ঠস্বর আমার শ্রবণেন্দ্রিয় ষোলআনা দখলে নিয়েছে
ফলে জগতের জন্য আমি বধির
সবকথা এসে মিলে যায় হেসে তোমার বাণীর শেষে।
আমার ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের যা ক্ষমতা তোমার সুবাস তার অধিক।
তোমার সবটুকু গন্ধে মাতাল হতে
আমার নিজস্ব খুশবুর বাগান আমি তামাদি করে রেখেছি;
ফলে আমার ভিতরে ও বাইরে ফুটেছে একটিমাত্র বাগান-
কেবল বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে।
আমার জিভ একমাত্র তোমার স্বাদ নিতে উজাগর,
জিভে দিবানিশি তুলে রাখি তোমার দারুচিনি নাম-
আর সব মসলা সুগন্ধি ও স্বাদ ঝুটা হ্যায়!
যা-কিছু স্পর্শের শিহরণ তার সবটুকু তুমি, কেবলই তুমি,
আমি আমাকে স্পর্শ করি- আর তোমাকে ছোঁয়ার মর্মে
উদ্বেলিত হই।
আমি এক জীবন্ত আয়না-
তোমার অনুভব, আস্থা, স্থিতি ও বিলয় অগ্নিগিরির প্রজ্জ্বলনে
ছলকে ছলকে আমাকে অন্ধ বানায়- আর আমি পরিপূর্ণ তোমাকে দেখি!
ইংরেজি ভাষান্তর: রেইচল বেনসন। Carlos Pellicer: You are more than my sight

বিসেন্তে উইদোব্রোর জন্ম ১০ই জানুয়ারি, ১৮৯৩ সান্তিয়াগো, চিলি; তাঁর জন্ম হয় খুব অবস্থাপন্ন ঘরে। বিশ বছর বয়সেই তিনি দক্ষিণ অ্যামেরিকা থেকে প্যারিসে পাড়ি জমান, নানাপর্যায়ে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে পাবলো পিকাসো, হুয়ান গ্রিস, ব্লেইজ সদ্রার্র, গিয়োম এপোলিনিয়ার, পিয়ের রেভের্দি প্রমুখের সঙ্গে। দক্ষিণ অ্যামেরিকা আর ইউরোপীয় শিল্পমর্মের সংশ্লেষের ভিতর দিয়ে তিনি একটি প্রাতিস্বিক চিন্তাকাঠামো গড়ে তোলেন- যা একপর্যায়ে একটি আস্ত শিল্প আন্দোলন- ক্রিয়েশনইজম: নির্মিতিবাদ নামে বিস্তার লাভ করে। ইউরোপ- অ্যামেরিকা মিলিয়েই বিসেন্তে উইদোব্রো এক অসামান্য প্রতিভা। বৃহত্তর উত্তর অ্যামেরিকান পাঠকের কাছে উইদোব্রোকে তুলে ধরবার সময় সম্পাদক ডেভিড এম. গাস তাঁর ভূমিকায় বলেন: বিসেন্তে উইদোব্রো পাঠ করলে সত্যিই মনে হয় কবিতা এক স্বর্গীয় অপরাধ! অন্যদিকে সারা দুনিয়ার কথা মাথায় রেখেই অক্তাবিও পাস বলেন- উইদোব্রো আমাদের কবিতার গোপন অক্সিজেন। বিসেন্তে উইদোব্রো ২রা জানুয়ারি, ১৯৪৮ সনে কার্তাহেনা, চিলিতে মারা যান।
মৃত্যুর জীবনী
আমার ডানহাত সোয়ালো পাখি
বামহাত সাইপ্রাস বৃক্ষ,
আমার সামনে এক প্রাণবান মানুষ
পিছনে যে সে মৃত পড়ে আছে।
মৃতজন হারিয়েছে সমূহ প্রত্যয়।
আমাদের বসতির মূলে জিভের অভিব্যক্তি মাঝে
এমনকী টিকটিক ঘড়ির কাল আলিঙ্গনে স্থির
উদ্বাহু বন্ধনে অসীমতার বাহু।
তারা ছুঁয়েছে অনন্ত প্রবাহের শীর্ষ
তাদের চোখ খোঁজে দূরের নিরালা ছাতিম
মেঘের কোমরজড়ানো দূরাভি সঙ্কেত।
তাদের পাঁচ ইন্দ্রিয়ে জেগে থাকে তুমুল উদ্ভাস
প্রতিটি আকাশের নীলে মনোনীত একেকটি পাখি।
তারা দুনিয়ার বুক থেকে নির্বাসিত,
আর দুনিয়া তাদের নিঃশ্বাসে বের করে দিয়েছে
আকাশের কাছে।
তারা অতঃপর কালের শক্ত পিঠে দাঁত বসায়!
জীবিতরা আকাশে বাড়িয়ে ধরে সাইপ্রাস গাছ।
তারা দিগন্তের ওপাশে এগিয়ে যায়;
বলতে চায়- সুপ্রভাত, আমাদের প্রিয় সোয়ালো পাখি।
ওরা পাহাড় ডিঙিয়ে আরো শূন্যে ওড়ে
আসমানের যে তবকে মৃত্যুর যোগাসন-
সেখানে তারা গান গেয়ে ওঠে।
বহুদিন ধরে মৃতজনেরা কথা বলে যায়
নৈঃশব্দ্যে মন্ত্রিত জিভের ব্যাকুলতায়
বজ্রপাতের পর যেমন নিনাদ চমকে ওঠে
বিদ্যুতের আলোয়, পুষ্পে।
জলপদ্মের ডাঁটা তো ফুল নয়-
শুকনো ডাঁটা তবু ধরে রাখে ফুলের সম্ভ্রম।
মৃতরা কখনো মাত্রাধিক দূরে সরে যায় না
বড়জোর একটি পিস্তলের গুলি যতোটা
দূরে যেতে পারে- ততোখানি দূরত্বে যায়।
তারা দিন গুনে সময় ধরে ফলের বীজে।
মৃত্যু শক্ত মজবুত আঁটি- যা ফলের জমাট
তারা জমিয়ে রাখে জীবনের ঘনীভূত আমানত।
তাদের কাছে জমা আছে নক্ষত্রের লেনদেন
তারা ওদের বহুবর্ণিল নামে সম্বোধন করে-
যদিও কারো কাছে থাক না থাক
জমা খরচের আমূল হিসাব।
কেউ কেউ গান গেয়ে উঠুক জলের বাঙময়
পদ্মফুলের মূর্ছনায়, দোলায়।
পাখি গান গায় নাম না জানা সহ¯্র শ্রোতা কল্যাণীয়েষু
একটি আদমসুরত জ্বলে থাকে নবজাতকের
চোখের মেধায়,
একটি পাখির গানে ও ডানায়
আড়মোড়া ভাঙে তামাম ভুবন-
একটি দূরের তারকা গর্ভে ধরে মৃত্যুর বিভা
আর এক বাও মিলায়- কতো মুসাফিরানা!
ইংরেজি ভাষান্তর : ডেভিড ওসম্যান। কার্লোস হ্যাগেন। Vicente Huidobro: The Song Of The Deathlife
প্রজ্ঞাপন
হাসি থাকে ঠোঁটের কোণায়
হাসি উবেও যায় ওখানেই-
রাত্রির নিঝুমে পাথর যেমন করে কাঁদে,
ঝরায় নুন-কটা জল।
কেউ না কেউ ভবিষ্যৎ দেখতে পারে
তারা জানে নক্ষত্রের বালিয়াড়ি- ভূভাগ,
কীভাবে কথারা সব বেদনার জলসত্রে দিগন্তে সংহত।
আকাশচারী ঋষি গমন পথে নামেন
পরনে চিত্রকল্পের এই আবরণ!
নদীর উপর মুখ বাড়িয়ে থাকা মেঘের গুণাগুণ;
মুখ খোলেন ঋষি- বুঝিবা পাশ ফেরে রাত্রির নেকাব
তাঁর মুখে কথার পিঠে কথা:
একটি পাখির মৃত্যুর স্থাপত্য গড়ে ওঠে।
সবই ফক্কা, মিছা ঘরবাড়ি
ভালোবাসা আর তারই ঘোর বহে অবিরাম।
নভোচারী জ্যোতিষের ভিন্ন বয়ান-
তাঁর আশার আশ্রয়ে কেবল দিব্যজ্ঞানের জ্যোতি!
নিঃসঙ্গতার ধারালো ক্ষুর দুইভাগে ফালি করে
নীরবতা নির্গুণ।
এমন ঘনঘোর হাওয়া আর অপার বিলয়
কথা কয় নিজেদের সাথে।
বাতাসের সুতীব্র মুখের উপর ক্রুশবিদ্ধ নিকষ রজনী
ও যামিনী, শুভরাত্রি!
Vicente Huidobro: Announcement

ইয়োসানো আকিকো এক প্রতিমুহূর্ত কবি- আকিকোই প্রথম জাপানি নারী কবি যাঁকে বোধে, শিল্পে, অধিকারের প্রশ্নে পশ্চিমা ভার্জিনিয়া উলফ, সিমোন দ্য বোভোয়া, মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট বা অ্যান সেক্সটনের সমগোত্রীয় লাগে। লেখার জন্য তাঁর মা দুর্গার ১০টি হাত ছিল- কথিত আছে, এক বসায় তিনি ৫০টি পর্যন্ত কবিতা লিখে ফেলতে পারতেন। খুব অল্পবয়সে কবিতাপত্র মায়োজো- বাঙলা করলে যার অর্থ দাঁড়ায় উজ্জ্বল নক্ষত্র- পড়তে শুরু করেন; আবার এই উজ্জ্বল তারকার সুবাদেই ওই কবিতাপত্রের সম্পাদক টেকান ইয়োসানোর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়- যার বদৌলতে তিনি প্রথমে টঙ্ক ধারার কবিতা লিখতে শুরু করেন।
প্রেমের কাছে তিনি হৃদয় বিনত করেন, কিন্তু নারীর ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা, অধিকার সমুন্নত রাখার প্রশ্নে তিনি এক সবিশেষ উন্নত শির, ও নিরাপোষ ব্যক্তিত্ব।
ইয়োসানো আকিকো ৭ই ডিসেম্বর, ১৮৭৮ সাকাই, ওসাকায় জন্মগ্রহণ করেন; মৃত্যুবরণ করেন জাপানেই ২৯শে মে, ১৯৪২ সনে টোকিও শহরে।
প্রথম প্রসব বেদনা
আমার খারাপ লাগছে
আমার শরীর আমার হাতে নেই।
আমি বিছানায় শুয়ে আছি- আমি একটি শিশুর জন্ম দেবো।
শুয়ে আছি চুপচাপ- দুই চোখ নিষ্পলক খোলা।
জানি, মৃত্যু হরহামেশাই দাবড়ে যায়
আর এই যে ব্যথায়, রক্তক্ষরণে, আর্তচিৎকারে
বেশ মানিয়েও নিয়েছি,
তা-ও জানি না কেন এমন ভয়ে, আতঙ্কে
বারবার কেঁপেকেঁপে উঠছি?
একজন তরুণ ডাক্তার আমাকে অভয় দিয়ে গেল,
জন্মদান কতোটা আনন্দদায়ক তা-ও বলেছে।
ওই বেটা যা বললো আমি তা হাড়েহাড়ে
তার থেকে বেশি জানি,
এ-মুহূর্তে তার সুবচন আমার কী কাজে লাগবে?
তত্ত্বকথা বাস্তব থেকে মেলা দূরে বসত করে
আর যা অভিজ্ঞতা- তা সবসময়ই অতীত।
হাত জোড় করি- চুপ করে থাকুন,
আপনারা কেবল দেখুন?
আমি নিরেট একা-
বেহেস্তের বাগানে একা, দুনিয়ায়ও একা
এই তো ঈশ্বরের মনোনীত নিঃসঙ্গতা
আমি দাঁত কামড়ে, ঠোঁট ফালাফালা করে
তারই কাজটি তুলে আনবো।
আমি জানি, জন্মদান করা-ই সত্যের চাক্ষুষ কৃষিকাজ
এখানে নেই কোন ভালো মন্দের দেনদরবার,
আছে কেবল আমার দেহের গোপন উদ্ভাস।
সৃষ্টির প্রথম ওঙ্কার
সূর্যের প্রখরতা কেমন মলিন হয়ে আসে
দুনিয়া ঘন হয়ে নামে সাপের বিষ
আর আমি একা- ধারালো, একা!
ইংরেজি ভাষান্তর: স্যাম হেমিল, কেইকো মাতসুই গিবসন। Yosano Akiko: First labor pains
সারা দুনিয়া
আমি বিশ্বব্রহ্মা- থেকে জন্মেছি
এখন আমি ভূলোক দ্যুলোকের অংশ।
কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন
নিখিল বিশ্ব থেকে আকস্মিক দূরে সরে গ্যাছি।
তাই আমি একা।
যখন তোমার সাথে থাকি
এমনকী তখনও আমি একা।
কিন্তু মাঝেমাঝে বিশ্বব্রহ্মা-ের সঙ্গে
আবার মিলে যেতে পারি।
জানি না- আমি বিশ্বব্রহ্মা-
না-কী বিশ্বব্রহ্মা-ই আমি।
একসময় আমার হৃদয় হয়ে যায় সারা দুনিয়ার হৃদয়
আমার চোখ হয় নিখিলের চোখ।
সেসময় আমি কাঁদি
আমি সবকিছু ভুলে যেতে থাকি।
তখন বৃষ্টি হয়।
কিন্তু আজ আমি আবার একা।
আমি ভূলোক থেকে দূরে সরে গ্যাছি।
আমার একা লাগে-
তোমার সঙ্গেই আছি- তা-ও আমার নিঃসঙ্গ লাগে।
ইংরেজি ভাষান্তর: স্যাম হেমিল, কেইকো মাতসুই গিবসন। Yosano Akiko: The Universe and myself.

সুইজারল্যান্ড একটি ছোট দেশ, কিন্তু ওখানে ৪টি ভাষায়- ফরাসি, জার্মান, ইতালীয়, ও রোমানে প্রায় সমানে সমান কবিতা লেখা ও শিল্প- সাহিত্যের চর্চা হয়ে থাকে; ব্লেইজ সেনড্রার্স ফরাসি ভাষার কবি। সুইজারল্যান্ডে জন্মালেও তিনি অবশ্য সেখানে বসতি গাড়েন নি, প্রধানত থেকেছেন প্যারিসে- ওখানেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন গিলিউম অ্যাপোলোনিয়ের, মার্ক শাগাল, পাবলো পিকাসোর মত শিল্পইতিহাসের মোড় ঘোরানো দিকপালদের সঙ্গে; ফলে সেনড্রার্সের কাজের মধ্যেও নানা মাত্রায় ভবিষ্যবাদিতা ও সিম্বলিজমের লক্ষণ দেখা যায়। অবশ্য ব্লেইজ সেনড্রার্সের মধ্যে একধরনের ছাঁচাছোলা অভিব্যক্তি আসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাঁর ডানহাত উড়ে যাবার পর থেকে- অনেক অনুরোধ করার পরও তিনি কৃত্রিম হাত লাগাতে আর রাজি হন নি। ব্লেইজ সেনড্রার্স ১৮৮৭ সনের ১লা সেপ্টেম্বর সুইজারল্যান্ডের লা চক্স-ডি ফন্ডসে জন্মগ্রহণ করেন, আর মৃত্যুবরণ করেন ২১শে জানুয়ারি ১৯৬১ সনে ফ্রান্সের প্যারিসে।
