০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

এআই সামলাচ্ছেন নতুন স্নাতকরা, কিন্তু পেশাগত দক্ষতার কী হবে?

কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ায় নতুন দায়িত্ব পাচ্ছেন স্নাতকরা, তবে প্রশ্ন উঠছে পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিয়ে।

এআই সামলাচ্ছেন নতুন স্নাতকরা, কিন্তু পেশাগত দক্ষতার কী হবে?

এআই যুগে বিশ্লেষণী চিন্তা এবং কাজের প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ছবি: ম্যাগনিফিক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 05 Nov 2026, 04:42 PM

Updated : 05 Nov 2026, 04:42 PM

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে ঢুকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে কাজ করছেন অনেক তরুণ। কেউ তৈরি করছেন এআই এজেন্ট, কেউ সেগুলো পরিচালনা করছেন, আবার কেউ খুঁজে বের করছেন কোন কাজগুলো এআই দিয়ে করানো সম্ভব। তবে নতুন এই কর্মপরিবেশে একটি প্রশ্নও সামনে আসছে, এআই ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠলেও তরুণেরা কি নিজেদের মূল পেশার প্রয়োজনীয় কাজগুলো শেখার যথেষ্ট সুযোগ পাচ্ছেন?

২৫ বছর বয়সী লটে আন্ডারউডের কর্মজীবন এর একটি উদাহরণ। বিপণন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে গত বছরের নভেম্বরে লন্ডনভিত্তিক জনসংযোগ সংস্থা ‘ফাইট অর ফ্লাইট’-এ যোগ দেন তিনি। তবে তার পদটি প্রচলিত জনসংযোগ নির্বাহী নয়, তিনি ‘এআই অ্যাসোসিয়েট’।

সংস্থাটির বিশেষায়িত এআই দল প্রায় ৩০টি এআই এজেন্ট তৈরি করেছে। শিল্প খাত নিয়ে গবেষণা, গ্রাহকদের জন্য প্রতিবেদন তৈরি, গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি, গ্রাহকদের কাজের নির্দেশনা আরও স্পষ্ট করা এবং ছবি তৈরির মতো কাজে এসব এজেন্ট ব্যবহার হচ্ছে।

লটে মূলত এআই এজেন্টগুলো পরিচালনা করেন, সেগুলোর তৈরি করা তথ্য যাচাই করেন এবং গ্রাহক ও গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি কাজ করা সহকর্মীদের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছে দেন। পাশাপাশি চ্যাটজিপিটি, ক্লড ও জেমিনাইয়ের মতো এআই টুলে গ্রাহকদের সম্পর্কে কী ধরনের তথ্য আসছে, সেটিও পর্যবেক্ষণ করেন তিনি।

লটে বলেন, “এই কাজের বড় একটি অংশ হচ্ছে গ্রাহকদের সঙ্গে বৈঠক ও ফোনালাপে অংশ নেওয়া, যাতে বোঝা যায় এসব এজেন্টের কাছ থেকে আসলে কোন ধরনের সহায়তা সবচেয়ে কাজে লাগবে।”

এআইয়ের কারণে স্নাতকদের চাকরির সুযোগ কমছে বলে আলোচনা থাকলেও কিছু কোম্পানি নতুন করে এআইকেন্দ্রিক পদও তৈরি করছে। লটের মতো তরুণরা সেখানে নিয়োগ পাচ্ছে।

প্রকৌশল সফটওয়্যার কোম্পানি ‘স্ট্রাইড’-এ ১৮ মাস আগে শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ২৪ বছর বয়সী ডিলান প্যাটেল। ব্যবসা ব্যবস্থাপনায় স্নাতক প্যাটেলকে শুরুতে এমন একটি অভ্যন্তরীণ চ্যাটবট তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে অবসরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া একজন জ্যেষ্ঠ কর্মীর অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান সংরক্ষণ করা সম্ভব।

এখন তিনি কোম্পানিটির এআই অটোমেশন বিশ্লেষক। বিভিন্ন দলের প্রয়োজন অনুযায়ী এআই এজেন্ট তৈরি করার পাশাপাশি কোম্পানির কোন কোন কাজ, যেগুলো হাতে হাতে বা বারবার করতে হয়, এআই দিয়ে করানো সম্ভব, তা খুঁজে দেখেন তিনি।

