Published : 24 Jan 2026, 08:59 PM
আর্কটিকের খনিজ সমৃদ্ধ দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড জোর করে দখল করে নেওয়ার হুমকি, তা থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পিছু হটা ও আরও আলোচনায় রাজি হওয়ার ঘটনাবহুল এক সপ্তাহ পর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটি সফরে গেলেন ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেদেরিকসেন।
শুক্রবার গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকের বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান স্বশাসিত দ্বীপটির প্রধানমন্ত্রী ইন্স-ফ্রেদেরিক নিলসেন।
তার সঙ্গে কথা বলতেই ফ্রেদেরিকসেন ব্রাসেলস থেকে সরাসরি নুকে গেছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
আর্কটিকের এ দ্বীপটি ঘিরে গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ডেনমার্ক ও ইউরোপীয় মিত্রদের উত্তেজনা ক্রমশ চড়ছিল। ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি যে কোনো মূল্যে দ্বীপটির দখল চান। এজন্য প্রয়োজনে বলপ্রয়োগেরও ইঙ্গিত দেন তিনি।
কিন্তু বুধবার হুট করেই পরিস্থিতি বদলে যায়। এদিন দাভোসে ট্রাম্প বলেন, তিনি গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক পদক্ষেপ নেবেন না। ডেনমার্ক ও তাদের মিত্র একাধিক দেশের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি থেকেও সরে আসেন তিনি।
দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে নেটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, গ্রিনল্যান্ডের সম্মান বজায় রেখেই ভবিষ্যৎ এক চুক্তির রূপরেখা নিয়ে সমঝোতা হয়েছে।
এ বিষয়ে আর বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। নেটো মহাসচিব ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে কী বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্নও উঠছে।
শুক্রবার সকালে ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী ব্রাসেলসে রুটের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠক করেন, এরপরই গ্রিনল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
এ বৈঠকের পর রুটে এক্সে লিখেছেন, তারা ‘আর্কটিকের প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদারে’ রাজি হয়েছেন।
“গ্রিনল্যান্ডের অধিবাসীদের প্রতি শক্তিশালী ডেনিশ সমর্থন দেখাতেই আজ আমি গ্রিনল্যান্ডে এসেছি। এটা খুবই কঠিন সময়, সবাই তা দেখতে পাচ্ছেন।
“আমরা খুবই জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আছি। সবাই দেখতে পাচ্ছেন। এখন আমরা কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করবো,” পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে গ্রিনল্যান্ড নেমে বলেছেন ফ্রেদেরিকসেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, ‘কোনো অর্থ খরচ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র সব পেতে যাচ্ছে’ এবং তার পরিকল্পনায় থাকা ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনার ‘অংশবিশেষ’ গ্রিনল্যান্ডেই স্থাপন করা হবে।
এটা কি প্রকৃত অর্থে ‘অধিগ্রহণ’ কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট বলেন, “সম্পূর্ণ প্রবেশাধিকার। এর কোনো সমাপ্তি নেই, কোনো সময়সীমা নেই।”
ট্রাম্পের এই অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সাবেক ডেনিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্তিন লিডেগোর।
“প্রেসিডেন্টের (ট্রাম্প) কথায় পরিবর্তন শুনছি আমি। উত্তেজনা, উত্তেজনা আর উত্তেজনার দীর্ঘ সময়ের পর আমি এখন খানিকটা আশাবাদী,” বিবিসিকে এমনটাই বলেছেন তিনি।
তবে তার মতো এতটা আশাবাদী নন গ্রিনল্যান্ডের আইনপ্রণেতা আয়া চেমনিৎজ। তার মতে, দ্বীপের বাসিন্দারা এত সহজে আশ্বস্ত হতে পারছেন না।
“আমার মনে হয় এখনই আমাদের মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া উচিত নয়। অনেকেই বিভ্রান্ত, উদ্বিগ্ন,” বলেছেন তিনি।
ট্রাম্প এর আগে সিএনবিসিকে গ্রিনল্যান্ডের ‘নিরাপত্তা, খনিজ ও সবকিছু নিয়ে খুবই দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি’ হতে যাচ্ছে বলে যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন চেমনিৎজ।
“নেটোর সঙ্গে খনিজ নিয়ে কোনো আলাপই হয়নি। তারা করবেই বা কেন? এটা পুরোপুরি গ্রিনল্যান্ডের বিষয়,” বলেন এই নারী।
সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এবং নেটো এখন গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যেসব বিকল্প নিয়ে ভাবছে তার মধ্যে আছে ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডের ওপর থেকে তার দাবি তুলে নেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র সেখানে একাধিক সামরিক ঘাঁটি বানাবে।
তবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তারা এ সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডে ডেনিশ সার্বভৌমত্বের বিষয়টি ‘লাল দাগ’, এবং এটি অতিক্রমযোগ্য নয়।
ফ্রেদেরিকসেন বলছেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না, তবে ডেনমার্ক ‘নিরাপত্তা’ নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী।
১৯৫১ সালে হওয়া এক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় দ্বীপটিতে এখনই মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। ওই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র সেখানে আরও সৈন্যও পাঠাতে পারবে।
২০০৪ সালে চুক্তিটিতে খানিকটা বদল এনে গ্রিনল্যান্ডকেও ডেনমার্কের সঙ্গে সমান অংশীদার বানানো হয়।
প্যারিসভিত্তিক এক বার্তা সংস্থা লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক এখন ১৯৫১ সালের চুক্তিটি নিয়ে নতুন আলোচনা করতে পারে বলে বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
ডেনিশ খবরের কাগজ বেরলিঙ্কস্কে লিখেছে, চুক্তি নিয়ে নতুন আলোচনার সম্ভাবনা প্রবল। তবে খনিজ সম্পদের অধিকার ও ভূখণ্ড আত্মসমর্পণ নিয়ে কোনো আলোচনা হতে পারবে না।
এ প্রসঙ্গে বিবিসি ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা কিছু বলতে রাজি হয়নি।