Published : 09 Dec 2025, 10:16 AM
বিল গেটসসহ আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দ ও দাতারা সোমবার পোলিও নির্মূল কর্মসূচির জন্য ১.৯ বিলিয়ন ডলার তহবিল ঘোষণা করেছেন। কিন্তু ধনী দেশগুলোর বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ায় এখনো বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অনুদান বিষয়ক সভার পর দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৯ সাল পর্যন্ত গ্লোবাল পোলিও ইরাডিকেশন ইনিশিয়েটিভের জন্য এখন ৪৪০ মিলিয়ন ডলার তহবিল ঘাটতি রয়েছে।
সিএনএন লিখেছে, আগামী চার বছরের মধ্যে পোলিও নির্মূলের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের উদ্যোগটি পরিচালনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গেটস ফাউন্ডেশন, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল, যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (সিডিসি), ইউনিসেফ ও গ্যাভির টিকা জোট।
গত অক্টোবরে এ কর্মসূচির তরফে জানানো হয়, উচ্চ-আয়ের দেশগুলোর সরকারি উন্নয়ন সহায়তা উল্লেখযোগ্যহারে কমে যাওয়ায় আগামী বছরে তাদের বাজেট ৩০ শতাংশ কমে যাবে।
গ্লোবাল পোলিও ইরাডিকেশন ইনিশিয়েটিভের অ্যালি রজার্স সিএনএনকে বলেন, “যে ঘাটতি রয়ে গেছে, তা মূলত প্রথাগত দাতা দেশগুলোর সহায়তা কাটছাঁট করার কারণে।
“কর্মসূচিটি পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ৬.৯ বিলিয়ন ডলার এবং পোলিওমুক্ত বিশ্ব প্রশ্নে স্থায়ী রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছাড়া শিশুরা পোলিওর ঝুঁকিতে এবং নির্মূল প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।”
উদ্যোগের মুখপাত্র ও বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির মত দাতা দেশগুলোও ২০২৬ সালের জন্য তহবিল কমিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন গ্যাভির জন্য তহবিল বন্ধ করেছে এবং বছরের শুরুতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বেরিয়ে গেছে।
পোলিও মোকাবিলায় মার্কিন কংগ্রেসের দ্বিদলীয় সমর্থন বজায় থাকলেও ২০২৫ অর্থবছরের তহবিল অপরিবর্তিত রয়েছে; আর ২০২৬ সালের বাজেট এখনো অনিশ্চিত।
সিএনএন লিখেছে, প্রতিশ্রুত ১.৯ বিলিয়ন ডলার অনুদান প্রতি বছর ৩৭০ মিলিয়ন শিশুকে পোলিওর টিকা দেওয়ার প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নেবে এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে, যা অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকেও শিশুদের সুরক্ষা দেবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস বলেন, “আমরা পোলিও নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে এবং মানবজাতির একটি ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জনের খুব কাছে। কিন্তু কাজটি শেষ করতে এখনই সব দেশ, অংশীদার ও দাতাদের এগিয়ে আসতে হবে।”
এ উদ্যোগে দাতাদের মধ্যে রয়েছে—মোহাম্মদ বিন জায়েদ ফাউন্ডেশন ফর হিউম্যানিটি, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল, ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস এবং পাকিস্তান, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও লুক্সেমবার্গ সরকার। সবচেয়ে বেশি ১.২ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে গেটস ফাউন্ডেশন।
‘আমরা ৯৯.৯% পথ পেরিয়ে এসেছি’
সিএনএন লিখেছে, পোলিও ভাইরাস কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটাতে পারে; আর তাতে যদি শ্বাস-প্রশ্বাসের পেশি অচল হয়ে যায় তাহলে তা পক্ষাঘাত ও মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
খারাপ স্যানিটেশনযুক্ত এলাকায় ভাইরাসটি দ্রুত ছড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে টিকাদান শুরু হওয়ার আগে ভাইরাসটি প্রতি বছর সাড়ে লাখের বেশি শিশুকে পঙ্গু করত।
আবুধাবি সম্মেলনের বিবৃতি অনুযায়ী, এখন বন্য পোলিওভাইরাস আছে কেবল আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে। তবে ভ্যারিয়েন্ট পোলিও ভাইরাস ধরনের প্রাদুর্ভাব আরও ১৮টি দেশে হুমকি সৃষ্টি করছে।
১৯৮৮ সালে উদ্যোগটি শুরু হওয়ার পর থেকে বিলিয়ন শিশু টিকাদানের মাধ্যমে সুরক্ষিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয় এবং পোলিওর ঘটনা ৯৯ শতাংশের বেশি কমে গেছে।
গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান বিল গেটস বলেন, “পোলিও নির্মূলের সংগ্রামে ফুটে উঠেছে যে, যৌথভাবে বিনিয়োগ করলে বিশ্ব কী অর্জন করতে পারে। আমরা ৯৯.৯ শতাংশ পথে পৌঁছে গেছি—কিন্তু শেষ অংশটুকু আমাদের ঠিক সেই দৃঢ় সংকল্পেরই দাবিদার, যা আমাদের এতটা পথ নিয়ে এসেছে।”
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা স্মলপক্স নির্মূলের মতই ফের সাফল্য দেখতে চান, যা ১৯৮০ সালে মানব প্রচেষ্টায় নির্মূল হওয়া প্রথম রোগ। তবে পোলিও নির্মূলের জন্য ঘোষিত ২০০০ সাল থেকে বহু সময়সীমা লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। কারণ অর্থায়নের ঘাটতি, পোলিওর নতুন ধরন উদ্ভব, অপতথ্য ও ব্যবস্থাপনাগত সংকটের কারণে।

বিল গেটস সিএনএনকে বলেন, “লক্ষ্য অর্জনে আমাদের প্রত্যাশার চাইতে কয়েক বছর বেশি সময় লাগছে, কিন্তু এখন আমাদের কাছে যথেষ্ট সম্পদ আছে, যাতে নতুন পদ্ধতিগুলো কাজে লাগিয়ে এটির শেষ দেখতে পারি।”
আবুধাবির অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমাদের শিশুদের টিকাদান চালিয়ে যেতে হবে। টিকা যতটা জীবন বাঁচিয়েছে, আর কিছুই তা পারেনি।”
এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক উন্নয়ন সহায়তার বড় ধরনের কাটছাঁট প্রসঙ্গে বিল গেটস বলেন, শুরুতে ব্যাপক কাটছাঁট এবং ইউএসএআইডি’র কাঠামো ভাঙা হলেও পরে কিছু তহবিল ফিরেছে।
“তহবিল পুনরুদ্ধারই ছিল সারা বছরের সাধারণ প্রবণতা। আজকের হিসাবে স্পষ্ট নয় যে, আমরা শেষ পর্যন্ত ১০ শতাংশ কাটছাঁট দক্ষতা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে আমরা সামাল দিতে পারব, নাকি ৪০ শতাংশ কাটছাঁটের মুখোমুখি হব।”
বৈশ্বিক স্বাস্থ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখনো বৃহত্তম তহবিলদাতা মন্তব্য করে তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র উদারতা বজায় রাখতে সক্ষম এবং আমাদের মূল্যবোধ অপরিবর্তিত আছে—এই যুক্তি তুলে ধরতে আমি আমার অনেক সময় ব্যয় করছি।
“দুঃখজনকভাবে এখনো শিশুরা মারা যাচ্ছে—এটা প্রশাসনের কিছু মানুষের জন্য সতর্কবার্তা যে, আমাদের প্রায় পূর্ণ পুনরুদ্ধার প্রয়োজন।”