Published : 02 Oct 2025, 10:23 AM
বিশ্বখ্যাত প্রাণীবিদ, প্রাইমেট বিশেষজ্ঞ, নৃতত্ত্ববিদ ও সংরক্ষণবিদ ডেম জেন গুডঅল ৯১ বছর বয়সে মারা গেছেন।
বিবিসি লিখেছে, তার পর্যবেক্ষণ মানুষ ও শিম্পাঞ্জির মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উন্মোচনে সহায়তা করেছে। তিনি বিশ্বজুড়ে প্রকৃতি সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন।
জেন গুডঅল ইনস্টিটিউট এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে ক্যালিফোর্নিয়ায় তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়।
“তার আবিষ্কার বিজ্ঞানে বিপ্লব এনেছে এবং তিনি আমাদের প্রাকৃতিক জগতের সুরক্ষা ও পুনরুদ্ধারে একজন নিরলস কর্মী ছিলেন।”
ড. গুডঅলের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে জাতিসংঘ বলেছে, “তিনি আমাদের গ্রহ ও তার সমস্ত প্রাণীর জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন এবং মানবতা ও প্রকৃতির জন্য এক অসাধারণ উত্তরাধিকার রেখে গেছেন।”

তার বন্ধু, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এক শোকবার্তায় বলেছেন, “প্রকৃতি হারাল তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কণ্ঠস্বর, রেখে গেল আমাদের হৃদয়ে গভীর শূন্যতা। আজ আমি তার অসামান্য অবদান ও অর্জনকে সালাম জানাই; তার কাজ পৃথিবীতে তার শারীরিক অনুপস্থিতির পরও প্রভাব বিস্তার করে যাবে।''
জেন গুডঅলের মৃত্যুকে ‘হৃদয়বিদারক’হিসেবে বর্ণনা করে গ্রিনপিস বলেছে, “তিনি আমাদের সময়ের একজন সত্যিকারের সংরক্ষণবাদী।”
গ্রিনপিস ইউকের সহ-নির্বাহী পরিচালক উইল ম্যাককালাম বলেন, “ড. গুডঅলের উত্তরাধিকার কেবল বিজ্ঞানে নয়, প্রকৃতি রক্ষা এবং একটি উন্নত বিশ্ব গঠনে যে আশা জাগানিয়া বৈশ্বিক আন্দোলন সৃষ্টিতে সহায়তা করেছেন, তাতেও বিরাজমান।”

প্রকৃতিবিদ ক্রিস প্যাকহ্যাম বিবিসিকে বলেন, তিনি জেন গুডঅলকে তার জীবনে দেখা হিরোদের একজন হিসেবে গণ্য করেন।
“পৃথিবীর জীবনের জন্য আমাদের সবাইকে যখন সম্মুখসারিতে দরকার, তখন এমন একজন হিরোকে হারানো এক বিরাট ট্র্যাজেডি।”
১৯৩৪ সালে লন্ডনে জন্ম নেওয়া গুডঅল শৈশবে ডক্টর ডলিটল ও টারজানের মত বই পড়ে প্রাণীর প্রতি গভীর আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
তার বয়স যখন প্রায় ২৫ বছর, তখন কেনিয়ায় এক বন্ধুর খামারে থাকাকালে প্রখ্যাত প্রাণীবিদ লুইস লিকির সঙ্গে দেখা করেন। প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা না থাকলেও গুডঅলের মধ্যে সম্ভাবনা দেখে তানজানিয়ার জঙ্গলে তার প্রথম গবেষণা সফরের ব্যবস্থা করেন লিকি।
সেই বছর গুডঅলই প্রথম কোনো প্রাণীকে যন্ত্র ব্যবহার করতে দেখেন। একটি পুরুষ শিম্পাঞ্জি লাঠি দিয়ে মাটির ঢিবি থেকে পোকা বের করছিল। প্রাণীটিকে ডেভিড গ্রেবিয়ার্ড নামে ডাকতেন গুডঅল।
তার আগ পর্যন্ত ধারণা ছিল, যন্ত্র ব্যবহারের মত যথেষ্ট বুদ্ধি কেবল মানুষেরই আছে। তার নতুন পর্যবেক্ষণ প্রচলিত বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং বিবর্তন বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখে।
তার গবেষণা শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয় এবং ১৯৬৫ সালে তিনি ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এর প্রচ্ছদে উঠে আসেন। সেখানে তিনি শিম্পাঞ্জিদের আবেগ ও সামাজিক জীবনের দিকগুলো তুলে ধরেন।
গুডঅল দেখান, এই প্রাণীরা শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন গড়ে তোলে এবং অঞ্চল দখল ঘিরে যুদ্ধেও লিপ্ত হয়।
তিনি একটি তথ্যচিত্রে অংশ নেন, যাতে বিখ্যাত অভিনেতা ও পরিচালক অরসন ওয়েলস ধারাভাষ্য দেন। সেখানে গুডঅলকে শিশু শিম্পাঞ্জিদের সঙ্গে খেলতে ও কুস্তি করতে দেখা যায়।
যে পদ্ধতিতে গুডঅল কাজ করতেন, প্রাণীদের খুব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন, তাদের নাম দিতেন এবং ‘আমার বন্ধু’ বলে ডাকতেন– সে সময়ের অনেকের কাছেই, বিশেষ করে পুরুষ বিজ্ঞানীদের কাছে এ পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য ছিল না।

গুডঅলের কোনো স্নাতক ডিগ্রি না থাকলেও নিজের গবেষণার ওপর ভর করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
অভিজ্ঞতা অর্জনের পর চিড়িয়াখানা বা গবেষণাগারে বন্দি শিম্পাঞ্জিদের মুক্তির আন্দোলনে নামেন গুডঅল। পরে জলবায়ু পরিবর্তন ও বন ধ্বংসের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সোচ্চার হন।
ড. গুডঅল ২০২৪ সালে বিবিসিকে বলেছিলেন, “আমরা ষষ্ঠ মহাবিলুপ্তির পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি... আমরা প্রকৃতি পুনরুদ্ধার এবং বিদ্যমান বন রক্ষায় যত বেশি কাজ করতে পারব, ততই ভালো।”
জীবনের শেষ ভাগে কী তাকে প্রেরণা যুগিয়েছে? এমন প্রশ্নের উত্তরে গুডঅল বলেন, “নিশ্চয় মানুষ তাদের সন্তানদের জন্য একটি ভবিষ্যৎ চায়।”
তার জেন গুডঅল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৭৭ সালে, যা শিম্পাঞ্জিদের সুরক্ষায় কাজ করে। পাশাপাশি প্রাণী ও পরিবেশের কল্যাণে কাজ করা প্রকল্পকে সহায়তা করে।
তিনি ২০০৩ সালে ডেম উপাধি পান এবং ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টিয়াল ফ্রিডম মেডাল লাভ করেন।
কাজের খাতিরেই প্রায় সবসময় তাকে ভ্রমণে থাকতে হত। ২০২২ সালে টাইমস পত্রিকাকে তিনি বলেন, “১৯৮৬ সাল থেকে আমি কোনো এক বিছানায় তিন সপ্তাহের বেশি সময় ঘুমাইনি।”
মৃত্যুর ঠিক এক সপ্তাহ আগেও নিউ ইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন গুডঅল। ৩ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ায় এক অনুষ্ঠানে তার বক্তৃতা করার কথা ছিল, সেই অনুষ্ঠানের সব টিকেটই ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে।