Published : 14 Jul 2026, 10:27 PM
প্রতিদিন কর্মদিবসের সকালে শিল্পি চোত্রানি স্পেনের সীমান্ত শহর লা লিনিয়া দে লা কনসেপসিয়নের বাসা থেকে সাইকেল চালিয়ে জিব্রাল্টারে যান। পথটি খুবই সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এর জন্য তাকে একটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার হতে হয়।
দক্ষিণ ইউরোপের আইবেরিয়ান উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে স্পেনের উপকূলে অবস্থিত স্বশাসিত ব্রিটিশ অঞ্চল জিব্রালটারের জনসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। তবে সেখানে প্রতিদিন স্পেন থেকে প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক সীমান্ত পেরিয়ে কাজ করতে যান এবং যাতায়াতের ক্ষেত্রে সীমান্তে কিছু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে যার মধ্যে দিয়ে তাদেরকে যেতে হয়।
শ্রমিকরা কাজে যাওয়ার ব্যস্ত সময়ে স্থল সীমান্তে অনেক সময় দীর্ঘ সারি তৈরি হয় এবং তল্লাশিও হয়।
জিব্রাল্টারের একটি শিপিং ও পর্যটন প্রতিষ্ঠানে হিউম্যান রিসোর্স বিভাগে কর্মরত শিল্পি চোত্রানি বলেন, “আমাদের মাঝে একটি সীমান্ত থাকাটা হাস্যকর। আমি মনে করি না কোনও বেড়া বা প্রাচীর দিয়ে এক জায়গার মানুষকে অন্য জায়গা থেকে আলাদা করে রাখা উচিত।”
তিনি যেখানে ছিলেন, তার ঠিক পেছনেই ছিল মেঘে ঢাকা ১,৪০০ ফুট উঁচু বিখ্যাত জিব্রাল্টার রক বা শিলাখণ্ড। এই অঞ্চলটি মরক্কো থেকে মাত্র ৯ মাইল দূরে, যেখানে আটলান্টিক মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগর মিলিত হয়েছে।
বহু সামরিক যুদ্ধ, সার্বভৌমত্ব বিতর্ক এবং স্পেনের চাপানো দীর্ঘ ১৩ বছরের কঠোর অবরোধের সাক্ষী এই জিব্রাল্টারে এবার এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।
আগামী ১৫ জুলাই থেকে স্পেনের সঙ্গে জিব্রাল্টারের দীর্ঘ ১১৮ বছরের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও বেড়া পুরোপুরি তুলে নেওয়া হচ্ছে, যার ফলে দুই অঞ্চলের মধ্যে অবাধ যাতায়াত শুরু হবে। দুই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ করতে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) পর সৃষ্ট জটিলতা কাটাতে ইইউ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে দীর্ঘ ও সতর্ক আলোচনার পর এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জিব্রাল্টারের সঙ্গে ইইউ-এর স্থল সীমান্ত থাকায় ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ সম্পর্কে শিল্পি চোত্রানি বলেন, “এটি স্পেন ও যুক্তরাজ্য উভয় পক্ষের জন্যই একটি বিশাল অগ্রগতি। আমাদের লা লিনিয়ার শহরে যারা থাকেন, তারা সবাই মনে করেন এটি একটি চমৎকার সিদ্ধান্ত। এটি আরও অনেক আগেই করা উচিত ছিল।”
জিব্রাল্টারের মাথাপিছু আয় বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ। কিন্তু এর ঠিক বিপরীতে থাকা স্পেনের সীমান্ত শহর লা লিনিয়া ও এর আশপাশের অঞ্চলটি দেশটির অন্যতম দরিদ্র এলাকা হিসেবে পরিচিত।
স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্দালুসিয়া জুড়ে এমনিতেই বেকারত্বের হার বেশি, আর এই সীমান্ত শহরে তা প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে সীমান্ত তুলে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত এখানকার অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এটি মানুষের যাতায়াত সহজ করার পাশাপাশি দুই অঞ্চলের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতেও ভূমিকা রাখবে। লা লিনিয়া দে লা কনসেপসিয়নের মেয়র হুয়ান ফ্রাঙ্কো বলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯০৮ সাল থেকে এখানে এই সীমান্ত প্রাচীর রয়েছে।”
ব্রিটিশ অঞ্চলের ওপর তাদের স্থানীয় অর্থনীতির নির্ভরশীলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আপনাকে বুঝতে হবে যে, এই শহরের একটি গড়পড়তা কোম্পানির আয়ের এক-তৃতীয়াংশই আসে জিব্রাল্টারের গ্রাহকদের কাছ থেকে।”
ব্রেক্সিটের পর জিব্রাল্টারের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক দশকের অনিশ্চয়তা শেষে ফ্রাঙ্কো আশা প্রকাশ করেন যে, এই সমাধান শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
জিব্রাল্টারের বাসিন্দারা শুরু থেকেই ব্রেক্সিটের তীব্র বিরোধী ছিলেন। ২০১৬ সালের গণভোটে সেখানকার ৯৬ শতাংশ মানুষ ইইউ-তে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। এই কট্টর ইইউপন্থি অবস্থানের পেছনে প্রধান কারণ ছিল, ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলে জিব্রাল্টারের ওপর স্পেনের সার্বভৌমত্বের দাবি আবার জোরালো হতে পারে।
