Published : 29 Jun 2026, 01:20 AM
আমার জীবনে রাষ্ট্র বদলেছে, ভূগোল বদলেছে, ঠিকানা বদলেছে। কিন্তু যেখানেই থাকি, বাংলা ভাষাই আমার একমাত্র আশ্রয়, আমার একমাত্র দেশ। রাষ্ট্র মানুষকে নির্বাসিত করতে পারলেও ভাষা থেকে বিচ্যুত করতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াশিংটন ডি.সি. বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এভাবেই নিজের আবেগ আর সংগ্রামের কথা জানান নির্বাসিত কবি ও লেখক তসলিমা নাসরিন।
শুক্রবার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে ‘বাংলা কেন্দ্র’ আয়োজিত দুই দিনব্যাপী এ মেলার উদ্বোধন করা হয়।
ফিতা কেটে ও প্রদীপ জ্বালিয়ে মেলার সূচনা করার পর উদ্বোধনী ভাষণে তসলিমা নাসরিন তার নির্বাসিত জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমা এবং বাংলা ভাষার প্রতি তার টানের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “আমি বাংলাতেই ভাবি, বাংলাতেই স্বপ্ন দেখি এবং বাংলাতেই প্রতিবাদ করি। ইউরোপে এক দশক থাকার পর ভাষার টানেই আমি পশ্চিমবঙ্গে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানেও আমাকে থাকতে দেওয়া হয়নি। তবুও আমার লড়াই থেমে নেই। আমি লিখে চলেছি মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এবং নারীর অধিকার ও বাকস্বাধীনতার পক্ষে। কারণ লেখাই আমার শ্বাস নেওয়া, লেখাই আমার বেঁচে থাকা।”
প্রযুক্তির আধিপত্যে বই পড়ার সংস্কৃতি হ্রাস পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এই কলামনিস্ট বলেন, “আজ মোবাইলের স্ক্রিন বইয়ের পাতা কেড়ে নিচ্ছে। মানুষ গভীর পাঠ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই সময়ে প্রবাসে বইমেলার আয়োজন এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। এটি শেকড় হারানোর বিরুদ্ধে এবং ভাষাহীন হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ লড়াই।”
নতুন প্রজন্মের সন্তানদের প্রসঙ্গে তসলিমা সতর্ক করে বলেন, “আমাদের সন্তানরা যদি বাংলা পড়তে না শেখে, তবে তারা শুধু একটি ভাষা হারাবে না; তারা হারাবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের মতো বিশাল এক মানবিক উত্তরাধিকারকে। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা মানুষের আত্মপরিচয় তৈরি করে।”
প্রবাসী আয়োজকদের এ উদ্যোগকে ‘ঐতিহাসিক কাজ’ হিসেবে অভিহিত করে তসলিমা। তিনি বলেন, “বই মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়। যে সমাজ বই পড়ে না, সেই সমাজ দ্রুত গুজব, কুসংস্কার আর স্বৈরাচারের হাতে বন্দি হয়ে যায়। তাই বইমেলা আসলে সভ্যতার মেলা।”
মেলা প্রাঙ্গণে মেরিল্যান্ড, ভার্জিনিয়া ও ওয়াশিংটন ডি.সিসহ দূর-দূরান্ত থেকে আসা বইপ্রেমী ও প্রবাসী বাঙালিদের ভিড় দেখা গেছে। আয়োজক সংস্থা ‘বাংলা কেন্দ্র’ জানায়, প্রবাসে নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পৌঁছে দেওয়াই এই মেলার মূল লক্ষ্য।
মেলায় বই বিক্রির পাশাপাশি লেখক-পাঠক আড্ডা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়।