Published : 04 Jan 2026, 02:05 AM
রাতের অন্ধকারে ক্ষমতাসীন একজন প্রেসিডেন্টকে তার রাজধানী থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া–লাগামহীন ক্ষমতার প্রকাশ এর চেয়ে আর কতটা নগ্ন হতে পারে? মার্কিন আইনেই তা কতটা সঙ্গত?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ৭৪ শব্দের একটি পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দেখালেন, পররাষ্ট্র নীতিতে নিজের বিচিত্র সব ইচ্ছা পূরণে তিনি কতটা আচমকা, কতটা দ্রুত এবং কতটা বেপরোয়া পদক্ষেপ নিতে পারেন।
এ ধরনের পদক্ষেপের পরিণতি কিংবা আন্তর্জাতিক আইন যে তিনি তোয়াক্কা করেন না, সেটাও স্পষ্ট করলেন।
লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় রাতের অন্ধকারে হামলার পর এর প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার পর মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণে এমন প্রশ্নই তোলা হয়েছে।
স্থানীয় সময় শুক্রবার রাতে (বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর) ভেনেজুয়েলার সামরিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আচমকা হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
হামলার পাশাপাশি দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করার কথা জানান ট্রাম্প। পরে মাদুরোকে উড়িয়ে (হেলিকপ্টারে) করে নিয়ে যাওয়ার তথ্য দেওয়া হয়।
হামলার বেশ কয়েক ঘণ্টা পর বাংলাদেশ সময় শনিবার রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মাদুরোর ছবি প্রকাশ করে বলেছেন, তাকে মার্কিন একটি জাহাজে করে নিউ ইয়র্ক নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে তার বিচার করার কথাও বলেন তিনি।
সাদ্দাম-নরিয়েগার পর মাদুরো
এই ঘটনার কাছাকাছি আরেকটি ঘটনার তুলনা কেবল হতে পারে পানামার নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে আটকের সেই ইতিহাস, যা ঘটেছিল ১৯৮৯ সালে। দুই ঘটনার মধ্যে কিছু মিলও আছে।
যেমন– মাদুরো ও নরিয়েগা দুইজনের বিরুদ্ধেই বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসার অভিযোগ ছিল। দুজনের বিরুদ্ধেই মাদক পাচারের অভিযোগ তুলেছিল যুক্তরাষ্ট্র। আবার দুটি দেশেই অভিযান চালানোর আগে থেকে তারা সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে।

আবার দুই অভিযানের ক্ষেত্রে তফাতৎ আছে। যেমন– নরিয়েগাকে ধরার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে ছোটখাটো যুদ্ধ হয়েছিল।
পানামার এই নেতা ১৯৮৮ সালে কোকেইন চোরাচালান ও অর্থপাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে চাপ তৈরি করতে বিভিন্ন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
তবে নরিয়েগা কোনোভাবেই চাপের কাছে নত হননি। বরং ১৯৮৯ সালে পানামার জাতীয় পরিষদ তাকে সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
এই ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছিল চ্যালেঞ্জ। ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ নামে পানামায় সামরিক অভিযান শুরু করে। যার লক্ষ্য ছিল, নরিয়েগাকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া।
অভিযানের ফলে নরিয়েগা পানামা সিটির ভ্যাটিকান দূতাবাসে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি আত্মগোপনের চেষ্টা করেন। তবে ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে তিনি আত্মসমর্পণ করেন। এটি ছিল নরিয়েগার শাসনের পতনের চূড়ান্ত মুহূর্ত।
এরপর তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড, মাদক পাচার, অর্থপাচারসহ নানা অভিযোগ আনা হয়েছিল।
পানামায় ওই অভিযানের পর লাতিন আমেরিকার কোনো দেশে এমন সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করেনি যুক্তরাষ্ট্র।

মাদুরোর মতো সবশেষ পরিণতি হয় ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের। দেশটিতে হামলা শুরুর নয় মাসের মাথায় ২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর মার্কিন বাহিনী তাকে আটক করে।
নোরিয়েগা ও সাদ্দাম– দুজনই বহু বছর ধরে ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ছিলেন। বিশেষ করে গত শতাব্দির আশির দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় সাদ্দামের পাশে ছিল মার্কিন প্রশাসন, যে যুদ্ধে প্রায় ১০ লাখ মানুষ নিহত হয়। কুয়েতে হামলা আর আল-কায়েদার মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ তুলে সাদ্দামের মতো মিত্রকে পরে ক্ষমতাচ্যুত করে ওয়াশিংটন।
মাদুরোর বিরুদ্ধে কী অভিযোগ?