এছাড়া, আরেকটি বড় কারণ ছিল ইইউ-এর সঙ্গে জিব্রাল্টারের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক, বিশেষ করে অনলাইন গেমিং, শিপিং এবং আর্থিক খাতের ব্যবসা। ব্রেক্সিটের ফলে এসব খাতে কী ধরনের লজিস্টিক সংকট তৈরি হবে, তা নিয়ে বড় ভয় ছিল তাদের।
স্পেন, ইইউ এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যে কয়েক বছরের আলোচনার পর সমাধান হিসেবে জিব্রাল্টারকে ইউরোপীয় শুল্ক ইউনিয়ন এবং ইউরোপীয় মুক্ত চলাচল অঞ্চল ‘শেনজেন’-এর অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে স্পেন ও ইইউ-এর সঙ্গে মানুষের যাতায়াত ও পণ্য চলাচল সম্পূর্ণ অবাধ হবে।
তবে যুক্তরাজ্য বা শেনজেন বহির্ভূত অন্য যেকোনো দেশ থেকে জিব্রাল্টার বিমানবন্দর বা বন্দরে পৌঁছালে যাত্রীদের জিব্রাল্টার ও স্পেনের কর্মকর্তাদের কাছে পাসপোর্ট দেখাতে হবে।
জিব্রাল্টারের চিফ মিনিস্টার ফ্যাবিয়ান পিকার্দো জানান, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনুমোদন অপেক্ষমাণ থাকায় এই নতুন ব্যবস্থাটি আপাতত সাময়িকভাবে কার্যকর করা হচ্ছে। জিব্রাল্টারের সরকারি সদর দপ্তরে বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এটি জিব্রাল্টারের জন্য “এক বিশাল পরিবর্তন”।
তিনি আরও বলেন, “গত আট প্রজন্ম ধরে জিব্রাল্টারের মানুষের জীবনকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে, তা হলো সীমান্তের এই কড়াকড়ি ও নিষেধাজ্ঞা।” পিকার্দোর মতে, এই চুক্তির ফলে জিব্রাল্টারের সঙ্গে স্পেন ও ইইউ-এর “মানুষ ও পণ্যের সম্পূর্ণ অবাধ প্রবাহ” নিশ্চিত হবে।
চিফ মিনিস্টার জানান, এই সিদ্ধান্তের ফলে সবচেয়ে স্পষ্ট অর্থনৈতিক লাভ হবে পর্যটক ও গ্রাহকদের আগমন বৃদ্ধি। জিব্রাল্টারের ব্যবসাগুলো এখন থেকে গ্রাহকদের ভিড় অনেক বেশি পাবে, যা আগে সীমান্তে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার ভয়ে বাধাগ্রস্ত হতো।
যুক্তরাজ্যের অধীনে থাকা জিব্রাল্টারের সার্বভৌমত্ব নিয়ে স্পেনের দাবি মাঝে মাঝেই রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি করে।
দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনার সবচেয়ে কুখ্যাত অধ্যায়টি ঘটেছিল ১৯৬৯ সালে, যখন স্পেনের স্বৈরশাসক ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো জিব্রাল্টারে সম্পূর্ণ অবরোধ আরোপ করেন। তার মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালে এই অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
মুখ্যমন্ত্রী পিকার্দো নতুন উদ্যোগকে সেই ঐতিহাসিক অবরোধের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “এটি মানবিক সম্পর্ক, ব্যবসা এবং সীমান্ত কর্মীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। এটি স্পেন ও ইইউ-এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন ভোর।”
স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেসও বিষয়টিকে একইভাবে মূল্যায়ন করে একে জিব্রাল্টারের জন্য একটি “নতুন যুগ” বলে অভিহিত করেছেন।
তবে এই চুক্তির কারণে জিব্রাল্টারে বিক্রি হওয়া পণ্যগুলোকে এখন থেকে ইইউ প্রবিধান মেনে চলতে হবে, যা আগে ছিল না। এছাড়া জিব্রাল্টারে কোনো ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) না থাকায় আমদানি শুল্কের পরিবর্তে একটি নতুন ‘লেনদেন কর’ (ট্রানজেকশন ট্যাক্স) চালু করা হচ্ছে।
জিব্রাল্টারে বিক্রি হওয়া সব পণ্যের ওপর এই কর চলতি বছর ১৫ শতাংশ থেকে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। এছাড়া নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর উচ্চ হারে আবগারি শুল্কও আরোপ করা হবে।
জিব্রাল্টারে বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁ ও বার পরিচালনাকারী ‘অ্যাংলো হিস্পানো কোম্পানি’-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক জন আইসোলা বলেন, ব্রেক্সিট ইস্যুটি কোনো কঠোর সীমান্ত ছাড়াই সমাধান হওয়ায় ব্যবসায়ী মহলে স্বস্তি এসেছে।
তিনি এটিকে একটি “ভালো আপস” হিসেবে দেখছেন যা পর্যটন ও ব্যবসাকে চাঙ্গা করবে। তবে নতুন ট্যাক্স ও কঠোর ইইউ নিয়মের কারণে কিছুটা উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন তিনি।
আইসোলা বলেন, “যারা পণ্য আমদানি করেন, তাদের জন্য নথিপত্র বা কাগজপত্রের প্রক্রিয়া এখন সম্পূর্ণ বদলে যাবে। এছাড়া যুক্তরাজ্য বা ইইউ-এর বাইরে থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ইইউ-এর মানদণ্ড বজায় রাখা সবার জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।”
অবশ্য জিব্রাল্টার ও লা লিনিয়ার বাসিন্দারা এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য বেশ কিছু দিন ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাতের আঁধারে বুলডোজার দিয়ে সীমান্ত প্রাচীর ভাঙার কাজ চলেছে, যা ১৫ জুলাই থেকে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।