Published : 09 Sep 2025, 08:25 PM
কাঠমান্ডুতে এসেছিলাম বাংলাদেশ-নেপাল প্রীতি ফুটবল ম্যাচের খবর সংগ্রহ করতে। কিন্তু এখানে এসে তারুণ্যের আরেকটি অভ্যুত্থানের সাক্ষী হয়ে যাব, তা স্বপ্নেও ভাবিনি।
মঙ্গলবার দুপুরে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির পদত্যাগের পরপরই বদলাতে থাকে কাঠমান্ডুর আবহ। জেন-জি বিক্ষোভকারীরা ছোট ছোট মিছিলে, মোটরবাইকে চেপে পতাকা উড়িয়ে উদযাপনে মাতে।
সকাল থেকে হোটেলে বন্দি বিদেশি পর্যটকরার বেরিয়ে আসেন রাস্তায়। কেউ ব্যস্ত সেলফি তুলতে, কেউ ভিডিও করছিলেন।
দুদিন ধরে ক্ষোভের উদগীরণের পর কাঠমান্ডুর থামেল এলাকার পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত। তবে স্থানীয় সাংবাদিকরা বলছেন, বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে নেপালের নানা অংশে।
কেপি শর্মা ওলির সরকারের ‘দুর্নীতি’, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো বন্ধ করে দেওয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল নেপালের জেনারেশন জেড, মানে জেন-জিরা। সোমবার তারা রাজপথে নেমে আসে দলে দলে।

শুরু হয় জ্বালাও-পোড়াও। পার্লামেন্ট ভবন, প্রশাসনিক ভবন, রাজনীতিবিদদের বাড়ি পুড়িয়ে দেয় তারা। রাজনীতিবিদদের রাস্তায় পেটানোর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে এক ডজনের বেশি মানুষের মৃত্যুতে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে নেপাল।
সোমবার পর্যন্ত থামেলের পরিস্থিতি ছিল তুলনামূলক শান্ত। তবে মঙ্গলবার সকাল থেকে পরিস্থিতি নাজুক হতে শুরু করে।
থামেলের মুসলিম চকের কাছে থানায় আক্রমণ করে বিক্ষোভকারীরা। ঢিল ছুড়ে থানার জানালার সব কাচ গুঁড়িয়ে দেয় তারা।
থানার সামনে থাকা পুলিশের গাড়িতে দেয় আগুন। মোড়ে অবস্থান নিয়ে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় রাস্তা। গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে মাঝেমধ্যে মোটরবাইক চলতে দেখা গেছে।
অলি-গলিতে বিক্ষোভকারীরা মিছিল শুরু করলে লুটপাটের ভয়ে দোকান, হোটেলের শাটার-দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিদেশি পর্যটক এবং স্থানীয়রা হোটেল-বাড়ির ছাদে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন উৎকণ্ঠা নিয়ে।

নেপাল-বাংলাদেশ প্রীতি ফুটবল ম্যাচ কাভার করতে কাঠমান্ডুতে আসা বাংলাদেশের সংবাদকর্মীরাও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন হোটেলে। বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
মঙ্গলবারের দ্বিতীয় প্রীতি ম্যাচ স্থগিত হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ফুটবল দলের বেলা ৩টার ফ্লাইটে দেশে ফেরার কথা ছিল, কিন্তু দল হোটেলই ছাড়তে পারেনি।
বিক্ষোভকারীরা ত্রিভুবন বিমানবন্দর বন্ধ করে দিলে ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায়। ফলে জামাল-মিতুলরা বন্দি হয়ে পড়েন হোটেলে।
আন্দোলনকারীরা হানা দিয়েছিল টিম হোটেলেও। তবে তারা যখন জানতে পারে, সেখানে কোনো রাজনীতিবিদ কিংবা ভিআইপি অবস্থান করছেন না, শুধু বাংলাদেশ ও নেপালের ফুটবল দল অবস্থান করছে, তখন তারা হোটেল ত্যাগ করে বলে জানালেন এক ফুটবলার।
নেপালে সন্ধ্যা নেমেছে কয়েক ঘণ্টা হয়। থামেলের পরিস্থিতি এখনো থমথমে। স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে যেটুকু জানা গেল, কাঠমান্ডুর বাইরে বিক্ষোভকারীরা মব তৈরি করে রাজনীতিবিদদের তাড়া করছে, রাস্তায় পুলিশ পেটাচ্ছে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া নিসা নামের এক তরুণী বললেন, দেশকে তারা নতুন করে গড়ে তুলতে চান।
“আমাদের আন্দোলন সফল হয়েছে। আমরা যে চাওয়া নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিলাম, সেটা পূরণ হয়েছে। দেশকে আমরা আমাদের মত করে গড়ে তুলব।”
বাংলাদেশের সাংবাদিক শুনে এক আন্দোলনকারী বললেন, “তোমাদের দেশের মত আমরা এখানে সরকার বদলে দিয়েছি।” বলেই ছুটলেন সহযোদ্ধাদের সঙ্গে উদযাপনে শামিল হতে। তার নামটিও জানার সুযোগ হয়নি।
কেউ কেউ বললেন সরকারের দুর্নীতিতে ‘হাঁপিয়ে’ ওঠার কথা। হোটেল বয় সুশান উৎকণ্ঠা নিয়ে বললেন, “ঘরে ফিরব কীভাবে?”

ঘরে ফেরা নিয়ে শঙ্কিত বাংলাদেশের গণমাধ্যমকর্মীরাও। অফিস বা বাড়ি থেকে ফোন আসছে একটু পরপর। কিন্তু কেউ বলতে পারছেন না, দেশে ফেরার বিমান কবে ধরতে পারবেন।
কাঠমান্ডুতে একটা কথা চালু আছে– থামেল জেগে ওঠে সন্ধ্যায়। দুই-তিন দিন আগেও থামেল ছিল আলো ঝলমলে, উৎসবমুখর। ইন্দ্রযাত্রার র্যালি, শপিং মলগুলোতে ভিড় ছিল।
কিন্তু এ মুহূর্তে পরিস্থিতি অন্যরকম। একদিকে জেন-জি’দের আনন্দ উৎসব, অন্যদিকে স্থানীয় আর বিদেশিদের মধ্যে ভয় আর আতঙ্ক।