ভেনেজুয়েলার মাদুরোকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়াটা যুক্তরাষ্ট্রে অনেকের চোখেই এক বিশাল জয়, বিশেষ করে যারা প্রকাশ্যে ভেনেজুয়েলায় শাসক বদলে সমর্থন জানিয়ে আসছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিন ধরেই বলে আসছে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অবৈধভাবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে মাদক পাচারে জড়িত।
এসব অভিযোগ এনে গত কয়েক মাসে ক্যারিবিয়ান সাগরে বিপুল সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ এবং পরমাণু-ডুবোজাহাজ নামায় যুক্তরাষ্ট্র।
ভেনেজুয়েলার তেলের ট্যাঙ্কার চলাচলে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। অভিযোগ ছিল, মাদক পাচার এবং অন্যান্য অপরাধের জন্য তেলের অর্থ ব্যবহার করছে মাদুরো সরকার।
অনেকে বিশ্লেষক মনে করেন, কেবল হত্যা কিংবা মাদক চোরাচালানের অভিযোগেই মাদুরোকে লক্ষ্যবস্তু বানাননি ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের নিশানায় পড়ার পেছনে ট্রাম্পের ‘মনরো’ মতবাদও কাজ করেছে। আছে জ্বালানি তেলের স্বার্থও।
চলতি মাসে ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশ করেছেন। এতে তিনি যুক্তি দেন যে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯ শতকের ‘মনরো’ মতবাদ পুনরুজ্জীবিত করা উচিত। এই মতবাদে ঘোষণা করা হয়েছে, পশ্চিম গোলার্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রভাব অঞ্চল’।
এতে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও সামরিক স্থাপনার মতো সম্পদে প্রবেশের ক্ষেত্রে বেইজিংকে আটকানোর সহজ উপায় হচ্ছে পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন প্রভাব ফিরিয়ে আনা।
মাদুরো বরাবরই অভিযোগ ছিল, ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার তেল চায়, যা এখন প্রধানত চীনের কাছে বিক্রি করা হয়।
মাদুরোর সামনে কী
মাদুরোর ভাগ্যে কী ঘটবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে কেউ এটুকু ধরেই নিতে পারেন যে, তার জায়গা হবে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে।
মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউ ইয়র্কে অভিযুক্ত করা হয়েছে বলে এরই মধ্যে জানিয়েছেন মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি।
তিনি বলেন, মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘মাদক, সন্ত্রাসবাদ, কোকেন আমদানি, মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক ডিভাইস রাখার’ অভিযোগ আনা হয়েছে।
“তারা শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে ন্যায়বিচারের মুখোমুখি হবেন।”
যদিও মাদুরোর স্ত্রীর বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়ে কিছু বলেননি বন্ডি।
তবে যত অভিযোগই তাদের বিরুদ্ধে আনা হোক না কেন, বিষয়টি সবসময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবেই দেখা হবে।
কারণ হোয়াইট হাউজ অনেক আগে থেকেই ভেনেজুয়েলার বামপন্থি সরকারকে হঠাতে চাইছে। সেটা কখনো মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অজুহাতে হোক, তেলের জন্যই হোক বা রাশিয়ার সঙ্গে মাদুরো সরকারের ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর কারণেই হোক।
মাদক পাচারের অভিযোগ মাদুরো বরাবরই অস্বীকার করে এসেছেন। বরং তার পক্ষ থেকে অভিযোগ ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় থাকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুদ কব্জায় নিতে চায়।
