রাশিয়া, ইরান ও এআই এর হুমকি নিয়ে যুক্তরাজ্যকে গোয়েন্দা প্রধানের সতর্কবার্তা
লন্ডনে এমআইফাইভ গোয়েন্দা সংস্থার সদরদপ্তরের বার্ষিক ভাষণে সংস্থাটির প্রধান বলেন, হুমকি মোকাবেলায় এখন তাদেরকে স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের চেয়েও বেশি সম্পদ ব্যয় করতে হচ্ছে।
রাশিয়া, ইরান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টি করছে। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআইফাইভ- এর প্রধান কেন ম্যাককালাম বলেছেন, এই হুমকি মোকাবেলায় এখন স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের চেয়েও বেশি সম্পদ ব্যয় করতে হচ্ছে।
তিনি রাশিয়াকে ‘এক নম্বর আগ্রাসী শক্তি’ আখ্যা দিয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে লন্ডনে এমআইফাইভের সদরদপ্তরের বার্ষিক ভাষণে ম্যাককালাম বলেন, বর্তমানে তাদের সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযান এবং বিদেশি রাষ্ট্র থেকে আসা হুমকির বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান- দুয়ের পরিধি বা কাজের চাপ অনেকটা সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারণ, গত এক দশকে বিদেশি শত্রুদের পক্ষ থেকে আসা হুমকি চার গুণ বেড়েছে। তিনি ভাষণে ইরান এবং 'চরম ডানপন্থি সন্ত্রাসবাদ' থেকে ক্রমবর্ধমান হুমকির বিষয়েও সতর্ক করেন।
তিনি আরও বলেছেন, এমআইফাইভ এমন সন্ত্রাসীদের ধরেছে যারা এআই অপব্যবহারের চেষ্টা করছে, যার মধ্যে ড্রোন প্রযুক্তির সঙ্গে এর সমন্বয় করাও রয়েছে এবং সতর্ক করেছেন যে, নতুন জৈব অস্ত্রের মতো উদীয়মান হুমকিগুলোর চেয়ে যুক্তরাজ্যকে অবশ্যই এক ধাপ এগিয়ে থাকতে হবে।
রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গোপনে বা আংশিকভাবে এমন যুদ্ধকৌশল নিয়েছে (যেমন: সাইবার হামলা বা অপপ্রচার) যাতে নেটো জোট সরাসরি কোনও সামরিক পদক্ষেপ না নেয়।
ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআইফাইভ এর প্রধান মনে করেন, রাশিয়া যদি এই সীমা পার হয়ে নেটোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ায়, তবে সেটি হবে রাশিয়ার একটি বড় বোকামি।
তিনি বলেন, “যুক্তরাজ্য থেকে রুশ গোয়েন্দাদের চিহ্নিত এবং বহিষ্কার করার ক্ষেত্রে এমআইফাইভ এর সাফল্যর কারণে ক্রেমলিনকে এখন হামলা চালানোর জন্য ভাড়াটে বা বেতনভুক্ত এজেন্টদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।"
“ইউক্রেইনে হামলার পর থেকে প্রায় ১,০০০ গুপ্তচরকে বহিষ্কার করার ফলে ক্রেমলিনের ঐতিহ্যবাহী গোপন নেটওয়ার্ক বা কার্যক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, যার কারণে তাদের বৈশ্বিক হাতিয়ারগুলো এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে।
“তাই আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, তারা নিজেদের কর্মসূচি বা উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য অপরাধীদের অর্থ দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে। এগুলো কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা কোনও পরাশক্তির কাজ নয়।"
এমআইফাইভ প্রধান কেন ম্যাককালাম সতর্ক করে এও বলেছেন যে, ইরান যুক্তরাজ্যেও একটি হাইব্রিড অভিযানের বিস্তার ঘটাচ্ছে। যুক্তরাজ্যে ইরান-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের ঘটনায় গত এক বছরে ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তার মতে, এসব তৎপরতার বড় অংশই যুক্তরাজ্যের ইহুদি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে। তবে সামরিক স্থাপনাও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটিতে হামলার ষড়যন্ত্রের সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনার বিষয়ে ম্যাককালাম সরাসরি মন্তব্য না করলেও প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নাম এ ঘটনার পেছনে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নির্দেশনা থাকার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন।
