Published : 10 Apr 2026, 08:14 PM
সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে আসা নারী নেত্রীদের সরব উপস্থিতি ও উচ্ছ্বাসে শুক্রবার মুখর ছিল রাজধানীর নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়।
ফরম সংগ্রহ করতে আসা নেত্রীরা বলছেন, বিগত ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের সময় দেড় যুগের আন্দোলনে সম্পৃক্ত ‘ত্যাগীরা’ সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পাবেন, এমন প্রত্যাশা তাদের।
এ দিন সকাল থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নারী নেত্রী ও তাদের অনুসারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। বেলা ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত এক ঘণ্টাতেই ফরম বিক্রি হয় শতাধিক। লাইন ধরে নেত্রীরা নিজেই ফরম নেন।
দলের সহ দফতর সম্পাদক তারিকুল ইসলাম তেনজিং বলেন, বিকাল ৪টা পর্যন্ত মোট চার শতাধিক ফরম বিক্রি হয়েছে।
এ দিন ফরম কিনতে এসেছিলেন বিএনপির তৃণমূলের নেত্রী থেকে শুরু করে শিক্ষক, আইনজীবী, শিল্পী, ছাত্রদলের সাবেকরা।
তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন- ডা. খন্দকার আখতারা খাতুন লুনা, শিরিন সুলতানা, হেলেন জেরিন খান, শিল্পী বেবি নাজনীন, শিল্পী রিজিয়া পারভীন, বিলকিস ইসলাাম, নিপুণ রায় চৌধুরী, সানজীদা ইসলাম তুলি, পেয়ারা মোস্তফা, শাহজাদী আখতার পাঁপড়ি।

ফরম সংগ্রহের লাইনে ছিলেন অনেক সাবেক সংসদ সদস্যও।
বেলা ১১টায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী ফরম বিক্রির কার্যক্রম শুরু করেন। প্রথম ফরমটি তিনি তুলে দেন জেরিন দেলোয়ার হোসেনের হাতে। দ্বিতীয় ফরমটি নেন ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক কাজী আসাদুজ্জামান আসাদের স্ত্রী ফাতেমা আসাদ।
এ সময় রিজভী বলেন, “বিগত ১৬/১৭ বছরের আন্দোলনের ভূমিকা, দক্ষতা এবং পার্লামেন্টে কথা বলার দক্ষতাসহ অন্যান্য যেসব যোগ্যতা থাকা দরকার, সবগুলো বিবেচনা করেই দলের নীতি নির্ধারণী ফোরাম বা পার্লামেন্টারি বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবে, কারা চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবেন।
“পার্লামেন্টারি বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তা সবাইকে মান্য করতে হবে। এটা (মনোনয়ন) আমি পেলাম না এবং ও পেল বলে এক ধরনের মানে বিশ্রী পরিবেশ তৈরি করা যাবে না।”
মনোনয়ন ফরমের মূল্য ধরা হয়েছে ২ হাজার টাকা। ১২ এপ্রিল পর্যন্ত ফরম ওঠানো এবং জমা দেওয়া যাবে। জমা দেওয়ার সময় প্রার্থীদের ৫০ হাজার টাকা জমানত জমা দিতে হবে।
‘আমার জীবন বিএনপিকে নিয়ে’
এ দিন মনোনয়ন ফরম তুলেছেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন মেয়ে ডা. খন্দকার আখতারা খাতুন লুনা।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে বলেন, “আমি বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ছোটবেলা থেকে বিএনপি করি। বাবার পাশে থেকে এই দলকে দেখেছি। আমার গোটা পরিবারই বিএনপির রাজনীতি করে। আমরা মনে প্রাণে এই দল, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ভালোবাসি।
“সর্বপরি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাদের পথ প্রদর্শক। তার দর্শণ নিয়েই আমরা সামনে এগিয়ে যাব। আমার জীবন বিএনপিকে ঘিরে, আমার মন বিএনপিকে নিয়ে। আমার এলাকা মানিকগঞ্জের মানুষজন চায় আমি সংসদ সদস্য হই।”
এক-এগারোর কঠিন সময়ে খন্দকার দেলোয়ার হোসেন বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন। ওই সময়ের কথা বলতে গিয়ে লুনা ও তার ছোট ভাই খন্দকার আকতার হামিদ পবনকে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তে দেখা যায়।