তবে এটাও ঠিক যে, মাদক পাচারের বিষয়ে ভেনেজুয়েলা একেবারে ধোয়া তুলসি পাতা ছিল না।
বিশ্বের শীর্ষ কোকেন উৎপাদনকারী দেশ কলম্বিয়াকে মাদক-পাচারের জন্য ভেনেজুয়েলা নিজেদের আকাশ ও জলপথ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল।
ভেনেজুয়েলার চেয়েও মাদক পাচারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হোতা কলম্বিয়া এবং মেক্সেকোর মাদকচক্র।
তবে সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ততটা নজর দেয়নি, যতটা তারা দিয়েছে ভেনেজুয়েলার ওপর। ফলে স্বাভাকিভাবেই ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য এই অভিযান চালানোর একটা বড় লক্ষ্য তলে তলে ছিল।
মাদুরোকে আটকের পর ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে আর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার আভাস এরই মধ্যে দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তবে এখন যে বিষয়টি অস্পষ্ট, তা হল ভেনেজুয়েলায় সামনের দিনগুলোতে কী হবে?
সেখানে কি রাতারাতি একজন উত্তরসূরি আসবে এবং মাদুরোর মতো একই ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক থাকবে? ভেনেজুয়েলায় কি যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী ক্ষোভ দেখা যাবে? নাকি মাদুরোর একনায়কতন্ত্রের অবসানে আনন্দ উদযাপনের আমেজ দেখা যাবে?

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সমর্থকরা বলছেন, মাদুরোর পতনে ভেনেজুয়েলায় এখন দেশটির নোবেলজয়ী বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর ক্ষমতা নেওয়ার পথ প্রশস্ত হবে।
মাচাদোর পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা এদমুন্দো গনসালেস নেতৃত্বে আসতে পারেন।
অনেকে অবশ্য মনে করেন, মাচাদো কিংবা গঞ্জালেসের ক্ষমতায় আসার বিষয়টি খুব একটা সহজ হবে না। কারণ, ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী এবং আধা-সামরিক বাহিনী মাদুরোর অনুগত।
মাদুরোর সমালোচনা করা কিছু বিশ্লেষক এমন আশঙ্কাও করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে ভেনেজুয়েলায় আরো অস্থিতিশীলতা ডেকে আনবে।
মাদুরো ধরা পড়ার খবর পাওয়ার পর তার অন্য অনেক ঘনিষ্ঠ মিত্রই এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় থাকবেন। তাই মাদুরোকে ধরতে পারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য জয় হলেও তার পতনে ভেনেজুয়েলায় যে বিশৃঙ্খলা এবং ধস নামবে, তা ধাপে ধাপে লোকসানের দিকেই যাবে।
ফলে পরবর্তীতে কী হবে, সেই পরিকল্পনা করাটাই এখন কারাকাসের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বা ক্ষমতার বিস্ময়কর প্রদর্শনীর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন
‘যথাযথ পরিবর্তন’ না হওয়া পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প
ছবি শেয়ার করে ট্রাম্প জানালেন, ‘মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের ইও জিমা জাহাজে’
মাদুরোকে লক্ষ্যবস্তু করার যে কারণ দেখিয়েছেন ট্রাম্প
ভেনেজুয়েলায় হামলা সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন: নিন্দায় রাশিয়া-ইরান
ভেনেজুয়েলায় আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না: মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ভেনেজুয়েলার রাজধানীতে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণ, জরুরি অবস্থা
যুক্তরাষ্ট্রকে মাদুরোর অবস্থান খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে সিআইএ চর
যুক্তরাষ্ট্রকে মাদুরোর অবস্থান খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে সিআইএ চর