কভেন্ট্রিভিত্তিক প্যাটেল বলেন, “আমার কাজের মূল লক্ষ্য হচ্ছে প্রযুক্তি, অটোমেশন, তথ্য ও এআই ব্যবহারের বাস্তবসম্মত উপায় খুঁজে বের করা, যাতে আমাদের কাজের পদ্ধতি আরও উন্নত হয়।”

আউটসোর্সড যোগাযোগকেন্দ্র পরিচালনা কোম্পানি ‘আরভাটো কানেক্ট’-এর মতো জায়গাতেও এআইয়ে দক্ষ স্নাতকদের চাহিদা বাড়ছে।

কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী ডেবরা ম্যাক্সওয়েল জানান, চলতি বছর তাদের নিয়মিত স্নাতক নিয়োগ কর্মসূচি স্থগিত রয়েছে। তবে আগামী বছর তা আবার চালুর পরিকল্পনা আছে, যেখানে এআইয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।

লন্ডনভিত্তিক ম্যাক্সওয়েল বলেন, “আমরা এমন এআই নিয়ে কাজ করা কর্মী খুঁজব, যারা একটি কোম্পানি হিসেবে আমাদের প্রচলিত চিন্তাভাবনাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন। এআই কোথায় কাজে লাগানো যায় এবং এর মাধ্যমে ব্যবসা কীভাবে বাড়ানো সম্ভব, তা আরও সামগ্রিকভাবে ভাবতে আমাদের সহায়তা করবেন।”

তিনি বলেন, “আমরা চাই না আমাদের স্নাতকরা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করুন। বরং তারা যেন ভিন্নভাবে কোম্পানির জন্য মূল্য তৈরি করতে পারেন।”

ম্যাক্সওয়েল উদাহরণ দিয়ে বলেন, সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া একজন স্নাতক এআই ব্যবহার করে নির্দিষ্ট বাজার নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করছেন। নতুন চুক্তির দরপত্র জমা দেওয়ার সময় সেই বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া তথ্য কোম্পানিকে সহায়তা করছে। এতে ওই কর্মীর দায়িত্বও আরও বিস্তৃত হয়েছে।

তার মতে, এআইয়ের কারণে একজন স্নাতকের কাজের পরিধি ও কোম্পানির কার্যক্রমে তার ভূমিকা বাড়লে কর্মীরা কোম্পানির প্রতি আরও বেশি অনুগত ও আগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন। একই সঙ্গে কর্মজীবনের শুরুতেই তারা আরও অর্থবহ অবদান রাখার সুযোগ পান।

পরামর্শক কোম্পানি পিডব্লিউসির গবেষণাতেও স্নাতক পর্যায়ের চাকরিতে দায়িত্ব বাড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। কোম্পানিটির ২০২৬ সালের ‘এআই জবস ব্যারোমিটার’ প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ২৪ লাখ প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এআইয়ের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তিত হওয়া প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরিগুলোতে এখন আগের তুলনায় জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের দক্ষতা চাওয়ার প্রবণতা সাত গুণ। এসব দক্ষতার মধ্যে রয়েছে অন্যদের কাজে উৎসাহ দেওয়া, কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দল গঠন।

পিডব্লিউসির হিসাবে, বেশি দায়িত্ব ও দক্ষতার চাহিদা থাকা এসব প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরির সংখ্যা ২০১৯ সালের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে, এআইয়ের প্রভাবে কম পরিবর্তিত হওয়া অন্যান্য প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরির সংখ্যা কমেছে ১০ শতাংশ।

পরামর্শক কোম্পানি ‘ভ্যালিয়েন্স’-এ গত বছরের সেপ্টেম্বরে যোগ দেওয়া ২৩ বছর বয়সী সিয়ান ক্লিনটনের অভিজ্ঞতাও কিছুটা আলাদা। ২০২৪ সালে বিজ্ঞানে স্নাতক শেষ করার পর তিনি প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে প্রায় ১০টি এআই এজেন্ট ব্যবহার করছেন।

তার মতে, এআই ব্যবহারের ফলে একজন নতুন কর্মী হিসেবে নিজের ধারণা ও সৃজনশীলতা কাজে লাগানোর সুযোগ বাড়ছে। একই সঙ্গে দায়িত্বও বাড়ছে।

