Published : 16 Jun 2025, 04:53 PM
ইরানে ইসরায়েলের নজিরবিহীন হামলার পর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক জোট সাংহাই কো-অপারেশন (এসসিও) এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিলেও নিজেদেরকে ওই বিবৃতি থেকে দূরে রেখেছে জোটেরই আরেক প্রভাবশালী সদস্য ভারত।
এমন না যে ভারত ইসরায়েলের এতটাই ঘনিষ্ঠ বন্ধু যে ইরানকে শত্রুর দৃষ্টিতে দেখে।
তেহরানের সঙ্গে নয়া দিল্লির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বোঝাপড়া বেশ চমৎকার। ইরানের চাবাহার বন্দর ঘিরে ভারতের বিনিয়োগও কম নয়।
তাহলে কেন ভারত জোটের সদস্যদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানাল না? প্রভাবশালী ইউরেশিয়ান রাজনৈতিক জোটে কী তবে ভাঙনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে? এসবেরই উত্তর খুঁজেছে আল-জাজিরা।
এসসিও কী বলেছে
শুক্রবার ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় ইসরায়েলের নজিরবিহীন হামলার পর বিশ্বের অনেক দেশই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং উত্তেজনা নিরসনে দুই দেশকে সংযত হতে আহ্বান জানিয়েছে।
উদ্বেগ জানালেও যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বেশিরভাগ দেশ ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে বলেছে, ইরান কোনোভাবেই পরমাণু অস্ত্র বানাতে পারবে না।
অন্যদিকে চীন, রাশিয়াসহ এশিয়া, আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশই ‘জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লংঘন’ ঘটিয়ে ইরানে ইসরায়েলের হামলার কড়া নিন্দা জানিয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানও দেখতে চেয়েছে তারা।
দশ দেশের জোট এসসিও-র বিবৃতিও মূলত এই ঘরানার।
২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত এসসিও-র সদস্যদের তালিকায় আছে চীন, বেলারুশ, ভারত, ইরান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, পাকিস্তান, রাশিয়া, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তান।
এই জোটে সর্বশেষ যোগ দেওয়া দেশ-ই ইরান। ২০২৩ সালে ভারত যখন এসসিও-র চেয়ারম্যান পদে ছিল, তখন তারা যুক্ত হয়।
ভারত ও ইরান আরেক প্রভাবশালী জোট ব্রিকসেরও সদস্য।
এসসিও-র এখনকার চেয়ার চীন। ইরানে ইসরায়েলের হামলার পর শনিবার জোটটি তাদের বিবৃতিতে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা বৃদ্ধিতে ‘গভীর উদ্বেগ প্রকাশ’ করে এবং ইরানি ভূখণ্ডে ‘ইসরায়েলের সামরিক হামলার তীব্র নিন্দা’ জানায়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোসহ বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুকে নিশানা করে ইসরায়েলের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এবং এটি আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
“(ইসরায়েলি হামলা) ইরানের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষতি এবং বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করছে,” ইরান সরকার ও দেশটির জনগণের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে বলা হয় বিবৃতিতে।
এতে আরও বলা হয়, “ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, শান্তিপূর্ণ, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়েই এর সমাধান হওয়া উচিত বলে এসসিও সদস্য দেশগুলো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।”
ভারতের ‘ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা’
তেহরানে ইসরায়েলের প্রথম হামলার পরপরই ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে ফোনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর ‘ঘটনার মোড় ঘুরে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর উদ্বেগের কথা’ জানান।
জয়শঙ্কর ‘উত্তেজনার যে কোনো পদক্ষেপ পরিহার এবং যত দ্রুত সম্ভব কূটনীতিতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান’ বলে জানায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
শুক্রবার পৃথক আরেক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয়টি ইরান-ইসরায়েল পরিস্থিতিতে ভারতের গভীর উদ্বেগের কথাও জানায়।
“দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর হামলার যে খবর আসছে, সেগুলোর দিকে কড়া নজর রাখছি আমরা,” বলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তারা উভয় পক্ষকে বিদ্যমান কূটনৈতিক ও সংলাপের নানান চ্যানেল ব্যবহার করে উত্তেজনা প্রশমনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়।
“উভয় দেশের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উপভোগ করে ভারত, তাই সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেও আমরা প্রস্তুত,” বলা হয় বিবৃতিতে।
নয়া দিল্লিকে আসলে এই পরিস্থিতির মধ্যেও ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এবং ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক, দুই কূলই বজায় রাখতে হচ্ছে বলে মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস-আমহার্স্টের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো শান্তি ডি’সুজা।
ভারত ইসরায়েলের অস্ত্রের সর্ববৃহৎ ক্রেতা; গাজা যুদ্ধের মধ্যে ২০২৪ সালে ভারতীয় অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানিগুলো ইসরায়েলকে রকেট ও বিস্ফোরক বিক্রি করেছে বলে আল জাজিরার এক অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে।
পাশাপাশি ভারত ইরানের চাবাহার বন্দর উন্নয়নেও কাজ করছে, যেন এটি মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানে ভারতীয় রপ্তানি পণ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করতে পারে।
“ইসরায়েলে ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক দফার লড়াইয়ের মধ্যেও ভারতকে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে,” বলেছেন ডি’সুজা।
ইরানে ইসরায়েলের হামলা নিয়ে এসসিও-র দেওয়ার বিবৃতির পর নয়া দিল্লি বলেছে, তারা এ বিবৃতি সংক্রান্ত আলোচনায় অংশ নেয়নি।
“পরিস্থিতি নিয়ে ভারত আগেই তার অবস্থান জানিয়েছে, সেটাই এসসিও সদস্যদেরকে জানানো হয়েছে,” বলেছে তারা।
তবে নয়া দিল্লির এ অবস্থান ভারতের ভেতরও সমালোচিত হচ্ছে। কংগ্রেসের নেতাকর্মীরা বেশ খোলাখুলিভাবেই নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে ‘ভীতু, কাপুরুষ’ বলছেন, কেউ কেউ আবার বলছেন- বিজেপির সরকার আসলে ‘ইসরায়েলের দোসর’, যা ভারতের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দীর্ঘদিনের অবস্থানকে নষ্ট করে দিচ্ছে।
ভারত কি ইসরায়েলকে সমর্থন দিচ্ছে?
না, সরাসরি নয়া দিল্লির সমর্থন পাচ্ছে না তেল আবিব। কিন্তু ভারত এসসিও-র বিবৃতির বাইরে থাকায় ইরানে ইসরায়েলের হামলা নিয়ে জোটের নিন্দার প্রভাব খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এসসিও-র বিবৃতির আগের দিনই ভারত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গাজায় ‘দ্রুত, শর্তহীন ও স্থায়ী অস্ত্রবিরতি’ দাবি করে হওয়া ভোটেও অনুপস্থিত ছিল।
ভারতের এমন অবস্থান নিয়ে ধন্দে পড়েছেন নয়া-দিল্লিভিত্তিক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের ডেপুটি ডিরেক্টর কবির তানিজা।
তার ধারণা, ভারত এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রকে বিন্দুমাত্র চটাতে চাইছে না, কারণ তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তির খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। তারা তাড়াতাড়ি চুক্তিটি করতে চায়, তা না হলে জুলাইয়ের শুরু থেকেই ভারতীয় পণ্যকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ২৭% শুল্ক গুণতে হবে।
জাতীয় স্বার্থ সরিয়ে রাখলেও, ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা নিয়ে এসসিও থেকে নয়াদিল্লির কিছুটা বাইরে থাকা জোটটির কাঠামোরই প্রতিফলন বলে মনে করেন তানিজা। তার মতে, এ জোটে ভারত কেমন যেন ‘খাপছাড়া’।
এ জোটের সদস্য চীন ও রাশিয়া ইরানের খুব ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, অন্যদিকে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়।
“এসসিও-র এমন বিবৃতি ও ভাষার সঙ্গে সহমত হওয়া ভারতের জন্য বেশ কঠিনই হতো,” বলেছেন তিনি।
ইরানের ওপর মার্কিন চাপ কি ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে ঝুঁকি নয়?
এখানেই নয়া দিল্লির বিপদ।
বারাক ওবামার আমলে হওয়া ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে এনে তেহরানের ওপর আগের সব নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পাশাপাশি আরও নিষেধাজ্ঞা দেন। তার আগ পর্যন্ত ইরান ছিল ভারতের তৃতীয় সর্ববৃহৎ তেল সরবরাহকারী।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর চাপ আরও বাড়ান। প্রথম মেয়াদে তিনি ইরানের চাবাহার প্রকল্পকে নিষেধাজ্ঞার বাইরে রেখেছিলেন, দ্বিতীয় মেয়াদে সেই ছাড়ও তুলে নেন তিনি। তাতে ভারত পড়ে বিরাট চাপে।
এই চাবাহার বন্দর ভারতকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে আফগানিস্তান এবং ইরানের ভেতর দিয়ে মধ্য এশিয়ায় বাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগ করে দিত।
এখন ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক বন্দরে নয়াদিল্লির কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ে গেছে।
ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভারতের আগ্রহ কেবল বন্দর প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ নয় বলেও মনে করেন তানিজা।
ভারত ইরানের ভৌগোলিক অবস্থানকেও গুরুত্ব দেয়, কারণ এটি আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় নয়া দিল্লির প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে, যা ভারতের বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও প্রভাবের ক্ষেত্রেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বলেছেন তিনি।