Published : 08 Feb 2026, 01:13 AM
ভোলার মনপুরার বাসিন্দা আব্দুর রহিম ফরাজি একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী। তার মত এলাকার আরও অনেকে ভোট দিতে উৎসুক হয়ে আছেন। এতদিন পর্যন্ত ঠিকঠাকই ছিল সব। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের মধ্যে শুক্রবারের সংঘর্ষের পর কিছুটা বদলে গেছে এলাকার পরিস্থিতি।
তার মতে ‘সুযোগসন্ধানী’ একটি রাজনৈতিক দল পরিস্থিতি ‘ঘোলাটে করার’ চেষ্টা করছে। এরপরও ‘যে যা-ই করুক’ মানুষ ভোট দিতে যাবে।
প্রত্যন্ত দ্বীপ উপজেলা মনপুরায় শুক্রবার নির্বাচনি প্রচারের সময় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে ওই সংঘর্ষে অন্তত আটজন আহত হন।
এর ঠিক এক সপ্তাহ আগে ৩১ জানুয়ারি একই জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় প্রচারকে কেন্দ্র করে এ দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হন অন্তত ১৫ জন।
উভয় ঘটনাতেই একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এনেছে দল দুটি। ভোটের সময় যত এগিয়ে আসছে শুধু এ দ্বীপ জেলা নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানেই সংহাত হচ্ছে।
শনিবার মুন্সীগঞ্জ সদরে নির্বাচনি প্রচারণা নিয়ে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত দুজন গুলিবিদ্ধ হয়। এদিন ময়মনসিংহেও হামলা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছেন জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
ভোটের আর সপ্তাহ খানেকের কম সময় বাকি থাকার মধ্যে শুক্রবার রাজধানী বাড্ডার এক এক বাসা থেকে ১১টি বিদেশি পিস্তল ও গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। এসময় আটক ব্যক্তি শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের সহযোগী বলে তথ্য দিয়েছে পুলিশ।
অপরদিকে শনিবার ফরিদপুরে পুকুর সেচে সাতটি আগ্নেয়াস্ত্রসহ বিপুল দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে যৌথ বাহিনী।
দেশজুড়ে প্রচারণার সময় এমন সংঘর্ষ আর অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘিরে সামনে ‘সহিংসতা বাড়ার’ আশঙ্কাও করছেন বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।
তবে এমন ঘটনাকে ‘নির্বাচনি টুকটাক’ ঘটনা বলে মন্তব্য করেছেন ভোলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “নির্বাচনে টুকটাক কিছু প্রচারে কিছু ঘটনা হয়। এরকম ছাড়া আমাদের এখানে বড় কোনরকম কিছু হয়নাই। প্রত্যেকটা মুহূর্ত আমাদের মনিটরিং করা হচ্ছে।”
তার এলাকায় ভোটের ‘পরিবেশ খুবই ভলো’ এবং ‘কোনো ঝুঁকি নেই’ বলে দাবি করেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
রোববার থেকে মাঠে নামছে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এর আগে সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে শনিবার উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে সন্তোষ প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, “সারাদেশে অত্যন্ত উদ্দীপনা, শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচনি প্রচারণা চলছে। কেউ কারও বিরুদ্ধে কটু কথা বলছে না, কোনো অভদ্র আচরণও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এটি আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তন।”
সরকারপ্রধান ভোটের পরিবেশ নিয়ে বেশ আশাবাদী হলেও প্রায় অর্ধেক ভোটকেন্দ্রে ঝুঁকি দেখছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। মোট ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৫ হাজার ৩৩২টি ঝুঁকিপূর্ণ বলে গত মাসের মাঝামাঝিতে তথ্য দেন তিনি। এগুলোর মধ্যে ৮ হাজার ৭৮৪টি অধিক ঝুকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করার কথা বলেন তিনি।
বাড়তি চ্যালেঞ্জ কী
একসময় একই জোটে থাকা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এবার ভোটের মাঠে প্রধান প্রতিপক্ষ। প্রচারের মধ্যে প্রতিনিয়ত কথার লড়াইয়ের উত্তাপ মাঝেমধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে তৃণমূলে, বাঁধছে সংঘর্ষ, ঘটছে প্রাণহানিও।
দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় সংঘাতের খবরের মধ্যে দরজায় কড়া নাড়ছে নির্বাচন।
অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ‘কাঙ্ক্ষিত উন্নতি’ করতে পারেনি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখনো চলমান থাকা ‘মবের’ ঘটনার প্রভাব নির্বাচনেও ‘পড়তে পারে’ বলে আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।
তারা মনে করছেন, যেসব আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে ‘শক্তির প্রতিযোগিতা’ হবে, সেখানে সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে বিবাদের জেরও রূপ নিতে পারে সহিংস সংঘাতে।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘শেষ অব্দি’ এই পরিস্থিতি কতটা সামাল দিতে পারবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী?

