Published : 09 Sep 2026, 08:00 PM
কানাডার সঙ্গে তীব্র বাণিজ্য যুদ্ধের জেরে দেশটির মোটরসাইকেল, অ্যালকোহল ও বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
হোয়াইট হাউজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ট্রাম্পের আদেশ অনুযায়ী, আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে চলেছে।
মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারের মার্কিন পণ্যের ওপর কানাডা পাল্টা শুল্ক আরোপের পরই ওয়াশিংটনের কাছ থেকে এই কঠোর সিদ্ধান্ত এল।
কয়েক দফা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর গত মাসে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারের কানাডীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছিল ওয়াশিংটন। তারই জবাবে মঙ্গলবার পাল্টা ব্যবস্থা নেয় অটোয়া।
ট্রাম্প মার্কিন মহামন্দার আমলের একটি পুরনো আইনের মাধ্যমে এই শুল্ক বসানোয় কানাডা ইউএসএমসিএ চুক্তির আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের এই অচলাবস্থার কারণে উত্তর আমেরিকার ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ‘ইউএসএমসিএ’-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি মার্কিন বাজারের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর তাগিদ দিয়েছেন।
এক ভিডিও বার্তায় কার্নি বলেন, “আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য যা প্রয়োজন তা সবই আছে। এই পরিবর্তনের পেছনে কিছু মূল্য অবশ্যই চুকাতে হবে, তবে হাত গুটিয়ে বসে থাকার মাশুলের চেয়ে তা অনেক কম।”
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় কানাডার বিয়ার, বিভিন্ন ধরনের ওয়াইন, হুইস্কি, ভদকা, রামসহ অধিকাংশ অ্যালকোহলজাত পণ্য রয়েছে। এছাড়া দুগ্ধজাত পণ্যের মধ্যে হুই প্রোটিন, বিশেষ ধরনের গুড় ও নন-অ্যালকোহলিক বিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি কানাডীয় বিভিন্ন ধরনের পনির, কাগজ, অ্যালুমিনিয়াম, কাঠ, আসবাবপত্র ও লাইটিং সামগ্রীর ওপর ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক বসানো হয়েছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, আগামী ১ জানুয়ারি থেকে কানাডীয় গাড়ির ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের যে হুমকি ছিল, তা এখনও বহাল রয়েছে।
অদূর ভবিষ্যতে মার্কিন সরকারি কেনাকাটার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা 'জিএসএ' থেকে কানাডীয় পণ্য বাদ দেওয়ার জন্যও ট্রাম্প নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে করে কানাডা তাদের নীতি বদলাতে বাধ্য হয়।
অবশ্য পরিস্থিতি নিরসনে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এবং কানাডার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক ল্যব্লাঁর মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
ল্যব্লাঁ এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে মার্কিন পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, “কানাডার শ্রমিক, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের এই অন্যায্য সিদ্ধান্ত থেকে রক্ষাই আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার।”
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে মিশিগান ও ওহাইওর মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোকে লক্ষ্য করে ইস্পাত, আসবাবপত্র, পোশাক ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যে ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে কানাডা।
‘কানাডিয়ান এগ্রি-ফুড ট্রেড অ্যালায়েন্স’-এর নির্বাহী পরিচালক মাইকেল হার্ভি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা সংঘাতের মাত্রা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে থাকা নিয়ে চিন্তিত। তবে একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী যে কৌশলী অবস্থান নিচ্ছেন তাও আমরা বুঝতে পারছি।”
এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় কানাডার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে ক্ষোভ ঝাড়ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
সম্প্রতি ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে ট্রাম্প হুমকি দেন, কানাডীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘বোম্বারডিয়ার’ যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা স্থাপন না করলে দেশটিতে আর কোনো বিমান বিক্রি করতে পারবে না।
এমনকি মার্কিন পতাকায় মোড়ানো উত্তর আমেরিকার একটি মানচিত্র শেয়ার করে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি ছবিতে প্রধানমন্ত্রী কার্নিকে ‘গভর্নর’ বলে উপহাস করেন ট্রাম্প, যা কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর পুরোনো কটাক্ষকে মনে করিয়ে দেয়।
এক নির্বাহী আদেশে সই করে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সীমান্তের ঐতিহাসিক 'লেক অন্টারিও'র নাম বদলে 'লেক আমেরিকা' রাখার বিতর্কিত ঘোষণাও দেন ট্রাম্প।
বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে জাপানি বিয়ার প্রস্তুতকারক সংস্থা ‘সাপ্পোরো’ তাদের নন-অ্যালকোহলিক পানীয় উৎপাদন কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। কানাডা মূলত তাদের মোট রপ্তানির ৬৮ শতাংশই পাঠায় যুক্তরাষ্ট্রে, যা প্রতিপক্ষের চেয়ে ১৩ গুণ ছোট অর্থনীতি।
সংঘাত মারাত্মক আকার ধারণ করলেও সাম্প্রতিক জনমত সমীক্ষায় দেখা গেছে, কানাডার ৬২ শতাংশ মানুষ প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নেওয়া কঠোর অবস্থানের পক্ষে রয়েছেন।
অন্যদিকে রয়টার্স/ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের এই কানাডাবিরোধী শুল্ক নীতির পক্ষে মাত্র ২০ শতাংশ আমেরিকান সমর্থন জানিয়েছেন।