Published : 07 Mar 2026, 04:07 PM
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের যুদ্ধের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইরানের সীমান্তবর্তী কিছু শহর দখলে আশা দেখা কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে তেল আবিব বিমান হামলা চালিয়ে সহায়তা করছে।
সশস্ত্র এ গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের আলোচনা বিষয়ে অবগত তিনটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ কথা বলেছে।
ইরাকে অবস্থান করা কুর্দি সশস্ত্র বাহিনীগুলো ইরানে অভিযানে নামতে পারে—এ ধারণা সবার নজর কাড়ে শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ‘কুর্দিরা সীমান্ত টপকে গেলে চমৎকার হবে’ এমন মন্তব্যের পর।
আকাশ পথে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মুহুর্মূহু হামলা মোকাবেলা করতে থাকা ইরান সীমান্তে কুর্দিদের তৎপরতা শুরু হলে বড়সড় বিপদে পড়ে যেতে পারে। কখন, কীভাবে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা করা যেতে পারে তা নিয়ে এ মিলিশিয়ারা এরই মধ্যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কথাও বলেছে বলে রয়টার্স আগে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল।
ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থান করা ইরানি কুর্দি বিদ্রোহীদের সঙ্গে ইসরায়েলের এই যোগাযোগ নতুন নয়। ইরানি কুর্দি দুটি সূত্র জানিয়েছে, গত প্রায় এক বছর ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের আলোচনা চলছে। অন্যদিকে একটি ইসরায়েলি সূত্র বলছে, তাদের মধ্যে ‘দীর্ঘদিন ধরে’ কথা চলছে।
কুর্দিদের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে এ দুই ইরানি কুর্দির সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে, আর ইসরায়েলের সূত্রটি ওই কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের যোগাযোগের বিষয়টি জানেন। তারা সবাই নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলেছেন।
রয়টার্স কুর্দিদের সঙ্গে যোগাযোগ ও ইরানের বিরুদ্ধে তাদের উসকে দেওয়ার প্রসঙ্গে ইসরায়েলি সরকার বা সামরিক বাহিনীর মন্তব্য চাইলেও তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পায়নি। সাধারণত যুদ্ধ চলাকালে এসব বিষয়ে ইসরায়েলি সরকার প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্যও করে না।
কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে সীমান্তবর্তী কিছু এলাকা দখল করা, বলছে ওই তিনটি সূত্র। তাদের নিশানায় অন্য এলাকাগুলোর পাশাপাশি ওশনাভিয়েহ ও পিরানশহরও আছে বলে দাবি করেছে একটি সূত্র।
এজন্য সীমান্তের ইরাক অংশে হাজার হাজার সেনা জড়ো করা হচ্ছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যে একটি অভিযান শুরুর প্রস্তুতি চলছে, বলেছে সূত্রগুলো। যদিও তাদের এ দাবি রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করতে পারেনি।
বিদ্রোহী দলগুলোর সম্মিলিতভাবে ৫ থেকে ৮ হাজার যোদ্ধা থাকতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। আর তাদের কাছে আছেও হালকা অস্ত্রশস্ত্র। কুর্দি সূত্রগুলো স্বীকার করেছে যে তাদের কাছে যে অস্ত্র রয়েছে তা দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান সহায়তা পেলে তারা সীমান্তে ইরানের জন্য বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি করতে পারবে।
ইসরায়েলি সূত্র বলছে, তারাও আশা করে না যে এই বিদ্রোহীরা ইরানের সরকার ফেলে দেবে, তবে এদেরকে তৎপর করতে পারলে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হবে এবং ইরানের প্রভাবশালী বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর (আইআরজিসি) মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
গত মাসের শেষ দিকে পাঁচটি ইরানি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী জোটবদ্ধ হয়েছে। এদের মধ্যে আছে কুর্দিস্তান ফ্রি লাইফ পার্টি-পিজেএকে, ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইরানিয়ান কুর্দিস্তান-পিডেকেআই এবং কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টি-পিএকে। ইরাকে এদের সবারই যোদ্ধা রয়েছে। তারা ইরাকের কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে কোনো সমর্থন পাবে কিনা তা পরিষ্কার হওয়া যায়নি।
ইরাকি কুর্দিস্তানের রাজনৈতিক বাইরের চাপ সত্ত্বেও ইরানে অভিযানে জড়িত হওয়া বা সেখানে যোদ্ধা পাঠানোর পরিকল্পনায় শামিল হওয়ার খবর প্রকাশ্যেই অস্বীকার করেছে।
তাদের সমর্থন ছাড়া ইরানি কুর্দিদের পক্ষে অভিযানের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া বেশ কঠিন হবে বলে মনে করছে ইসরায়েলি ওই সূত্রটিও। এ পরিকল্পনায় ট্রাম্পের আগ্রহই বা কতদিন থাকে তা নিয়ে সন্দেহও বিদ্রোহীদের দুশ্চিন্তায় রেখেছে।
ইরান বিশেষজ্ঞ ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ সতর্ক করে বলেছেন, এই বিদ্রোহের পেছনে ইরাকি বা ইরানি কুর্দিদের ব্যাপক জনসমর্থন নেই। তুরস্ক ও ইরাকও ইরানে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দেখতে পছন্দ করবে না।
ইরানের অভ্যন্তরে থাকা কুর্দিরা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুর তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে কুর্দি নেতাদের মধ্যে অন্য একটি ভয় কাজ করছে, সেটি হল- সিরিয়ার কুর্দিদের মতো ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ শিকার হওয়া। এজন্য তারা ওয়াশিংটনের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা নিশ্চয়তাও চেয়েছে বলে জানা গেছে।
তাছাড়া অভিযানে গেলে ড্রোনসহ ভারি অস্ত্রশস্ত্রও তাদের লাগবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আকাশ পথে তাদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে এবং সহায়তা দিতে হবে, বলছে সূত্রগুলো।
এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ইরাকের মডেলে ইরানের ভেতরে একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা। তবে ইরান হুঁশিয়ারি করে বলেছে, ইরাক সীমান্ত থেকে কোনো উস্কানিমূলক হামলা হলে তারা তার কঠোর প্রতিশোধ নেবে।