Published : 07 Dec 2019, 08:57 AM
জলের নিচে মৌন পানি
রঙ একটি রাজনৈতিক বর্গ। সাদাকে বলি শান্তির অভিব্যক্তি, লালকে ডাকি ক্রোধের প্রকাশ নামে, সবুজকে আমরা যুদ্ধবিরোধী মীমাংসার প্রতীক হিসাবে ধরে নিতে অভ্যস্ত। কিন্তু যে-রঙ দেখা যায় না তা-কে কোন নামের অঙ্কনে বাঁধি?
জলের উপরিভাগ যাকে কায়দা করে বলি তলদেশ- ঝিরঝিরানো রূপালি শীতল পাটি, আর যদি এই জলের তলদেশ হয় এক বহমান নদীর রেখা তাকে আলগোছে মনে হয় নিসর্গের সিঁথি। এ-তটিনীর সরল ও বাঁকা আর্তি, বহমানতার স্তব্ধ রঙিন কুহক আমাদের হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার ঘোরে ভুলিয়ে দেয় যে এই জলশ্রুতির নিচেই বহে আরেক মায়া কল্লোল।
জলের পিঠদেশে সন্তরণ করে কাঁকিয়া মাছের দল, আকস্মিক ফুটকি কাটে বউমাছের কোন আকুল লোকনৃত্য; আমরা হয়তো বোধের ভিতরে আনি না- তখনও জলেরই নিবিড় তলদেশে শত বছরের নির্জনতায় ধ্যান করে আছেন এক নির্বাণবাদী কাছিম, দয়িতের জন্য নৈঃশব্দ্যে পদাবলী রচনা করে যাচ্ছেন সরলা বেলে মাছ- একজন মীরা বাঈ!
অন্তর্লীন
তোমাকে দেখে লাগে তোমার মুখমণ্ডল পুরনো উপনিষদের পাতা- কিছুটা বিস্রস্ত, এলোমেলো; তোমার মুখচ্ছবি বুঝি বা এলায়িত আম্মাসিফারার কালাম- তার নাম পাতা, তার নাম অনাগত পথের মোড়। তোমারই মাঝে বসত করে ছয় ঋতুর উন্মনা ধারাপাত, মৃত্তিকার হৃৎপিণ্ড থেকে বেরোয় যে প্রথম দু'টি পাতা- একটি পুণ্যবতী শ্লোক, তিরতির হাসি- দোটানার ফুল! তুমি পুঁথির অঙ্কুর, জলের উপর দাঁড়ানো ভাঙচুর; শোন সুকল্যাণ, দূর করে আসি আমি ঝড়ুয়া তাজেল, এলোমেলো পরে নাও হংসবৎ ডানা- দেখো তোমার সমুখে কেমন জেগে ওঠে ঢেউয়ের প্রতিকূল। আমার শরণে দাহজলে তুমি প্রসন্ন মন্দিরা, তোমার চুলে গড়ে ওঠে বর্ষাবতী গোপন আসন, অঙ্গে তোমার সংকলিত শরতের টলমল, হাওয়া এসে দূরে যায় নীলের কারণ; পদকমলের আশায় ডিঙা বেয়ে যাই পতনের কারবারী, দিগন্তভরে ফুটে থাকো তুমি তারাবাজি সুর- বসন্তের দিগ্বলয়ে থোকা থোকা ভুলপ্রহরী- কৃষ্ণ বুঝি ডালে ডালে লুকিয়ে রাখে তোমার দিলকাঁপানিয়া শাড়ি!
ভাঙা হাট
হাট ছিল- শোরগোল ছিল, মঙ্গলবার বাজারে
বুন্দিয়া বাতি ছিল।
হাট ভেঙে গ্যাছে- মানুষগুলো নেই- এতোগুলো মানুষ!
শতসহস্র কথার হাড় পড়ে আছে, কথাদের নাকফুল পড়ে আছে!
জলকে ছল
আমার কাছে মহাভারতের কোন পরিচ্ছেদ থেকে উঠে আসে এমন বিষন্ন সুন্দর এক নারী – ভেবে হই অকূল ধীবর! ভাবি বহুবিধে – এক পারলৌকিক আনন্দ তারাদের খোঁপা খুলে আমার মর্মে এসে নামে! আর কিছু তো নাই ভাঙন গরীয়সী যমুনার তীর যে তোমাকে দেবো; লহো লহো তোমার কাছে পরাজিত হবার আমার অহিফেন; যদি দাও – দেহ পেতে নেবো আমি তোমার চন্দন কাঠ, বড় বড় শ্রমের বাজারে কর্মহীন বসেথাকা পোড়া মাটির ঘরামী যুবা,আর ঠাট্টার লতাগুল্মে আটক জলকে ছল চাঁদের জ্যামিতি নারী- মুখোমুখি দোঁহা। চলো গড়ে তুলি জলের নিচে মাছের স্বভাব- মহাভারতের শত কল্লোলে দাঁড়িয়ে আছো কালো নৌকার ধাপ! জল ও শামুকের নকশি কাঁথায় বুনি চলো ক্রীতদাস আর ক্রীতদাসীর পাপ!
