Published : 18 Dec 2025, 04:18 PM
ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলে একটি নৌযানে চালানো সর্বশেষ হামলায় চারজন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন কমান্ড (সাউথকম) জানায়, তাদের চালানো হামলায় ‘চারজন পুরুষ মাদক-সন্ত্রাসী’ নিহত হয়েছেন। তবে ধ্বংস করা নৌযানটি মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না, এমন কোনো প্রমাণ তারা দেয়নি।
সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা লিখেছে, মার্কিন আইনপ্রণেতারা ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসন সীমিত করতে আনা প্রস্তাবগুলো খারিজ করার পরই এই ‘প্রাণঘাতী’ হামলার ঘোষণা আসে।
সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন কমান্ড সাউথকম বলেছে, “নৌযানটি পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের জ্ঞাত মাদক চোরাচালানের রুট ধরে যাচ্ছিল আর এটি মাদক পাচার করছিল।”
এই পোস্টের সঙ্গে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। সেটিতে দেখা গেছে, মার্কিন বাহিনীর হামলায় একটি স্পিডবোট ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এ হামলা চালানোর নির্দেশ দেন। এ নিয়ে সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর ও ক্যারিবীয় সাগরে ২৬টি নৌযানের হামলা চালানোর কথা জানালো ওয়াশিংটন। তাদের এসব হামলায় প্রায় ১০০ জন নিহত হয়েছেন।
আইনি বিশেষজ্ঞরা আন্তর্জাতিক জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের এসব অভিযানকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে আখ্যা দিলেও ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ভেনেজুয়েলাভিত্তিক মাদকচক্রসহ কার্টেলগুলোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবাহ ঠেকাতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বুধবার রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদ ২১৩-২১১ ভোটে এমন একটি প্রস্তাব নাকচ করে দেয়, যেখানে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ভেনেজুয়েলার সঙ্গে বা ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সামরিক তৎপরতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়ার কথা ছিল।
আরেকটি প্রস্তাবও ২১৬-২১০ ভোটে বাতিল হয়, যেখানে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ‘পশ্চিম গোলার্ধে প্রেসিডেন্ট ঘোষিত যেকোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের’ বিরুদ্ধে সামরিক তৎপরতায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলা হয়েছিল।
লাতিন আমেরিকার ক্যারিবীয় অঞ্চলে বড় ধরনের সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এখানে হাজারো সেনা, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরীবহর, ডজনখানে যুদ্ধজাহাজ ও এফ-৩৫ স্টিলথ যুদ্ধবিমান এবং একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে উৎখাতের হুমকিও দিয়েছেন ট্রাম্প।
মঙ্গলবার ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার বন্দরে যাতায়াতকারী যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সব তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর নৌ অবরোধের নির্দেশ দেন। ভেনেজুয়েলা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপকে ‘জঘন্য হুমকি’ বলে অভিহিত করে এবং এটি দেশের সম্পদ ‘লুটে নেওয়ার’ চেষ্টা বলে অভিযোগ করে।
গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলার উপকূলে ‘স্কিপার’ নামের একটি তেলবাহী জাহাজে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। পরে জাহাজটিতে বহনকারী তেল খালাস করার জন্য সেটিকে টেক্সাসে নিয়ে যাওয়া হয় বলে খবর।
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, নৌ অবরোধ ঘোষণার পর ভেনেজুয়েলার নৌবাহিনী পেট্রোলিয়ামবাহী জাহাজগুলোকে পাহারা দিতে শুরু করেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ও বুধবার সকালে দেশটির পূর্ব উপকূল থেকে নৌবাহিনীর পাহারায় কয়েকটি জাহাজ যাত্রা করে বলে পত্রিকাটি তিনটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে।
ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় যুদ্ধের আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে, এমন প্রেক্ষাপটে লাতিন আমেরিকার নেতারা এবং জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম ভেনেজুয়েলায় সহিংসতা ঠেকাতে জাতিসংঘকে ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান।
"এখনো তারা সক্রিয় নয়। রক্তপাত ঠেকাতে তাদের দায়িত্ব নিতে হবে," বলেন তিনি। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলায় বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন শেইনবাউম।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা বলেন, “লাতিন আমেরিকা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মনোভাব ও হুমকি আমাকে উদ্বিগ্ন করছে।”
তিনি জানান, চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে তিনি ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানান।
“আমি ট্রাম্পকে বলেছি, শব্দের শক্তি বন্দুকের শক্তিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। আপনি যদি ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সঠিকভাবে কথা বলতে চান, আমরা সহায়তা করতে পারি। তবে আপনাকে কথা বলতে আগ্রহী ও ধৈর্যশীল হতে হবে,’” বলেন লুলা।
ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট মাদুরো জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেসের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের নিন্দা জানান বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে জানিয়েছে।
সরকারি সংবাদমাধ্যম আগেনসিয়া ভেনেজুয়েলার প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘ঔপনিবেশিক হুমকির নতুন মাত্রা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এ ছাড়া ’ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদ তাদেরই’,যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের করা এমন মন্তব্যকে তিনি ‘বর্বর কূটনীতি’ বলে অভিহিত করেছেন।