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের ওপর হামলা, থানা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করে পুলিশের অস্ত্র লুটের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। এর বাইরে তখন আন্দোলন দমাতে বলপ্রয়োগ করে অনেকেই বিচারের মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি সমালোচনায় পড়ে পুরো বাহিনী।
দেড় বছর পর সে ঘটনার রেশ এখনও পুরোপুরি দূর না হওয়ার কথা তুলে ধরে সপ্তাহখানেক আগে পুলিশ সদর দপ্তরে অভ্যন্তরীণ এক অনুষ্ঠানে খোদ বাহিনীর প্রধান আইজিপি বাহারুল আলম বলেছেন, তারা বাহিনীর সদস্যদের মনোবল ‘চাঙ্গা করতে’ এবং জনগণের ‘আস্থা পুনরুদ্ধারে নিরলস’ কাজ করে যাচ্ছেন।
তবে নির্বাচনে পুলিশ ‘পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্ববোধের’ প্রমাণ রাখতে ‘সক্ষম হবে’ বলে বিশ্বাস তার।
অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “এখন পর্যন্ত যে পরিস্থিতি আছে সেক্ষেত্রে তেমন ঝুঁকি দেখছি না, তবে ঝুঁকিটা সামনের কয়েকদিন বাড়বে। নির্বাচনের দিন পর্যন্ত প্রচণ্ড পরিমানে বাড়বে।”
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযু্ক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের এই চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা যে পরিস্থিতিতে আছে, ঝুঁকিগুলো সামনে চলে আসলে বাহিনীগুলোর পক্ষে ‘মোকাবিলা করা কঠিন’ হয়ে যাবে।
তবে ‘আত্মবিশ্বাসের কথা’ জানিয়ে শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে আইজিপি বাহারুল বলেন, “গত ৫০ বছরের ইতিহাসে এত কম সহিংসতা কোথাও হয় নাই। এত কম আশঙ্কাও কখনো ছিল না, সবসময় এরচেয়ে বেশি ছিল।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হকের মতে, ভালো নির্বাচনের প্রশ্নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যতটুকু সক্ষমতা তৈরি হয়েছে ‘ততটুকু নিয়েই’ নির্বাচন করতে হবে। চাইলে এর চেয়ে ভালো করা যেতো, কিন্তু হয়নি বলে ‘ঝুঁকি রয়েছে’।
তিনি বলেন, “এ অবস্থায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সকল পক্ষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। একটি ভালো নির্বাচনের জন্য পরিবেশ পরিপূর্ণ হয়েছে বলতে পারছি না, তবে তৈরি হওয়া পরিবেশ খুব খারাপ বলারও সুযোগ নেই। পরিবেশ ও পরিস্থিতির ক্ষেত্রে একটা মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে।”

সহিংসতায় ঘটছে প্রাণহানিও
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি এবং এ হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের নানান কর্মসূচী ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভোটের মাঠে ‘বাড়তি চ্যালেঞ্জে’ ঢাকার পুলিশ। এর প্রভাব দেখা গেছে দেশের অন্যান্য স্থানেও।
ঢাকার বিজয়নগরে গত ১২ ডিসেম্বর হাদিকে গুলি করা হয়। পরে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
সবশেষ গেল ২৮ জানুয়ারি শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শেরপুর-৩ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বাগবিতণ্ডার থেকে সংঘর্ষে জড়ান বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীরা। এ ঘটনায় আহত জামায়াতের শ্রীবরদী উপজেলার সেক্রেটারি রেজাউল করিম চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেদিন রাতেই মারা যান।
এরমাঝে গত ২৪ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে জাসাস নেতা ফরিদ সরকার হত্যা ও ১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলায় স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক নজরুল ইসলাম হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
এছাড়া কিশোরগঞ্জ-২ আসনের কটিয়াদি উপজেলার আচমিতা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. কামাল উদ্দিন এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চনে আজাহর নামে এক স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নিহত হন।

নির্বাচন কেন্দ্রিক প্রচারণার সময় গত এক সপ্তাহে প্রতিপক্ষের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনকে ঘিরে দেশে ২৭৪টি নির্বাচনি সহিংস ঘটনার তথ্য দিয়ে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর গত সোমবার বলেছে, এসব ঘটনায় হত্যাকাণ্ড হয়েছে পাঁচটি।
তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে, তফসিল ঘোষণার পর ৩৬ দিনে সারাদেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ‘সবচেয়ে দুর্বল’ জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান তাদের এ বিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের অনুষ্ঠানে বলেছেন, নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ‘অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কা’ থাকলেও নির্বাচনি ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার যে প্রবণতা সবসময় ছিল, সেটি ‘অব্যাহত আছে’ বলে মনে করেন তিনি।