আল আরাফ
নারী এখন আর নারী নয়, কেননা সে নারী; পুরুষ আর পুরুষ নয়, কারণ সে পুরুষ!
আমি মাঝামাঝি একটা জায়গা খুঁজি, অথবা একটাই মোকাম- খালি কাজের সুবিধার জন্য দুইটা নাম। হঠাৎ মনে পড়লো, এডগার অ্যালান পো হয়তো এমন একটা জায়গার সন্ধান দিতে পারবেন।
আমি অ্যালান পো-রে জিগাই, ভাই তুমি তো আল আরাফ লিখচো: বেহেস্ত আর দোযখের মাঝামাঝি না-স্বর্গ না-নরক; অথবা কিছুটা জান্নাত খানিকটা জাহান্নাম; আচ্ছা পো, ব্যাপারটা আমাকে একটু গুছিয়ে কও দেখি! এডগার অ্যালান পো পরিস্কার করে বলতে পারেননি।
এডগার অ্যালান পো এডগার অ্যালান পো নন, কেননা তিনি এডগার অ্যালান পো!

বাঙলায় যেভাবে শ্যামলা রঙ গৃহীত হয়
ইংরেজ আমলের শেষদিকে, এবং পরেপরে যেসব মেয়েরা কলেজের সীমানা ডিঙিয়েছে, কলেজ টপকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে পায়ের চিহ্ন ফেলেছে -তারা মোটের উপর সবাই শ্যামলাবরণ- যদিও কদাচিত জাহানারা ইমামের মত আকস্মিক ব্যতিক্রম থাকতেই পারে।
সেইসময় শ্যামলা রঙের বদলে যারা ফর্সা, সাদা রূপসী- তারা হাই ইস্কুলের সীমানা পেরুনোর আগেই বিয়েটিয়ে হয়ে রূপালি পানের বাটায় জর্দাপান চিবুতে চিবুতে বৈকালিক বিছানায় ভাতঘুমে শুতে চলে যায়। শ্যামলা মেয়েরা রিক্সায়, পায়ে হেঁটে কলেজ থেকে, ইউনিভার্সিটির ক্লাসশেষে বিকেলে তখনও বাড়ির দিকে ফেরে।
এভাবে শ্যামলা মেয়েরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় উৎরে সমাজকল্যাণ বিভাগে ঢোকে, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে।
তাঁদের ছেলেমেয়েরা দ্যাখে- তাদের জননী ব্লাউজ পরে, পেটিকোট পরে; ফলে কেবল মুখাবয়ব দেখেই বুঝতে হয়- তাঁরা শ্যামলা।
শ্যামলা মা তাঁর সন্তানকে বলেন: টেবিলের উপর চা রাখা আছে- চা খেয়ে পড়তে বসো। আদেশটি আটপৌরে নৈর্ব্যক্তিক, কিন্তু তার মূলে দৃঢ়তার বীজানু দানা বেঁধে থাকে- যা গোচরে একরোখা, কিন্তু অগোচরে দায়িত্বশীলভাবে দয়াশীল।
যে-কালো তাকেই আমরা আদর করে শ্যামলা বলি। এভাবেই কালোর ভিতর দিয়ে, শ্যামলা ডাকে স্নেহের পরিধির মধ্যে বাঙলায় শ্রমনিষ্ঠ মাতৃকল্যাণমুখী এক সমাজের শক্ত বুনিয়াদ গড়ে ওঠে।
এ-কারণেই কেউ লাঞ্চিত করলে অপমানে আমাদের মুখ কালো হয়ে ওঠে- মনের অজান্তেই আমরা আমাদের শ্রমনিষ্ঠ মায়ের দৃঢ়তা নিয়ে কালো নকশি কাঁথায় গঠিত হতে থাকি!
ভাঙা আধুলির ময়াল
আমি চাই না তোমার কথা আমার মনে পড়ুক, কিন্তু বারবার ঘুরেঘুরে তোমার কথা-ই মনে পড়ে। ভাবি, আমি মরুভূমির ধুলিঝড়ের ভিতর দিশাহারা- দিকভ্রান্ত হেঁটে যাই- আর চারদিকে নিস্তব্ধ গর্জনে বজ্রপাত হতে থাকে, ঝড়তুফান ছোটে। এতোক্ষণে আমার বুঝি খানিকটা সম্বিত ফিরে আসে, বুঝে উঠতে পারি: আমি একটি মৃতদেহ- ৪জন চণ্ডাল, বা ৪জন গোরখোদক আমাকে কাঁধে করে হাঁটুভাঙার মোড়ের দিকে যায়। এই প্রথম দেখি, আগে তো কখনও মরি নি- বুঝবোই বা কেমন করে- মৃতমানুষ সম্পূর্ণ মৃত নয়, যতদিন দুনিয়াতে কেউ- না-কেউ বেঁচে আছে ততোদিন একটি মানুষও মৃত নয়।
এই যে আমাকে বহনকারী বাহকেরা- তাদের সাথে আমার সাতজন্মেও পরিচয় ছিল না; কিন্তু তারা একদম আপনজনের টানে আনাকে বয়ে নিয়ে যায়- একটা কাঁচা আধুলিকে যেমন সম্ভ্রম দেখিয়ে দেখভাল করে- আমাকেও তেমনই মান্যিগন্যি করে বয়- স্টেশনের কুলিদের কাছে ব্যাগবেগেজ, গাটরিবোচকার যেরকম একটা উচ্চাসীন মূল্য- আমার মনে হলো চণ্ডালেরাও আমাকে কথিত উচ্চ মূল্যায়নে পোছে- আমি তো ঠাসঠাস করে প্রায় হেসেই ফেলেছিলাম; কেননা, একটু বাদেই আমাকে যখন তারা ভাঙা শ্মশানে, বা পড়ো একটা কবরখানায় নিয়ে ফেলবে তখন ঠিকঠিক বুঝবে আমার একটা কানাকড়ি সমান মূল্যও নেই; কেননা আমি ধুনফুন নই- আমি ছিলাম একজন সত্যিকার মুক্তিবাহিনীর ছেলে, অথবা মাওবাদী গেরিলা- যে ক্রসফায়ারে মরেছি! আমার বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই, কেননা আমি লোভে দীক্ষিত হই নি,কেবল স্বপ্ন দেখেছি; একজন নির্লোভ নিরীহ মানুষের চেয়ে বড় আতঙ্ক ক্ষমতারাজনীতির সামনে আর কিছু নেই। তাদের দরকার লোভী ফেউয়ের দঙ্গল।
আমি মরেছি; আমি চাই না- তোমার কথা মনে পড়ুক, কিন্তু ঘুরেঘুরে বারবার তোমার কথাই মনে পড়ে; তোমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী- আগে বুঝি নি- আকাঙ্ক্ষার নামই আত্মা- সে কখনোই মৃত নয়!
লোহা
তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আছি-আমি শূদ্র।
আমার হাতে নেই হাতিয়ার কোন,
আমাকে ছুঁতে দাও নি আদি পুস্তকের শ্লোক!
ফলে জানি না লোহার প্রতিভা কতোটা স্মৃতিবান!
আমি লোহাহীন মন্ত্রহীন পাহাড়ের খাদ
নিরস্ত্র মাটিমাখা ভাঙা চাহনি
হাত থেকে কেড়ে নিয়ে গ্যাছো
আমারই হাতের মিনার।
উপত্যকার কিনারে দাঁড়িয়ে আছি
একা লোহার পাত
তোমার বাতাবী মৌতাত, চিনিচম্পা ধানের বয়ান
তুলে আনবার আমি একা শঙখচিল, লোহা!
