Published : 10 Oct 2025, 12:07 AM
উন্নত প্রযুক্তি তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ ও অন্যান্য উপকরণের রপ্তানি নীতিমালা আরও কঠোর করছে চীন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য আলোচনা এবং এ মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন বৈঠকের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্তকে বড় কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিবিসি লিখেছে, বিশ্বে ব্যবহৃত বিরল খনিজের প্রায় ৯০ শতাংশই প্রক্রিয়াজাত করে চীন। সোলার প্যানেল থেকে শুরু করে স্মার্টফোন তৈরিতে এই খনিজগুলো আধুনিক প্রযুক্তি শিল্পের অপরিহার্য উপাদান। ফলে ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে এগুলো চীনের দর কষাকষির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
চীন এর আগেও প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অনুমোদনবিহীন সহযোগিতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। তবে বৃহস্পতিবার রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার নতুন ঘোষণার মাধ্যমে সেই বিধিনিষেধ এখন আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়মে পরিণত হল।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশি কোম্পানিগুলোকে এখন সামান্য পরিমাণ বিরল খনিজ রপ্তানির আগেও চীন সরকারের অনুমোদন নিতে হবে। পাশাপাশি তাদেরকে এও জানাতে হবে যে, এসব উপকরণ কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একইভাবে লিথিয়াম ব্যাটারি এবং কিছু ধরনের গ্রাফাইট রপ্তানির ওপরও সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে—যেগুলো বিশ্ব প্রযুক্তি সরবরাহ চেইনে অত্যাবশ্যক এবং মূলত চীনেই উৎপাদিত হয়।
বেইজিং বলেছে, এই বিধিনিষেধের লক্ষ্য ‘জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা’। বিশ্লেষকদের মতে, এই নিয়ন্ত্রণ মূলত বিদেশি প্রতিরক্ষা নির্মাতাদের লক্ষ্য করে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠান চীনের বিরল খনিজের ওপর নির্ভরশীল।
এ বছর এপ্রিলেই চীন বেশ কয়েকটি বিরল খনিজ ও সংশ্লিষ্ট উপাদানকে তাদের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তালিকায় যুক্ত করেছিল, যখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ আরও তীব্র হয়। এতে বৈশ্বিক ঘাটতি তৈরি হয়।
তবে নতুন ঘোষণায় স্পষ্ট করা হয়েছে—অস্ত্র নির্মাতা ও চিপ শিল্পের কিছু কোম্পানিকে বিরল খনিজ রপ্তানির লাইসেন্স দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, খনিজ আহরণ, প্রক্রিয়াকরণ বা বিরল খনিজ থেকে চুম্বক তৈরির প্রযুক্তিও এখন সরকারের অনুমতি ছাড়া রপ্তানি করা যাবে না।
একইভাবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চীনা ফার্মগুলোর যৌথভাবে বিরল খনিজ খাতে কাজ করাও সরকারের অনুমতি ছাড়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে নতুন নিয়মে।
ঘোষণায় বলা হয়, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবে খনিজ আহরণ, গলন, পৃথকীকরণ, চৌম্বক পদার্থ তৈরি ও পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি। এমনকি উৎপাদন যন্ত্রপাতির সংযোজন, রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার ও আপগ্রেডও অনুমতি ছাড়া রপ্তানি করা যাবে না।
এ পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। দেশটিতে বিরল খনিজ আহরণ শিল্প থাকলেও প্রক্রিয়াজাত করার পর্যাপ্ত সুবিধা নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার পাল্টা পদক্ষেপ। ওয়াশিংটন যেভাবে চীনে চিপ তৈরির সরঞ্জাম বিক্রি বন্ধ করেছে, চীন এখন সেই কৌশলই উল্টোভাবে প্রয়োগ করছে।
মার্কিন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স ক্যাপরি বলেন, “ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগেই এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা সময়োপযোগীভাবে পরিকল্পিত।” তার মতে, বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের ইলেকট্রনিক্স ও অস্ত্রশিল্পের দুর্বল জায়গাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে, ঠিক যেভাবে আগে যুক্তরাষ্ট্র চীনের চিপ শিল্পকে টার্গেট করেছিল।
বিরল খনিজ কী?
বিরল খনিজ বলতে ১৭ ধরনের রাসায়নিক উপাদানকে বোঝায়, যেগুলো উন্নত প্রযুক্তিপণ্য তৈরিতে অপরিহার্য।
যদিও প্রকৃতিতে এগুলো তুলনামূলকভাবে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়, কিন্তু বিশুদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায় না এবং আহরণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
এই খনিজগুলোর মধ্যে নিওডিমিয়াম, ইট্রিয়াম ও ইউরোপিয়ামের মতো উপাদান রয়েছে, যেগুলো ব্যবহৃত হয় স্পিকার, কম্পিউটার হার্ডড্রাইভ, বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর এবং জেট ইঞ্জিনে—যা যন্ত্রপাতিকে আরও ছোট ও কার্যকর করে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী বিরল খনিজের উৎপাদনের ৬১ শতাংশ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের ৯২ শতাংশই চীনে হয়ে থাকে।