Published : 22 Jun 2026, 02:03 PM
তীব্র রাজনৈতিক চাপ ও জনপ্রিয়তা হ্রাসের মুখে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সোমবারই তার পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণা করতে পারেন বলে আভাস পাওয়া গেছে।
এর মাধ্যমে দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ডি বার্নামের কাছে সুশৃঙ্খলভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সুগম হতে পারে। তেমনটি হলে এক দশকের মধ্যে সপ্তম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য।
রয়টার্স লিখেছে, ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে এক বিশাল জয়ের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের বিশৃঙ্খল রাজনীতির অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্টারমার। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তার পদত্যাগের গুঞ্জন জোরালো হলো।
একটি সূত্র জানিয়েছে, ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াবেন নাকি দলীয় নেতৃত্বের লড়াইয়ে নামবেন, তা নিয়ে সপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে চিন্তাভাবনা করেছেন স্টারমার। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সূত্রটি রয়টার্সকে বলে, “কিয়ার যেকোনো বিষয়ে একটু সময় নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে পছন্দ করেন।”
কয়েক মাস ধরে বাড়ছিল চাপ
প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের ওপর গত কয়েক মাস ধরেই পদত্যাগের চাপ বাড়ছিল। গত শুক্রবার সেই চাপ আরও তীব্র হয়, যখন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নাম একটি পার্লামেন্টারি উপনির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে হাউজ অব কমন্সে ফিরে আসেন।
ওই নির্বাচনে বার্নাম নাইজেল ফারাজের ডানপন্থী ‘রিফর্ম ইউকে’ পার্টির প্রার্থীকে পরাজিত করেন। যদিও এক বছরেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় জনমত জরিপগুলোয় এগিয়ে রয়েছে রিফর্ম ইউকে।
বার্নামের এই জয় লেবার পার্টির আইনপ্রণেতাদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। দলটির অনেকেরই বিশ্বাস, স্টারমারের অধীনে ক্রমাগত সমর্থন হারাতে থাকা লেবার পার্টিকে বাগ্মী হিসেবে পরিচিত বার্নহামই আবার টেনে তুলতে পারেন।
বর্তমানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে স্টারমারের জনপ্রিয়তার রেটিং সবচেয়ে নিচে রয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকটের ঝুঁকি
নেতৃত্বের এই সম্ভাব্য পরিবর্তন অবশ্য ঝুঁকিমুক্ত নয়। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং দেশে মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও, বার্নাম এখনো পররাষ্ট্র নীতি, অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ে তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান পরিষ্কার করেননি।
স্টারমারের মতো বার্নামও দায়িত্ব নিলে অর্থনৈতিকভাবে খুব একটা সুবিধা করতে পারবেন না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বন্ড মার্কেটের বিনিয়োগকারীদের অমত থাকা সত্ত্বেও নতুন করে ঋণ নেওয়া এবং জনগণের ক্ষোভের মুখে পড়ার ঝুঁকি তার ক্ষেত্রেও থাকবে। উচ্চ ঋণ ও সুদের কিস্তি, বছরের পর বছর ধরে মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ব্যয় সংকোচনের সংকটের কারণে বর্তমানে জি-৭ ভুক্ত ধনী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যে ঋণ নেওয়ার খরচ সবচেয়ে বেশি।
বিনিয়োগকারীদের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, বার্নাম বন্ড মার্কেটের শর্তগুলো কতটা মেনে চলবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সিটিব্যাংকের অর্থনীতিবিদরা এক বিবৃতিতে বলেন, “আমাদের দৃষ্টিতে, বার্নামের প্রধানমন্ত্রিত্ব একটি ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক পরিস্থিতি উত্তরাধিকারসূত্রে পাবে, যেখানে তাৎক্ষণিক বড় কোনো পরিবর্তনের সুযোগ খুবই সীমিত।”
ব্রেক্সিট পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা
ডাউনিং স্ট্রিটের পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে স্টারমার যদি সোমবার তার বিদায়ের সময়সূচি ঘোষণা করেন এবং অ্যান্ডি বার্নাম তার স্থলাভিষিক্ত হন, তবে ব্রেক্সিট ভোটের পর বার্নহাম হবেন যুক্তরাজ্যের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী।
কাকতালীয়ভাবে, চলতি সপ্তাহে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) ঐতিহাসিক গণভোটের ১০ বছর পূর্ণ হচ্ছে।
প্রায় দুই শতাব্দীর মধ্যে দেশটিতে এত দ্রুততম সময়ে বারবার সরকারপ্রধান পরিবর্তনের এই রেকর্ড নজিরবিহীন।
মূলত জনপরিষেবার অবনতি, জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ব্যর্থতা এবং অবৈধ অভিবাসন সংকট মোকাবিলায় একের পর এক সরকারের ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণেই ব্রিটিশ জনগণের মধ্যে এই তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ওদিকে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং জানিয়েছেন, দলীয় নেতৃত্বের লড়াইয়ে নামার জন্য প্রয়োজনীয় ৮১ জন লেবার আইনপ্রণেতার সমর্থন তার রয়েছে।
তবে দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা মনে করছেন, স্ট্রিটিং হয়তো বার্নামের সাথে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন, যেখানে লড়াই থেকে দূরে থাকার বিনিময়ে তাকে কোনো জ্যেষ্ঠ পদের প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে।
রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ইউরেশিয়া’ জানিয়েছে, স্টারমার যদি আগামী সেপ্টেম্বর মাসে পদত্যাগের ঘোষণা দেন, তবে সেটিই হবে সবচেয়ে ভালো সমাধান।
এর ফলে তিনি আগামী জুলাই মাসে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাজ্য-ইউরোপীয় ইউনিয়ন শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন এবং বার্নামও সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবেন।