Published : 03 Feb 2026, 12:00 AM
পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে গত সপ্তাহের ভয়াবহ হামলার পর এক নারী আত্মঘাতী হামলাকারীর ভিডিও প্রকাশ করেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)।
ভিডিওতে দেখা যাওয়া ওই হামলাকারীকে হাওয়া বালুচ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভি।
বিএলএ-র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘অপারেশন হেরোফ’(বালুচ সাহিত্যে হেরোফ শব্দের অর্থ ‘কালো ঝড়’)-এর দ্বিতীয় ধাপে গওয়াদার ফ্রন্টে লড়াইয়ের সময় ভিডিওটি ধারণ করা হয়। এটি হাওয়ার মৃত্যুর ১২ ঘণ্টা আগে পাঠানো শেষ বার্তা।
মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওটিতে হাওয়া বালুচকে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে রাইফেল দিয়ে গুলি করতে দেখা যায়।
ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “বালুচ জাতি, আজ তোমাদের এক বোন পাঞ্জাবি সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হয়েছে। এখন তোমাদের সাহস নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত। আমাদের জন্য আর কোনও পথ খোলা নেই।”
বিএলএ-র লোগো সংবলিত ক্যাপ ও লাল-নীল কুর্তা পরা ওই নারী আরও বলেন, “পাকিস্তান ভয়ে সামনে আসছে না। পাকিস্তান আমাদের মোকাবেলা করতে পারবে না। ওরা (পাক সরকার) আমাদের মা-বোনেদের দমিয়ে রাখতে শুধু গায়ের জোর দেখায়। আমাদের মুখোমুখি দাড়ানোর ক্ষমতা তাদের নেই। বালুচ জাতিকে জেগে উঠতে হবে।”
ভিডিওতে অন্য একজন হামলাকারী তাকে যুদ্ধের খবর জিজ্ঞেস করলে তিনি হাসিমুখে উত্তর দেন, “যুদ্ধ মানেই আনন্দ।” ওই সময় তাকে ‘দ্রুশুম’ নামে সম্বোধন করা হয়।
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানের একাধিক শহরে গত শুক্র ও শনিবারের সিরিজ বোমা ও বন্দুক হামলায় বেসামরিক নাগরিক, নিরাপত্তাকর্মী এবং হামলাকারী মিলিয়ে ১৯৩ জন নিহত হয়।
এর মধ্যে বেসামরিক নাগরিক নিহতের সংখ্যা ছিল ৩১, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয় ১৭ জন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয় অন্তত ১৪৫ জন হামলাকারী।
রোববার পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তা বাহিনী বেলুচিস্তানে তিনদিনে ১৫০ জনেরও বেশি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীকে’ হত্যা করেছে।
বিদ্রোহী গোষ্ঠী বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) গত সপ্তাহের ওই হামলার দায় স্বীকার করেছে। এবার তারা আত্মঘাতী হামলাকারী নারীর ভিডিও প্রকাশ করল।
ভারতীয় পত্রিকা ইন্ডিয়া টুডেতে বলা হয়েছে, একজন নয়, আরেকজন আত্মঘাতী নারীকেও পাঠানো হয়েছিল আত্মঘাতী হামলার জন্য। তার নাম আসিফা মেঙ্গাল।
হাওয়া বালুচের সঙ্গে আসিফার ছবিও প্রকাশ করেছে বিএলএ। আসিফা এমজিড ব্রিগেডের সদস্য। ২০২৪-এর জানুয়ারিতে তিনি স্বেচ্ছায় আত্মঘাতী মিশনে যান।
পাকিস্তানের ‘দ্য ডন’ পত্রিকাও আত্মঘাতী হামলাকারীদের মধ্যে একাধিক নারী থাকার খবর জানিয়েছে। বিএলএ-র দাবি, গুলি ও আত্মঘাতী হামলা সব মিলিয়ে পাক সেনা, পুলিশ ও ফ্রন্টিয়ার কোরের বড় ক্ষতি হয়েছে।
তারা দাবি করছে, ৪০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই অভিযানে ২০০-এর বেশি পাকিস্তানি সেনা মারা গেছে। নারী যোদ্ধা ব্যবহারকে তারা ‘নতুন যুগের’ প্রতীক বলে তুলে ধরেছে।
আত্মঘাতী নারী হামলাকারী হাওয়া বালুচ দাবি করেন যে, তার দল গওয়াদার ফ্রন্টের কাছে থাকা পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যদের মেরে ফেলেছে।
ভিডিওর শেষ অংশে ওই নারী ও অন্য একজন যোদ্ধার রক্তাক্ত মৃতদেহ মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
ওদিকে, বিএলএ-র ভাষ্যমতে, আসিফা মেঙ্গাল নোশকিতে ইন্টার-সার্ভিসেস ইনটেলিজেন্স সদর দপ্তরে গাড়ি বোমা হামলা চালান এবং সেখানেই নিহত হন।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আরেক আত্মঘাতী নারী হাওয়া বালুচ বর্তমান ‘জেন জি’ প্রজন্মের একজন শিক্ষিত নারী। তার বাবাও একজন বিএলএ যোদ্ধা ছিলেন, যিনি ২০২১ সালে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চশিক্ষিত তরুণীদের এই সশস্ত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা।
পাকিস্তান সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত শুক্রবার ও শনিবার তাদের পাল্টা অভিযানে মোট ১৩৩ জন বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হয়।
অন্যদিকে, বিএলএ তাদের ১৮ জন যোদ্ধার মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে। এদের মধ্যে ১১ জন ‘মজিদ ব্রিগেড’-এর আত্মঘাতী সদস্য, ৪ জন ‘ফাতেহ স্কোয়াড’-এর এবং ৩ জন ‘এসটিওএস’ ইউনিটের যোদ্ধা।
প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক বঞ্চনার অভিযোগে বেলুচিস্তানে কয়েক দশক ধরে এই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে। বিএলএ-কে পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে।