Published : 04 Jun 2026, 06:56 PM
তীব্র অনাবৃষ্টি ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে এশিয়াজুড়ে ফসল রোপণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এই অঞ্চলে খাদ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এর ওপর আবহাওয়ার চরম বৈরি রূপ ‘এল নিনো’ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার আশঙ্কায় ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে।
কৃষক, বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ভারতের শস্য উৎপাদনকারী উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সমভূমি থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় গম বলয়, থাইল্যান্ডের ধানক্ষেত এবং ইন্দোনেশিয়ার বিস্তীর্ণ পাম তেল বাগান পর্যন্ত সর্বত্রই তীব্র গরম ও স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত ফসলের ক্ষতি করছে।
পানির সংকটে কৃষকেরা চাষাবাদের পরিধি কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছেন। চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে এমনিতেই বিশ্ববাজারে সার ও ডিজেলের তীব্র সংকট চলছে। তার ওপর এল নিনো-সৃষ্ট শুষ্ক আবহওয়া কৃষকদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৬ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিশ্ববাজারে গমের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে, যার প্রধান কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান উৎপাদন অঞ্চলগুলোতে তীব্র খরা।
এছাড়া, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় গত এক মাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান রপ্তানি কেন্দ্রগুলোতে চালের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি তৈরি হতে যাচ্ছে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে এশিয়া অঞ্চলে চরম গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া দেখা দিলেও আমেরিকা মহাদেশে অতিবৃষ্টির সৃষ্টি হতে পারে।
স্যাটেলাইট ডেটা ও ইমেজারি ফার্ম ‘স্কাইফাই’-এর মার্কিন আবহাওয়াবিদ ক্রিস হাইড বলেন, “এল নিনোর বৈশ্বিক প্রভাব মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া থেকে শুরু হয়; এরপর তা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে।”
তিনি জানান, তাদের উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন স্যাটেলাইট চিত্রে ইতিমধ্যে এশিয়ার বিভিন্ন অংশে খরার প্রাথমিক লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
খরায় পুড়ছে কৃষিজমি:
ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর গত সপ্তাহে চার মাসের মৌসুমি বায়ু বা বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টির পূর্বাভাস আরও কমিয়ে দিয়েছে। দেশটির বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭০ শতাংশই আসে এই মৌসুমি বায়ু থেকে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের এক ব্যবসায়ী এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান, দেশের অধিকাংশ এলাকার তাপমাত্রা এখন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। এই তীব্র গরমের কারণে গ্রীষ্মকালীন ফসল সময়মতো বোনার পরিবেশ এখন অনুকূলে নেই।
তিনি আরও জানান, এবার মৌসুমি বায়ু দেরিতে আসছে। এই কারণে কৃষকদের চাষাবাদ পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো, বর্ষা আসার পরও বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে কম হতে পারে। এর ফলে আগামীতে দীর্ঘস্থায়ী খরা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতে এই গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে মূলত ধান, সয়াবিন, ডাল, আখ ও ভুট্টা চাষ করা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে অনাবৃষ্টির কারণে ধান ও পাম তেলের ফলন ব্যাহত হচ্ছে।
মধ্য থাইল্যান্ডের চাইনাত প্রদেশের ৪৭ বছর বয়সী কৃষক নেরাঘাত ওরামাহ বলেন, “সবাই খরা নিয়ে চিন্তিত, এখন চাষ করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। দ্বিতীয়বার ধান কাটার জন্য আমাকে পরিস্থিতি বুঝে অপেক্ষা করতে হবে। পানি না থাকলে সবার জন্যই বিপদ, তখন বছরে কেবল একবারই ফসল ফলানো সম্ভব হবে।”
থাইল্যান্ড ও ফিলিপিন্স সাধারণত জুন-জুলাই মাসে তাদের প্রধান ধান রোপণ করে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় এখন দ্বিতীয় মৌসুমের বীজ বপন চলছে।
ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে জনবহুল জাভা দ্বীপসহ উত্তর সুমাত্রা, দক্ষিণ কালিমান্তান এবং সুলাওয়েসির কিছু এলাকায় টানা ১০ দিনেরও বেশি সময় ধরে কোনো বৃষ্টি হয়নি এবং জুন মাসেও সেখানে মাঝারি থেকে কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
চালের বাজারে মূল্যের ঊর্ধ্বগতি:
বিশ্বের মোট চাল রপ্তানির ৪০ শতাংশই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ করে ভারত। বিগত বছরগুলোতে রেকর্ড ফলন হওয়ায় দেশটির কাছে পর্যাপ্ত চালের মজুদ থাকার পরও বিশ্ববাজারে চালের দাম ক্রমাগত বাড়ছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক এক আন্তর্জাতিক শস্য ব্যবসায়ী বলেন, “বাজারে চালের কোনো বড় ধরনের ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে সংকটের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
গত এক মাসে থাইল্যান্ডের চালের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। ভারতের কাছে প্রয়োজনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি চালের বিশাল মজুদ রয়েছে।
তবে ধারণা করা হচ্ছে, মৌসুমি বায়ুর শুরুতে কোনও বিপর্যয় দেখা দিলে ভারত এই মজুদকে জরুরি সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করবে এবং চাল রপ্তানিতে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা বা কড়াকড়ি আরোপ করতে পারে।”
তবে থাইল্যান্ডের কিয়াতনাকিন ফাত্রা ব্যাংকের গবেষণা শাখা ‘কেকেপি রিসার্চ’ জানিয়েছে, জলাধারগুলোতে পানির স্তর ভালো থাকায় খরার প্রাথমিক ধাক্কা কিছুটা সামলানো যেতে পারে। কিন্তু তারা আসল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সারের সংকট নিয়ে।
রয়টার্সকে দেওয়া এক নোটে ব্যাংকটি জানায়, সারের তীব্র সংকট দেখা দিলে চরম পরিস্থিতিতে চালের উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
এদিকে সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের পর অস্ট্রেলিয়ার শুষ্ক ফসলি জমিতে দেরিতে হলেও গমের বীজ বপন শুরু হয়েছে। তবে আগামী মাসগুলোতে এল নিনোর কারণে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কায় কৃষকেরা তটস্থ রয়েছেন।
দেশটির আবহাওয়া ব্যুরো পূর্বাভাস দিয়েছে যে, নিউ সাউথ ওয়েলস এবং কুইন্সল্যান্ডের প্রধান কৃষি অঞ্চলগুলোতে আগামী তিন মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ থেকে ৪০ মিলিমিটার কম বৃষ্টি হতে পারে।
নিউ সাউথ ওয়েলসের কৃষক জন লো জানান, পানির সংকটের কারণে তার মোট চাষযোগ্য জমির পরিমাণ স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ কম রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই এল নিনো পরিস্থিতি চীন এবং কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের আবহাওয়ায় তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না। তবে আমেরিকার দেশগুলোতে এটি প্রচুর বৃষ্টিপাত বয়ে আনবে।
‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার ইনকরপোরেটেড’-এর কৃষি আবহাওয়াবিদ ও সভাপতি ড্রিউ লার্নার বলেন, “পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গ্রীষ্মকালে যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়ার সঙ্গে এল নিনোর সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। অনেক সময় এল নিনোর প্রভাবে গ্রীষ্মে কিছুটা আর্দ্রতা বাড়লেও তার মানে এই নয় যে, সেখানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হবে।”