Published : 23 Sep 2025, 12:11 AM
ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও পর্তুগাল। গাজায় ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরের দখল করা ভূমিতে বসতি সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপটে এ এক প্রতীকী ঘোষণা।
ফ্রান্সসহ আরও কয়েকটি দেশ শিগগিরই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় গাজায় সামরিক অভিযান আরো জোরদার করেছে ইসরায়েল।
রোববার ব্রিটেনসহ চার দেশ যখন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির ঘোষণা দিল, তার কিছুক্ষণ আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মুখপাত্র শোশ বেদ্রোসিয়ানের প্রতিক্রিয়া আসে।
নেতানিয়াহুকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, “এ পদক্ষেপ স্রেফ অযৌক্তিক এবং সন্ত্রাসবাদকে পুরস্কৃত করার শামিল।”
অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে এক সমাবেশে নেতানিয়াহু তার সমর্থকদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ‘ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কখনো হবে না।”
চার দেশের স্বীকৃতি যখন বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে, তখন বাস্তবতা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছে আল জাজিরা।
বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক এ সংবাদমাধ্যম লিখেছে, গাজায় হাজার হাজার মানুষকে হত্যা আর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে এই স্বীকৃতি ক্ষুদ্র এক ‘প্রতীকী’ পদক্ষেপ; অবশ্য এর কিছু তাৎপর্যও আছে।
ফিলিস্তিনের রাজনীতি বিশেষজ্ঞ রিদা আবু রাস আল জাজিরাকে বলেন, “এই স্বীকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ এই মিত্র দেশগুলো এতদিন বলে আসছিল, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হলে তখন তারা স্বীকৃতি দেবে।
“এটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই দেশগুলো এখন অবস্থান বদলেছে। তাতে ইসরায়েল আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে, সেটাও তাৎপর্যপূর্ণ।”
চার দেশের স্বীকৃতির ঘোষণা যেদিন এল, সেদিনও গাজায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৫৫ জন ফিলিস্তিনির প্রাণ গেছে। কেবল গাজা সিটিতেই ৩৭ জন নিহত হয়েছেন, যেখানে ইসরায়েলি সেনারা নৃশংস সামরিক অভিযান চালাচ্ছে।

‘লোক দেখানো’ স্বীকৃতি?
ইসারায়েলি আগ্রাসনের মুখে যে অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্যে দিয়ে ফিলিস্তিনিদের দিন কাটছে, সেই বাস্তবতায় এই স্বীকৃতি আদৌ কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের অনেকেই সন্দিহান।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে অন্তত ৬৫ হাজার ২৮৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে, আহত হয়েছেন এক লাখ ৬৬ হাজার ৫৭৫ জন। যদিও অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
অন্যদিকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলায় ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত হয়েছিল, প্রায় ২০০ জনকে জিম্মি করা হয়েছিল।
পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি সেনা ও দখলদার বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ইতোমধ্যে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল সরকার পুরো ভূখণ্ড দখল করার হুমকি দিচ্ছে।
ইসরায়েলের এই যুদ্ধকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন দেশটির কিছু বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। কয়েকটি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির ঘোষণা দিলেই যে যুদ্ধ থেমে যাবে, সেই আশা বিশ্লেষকরাও করছেন না।
গবেষক ক্রিস ওসিক আল জাজিরাকে বলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত না সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ আসছে, যেমন অস্ত্র বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া না হচ্ছে, আন্তর্জাতিক জোট গড়ে দখলকৃত ভূখণ্ডে ‘নো-ফ্লাই জোন’ কার্যকর করা না হচ্ছে, ততক্ষণ আমি আশাবাদী হওয়ার মত কিছু দেখব না।”
দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি বলেন, কয়েকটি দেশের স্বীকৃতির ঘোষণা অনেকটাই ‘লোক দেখানো’।
“তারা আন্তর্জাতিক সমাজ এবং নিজেদের জনগণের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়েছে। আমি মনে করি, প্রকৃত পদক্ষেপ না নিয়ে তারা দেখাতে চাইছে যে, তারা কিছু করছে।”
তবে স্বীকৃতির অর্থ হল, এই চার দেশ এখন ফিলিস্তিন সরকারের সঙ্গে চুক্তি করতে পারবে এবং পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিতে পারবে। যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে হুসাম জোমলটকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে ঘোষণা করেছে।
এক বিবৃতিতে জোমলট বলেছেন, “বহু বিলম্বিত এ স্বীকৃতি ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বাধীনতা ও স্বাধীন মাতৃভূমির অধিকারের অস্বীকৃতির অবসান ঘটাল।”
তিনি বলেন, “এটি ন্যায়বিচার, শান্তি এবং শত বছরের ঐতিহাসিক অন্যায়ের সংশোধনের দিকে এক অনিবার্য পদক্ষেপ।”

