এইডস প্রতিরোধে কেন পিছিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা

১৯৯৬ সালে বিশ্বজুড়ে এইডস আক্রান্ত হয়ে চার কোটির বেশি মানুষ মারা যায়। যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 1 Dec 2022, 06:53 PM
Updated : 1 Dec 2022, 06:53 PM

বেড়েছে সচেতনতা, গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে নতুন করে এইচআইভি/এইডস আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাসে পেয়েছে। কিন্তু ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায়। 

অনেকদিন আগেই বিশ্ব এইডস মহামারীর চূড়া দেখে ফেলেছে। বিবিসি জানায়, ১৯৯৬ সালে বিশ্বজুড়ে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে চার কোটির বেশি মানুষ মারা যায়, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। 

তারপর অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে, এগিয়ে গেছে বিশ্ব। ২০১০ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে নতুন করে এইচআইভি আক্রান্তের হার হ্রাস পেয়ে ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে। 

যদিও একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে বিশ্বের অন্যান্য জায়গার চেয়ে এইচআইভি/এইডস রোগী তুলনামূলক কম হলেও নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। 

এর বাইরে বিশ্বে আর মাত্র তিনটি অঞ্চলে এখনও এইডস আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। ওই তিন অঞ্চল হল: পূর্ব ইউরোপ, মধ্য এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকা। 

কী কারণে ওইসব অঞ্চলে এইচআইভি সংক্রমণ বাড়ছে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে বিবিসি। 

পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব: 

যদিও মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে নতুন করে এইডস আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার কারণ হিসেবে রোগ শনাক্তের পরীক্ষা (টেস্ট) বাড়ার কথা বলা হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা আরো অনেক বেশি জটিল।

বৈরুতে আমেরিকান ইউনিভার্সিটির এইচআইভি বিশেষজ্ঞ নাসরিন রিজক বলেন, ‘‘টেস্টের হার বাড়ার কারণে আমরা যেসব রোগীর সংখ্যা বাড়তে দেখছি তারা কেউই পুরাতন আক্রান্ত নন। বরং তারা নতুন করে সংক্রমিত হয়েছেন। এবং এটাই বলে দিচ্ছে, ওই অঞ্চলে এইচআইভি ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। 

‘‘এটা ঠিক, সেখানে এইচআইভি সম্পর্কে সচেতনতা আগের তুলনায় বাড়ছে। কিন্তু এখনো সেটা যথেষ্ট নয়।” 

ঠিক কখন একজনের দেহ থেকে আরেক জনের দেহে এইচআইভি সংক্রমণের বিস্তার ঘটতে পারে সে সম্পর্কে ওই অঞ্চলে ‘সঠিক বিজ্ঞানভিত্তি তথ্য’ পাওয়ায় এখনো ঘাটতি রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। 

বিবিসি অ্যারাবিক থেকে একটি প্রতিনিধি দল বৈরুত ও কায়রোর সড়কে লোকজনদের প্রশ্ন করেছিল তারা এইচআইভি সম্পর্কে কতটুকু জানেন এবং কিভাবে এই রোগের বিস্তার ঘটে বলে তারা বিশ্বাস করেন। 

জবাবে অর্ধেকের বেশি মানুষই বলেছেন, তারা এইচআইভি বা এইডস সম্পর্কে ‘খুব বেশি কিছু জানেন না’। কেউ কেউ তো বলেছেন, তারা এ সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানতেও চান না। 

তারা মনে করেন, তারা যত কম জানবেন তত এই রোগ থেকে ‘তিনি এবং তার প্রিয়জন দূরে থাকবে’। 

যারা মাদক গ্রহণ করে, সমকামী পুরুষ, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ এবং যৌন কর্মীরা এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। 

এইডসকে ঘিরে অপবাদ-কলঙ্ক: 

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় এইচআইভি/এইডস আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সেখানে এই রোগের চিকিৎসার হার বিশ্বে সবচেয়ে কম। 

ইউএনএইডস এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় এইচআইভি আক্রান্ত মাত্র ৫০ শতাংশ মানুষ চিকিৎসার সুযোগ পান। 

নারীদের বেলায় এই হার আরও কম, মাত্র ৪৪ শতাংশ। আর শিশুদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৪০ শতাংশ। 

যদিও সারা বিশ্বেরই এইডসের চিকিৎসা এখন হাতের নাগালে। কিন্তু এইচআইভি/এইডস নিয়ে অপবাদ, কলঙ্কের ভয়ে লোকজন পরীক্ষা করাতে এবং ‘পজিটিভ’ হলে চিকিৎসা নিতে দ্বিধায় থাকে। 

যার ফলে, মাত্র ৬৭ শতাংশ এইচআইভি আক্রান্ত জানতে পারেন তার এই রোগ রয়েছে। 

ইউএনএইডস আরো জানায়, ২০২১ সালে মোট এইচআইভি আক্রান্তের মাত্র ৪১ শতাংশের রোগ শনাক্ত হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বিবিসি-কে বলেন, গত পাঁচ বছর ধরেই তার সন্দেহ ছিল তিনি এইচআইভি আক্রান্ত। কিন্তু মাত্র গত বছর তিনি সাহস করে পরীক্ষা করান এবং ফলাফল ‘পজিটিভ’ আসে। 

তিনি বলেন, ‘‘আমি এখনও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ এবং যতদিন ওষুধ খাব ততদিন নিশ্চয়ই সুস্থ থাকব। তবে আগেভাগে রোগ শনাক্ত হওয়া আমার মানসিক ও দৈহিক উভয় স্বাস্থ্যের বেলায় পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।” 

এই ব্যক্তি একজন সমকামী পুরুষ এবং তার দেশে সমকাম নিষিদ্ধ এবং অপরাধ বলে গণ্য হয়। তিনি মনে করেন, যেসব দেশে সমকাম অপরাধ ওই সব দেশের মানুষরা পরীক্ষা করাতে ভয় পায়। কারণ, তারা সমাজে কলঙ্কিত হওয়া কিংবা বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আতঙ্কে থাকে। 

অসমতা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা না থাকা: 

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের ইউএনএইডস এর চিকিৎসক শিরিন এল ফেকি বলেন, বর্তমানে বিশ্বে এইডসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে অসমতা। এর করণে মানুষ এইচআইভি’র চিকিৎসা নিতে পারছেনা এবং এই রোগ প্রতিরোধ করতে পারছেনা। 

এই অসমতর একটি কারণ পরিষ্কারভাবেই দারিদ্র এবং শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবার সুযোগ না থাকা। আরেকটি কারণ হচ্ছে কঠোর সব আইন এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর দমনপীড়ন। 

সাব-সাহারা আফ্রিকার দেশগুলো যেখানে সমকাম নিষিদ্ধ, ওই সব দেশের মানুষরা যেসব দেশে সমকাম বৈধ তাদের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি এইডস আক্রান্ত হয়। 

ইউএনএইডস এর চিকিৎসক শিরিন এল ফেকি বলেন, ‘‘এক্ষেত্রে আপনি এগিয়ে আসতে এবং নিজের অবস্থা প্রকাশ করতে চাইবেন না। 

তার মতে, ঠিক একইভাবে লিঙ্গবৈষম্যও এক্ষেত্রে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে নারী ও মেয়ে শিশুরা এইডস মোকাবেলায় ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পড়ে যায়।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক