Published : 05 Mar 2026, 02:58 PM
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বাসভবন ও কার্যালয়ে আচমকা আক্রমণ করে যে যুদ্ধের সূচনা করেছিল ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র, তা ষষ্ঠ দিনে গড়ালেও সহসা কোনো পক্ষের পিছু হটা কিংবা উভয় পক্ষকে আলোচনায় বসাতে কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
ওয়াশিংটন ও তেহরান নিজ নিজ অবস্থানের পক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমর্থন আদায়ে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, তার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানজুড়ে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এর পাল্টায় তেহরানও ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন স্থাপনা ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট জায়গায় নিয়মিত আঘাত হানছে।
বৃহস্পতিবারও ইরান ইসরায়েলকে নিশানা করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, যা থেকে বাঁচতে লাখ লাখ ইসরায়েলিকে বাংকারের দিকে ছুটতে হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই এ যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশে তো বটেই, এমনকি এর বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার মার্কিন সাবমেরিন ভারত মহাসাগরে ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজকে ডুবিয়ে দেওয়ায় অন্তত ৮০ জন নিহত হয়েছে। একইদিন নেটোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা তুরস্কের দিকে যাওয়া একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রকে ভূপাতিত করেছে।
ইরানের ওপর ওয়াশিংটন-তেল আবিবের চাপিয়ে দেওয়া এ সংঘাত এমন এক সময়ে বিস্তৃত হচ্ছে যখন প্রয়াত নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির ছেলে মোজতোবা হোসেইনি খামেনি-ই শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির পরবর্তী নেতা হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন বলে খবর মিলছে।
ইসরায়েলি-মার্কিন ব্যাপক সামরিক অভিযানেও যে ইরানের শাসকগোষ্ঠী যে মাথা নোয়াতে রাজি নয়, তা তাদের নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ৫ দিনের এই অভিযান এরই মধ্যে ইরানে হাজারের বেশি বেসামরিকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, বিশ্বের শেয়ার বাজারগুলোকে ঠেলে দিয়েছে নতুন অস্থিরতার দিকে।
এই সংঘাতের মধ্যে বুধবারই প্রথম তুরস্কের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুটে গেছে। ইরানের সীমান্তবর্তী এ দেশটি নেটোর সদস্য. মার্কিন নেতৃত্বাধীন এ যুদ্ধ জোটের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ সামরিক বাহিনীও তুরস্কের।
কিন্তু তুরস্কে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার ঘটনাকে নেটোর ওপর আঘাত হিসেবে ধরা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, সে কারণে ‘সম্মিলিত প্রতিরক্ষার ধারা’ কার্যকরেরও প্রয়োজন পড়ছে না।
এশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে এ যুদ্ধের কারণে বৃহস্পতিবারও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে আছে, ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাস বিশ্বের অন্যত্র যেতে পারছে না।
ট্রাম্প ওই প্রণালীতে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজের পাহারা চালু ও জাহাজগুলোতে বীমা সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার পরও বৃহস্পতিবার তেলের দাম বাড়তে দেখা গেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর উপকূলগুলোর কাছে অন্তত ২০০ নৌযান নোঙর করে আছে বলে ধারণা করছে রয়টার্স।
ফক্স নিউজকে বুধবার মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছেন, তাদের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে তেলের ট্যাংকারগুলোকে পাহারা দিয়ে পার করার কাজ ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব’ শুরু করবে, কিন্তু আপাতত সেই নৌযানগুলো সামরিক অভিযানের দিকেই বেশি মনোযোগী।
“না, এখনই না, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা করা শুরু করবো। কিন্তু এখন, আমাদের নৌবাহিনী, আমাদের সামরিক বাহিনীর নজর অন্য দিকে, ইরানের শাসকদের নিরস্ত্র করায়,” কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর সহযোগিতা চেয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে এমনটাই বলেন রাইট।
শুক্রবার এশিয়ার দেশগুলোর শেয়ারবাজারে সূচকের সামান্য উত্থান দেখা গেছে, বুধবার মার্কিন শেয়ার বাজারগুলোও যুদ্ধ তাড়াতাড়ি শেষ হতে পারে এই আশা নিয়ে ঝাঁপ বন্ধ করেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে ইরানি গোয়েন্দা সংস্থা যুদ্ধ বন্ধের উপায় নিয়ে সিআইএ-র সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এমন খবর প্রকাশিত হওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে, বলছেন অনেক ব্যবসায়ী।
তবে ইরানি গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র নিউ ইয়র্ক টাইমসের ওই প্রতিবেদনকে ‘ডাহা মিথ্যা ও যুদ্ধাবস্থায় চালানো মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ আখ্যা দিয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের আধা-সামরিক বার্তা সংস্থা তাসনিম।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্তালিনা গিওর্গেভা বলেছেন, ইরানে সংঘাত ‘বৈশ্বিক অর্থনীতির শক্তি সামর্থ্য কতটা’ তার পরীক্ষা নিচ্ছে।
“যদি দেখা যায় যে এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, তাহলে অবশ্যই বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্য, বাজারের মনোভাব, প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির ওপর এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি তখন সর্বত্র নীতিনির্ধারকদের কাঁধে নতুন ভারও চাপিয়ে দেবে,” বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে এক অনুষ্ঠানে এমনই বলেছেন তিনি।
যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আটকে পড়া নাগরিকদের ফিরিয়ে আনতে বুধবারও বিশ্বের অনেক দেশের সরকারকে জরুরি ফ্লাইট পাঠাতে হয়েছে। তবে ওমান থেকে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার একটি ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ে অবতরণ করেনি বলে জানিয়েছে স্কাই নিউজ।
তবে ওই অঞ্চলে বাণিজ্যিক ফ্লাইটের চলাচল মোটাদাগে এখনও বন্ধই আছে; বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত দুবাই বিমানবন্দরের কার্যক্রমও স্থবির হয়ে আছে।
এদিকে টাইমস অব ইসরায়েলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সংখ্যা কমে আসায় তারা জনসাধারণের ওপর দেওয়া কিছু নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছেন।
সংঘাত শুরুর তুলনায় ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর দিকে তেহরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের পরিমাণ ৮৬% কমে এসেছে বলে বুধবার এক মার্কিন জেনারেল জানিয়েছিলেন। তারপর ইসরায়েল নাগরিকদের জীবনযাত্রা সহনীয় করতে কিছু বিধিনিষেধ তোলার সিদ্ধান্তের কথা জানাল।
তবে এখনও বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমুদ্র সৈকত বন্ধ থাকবে। বাংকারের ব্যবস্থা থাকলে অফিসগুলো তাদের কাজ চালাতে পারবে। কাছাকাছি বাংকার থাকলে সড়কে বা উন্মুক্ত জায়গায় ৫০ জন একত্রিত হওয়ারও সুযোগ পাবে।
আগের সব বিধিনিষেধ বহাল থাকলে প্রতি সপ্তাহে ইসরায়েলের ৩০০ কোটি ডলার ক্ষতি হতে পারে বলে তাদের অর্থ মন্ত্রণালয় ধারণা দিয়েছিল।