বিন্যাস
রঙ, রঙ, অঢেল রঙ
ছড়িয়ে পড়ে আলোর রঙিন ঝরকা
দৃঢ় হয়ে ওঠে
ঘন হয়ে বসে
আমাদের জড়জীবন
ব্রহ্মাণ্ডের কঠিন ব্যূহ
কোমলতা
অস্বচ্ছতা
সকলই উধাও
মেঘমেদুর পেলবতায়
কাজ নেই
গড়ে তোলে কঠিন ভিত
দোলাচল
একসঙ্গে পা ফেলা
আচমকা এক আদি ওঙ্কার মন্ত্র আমার প্রাণে
ফুঁঁ দিয়ে যায়
ও চাকা ঘোরে
জীবন আড়মোড়া ভাঙে
যন্ত্র অযান্ত্রিকে জাগে
আত্মা শিখায় কেঁপে ওঠে
গ্লাসে পানীয় ছলকায়
আমি- এই তো আমি
নোতুন শিল্পে
আবার গঠিত হই।
Blaize Cendrars: Construction.
নৈমিত্তিক
প্রভু যিশু, এ-তো বছরখানেকের বেশি হয়ে যায় আমি
তোমাকে নিয়ে ভাবনা স্থগিত করেছি,
আমার সর্বশেষ কবিতার আগের কবিতাটা
লিখবার সঙ্গেসঙ্গেই এই সিদ্ধান্তে স্থির হই।
তারপর অনেক চড়াই-উতরাইয়ের ভিতর দিয়ে যাই
কিন্তু লোকটি আমি মোটের উপর একই রয়ে গ্যাছি।
আমি নিজেকে একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে দেখতে চাই।
আজ রাতে কেমন অদ্ভুত কিছু ব্যাপার ঘটে-
এই যে আমার আঁকা ছবিগুলো দেয়ালে ঝুলছে
ওরা কেমন আমার ভিন্ন এক আবছায়া অধরাকে
চিত্রিত করে তোলে,
আর আমি ফের তোমার কথা ভাবতে থাকি!
প্রভু যিশু, জীবন এমনই- খনন করে যাই দীর্ঘ পথ
দেখি আমি কতোটা ভঙ্গুর; একেকটি ছবি আমাকে খোঁড়ে!
জারণের ভিতরে আমি দেখি সকলই সৃষ্টি কল্লোলে জাগর।
আমি বেদনাবিধুর কাটিয়েছি দিন
তুলেছি মন প্রাঙ্গনে পুরনো যত সহচর,
দেখেছি আমার দিবসের খুঁটিনাটি চালচিত্রখানি
খুঁজেছি প্রভু যিশু।
ছোট ছোট প্রাত্যহিকতা, গৌণাতি ঘটনার কোলাজে
জীবন আমার ক্রুশবিদ্ধ যিশু
এই তো একহাত দূরে পাখির ডানার চিত্রে
খবরের কাগজের মেলানো পাতায়-
যুদ্ধবিমান
উত্থান-পতন
শোরগোল
বিধ্বস্ত জেট
ওটা আমি।
কম্পন
আগুন
লাগাতার প্রতিবেদনে
নিজেকে প্রত্যহ চাপা দিয়ে রাখি।
তুমি যতই ভাবো ছাড় দেবে- মুখে পেরেক
ঠুকে রাখবে রাতদিন-
একসময় তা ফেটে পড়বেই।
এভাবেই এই আমিটা আর রোজকার আমি নই- অন্য কেউ
বরফাগ্নি!
Blaize Cendrars: My Daily News.