ম্যাককালাম বলেন, “যারা যুক্তরাজ্যের মাটিতে অশান্তি তৈরি করতে চায়—তারা দেশের ভাড়াটে গুন্ডাই হোক বা বিদেশ থেকে তাদের চালানো কোনো বড় মাথাই হোক—কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, সবার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
তিনি জানান, বিদেশি শক্তির হয়ে কাজ করাদের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের জাতীয় নিরাপত্তা আইন কাজে লাগানো হচ্ছে। চীন, ইরান ও রাশিয়ার হুমকি মোকাবেলাতেও এই আইন প্রয়োগ করা হয়েছে।
এআই নিয়ে উদ্বেগ:
এআই বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ম্যাককালাম। তার কথায়, সাইবার অপরাধী (হ্যাকার) এবং সাইবার নিরাপত্তা কর্মী—উভয় পক্ষই এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
ফলে হ্যাকাররা যেমন আরও জোরাল আক্রমণ করতে পারছে, তেমনি রক্ষকরাও এআই দিয়ে আরও দ্রুত সেই আক্রমণ ঠেকাতে পারছে। এআই আসার কারণে এই পুরো লড়াইয়ের গতি ও তীব্রতা অনেক গুণ বেড়ে গেছে।
এই প্রযুক্তি দিয়ে ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে প্রচারণা ও উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ করার উপকরণ তৈরি করা যায়। সন্ত্রাসীরা নজরদারি ও হামলা পরিকল্পনা উন্নত করতে এআই ব্যবহার করছে। এআই-সক্ষম ড্রোনও নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
তবে চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলোর এআই ব্যবহার করে জীবাণু অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনাকে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন ম্যাককালাম।
তিনি বলেন, এমন হুমকি এখনও চোখে দেখা না গেলেও এআই বিদ্যমান বা নতুন জীবাণু অস্ত্রের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে। এই হুমকি বাস্তব।
এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দেশের এআই নিরাপত্তা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে কাজ করছে বলে জানান তিনি।
মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান কোনও শক্তির মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা মানব ইতিহাসে নেই উল্লেখ করে ম্যাককালাম বলেন, এআই ভবিষ্যতে কী ধরনের হুমকি সৃষ্টি করবে, তা পুরোপুরি ধারণা করা কঠিন।
ডানপন্থি সন্ত্রাসবাদ নিয়ে উদ্বেগ:
যুক্তরাজ্যে গত এপ্রিলে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথম সন্ত্রাসবাদী হুমকির মাত্রা ‘গুরুতর’ পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছিল। তার মানে, হামলার আশঙ্কা অত্যন্ত বেশি।
ম্যাককালাম বলেন, একদিকে আল-কায়েদা ও আইএস এর মতো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে এবং মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে। অন্যদিকে, কট্টর ডানপন্থি সন্ত্রাসীদের কারণেও হামলার ঝুঁকি অনেকখানি বেড়ে গেছে।
তর কথায়, গত এক বছরে একটা বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। তা হল—বিদেশি নাগরিক এবং মুসলিমদের প্রতি মানুষের মনে যে রাগ বা ক্ষোভ আছে, তার চরম রূপগুলো এখন আস্তে আস্তে সন্ত্রাসী হামলায় রূপ নিচ্ছে।
ইন্টারনেটের প্রভাবে ইদানিং কম বয়সীরা চরমপন্থি বা উগ্র ডানপন্থি সন্ত্রাসী ভাবধারার দিকে বেশি ধাবিত হচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমআইফাইভ সম্প্রতি মাত্র ১৩ বছর বয়সী এক উগ্রপন্থি কিশোরের বিরুদ্ধে তদন্ত করেছে।
সেই তদন্তে এমন কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছিল, যা দিয়ে আমাদের এক আন্তর্জাতিক বন্ধু দেশ তাদের দেশে একটি বড় ধরনের প্রাণঘাতী হামলা রুখে দিতে পেরেছিল।