আশুরা দশুরা ও নিসর্গের নুন
পশ্চিমে যে ঋতু সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে তা ফল। ফলের বাঙলা কী- হেমন্তকাল? ঠিক জানি না, মিলানো মুশকিল।
ফল এলে মনে হয়- সারাদুনিয়া ঝলকে ওঠে ছিটকাপড়ের জামাপরা মেয়েদের কল্লোলে, হাসিঠাট্টায়; প্রিন্টের জামাপরা ছেলেদের রগড়ে,হল্লায়- আমাদের ঈদে দুর্গাপুজায় যেমন হয়। কিন্তু তার লাগোয়া পরতেই ঝরকা প্রকৃতির কোমর জড়িয়ে দুর্গাপুজার মতোই বিন্যস্ত হতে থাকে বিরহী রাগ চারুকেশী- এক অনিবার্য বিসর্জনের মনস্তাপ।
আমাদের লোকভাষা মা দুর্গাকে বলে দশুরা। দশুরা আশুরা কতো একান্নবর্তী শোনায়, ভাব তাৎপর্যের দিক থেকেও কতোই না নিকটবর্তী! প্রথাগত শিক্ষার বাইরে, বাঙলার পথের ধারে কৃষিলগ্ন অর্গানিক বুদ্ধিজীবী নারী-পুরুষের মুখে এমনও শুনেছি- আশুরা দশুরা দুই বোন।
শত ত্যাগের পরেও মানুষের জিজীবিষার শেষ থাকে না; তাদের বেঁচেবর্তে থাকার অনত নিষ্ঠা প্রকৃতির শিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে ওঠে, হারতে হারতে আবারও বেঁচে ওঠার, ভালোবাসার সাধ জাগে, দুঃখ পাবার প্রতীক্ষায় স্থির পাটাতনের উপর ফের এসে দাঁড়ায়।
ফলও এক রঙের আতসবাজি যেনবা; নিভে যাওয়াকে উদযাপন করার বাসনায় নিমেষী উল্লাসে মেতে ওঠা-ই তার ধর্ম, অচিরেই সব গাছ রঙের তারা-ঝিকমিক হারিয়ে হয়ে পড়বে নিঃসঙ্গ, একা ও শীতার্ত; এ-বেলায় রাঙা হয়ে জাগার ধুম পড়ে গ্যাছে তাই!
আমাদের মনস্তত্ত্বে এই নিভে যাওয়ার আতসবাজি সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে আশুরা ও দশুরায়। কী বিস্ময়কর নৈকট্য আর বোধিসত্ত্বের মিস্তিরিপনায় আমাদের লোকজ্ঞান এই দু'টো শব্দকে একসাথে কয়েন করেছে!
ফল- তার খিলিপান মুখে ছিটরঙে হাসে, দুর্গাপুজা আনন্দে স্ফূরণে বিসর্জনের রাখীবন্ধন- যে অশ্রুপাতে শুচি হয় ধরা, তাজিয়ার প্রতিজ্ঞা ও কল্যাণে হায় হোসেন, হায় হাসান মর্সিয়া আছড়ে আছড়ে পড়ে ক্ষতবিক্ষত প্রাণের বাগানে; সারা জমানা ভরে ওঠে ফলে, ঝরে পড়া, প্রতীক্ষা, আশুরা, দশুরা ও নিসর্গের নুনে।
নির্বিকার বিন্দুটি
কৃষ্ণ মাত্র ১৬বছর বয়সে বাঁশি বাজানো ছেড়ে দেন। তিনি যখনই বোঝেন রাধার মন তমাল গাছের একটি পাতা বুঝি কেঁপে উঠেছে, তখনই বাঁশিটি রাধার হাতে তুলে দিয়ে একটি দূরত্বের রঙে লুকিয়ে যান। এভাবেই লীলাবান কৃষ্ণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণে রূপান্তর লাভ করেন।
আবদুল হাই বৃষ্টির ফোঁটা হয়ে জলের ঢেউয়ে মিশে মৃগেল মাছের চোখের মণিতে সিদ্ধ হন; মৃত্যুকে পরিধান করে আবদুল হাই মেঘের ধামে বিদ্যুতের পদ্মহেমে লোকান্তরে মেশেন। রঙমালা বেগম প্রতিদিন গণক ডেকে দিশা গুণিয়ে দেখেন- কবে আহা, তার সাধু হাই বাড়ি ফিরবেন! চুলার আগুন একাএকা তরকারি পুড়ে ফেলে, কিন্তু তার আঁচ তাকে ঘুনাক্ষরে স্পর্শও করে না। এভাবে রঙমালা একটি স্থিরবিন্দু, নির্বিকার ঈশ্বর হয়ে ওঠেন।
সন্ধ্যা গড়িয়ে ঢালুতে নামতেই প্রতিদিন নিরুপমা পিসিমার জ্যোৎস্নার ডালি সাজাতে ইচ্ছা করে। দুধেদুধে অন্ধ দুনিয়া দেখতে নিরুপমা পিসিমা ঝামায় কাসার থালাটি ঘষেন- ফলে থালা ঝকমক করে ওঠে। কাহার তরে জানি মায়াপাত্রে জ্যোৎস্না তুলতে দরজার দিকে যান। পিসিমা ভুলে যান, কবেই ওই দরজা আদিঅন্ত কালের জন্য বন্ধ হয়ে গ্যাছে!
পিসিমা নির্বিকার। নিরুপমা পিসিমা এভাবেই ভগবান হয়ে ওঠেন।