Published : 21 May 2026, 08:44 PM
ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে আচমকাই উঠে এসেছে এক অভিনব নাম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। রাজনৈতিক দল নয় বরং নিজেদের ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক গোষ্ঠী বলেই দাবি তাদের। কিন্তু জনপ্রিয়তায় এরই মধ্যে ভারতের শাসকদল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ছাপিয়ে গেছে এই তেলাপোকা দল।
ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ককরোচ জনতা পার্টি। নতুন এই দলেই এখন মজে তরুণ প্রজন্ম (জেন জি) থেকে গোটা সোশাল মিডিয়া এবং তুখোড় রাজনীতিবিদরাও।
দলটি আত্মপ্রকাশের মাত্র ২ দিনের মধ্যে ৪০ হাজার সদস্য জুটে গেছে। আর ৫ দিনের মধ্যেই অনলাইন অনুসারী হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। মূল ধারার গণমাধ্যমেরও নজর কেড়েছে দলটি।
ব্যতিক্রমধর্মী নাম, ভিন্নধর্মী প্রচার এবং ভাইরাল পোস্টারের মাধ্যমে তরুণদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে তারা। বিশেষ করে ফেইসবুক, এক্স এবং ইনস্টাগ্রামে দলটির বিভিন্ন পোস্ট ও প্রচার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তরুণদের একটি বড় অংশ বিষয়টিকে নতুন রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও সামাজিক বার্তার সমন্বয় হিসেবে দেখছেন।
ককরোচ পার্টি নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে, “যুবদের দ্বারা, যুবদের জন্য, যুবদের রাজনৈতিক মঞ্চ” হিসেবে। আর দলের মূলমন্ত্র, “ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, অলস”। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুর্যকান্তের বেকার তরুণদের 'তেলাপোকা' ও 'পরজীবী' হিসেবে কটূক্তির প্রতিবাদেই এই ককরোচ জনতা পার্টির সূচনা।

মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে সুর্যকান্ত এক শুনানিতে অভিযোগ করেছিলেন যে, কিছু বেকার তরুণ ভুয়া ডিগ্রির সাহায্যে সাংবাদিকতা ও তথ্য অধিকার (আরটিআই) অ্যাক্টিভিজমে যুক্ত হয়ে সিস্টেম ধ্বংস করছে।
এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে তরুণ সমাজ ব্যঙ্গাত্মকভাবে তেলাপোকাকে (ককরোচ) নিজেদের মাসকট বা প্রতীক হিসেবে বেছে নেয়। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের আদলে দলটির নাম দেওয়া হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।
সূর্যকান্ত অবশ্য পরে তার কথার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে ডিগ্রি নেওয়া কিছু মানুষকে উদ্দেশ্য করে তিনি ওই মন্তব্য করেছিলেন। ভারতের যুবসমাজকে লক্ষ্য করে কথাটি বলেননি।
তারপরও মূলত তরুণ বেকারদের তেলাপোকার সঙ্গে তুলনার করার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। বিশেষ করে জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। প্রধান বিচারপতির মন্তব্য ঘিরে চর্চা শুরু হয় সমাজমাধ্যমে। নিন্দায় সরব হন নেটিজেনদের একাংশ। আর এরপরই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অনলাইন আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়।
এই পার্টি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিতও নয়, এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলও নয়। অনলাইনে চলমান এক ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলনের নাম সিজেপি।
কয়েকদিন আগেই তৈরি হওয়া এই দলটি বলছে, “আপনি যদি ভারতে টুইটার জগতে ঢুঁ মেরে থাকেন এবং যদি ভেবে থাকেন কেন আপনার টাইমলাইনে পোকামাকড়ের ইমোজি, ভোটার তালিকা বিষয়ক মিম এবং ‘ম্যায় ভি ককরোচ’ (আমিও ককরোচ) এই শব্দবন্ধ ছেয়ে গেছে- তবে এই নির্দেশিকা আপনার জন্যই।”

ককরোচ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ ডিপকে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটির ৩০ বছর বয়সী এক ভারতীয় শিক্ষার্থী, যিনি বর্তমানে জনসংযোগ বা পাবলিক রিলেশনস নিয়ে পড়াশোনা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে তিনি ভারতের আম আদমি পার্টির (এএপি) সোশ্যাল মিডিয়া দলের হয়েও কাজ করেছেন। আর ঠিক সেখান থেকেই তিনি রাজনৈতিক যোগাযোগের সহজাত দক্ষতা অর্জন করেন, যা বর্তমানে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