বড় বাধা যুক্তরাষ্ট্র
বিশ্বের অধিকাংশ দেশ আগেই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন আরো কয়েকটি দেশ সেই তালিকায় যোগ হল। তারপরও যুক্তরাষ্ট্র এবং কয়েকটি ইউরোপীয় ও বাল্টিক দেশ, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ কিছু এশীয় দেশ এখনো স্বীকৃতি দেয়নি।
অধিকাংশ দেশের সমর্থন পেলেও ফিলিস্তিন এখনো জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য নয়।
আবু রাস বলেন, এই স্বীকৃতি জাতিসংঘে ফিলিস্তিনকে নতুন কোনো সুবিধা দেবে না, নতুন কোনো আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সদস্যও তারা হতে পারবে না, যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্র তাদের সমর্থন দিচ্ছে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ফিলিস্তিন বর্তমানে জাতিসংঘে ‘পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’ হিসেবে মর্যাদা পাচ্ছে। পূর্ণ সদস্য হতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। কিন্তু ভিটোক্ষমতাধারী যুক্তরাষ্ট্রের কারণে তা ‘প্রায় অসম্ভব’।
তবুও বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নতুন পশ্চিমা দেশের স্বীকৃতি হতে পারে প্রথম ধাপ।
বিশেষ করে গাজায় যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইসরায়েলের ওপর ইউরোপীয় চাপ বাড়ছে। বয়কট আন্দোলন জোরালো হচ্ছে, ইসরায়েলকে ইউরোভিশন এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও কিছু ইসরায়েলি পণ্যে শুল্ক বাড়ানো এবং নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে।
আবু রাস বলেন, “স্বীকৃতি গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে সরাসরি প্রভাব ফেলছে না। তবে এটি হয়তো ইঙ্গিত করছে যে স্বীকৃতিদাতা দেশগুলো এখন বাস্তব পদক্ষেপ নিতে রাজি, যার সরাসরি প্রভাব ইসরায়েলের ওপর পড়তে পারে। যেমন দ্বিমুখী অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা যদি জারি করা হয়, তাহলে ইসরায়েলকে তারা অস্ত্র বিক্রি করবে না, ইসরায়েলের অস্ত্রও তারা কিনবে না।”

নেতাদের ‘মুখরক্ষা’
কয়েকজন বিশ্লেষক বলেছেন, মাসের পর মাস আলোচনার পর পশ্চিমা দেশগুলো ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে মূলত ইসরায়েলের আগ্রাসনের জবাব হিসেবে এবং নিজের দেশে চাপ সামলাতে।
তাদের মতে, পশ্চিমা নেতারা একদিকে ইসরায়েলপন্থি চাপ সামলাচ্ছেন, অন্যদিকে গণহত্যা ঠেকাতে পদক্ষেপ চাওয়া জনমতকেও মানতে বাধ্য হচ্ছেন।
আবু রাস বলেন, “এই স্বীকৃতিতে কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। যা ঘটছে, তা হল দীর্ঘমেয়াদি ক্ষোভের অতি ধীর বহিঃপ্রকাশ। এই পদক্ষেপগুলো হল কম ঝামেলায় জনগণের দাবি মেটানোর পন্থা।”
তিনি বলেন, “তারা (নেতারা) মূলত মুখরক্ষা করছেন।”
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গত জুলাই মাসে বলেছিলেন, ইসরায়েল যদি গাজায় যুদ্ধ বন্ধের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে হাঁটবে।
আর রোববার তিনি বলেন, স্বীকৃতি এসেছে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের ‘বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে।
তিনি বলেন, “এই স্বীকৃতি এখন দেওয়া হচ্ছে, কারণ আমি বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন, দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনা যেন আরও দূরে সরে যাচ্ছে।”
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজও স্বীকৃতির ঘোষণা দিয়ে কিছু শর্ত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সংস্কারে আরও অগ্রগতি দেখাতে পারলে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং দূতাবাস খোলা হবে।
ব্রিটেনের দায়
এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে ব্রিটিশ সরকার বেলফোর ঘোষণা দিয়ে ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগণের জন্য জাতীয় আবাসভূমির সমর্থন জানিয়েছিল।
এর পর থেকে ব্রিটেন ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদে ভূমিকা রেখে গেছে। তাই এবার ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির ঘোষণা বিশ্লেষকদের কারো কারো কাছে যুক্তরাজ্যের দায় স্বীকারেরও প্রতীক।
জুলাইয়ে জাতিসংঘে দেওয়া বক্তৃতায় ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেন, “দ্বিরাষ্ট্র সমাধানকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্রিটেনের বিশেষ দায়ও রয়েছে।”
তবে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, ওই দায় স্বীকারে খুব বেশি পরিবর্তন আসবে না।
আবু রাস বলেন, “বিশ্বের সব দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলেও ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ভেঙে না দেওয়া পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের জীবনে তেমন পরিবর্তন আসবে না। আন্তর্জাতিক চাপের ভূমিকা আছে, কিন্তু সেজন্য শুধু স্বীকৃতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও সাংস্কৃতিক বয়কটের মত পদক্ষেপে যেতে হবে।”