সুষ্ঠু বা নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে কি না- এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “অর্থ, পেশীশক্তি এবং ধর্ম- এই তিন শক্তির অপব্যবহার প্রকট হওয়ার দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে। যার ফলে বাস্তবে সমান প্রতিযোগিতাসহ কতটুকু সুষ্ঠু নির্বাচন হবে, সেটি আমাদের দেখার বিষয়।”
নির্বাচনি সহিংসতা বিষয়ক এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমরা মনে করি যে, এখন থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি শুধু না; তার পরবর্তী বেশ কিছুদিন পর্যন্ত সহিংসতার ঝুঁকি রয়ে গেছে।”
এদিকে মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) শুধু জানুয়ারিতেই পৃথকভাবে ৬৪টি নির্বাচনি সহিংসতা ও ২৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার তথ্য দিয়েছে। যেখানে এসব সহিংসতায় যথাক্রমে ৪ জন ও ৬ জনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে।
তারা বলেছে, “এটি প্রমাণ করে যে, জানুয়ারি মাসে নির্বাচনি প্রক্রিয়া কার্যত প্রাণঘাতী সহিংসতার দিকে যাচ্ছে।”
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ও নিজেদের সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে এমএসএফ বলছে, নির্বাচনি সহিংসতার ৬৪টি ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৩টি বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষের।
এমন প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গত সপ্তাহে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে দেশে নির্বাচনকেন্দ্রিক সংহিসতার ঘটনা কিছু ঘটলেও সেটি ‘বাড়ছে না’ বলে দাবি করেন।
তার ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতিমধ্যে মাঠে নেমেছে, সব কিছু ‘নিয়ন্ত্রণে আছে’।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র, পুলিশের পরিকল্পনা
ঝুঁকিপূর্ণ, অধিক গুরুত্বপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ ভোট কেন্দ্রগুলোকে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশ লাল, হলুদ ও সবুজ হিসেবে চিহ্নিত করে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, তার এলাকায় ১৪৩০টি কেন্দ্রকে লাল হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হলুদ কেন্দ্র ৩০২১টি এবং ২ হাজার ১৯৬টি কেন্দ্র সবুজ।
ঢাকা মহনগরের ভোট কেন্দ্রগুলোকে ‘গুরুত্বপূর্ণ ও সাধারণ’ হিসেবে ভাগ করার কথা বলেছেন পুলিশ কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত হোসেন।
ডিএমপিতে মোট ২ হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৭৫ ভাগই গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ডিএমপির একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এলাকাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো যাচাই করে ১ হাজার ৬১৬ গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি ৫১৫টি কেন্দ্র সাধারণ।
ওই কর্মকর্তা ৩৭টি কেন্দ্রকে ‘বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে নজরদারিতে রাখার কথা বলেছেন।

পুলিশের এ দুই ইউনিটের মত রেঞ্জ, জেলা ও মহানগরভেদে ঝুকিপূর্ণ কেন্দ্রে বিশেষ নজর রাখা হবে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর এবার সারাদেশে ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৫ হাজার ৩৩২টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করার কথা বলেছেন।
পুলিশ নজর রাখবে যেভাবে
প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ইনচার্জ হিসেবে একজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। থানায় স্ট্রাইকিং টিম ও মোবাইল টিমগুলো স্ট্যান্ডবাই থাকবে। কোথাও কোনেরা সমস্যা হলে তারা দ্রুত সেখানে যাবেন। সঙ্গে প্রয়োজনে সেনা ও বিজিবি থাকবে।
ভোলার পুলিশ সুপার শরীফুল হক বলেন, “কেন্দ্রভিত্তিক পুলিশ ও আনসার মিলিয়ে আমাদের ১৭ জন করে থাকবে। এর পাশাপাশি যেগুলো চর এলাকা সেখানে কোস্টগার্ড টিম হিসেবে থাকবে। আমাদের মোবাইল পার্টি থাকবে, সব জায়গায় আমাদের নিরাপত্তা পরিকল্পনা আছে।“
তার এলাকায় ঝুঁকি না থাকার দাবি করে তিনি বলেন, “রেসপন্সটা সবাই মিলে আমরা একসাথে করতেছি। আমরা প্রত্যেক প্রার্থীকে গানম্যান দিয়েছি। এবার বডি ওর্ন ক্যামেরা ও সিসি ক্যামেরা থাকবে। কেউ কিছু যদি করে সবকিছু রেকর্ড থাকবে, কোনকিছু করার সুযোগ নাই। মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য উৎসুক হয়ে আছে।”