গত ১৬ মে মাইক্রোব্লগিং সাইট এক্সে-এ একটি গুগল ফর্ম পোস্ট করে ডিপকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’তে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান সবাইকে।
একাধিক সাক্ষাৎকারে ডিপকে উল্লেখ করেছেন, “এই সম্পূর্ণ বিষয়টি প্রথমদিকে ছিল পুরোপুরি আকস্মিক এবং মজার ছলে মাথায় আসা একটি চিন্তা”। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষ এতে যোগ দেওয়ার পর তিনি উপলব্ধি করেন যে, এটি শুধুমাত্র একটি হাসির বিষয় নয়, বরং দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভেরও বহিঃপ্রকাশ।
ইতোমধ্যেই দলটির একটি ওয়েবসাইটও খোলা হয়েছে, আর সেখানে এই ব্যাঙ্গাত্মক রাজনৈতিক দলটির পরিচয় দেওয়া হয়েছে এভাবে— যে তারা হল “অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর”। তাদের দাবি, দেশের এমন সব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করা তাদের লক্ষ্য, যাদের দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিকাঠামোয় সাধারণত গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ইচ্ছা থাকলেই আপনি এই দলে যোগ দিতে পারবেন না। দলে যোগদানের জন্য আপনার থাকতে হবে বেশকয়েকটি যোগ্যতা। সেগুলো ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করে বলা হয়েছে –
*আবেদনকারীকে বেকার হতে হবে।
*আবেদনকারীকে অলস হতে হবে।
*আবেদনকারীকে সবসময় অনলাইনে সক্রিয় থাকতে হবে।
*আবেদনকারীকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে রাগ অথবা অভিযোগ প্রকাশ করতে জানতে হবে।
তবে এই আরশোলা বা তেলাপোকা দল শুধুমাত্র ব্যঙ্গ করেই থেমে থাকছে না। তারা রাজনৈতিক বার্তাও দিচ্ছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তারা তাদের মতামত প্রকাশ করছে। যেমন: পরীক্ষার দুর্নীতি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া, রাজনৈতিক দলবদল, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সংসদে নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের মতো বিষয়গুলোকে তারা তাদের ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
সিজেপি-র পাঁচ-দফা ইশতেহার রয়েছে। ভারতের দুই বর্তমান পার্লামেন্ট সদস্য এর সম্মানসূচক সদস্যপদও গ্রহণ করেছেন। তারা হলেন পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূলের দুই সাংসদ, মহুয়া মৈত্র এবং কীর্তি আজাদ। দলটির অংশ হতে চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বার্তা পোস্ট করেছিলেন তারা।
সিজেপি-র কোনও স্পনসর নেই এবং আপাতত নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কোনও পরিকল্পনা নেই।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় প্রশ্ন এই মুহূর্তে এটাই যে, ককরোচ জনতা পার্টি শুধুমাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ার একটি ক্ষণিকের ট্রেন্ড বা অল্প সময়ের জন্য জনপ্রিয়তা, নাকি এটি আসলে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আন্দোলনের কোনো পূর্বাভাস বা ইঙ্গিত দিচ্ছে?
কারণ স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কতটা অসন্তোষ, নৈরাশ্য ও হতাশা সৃষ্টি করেছে, আর সেকারণেই তরুণ বয়সীরা ‘ককরোচ’ শব্দটিকে অপমানজনক মনে না করে বরং এটি তাদের প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করছে।
আগামী দিনে নির্বাচনে এই দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে কিনা- সে বিষয়ে অভিজিৎ ডিপকে জানিয়েছেন, এখনই তা বলার সময় আসেনি। আগে সবাইকে সংঘবদ্ধ করতে হবে। তার মতে, সময়ের সঙ্গে রাজনীতিও বদলাচ্ছে। জনমত তৈরিতে সোশ্য়াল মিডিয়া নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করছে।
তাই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরির ভাবনাই মাথায় এসেছে তার। কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে হাত মেলানোর পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে ভবিষ্যতে যদি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেনও, তাহলেও দলের নাম পাল্টানো হবে না বলেও জানিয়েছেন ডিপকে।
এই ‘ককরোচ’ আন্দোলন ভবিষ্যতে বাস্তব রাজনৈতিক মঞ্চে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে সেটিই এখন দেখার বিষয়।