সৌদি আরব-ইসরায়েলে হামলা চালাতে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করছে চীন?
ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী চীনা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে ইরানের তৈরি 'খাইবার শেকান' নিখুঁত লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্রের আরও দীর্ঘ পাল্লার একটি সংস্করণ তৈরির চেষ্টা করছে।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা নিজস্বভাবে উন্নত মাঝারি-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। এ অস্ত্র তৈরিতে তারা ব্যবহার করছে চীনের বানানো যন্ত্রাংশ। এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সফল হলে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের যে কোনও স্থানে হামলা চালাতে পারবে হুতিরা।
এটি হুতিদের এমন এক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যা তাদের হামলার হুমকি আরও বাড়িয়ে দেবে। ব্রিটিশ অস্ত্র-নজরদারি সংস্থা ‘কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ (সিএআর)- এর মূল্যায়ন প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ একথা জানিয়েছে।
এই প্রতিবেদন এমন এক সময়ে এসেছে যখন সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং হুতিদের মধ্যে তীব্র লড়াই শুরু হয়েছে। সৌদি আরবজুড়ে বিমানবন্দর এবং জ্বালানি কেন্দ্রগুলো ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে।
এ সপ্তাহের শেষ দিকে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতি হামলার মাধ্যমে সাম্প্রতিক দফায় লড়াই শুরু হওয়ার ঘটনায় ১৩ জন নিহত হয় এবং ২০১৫ সালের পর সবচেয়ে ভয়াবহ এই হামলার কারণে বিমান চলাচল স্থগিত করা হয়।
কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ (সিএআর)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী চীনা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে ইরানের তৈরি 'খাইবার শেকান' নিখুঁত লক্ষ্যভেদী (প্রিসিশন গাইডেড) ক্ষেপণাস্ত্রের আরও দীর্ঘ পাল্লার একটি সংস্করণ তৈরির চেষ্টা করছে।
এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা হবে প্রায় ১,৯০০ কিলোমিটার (১,২০০ মাইল)। এর মানে হল, ইয়েমেন সীমান্ত থেকে অনেক দূরে থাকার পরও এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইসরায়েল, সৌদি আরব এবং পারস্য উপসাগরের অন্যান্য দেশগুলোতে অনায়াসেই হামলা চালানো সম্ভব হবে।
‘খাইবার শেকান’ বা ‘খাইবার-বংশক’ নামকরণ করা হয়েছে সৌদি আরবের একটি ঐতিহাসিক ইহুদি দুর্গের নামানুসারে, যা ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলিম যোদ্ধারা জয় বা অবরুদ্ধ করেছিল। ইরান তাদের তৈরি দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের নাম ‘খাইবার শেকান’ রেখে মূলত ওই ঐতিহাসিক বিজয়কেই ইঙ্গিত করেছে।
এই ক্ষেপণাস্ত্রের বর্তমান পাল্লা ১,৪৫০ কিলোমিটার (৯০০ মাইল)। তার মানে এটি উপসাগরীয় দেশ এবং ইসরায়েলের বেশিরভাগ জায়গায় সহজেই পৌঁছাতে পারে। এটিকে খুব দ্রুত যুদ্ধের জায়গায় নিয়ে গিয়ে চালু করা যায়। এ কারণে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের জায়গাগুলো খুঁজে ধ্বংস করার আগেই ইরানিরা তাদের বিমান হামলা থেকে বেঁচে গেছে।
গত বছর চীনের দুটি চালান আটক করার পর জুলাই মাসে ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই সিএআর তাদের প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে বলা হয়েছে, অন্যান্য জিনিসের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র সংক্রান্ত সরঞ্জামগুলো লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
জব্দ করা জিনিসের মধ্যে ছিল রকেটের ইঞ্জিন (মোটর), বডি বা কাঠামো তৈরির জন্য কাস্টমাইজড ধাতব পার্টস, ক্ষেপণাস্ত্রকে সোজাভাবে উড়তে সাহায্য করার পাখা এবং ইরানের বিখ্যাত 'খাইবার শেকান' ক্ষেপণাস্ত্রের কঠিন জ্বালানিচালিত ইঞ্জিনের কিছু অংশ।
কর্তৃপক্ষ পরীক্ষার সরঞ্জাম, হাতিয়ার এবং সেইসঙ্গে কাঁচামালও জব্দ করেছে, যার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের অংশগুলোকে উড্ডয়নের সময় সৃষ্ট তীব্র তাপ থেকে রক্ষা করার জন্য বানানো হয়েছে বা এতে বিশেষ উপাদান (আস্তরণ) রয়েছে।
কিছু শিপিং বা পণ্য পরিবহনের কাগজপত্রের মাধ্যমে চীনের এমন একটি ধাতব যন্ত্রাংশ তৈরির কোম্পানির সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা মহাকাশযানের বিশেষ যন্ত্রাংশ তৈরিতে দক্ষ বলে দাবি করে। তবে যে প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ পেয়েছে, সেখানে কোম্পানিটির আসল নাম বলা হয়নি।
আমদানি করা কিছু উপাদানের বেসামরিক বা সাধারণ ব্যবহার থাকতে পারে। তবে অন্য উপাদানগুলো বিশেষভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, যা এই সরঞ্জামগুলো কীভাবে সংগ্রহ এবং সরবরাহ করা হয়েছিল তা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সর্বশেষ এই তথ্য বা অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে যে, হুতিদের অস্ত্র কর্মসূচিকে সমর্থন জোগানো বিদেশি সরবরাহকারীদের নেটওয়ার্ক বা যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও প্রসারিত হচ্ছে।
জাতিসংঘ প্রতিবেদন এবং অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের তথ্যানুযায়ী, হুতির কাছে যাওয়ার পথে যেসব মালপত্র আটক হয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই এসেছে চীনের কোম্পানিগুলো থেকে। যদিও চীন জোর দিয়েই বলে আসছে যে, তারা হুতিদের অস্ত্র সরবরাহ করে না এবং ইরান সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর ওপর জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা মেনে চলে।
কিন্তু চীন ও দেশটির বিভিন্ন কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে ইরান এবং ইরানের সমর্থনপুষ্ট সশস্ত্র দলগুলোকে যুদ্ধাস্ত্র ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ দিয়ে সাহায্য করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। তাছাড়া, গত ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চীনই ইরানের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদার হয়ে আছে। কারণ, ইরান যে তেল বিক্রি করে তার মূল ক্রেতাই চীন।
অস্ত্র বিক্রির খবর থাকার পরও চীন গত মাসে ব্যক্তিগতভাবে ইরানকে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করার আহ্বান জানয়েছিল বলে জানান এই আলাপের বিষয়ে অবগত কয়েকজন। চীন প্রকাশ্যে সংযম, সংলাপ এবং নিরাপদ নৌচলাচল ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছে, তবে সূত্রগুলো বলেছে যে, তাদের ব্যক্তিগত বার্তা প্রকাশ্য বিবৃতির চেয়ে আরও কড়া ছিল।
সৌদি আরবের অনুরোধে এবং নিজেদের বাণিজ্যিক জ্বালানি রুট নিরাপদ রাখার উদ্দেশ্যে চীন এই পদক্ষেপ নিয়েছিল।