রাঙামাটি জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ইতোপূর্বে পুলিশ দায়িত্বের বাইরে গিয়ে অনেক কিছু করেছে, যার কারণে সমালোচনায় পড়েছিল পুলিশ। এবার আর সেটি করবে না।
নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতি প্রায় শেষ হওয়ার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, “যাদের ভিন্ন বিভাগ বা জেলায় দায়িত্ব পড়েছে তারা শনিবার গন্তব্যে রওনা হয়ে গেছেন।”
অবৈধ অস্ত্র নিয়ে ‘শঙ্কা’
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গণঅভ্যুত্থানের সময় থানাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র আর ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮ রাউন্ড গুলি লুট হয়। যেগুলোর মধ্যে ১ হাজার ৩৩১টি অস্ত্র এবং ২লাখ ৫৭ হাজার ১৪৪ রাউন্ড গুলি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
নির্বাচনি সহিংসতার মধ্যে এর বাইরেও সীমান্ত দিয়ে দেশে অবৈধ অস্ত্র দেশে আসার তথ্য পেয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র আসার তথ্য পেয়ে দেশের সীমান্তবর্তী ৩৫ জেলার পুলিশ সুপারকে নজরদারি ও অভিযান বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সীমান্তে যারা অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত, তাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
ইনকিলাব মঞ্চের ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরদিনই ১৩ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিতের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ-২’ চালুর ঘোষণা দেন।
এ অভিযানে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে ২৪ হাজার ৬২০ জন গ্রেপ্তার এবং ৬৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

প্রথমবারের মত কেন্দ্রে থাকবে সেনা
এর আগের নির্বাচনের মাঠে নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনা সদস্যরা ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও এবার প্রথমবারের মত সরাসরি ভোটকেন্দ্র প্রাঙ্গণেও দায়িত্ব পালন করবে বলে জানিয়েছে সেনা সদর।
বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে সেনা সদরের সামরিক অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, সবাই যাতে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারে সেজন্য এ ব্যবস্থা।
তিনি বলেন, এবার এক লাখ সেনা সদস্য মোতায়েন থাকবে। আগের নির্বাচনগুলোতে এ সংখ্যা ছিল ৪০ থেকে ৪২ হাজার।
সেনাবাহিনী এবার ৬২টি জেলার ৪১১টি উপজেলায় মোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে।

স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে থাকছে র্যাবও
আইনশৃঙ্খলার সামগ্রিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফুটপেট্রোল, মোবাইল পেট্রোল, চেকপোস্ট, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করবে এ ইউনিটের সদস্যরা। রিটার্নিং অফিসারের চাহিদার প্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে মাঠে থাকার কথা বলেছে র্যাব।
এর পাশাপাশি হেলিকপ্টার, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুততম সময়ে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত থাকবে।
কোথাও দ্রুত যেতে হলে হেলিকপ্টার, কোনো কেন্দ্র ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণের জন্য ড্রোন ও কোথাও দ্রুত সুইপিংয়ের প্রয়োজনে ডগ স্কোয়াড কাজ করার তথ্য দিয়েছে র্যাব।
এর বাইরে যেকোনো ভোটকেন্দ্রে ‘অপ্রীতিকর পরিস্থিতি’ তৈরি হলে প্রয়োজনে যৌথ বাহিনীর অপারেশনের জন্য প্রস্তুত থাকার কথা বলা হয়েছে ইউনিটের তরফে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, প্রতিটি কেন্দ্রকে র্যাবের একটি টিমের আন্ডারে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। ১৫টি ব্যাটালিয়নকে এমন কিছু টিমে ভাগ করা হয়েছে।
মাঠে থাকবে বিজিবির ৩৭ হাজার সদস্য
নির্বাচনে দেশজুড়ে বিজিবির ৩৭ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েনের তথ্য দিয়েছে সদর দপ্তর।
তবে দুর্গম বিবেচনায় তিন পার্বত্য জেলার ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিজিবি সদস্যদের বাড়তি নজর থাকবে। সেখানে ১০৮ প্লাটুন (২ হাজারেরও বেশি) বিজিবি সদস্য নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে।
বিজিবি মূলত ‘মোবাইল ও স্ট্যাটিক ফোর্স’ হিসেবে দায়িত্বে থাকবে। উপজেলা ভেদে ২ থেকে ৪ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন থাকার কথা রয়েছে।
ময়মনসিংহ-৬: হামলা নিয়ে জামায়াত ও 'বিদ্রোহী'র পাল্টাপাল্টি অভিযোগ