লন্ডনভিত্তিক ক্লিনটন বলেন, “আপনার ধারণা ও সৃজনশীলতা এখন অনেক বেশি মূল্য পাচ্ছে। কারণ, আপনি নিজেই সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারছেন। এর ফলে আপনার দায়িত্বও অনেক বেড়ে যাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “এখন আমি এমন কিছু দায়িত্ব পালন করছি, যে দায়িত্ব পেতে আমার প্রায় চার-পাঁচ বছর সময় লাগত।”

ক্লিনটনের ধারণা, এআইয়ের কারণে তার কর্মজীবনে উন্নতির গতিও বাড়বে।

তিনি বলেন, “এআই প্রচলিত ‘পিরামিড’ পদ্ধতিকে ভেঙে দিচ্ছে। এখন আর শুধু কতটা জ্ঞান জমা করেছেন, তার ভিত্তিতে পদোন্নতি নির্ধারিত হচ্ছে না। বরং আপনার বিশ্লেষণী চিন্তা এবং কাজের প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।”

পেশার কাজ শেখার সুযোগ কোথায়?

লটে, দিলান ও ক্লিনটনের মতো তরুণরা এআই ব্যবহারে মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন, যা ভবিষ্যৎ কর্মজীবনেও কাজে লাগতে পারে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তাদের বেশিরভাগ সময় যদি এআই নিয়ে কাজ করেই কাটে, তাহলে মূল পেশার প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখার সুযোগ কতটা থাকছে?

লটে নিজেও মনে করেন, প্রচলিত জনসংযোগের কিছু কাজ শেখার সুযোগ তার এখনও হয়নি। তবে কোম্পানির বাড়তে থাকা এআই দলে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী।

তিনি বলেন, “এমন কিছু কাজ আছে, যেগুলো করার সুযোগ এখনও পাইনি। যেমন সরাসরি গণমাধ্যমের কাছে সংবাদ বা তথ্য উপস্থাপন করা। তবে, আমি অবশ্যই কাজটি করতে চাই।”

পোর্টম্যান ফাইন্যান্স গ্রুপের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা সাইমন প্র্যাটের উদ্বেগও এখানেই। তার মতে, এআই ব্যবহারে দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও একজন নতুন কর্মীর নিজের পেশার মৌলিক কাজগুলো শেখা আরও জরুরি।

নর্থহ্যাম্পটনভিত্তিক প্র্যাট বলেন, তাদের দুই বছর মেয়াদি স্নাতক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মূল লক্ষ্যই হচ্ছে পেশার কাজ শেখানো।

তিনি বলেন, “আমাদের স্নাতকরা প্রতি ছয় মাস পরপর চারটি বিভাগে কাজ করেন। সেখানে তারা সরাসরি জ্যেষ্ঠ গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে কাজ করে পেশার খুঁটিনাটি শেখেন।”

তিনি আরও বলেন, “তারা আমাদের সব ধরনের আর্থিক পণ্য সম্পর্কে জানবেন, ঋণদাতাদের কাছে জমা দেওয়ার জন্য ঋণসংক্রান্ত নথি তৈরি করতে শিখবেন এবং গ্রাহকদের সঙ্গে অর্থবহ সম্পর্ক গড়ে তুলবেন। এরপর ধীরে ধীরে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো লেনদেন পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন।”

পিডব্লিউসি যুক্তরাজ্যের প্রধান প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন কর্মকর্তা ক্লেয়ার রিডের মতে, যেসব স্নাতক পদে এআই ব্যবহারের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো সব সময় কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির পথ তৈরি করবে না।

গ্লাসগোভিত্তিক রিড বলেন, “এখন এমন কোনো স্নাতক পর্যায়ের চাকরি থাকবে না, যেখানে এআই সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা প্রয়োজন হবে না।”

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “শুধু এআইয়ের দক্ষতা আপনার কর্মজীবনে সহায়তা করবে না। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাত সম্পর্কে জ্ঞান এবং গ্রাহক আসলে কী চান, তা বোঝার ক্ষমতাও থাকতে হবে।”

অন্যদিকে, কভেন্ট্রিতে ডিলান প্যাটেল মনে করেন, এআই নিয়ে তার কাজ ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। তিনি এই ক্ষেত্রেই নিজের অভিজ্ঞতা আরও বাড়াতে চান।

প্যাটেল বলেন, “কোম্পানির অন্য কোনো পদে কাজ করার আগ্রহ আমার নেই। এআই–সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে যুক্ত থাকার কারণে আমি ইতোমধ্যে কোম্পানির বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি। এর মধ্য দিয়ে মূল্যবান জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাও অর্জন করছি।”