১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

হামাস-ইসরায়েল চুক্তি: গাজার ভবিষ্যৎ কী?

“এখন পর্যন্ত যত যুদ্ধবিরতি হয়েছে, ইসরায়েল প্রত্যেকবারই ইচ্ছাকৃতভাবে ও নির্লজ্জভাবে সেগুলো লঙ্ঘন করেছে।”

হামাস-ইসরায়েল চুক্তি: গাজার ভবিষ্যৎ কী?
ছবি: রয়টার্স।

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 10 Oct 2025, 01:01 AM

Updated : 26 Aug 2026, 02:26 PM

গাজায় যুদ্ধ বন্ধে শান্তিচুক্তির প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে হামাস ও ইসরায়েলের একমত হওয়ার কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। 

যুদ্ধ বন্ধ করতে গেল সপ্তাহে ট্রাম্প যে ২০ দফা হাজির করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় এ অগ্রগতির খবর এল।  

গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৬৭ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। 

এর মধ্যে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আল জাজিরা। 

কী ঘটেছে বুধবার?

রাত সোয়া ১১টার দিকে ট্রুথ সোশালে ট্রাম্প লেখেন, সব বন্দি ‘অচিরেই’ মুক্তি পাবেন এবং ইসরায়েল তাদের সেনাদের চুক্তি মেনে নির্ধারিত এলাকায় প্রত্যাহার করে নেবে।

এর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, শান্তিচুক্তির পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে রোববারই মধ্যপ্রাচ্য সফরে যাওয়ার জন্য তিনি প্রস্তুত রয়েছেন।  

ট্রাম্প তার ২০ দফা প্রস্তাব প্রথম সামনে আনেন ২৯ সেপ্টেম্বর। এর আগে সেদিন হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। 

শান্তিচুক্তির বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় গত বুধবার হোয়াইট হাউসের এক অনুষ্ঠানে, যেখানে ট্রাম্পের হাতে একটি নোট ধরিয়ে দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। 

নোটটি পড়ার পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, “আমাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটি নোট দিয়েছেন, যেখানে বলা হয়েছে, আমরা মধ্যপ্রাচ্যে একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি এবং আমাকে তাদের জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজন পড়বে।”

অনুষ্ঠানের ইতি টানতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের কিছু সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালাতে আমাকে এখনই যেতে হবে।”

ওই নোটের একটি ছবি বলছে, সেখানে প্রেসিডেন্টকে ট্রুথ সোশালের একটি পোস্টে সই করতে বলা হয়েছিল, যেন তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে চুক্তির বিষয়টি ঘোষণা করতে পারেন।

ট্রাম্পের কোন কোথায় রাজি হলেন তারা 

ট্রুথ সোশালের পোস্টে ট্রাম্প বলেন—

>> ইসরায়েল ও হামাস উভয় পক্ষই শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে সই  করেছে

>> শিগগিরই সব বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হবে

>> ইসরায়েল তাদের সেনাদের চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে প্রত্যাহার করে নেবে

>> এই চুক্তি হবে শক্তিশালী ও টেকসই শান্তি অর্জনের প্রথম পদক্ষেপ

>> সব পক্ষের সঙ্গে আচরণ হবে ন্যায্য 

কাতার, মিশর ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীদেরও ধন্যবাদ জানান ট্রাম্প। 

ডনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: বিবিসি

ডনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

অনিশ্চয়তা কোথায় 

এই চুক্তি যুদ্ধে ইতি ঘটার একটা আশা তৈরি করেছে ঠিকই, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় এখনও ঝাপসা থেকে গেছে।  

আল জাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা বলছেন, “হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে ‘বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো মতবিরোধ’ রয়ে গেছে। কিছু বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও সামনে আসেনি। 

এর মধ্যে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের সময়সীমা ও পরিমাণ; হামাসের ভবিষ্যৎ এবং গাজায় যুদ্ধপরবর্তী প্রশাসন গঠন করার মতো বিষয় রয়েছে। 

বিশারা বলছেন, “আপনি বলতে পারেন যে বিষয়টি এখন প্রাথমিক ধাপের প্রাথমিক পর্যায়ে আছে।”

তার কাছে মনে হচ্ছে, দুই পক্ষই বন্দি-বিনিময়ের জন্য কোনো একটা জায়গায় একমত হয়েছে। 

“ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, হামাস যখন বন্দিদের হস্তান্তর করবে, তখনই যুদ্ধের ইতি ঘটা উচিত। কিন্তু ইসরায়েল বলছে, যুদ্ধ তখনই শেষ হবে, যখন হামাস অস্ত্র ত্যাগ করবে।”

বন্দিরা কি শিগগিরই মুক্তি পাবেন

বুধবার ফক্স নিউজে ট্রাম্প বলেন, যারা মারা গেছেন, তাদের লাশসহ সোমবার বন্দিদের মুক্তি মিলতে পারে। 

হামাসের একটি সূত্র বলছে, ইসরায়েল সরকার চুক্তি অনুমোদনের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হবে। 

ইসরায়েলের কর্মকর্তারা আভাস দিয়েছেন, বন্দি বিনিময়ের প্রক্রিয়া শনিবার থেকে শুরু হতে পারে। 

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার দিন হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সংগঠন প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করে। ধারণা করা হয়, গাজায় এখনও ২০ ইসরায়েলি জিম্মি জীবিত আছেন। 

ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া কী 

প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এটিকে ‘ইসরায়েলের জন্য একটা ঐতিহাসিক দিন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। 

বুধবার রাতে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আমাদের বন্দিদের মুক্তির মিশনে সহায়তার জন্য আমি হৃদয় থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার টিমের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

“সৃষ্টিকর্তার সহায়তায় আমরা সবাই মিলে লক্ষ্য অর্জনের যাত্রা অব্যাহত রাখব এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তি বৃদ্ধি করব।”

হামাস কী বলছে?

হামাস এক বিবৃতিতে বলেছে, চুক্তিতে গাজা যুদ্ধের অবসান, দখলদারদের প্রত্যাহার, ত্রাণ সরবরাহের অনুমতি ও বন্দি বিনিময়ের কথা বলা হয়েছে। 

মধ্যস্তকারী হিসেবে ভূমিকা রাখায় তারা কাতার, মিশর, তুরস্ক ও ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। সঙ্গে আহ্বান জানিয়েছে, যেন চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন হয় এবং ইসরায়েল যেন তা মেনে চলে।     

“আমাদের গাজা উপত্যাকা, জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরের জনগণকে স্যালুট জানাই, যারা নজিরবিহীন বীরত্ব ও সম্মান দেখিয়েছেন।” 

হামাস বিবৃতিতে এটাও বলেছে, “আমরা আমাদের জনগণের মুক্তি ও স্বাধীনতার মতো অধিকারগুলো কখনোই পরিত্যাগ করব না।”

গাজার বাসিন্দারা কী বলছেন

আল জাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজম বলছেন, চুক্তি নিয়ে ফিলিস্তিন, বিশেষ করে গাজার বাসিন্দাদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ও উদ্বেগ—দুটোই আছে। 

মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকা থেকে ওই সাংবাদিক জানান, চুক্তির বিষয়টি শোনার পর সেখানকার অনেক পরিবারই উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন। 

“সেখানকার মানুষজন প্রিয়জনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। কিন্তু যুদ্ধবিরতি চুক্তি এখনও সেখানে বলবৎ হয়নি। রেড জোনে থাকা অনেক এলাকায় ফেরার ব্যাপারে এখনো সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে ভয় কাজ করছে।”

এরপর কী?

নেতানিয়াহু বলেছেন, অনুমোদনের জন্য বৃহস্পতিবার তিনি চুক্তিটি মন্ত্রিসভায় তুলবেন। 

সেটি অনুমোদন পেলে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ফিরে আসবে। ধারণা করা হচ্ছে, এর ৭২ ঘণ্টা পর বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে হামাস।

প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউটের’ জ্যেষ্ঠ ফেলো এইচএ হেলায়ার বলেন, শান্তিচুক্তি বজায় রাখতে উভয় পক্ষের ওপর, বিশেষ করে ইসরায়েলের ওপর কতটা চাপ অব্যাহত রাখতে পারবে, সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।  

আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই মিশর সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। তাকে ইসরায়েলের পার্লামেন্টে বক্তব্য দিতে আমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছেন নেতানিয়াহু। ট্রাম্প এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন বলে আভাস দিয়েছেন।   

ট্রাম্পের পরিকল্পনার পরের ধাপে রয়েছে যুদ্ধপরবর্তী গাজা পরিচালনার জন্য ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন করা। বোর্ডের সভাপতি হবেন ট্রাম্প নিজেই, যেখানে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের মতো বিশ্বনেতাদের থাকার কথা রয়েছে। 

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামীতে যেসব সমস্যা সামনে আসবে, সেগুলো আরও কঠিন হতে পারে।   

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ডনের ‘ইসরায়েল-ফিলিস্তিন’ বিভাগের পরিচালক মাইকেল শিফার ওমার-ম্যান বলেন, “যুদ্ধের ইতি টানার বিনিময়ে জিম্মিদের মুক্তির প্রস্তাব হামাস শুরু থেকেই দিয়ে আসছে। 

“এখন পর্যন্ত যত যুদ্ধবিরতি হয়েছে, ইসরায়েল প্রত্যেকবারই ইচ্ছাকৃতভাবে, প্রকাশ্যে ও নির্লজ্জভাবে সেগুলো লঙ্ঘন করেছে।”