মনোনয়ন সংগ্রহ করা জেরিন দেলোয়ার হোসেন বলেন, “আমি কাজ করতে চাই, এটাই আমার প্রত্যাশা। আমি মহিলাদের জন্য, কন্যা শিশুদের জন্য ৩০ বছর ধরে কাজ করে আসছি একটা ইন্টারন্যাশনাল প্লাটফর্ম থেকে। আমাদের চুপ থাকার সময় চলে গেছে। এখন কথা বলতে হবে। দেখাতে হবে যে, আমরা ‘না’ বলতে পারি।”

মহানগর দক্ষিণ বিএনপি নেত্রী আরিফা সুলতানা রুমা বলেন, “আসলে আমি একজন নির্যাতিত নারী। কারণ এক-এগার থেকে শুরু করে বিগত ৫ অগাস্ট পর্যন্ত আমি আন্দোলন-সংগ্রামে ফুলটাইম মাঠে ছিলাম। আমি জানি আসলে তৃণমূলের যে হাহাকার। তৃণমূলের সঙ্গে কাজের সেই অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে।
“আমি বিশ্বাস করি, দল যদি আমাকে দায়িত্ব দেয়, আমি তৃণমূলের সঙ্গে মিশে থেকে কাজ করতে পারবো। আর আমি ব্যক্তিগতভাবে একজন আইনজীবী। আমি নারীদের জন্য কাজ করি এবং ভবিষ্যতেও দল আমাকে দায়িত্ব দিলে নারীদের জন্য কাজ করব।”
শওকত আরা আখতার বলেন, “দল যদি আমাকে নির্বাচিত করে মহিলা এমপি হিসেবে, তাহলে আমার এলাকায় কাজ করতে চাই। আমার এলাকা শরীয়তপুরের অবহেলিত একটা জনপদ। সেই অবহেলিত জনপদে যেসব নিঃস্ব, অসহায়, অবহেলিত নারীরা আছেন, তাদের জন্য আইনি সহায়তা দিতে আমি আইনজীবী হিসেবে কাজ করতে চাই।”
কণ্ঠশিল্পী রিজিয়া পারভীন নিজের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে বলেন, “ছোটবেলা থেকে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত থেকে অনেক পুরস্কার পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তখন থেকেই বিএনপির প্রতি আমার ভাললাগা। এরপরে আমার সৌভাগ্য হয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার সান্নিধ্য পাওয়ার। আমি চেষ্টা করেছি তার মত হওয়ার।
“একজন শিল্পী হিসেবে আমি সারাদেশে আমার দেশকে আমি রিপ্রেজেন্ট করেছি। দল যদি আমাকে মনে করে, আমি কাজ করে যাব। যদি নাও মনে করে, তবু অসুবিধা নেই। আমি সারাজীবন এই দলের সাথেই আছি, এই দলের সাথে থেকেই মরে যেতে চাই।”
মনোনয়ন ফরম নেওয়া ঢাকা মহানগর মহিলা দলের নেত্রী মেহেরুন্নেসা হক বলেন, “আজ এত বছর পরে মনে হয় যেন প্রাণ ফিরে আসছে। এত যুদ্ধ করার পরে এবার মনে হয় যেন সংসদে যেতে পারব।”
“আমার দল যাকে ভালো মনে করে, যাকে যোগ্যতাসম্পন্ন মনে করে তাকে মনোনয়ন দেবে। আমরা আশা করি, নারীরা যেন যেন একে একে এভাবে এগিয়ে যেতে পারে।”
মহিলা দলের নেত্রী ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, “যারা নির্যাতিত তাদেরকে অবশ্যই এবার মূল্যায়ন করা উচিত। কারণ ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে মেয়েদের যে ভূমিকা ছিল তা অতুলনীয়। এদেরকে মূল্যায়ন করা উচিত। আমি মনে করি, আগামীদিনে এরাই হচ্ছে দলের খাঁটি সোনা। এদেরকে দল যদি মূল্যায়ন করে, তাহলে দলের দুর্দিন বা সুদিন, যে কোন সময় তারা নিষ্ঠার সঙ্গে দলকে এগিয়ে নেবে।”
গত বুধবার সকালে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মনোনয়ন দাখিলের শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ এপ্রিল। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ২২ ও ২৩ এপ্রিল। বাছাই নিয়ে কোনো আপত্তি থাকলে আপিল করা যাবে ২৬ এপ্রিল। সেই আপিল নিষ্পত্তি করা হবে ২৭ ও ২৮ এপ্রিল।
চূড়ান্ত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে ৩০ এপ্রিল। এরপর ভোটগ্রহণ হবে আগামী ১২ মে।
ইসি বলছে, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আসন বণ্টনে বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াতে ইসলাম জোট ১৩টি, স্বতন্ত্ররা মিলে পাবে একটি আসন।
পুরনো খবর