Published : 16 Jul 2025, 11:50 PM
জেফ্রি এপস্টিন ফাইল নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনকে নিয়ে বিচার বিভাগের তদন্তে এটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি যেসব তথ্য ‘বিশ্বাসযোগ্য’ বলে মনে করেন তা তার প্রকাশ করা উচিত।
এপস্টিনের গোপন ফাইল সামাল দিতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্পের নিজ সমর্থকদের ভেতরে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। এমন পরিস্থিতিতেই মঙ্গলবার হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ওই কথা বলেন ট্রাম্প।
পাম বন্ডি এর আগে এপস্টিন ফাইল প্রকাশের আহ্বান জানালেও সম্প্রতি তার দপ্তর এপস্টিনের কোনও ‘ক্লায়েন্ট লিস্ট’ থাকার প্রমাণ নেই দাবি করে রাজনৈতিক পরিমন্ডলে সমালোচনার শিকার হয়েছে।
গতবছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচার চালানোর সময় ট্রাম্প এপস্টিন ফাইল প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ বছর আবার বিষয়টি সামনে আসে ধনকুবের ইলন মাস্কের সঙ্গে ট্রাম্পের বিবাদের মধ্যে।
জেফ্রি এপস্টিন ফাইল ফাঁস করার হুমকি দেন মাস্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে জেফ্রি এপস্টিনের ফাইল প্রকাশ না করায় ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রভাবশালীদের রক্ষায় এপস্টিন-সম্পর্কিত কেলেঙ্কারির তথ্য গোপন রাখার অভিযোগ আছে, যা তার রাজনৈতিক ভিত্তির মধ্যেই বিভাজন সৃষ্টি করেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, “অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি বিষয়টি খুব ভালোভাবে সামলাচ্ছেন। এটি সম্পূর্ণ তার ওপর নির্ভর করছে। তিনি যা বিশ্বাসযোগ্য মনে করবেন, তা তিনি প্রকাশ করবেন।”
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, বন্ডি তাকে জানাননি যে কোনও নথিতে তার নিজের নাম আছে কি না।
এর আগে এপস্টিন ইস্যুতে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমি বুঝি না, কেন এই ব্যাপারে এত আগ্রহ। এটা খুবই জঘন্য এবং বিরক্তিকর।”
তবে ট্রাম্পের এই মন্তব্য অনেকের কাছেই হতাশাজনক লেগেছে, বিশেষ করে তার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন (মেগা)’ আন্দোলনের অনেক সমর্থক এখনও বিশ্বাস করেন, এপস্টিন-সম্পর্কিত তথ্য গোপন করে রাখা হয়েছে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিকে রক্ষা করার জন্য।
গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এবং বিচার বিভাগ এই মাসের শুরুতে প্রকাশিত এক স্মারকে জানিয়েছে, তারা এপস্টিনের কোনও ‘ক্লায়েন্ট তালিকা’ বা তার ব্ল্যাকমেইল করার বিষয়ে প্রমাণ খুঁজে পায়নি। তারা আরও জানায়, এপস্টিন আত্মহত্যা করেছেন। তার মৃত্যু এবং সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে আর কোনও তথ্য প্রকাশ করা সমীচীন নয়।
এই স্মারক প্রকাশের পরই ক্ষোভ আরও বাড়ে। সমালোচকদের অনেকে বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত তারা একে ধামাচাপা দিয়ে দিচ্ছে।
এমনকি ট্রাম্পের পরিবারের ভেতর থেকেও আপত্তির সুর শোনা গেছে। পুত্রবধূ ও রাজনৈতিক সহযোগী লারা ট্রাম্পও স্বচ্ছতার দাবি জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার মাইক জনসন বলেন, “সবকিছু প্রকাশ করা হোক, জনগণ নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেবে।” তিনি এটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিকে এ নিয়ে ‘ব্যাখ্যা দিতে’ আহ্বান জানান।
ফেব্রুয়ারিতে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বন্ডি বলেছিলেন, “এপস্টিনের ক্লায়েন্ট তালিকা এখনই আমার ডেস্কে আছে পর্যালোচনার জন্য।” পরে তার মুখপাত্র জানিয়েছিলন, তিনি আসলে মামলার অন্যান্য ফাইলের কথা বলেছিলেন।
প্রভাবশালী রক্ষণশীল রাজনীতিকদের একজন, কংগ্রেসওম্যান মারজরি টেলর গ্রিন বলেন, “আমি স্বচ্ছতার পক্ষে। জনগণের আস্থা অর্জনে আমাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা উচিত।”
অপর রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান লরেন বোয়েবার্ট বলেন, যদি এপস্টিন সম্পর্কিত আরও তথ্য প্রকাশ না করা হয়, তবে এ বিষয়ে আলাদা একটি বিশেষ কৌঁসুলির তদন্ত হওয়া উচিত।
এপস্টিন ফাইলস যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্কিত কেলেঙ্কারির এক গোপন নথি। ট্রাম্পের রিপাবলিকান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এসব নথি প্রকাশের দাবি উঠেছিল। পরে সেই ফাইলের একটি অংশ প্রকাশ্যে এনেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল পামেলা বন্ডি।
যৌনদাসী কেনাবেচা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যৌনদাসী সরবরাহের অভিযোগ আছে এপস্টিনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ আছে- এপস্টিনের পিডো দ্বীপের বিলাসবহুল প্রাসাদে চলত অবৈধ সম্পর্ক। নাবালিকা, এমনকি শিশুদের দিয়েই চালানো হতো যৌন সম্পর্কের কাজ।
এপস্টিনের ব্যক্তিগত বিমানে করে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে অতিথিরা সেখানে যেতেন। এপস্টিনর যৌন কেলেঙ্কারিতে ট্রাম্পসহ সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন, স্টিফেন হকিং থেকে মাইকেল জ্যাকসন পর্যন্ত বিশ্বের প্রভাবশালী সব ব্যক্তির নাম আছে বলেও শোনা গিয়েছিল।
লুইজিয়ানার সিনেটর জন কেনেডি বলেন, “আমেরিকান জনগণ জানতে চায়, এপস্টিন কার জন্য মেয়েদের পাচার করত এবং কেন তাদের বিচার হয়নি।”
তবে অনেক প্রভাবশালী রিপাবলিকান নেতা—যেমন সিনেটর জন থুন ও কংগ্রেসম্যান জিম জর্ডান—এ বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত বলে মেনে নিচ্ছেন।
একটি ভিন্ন সংবাদ সম্মেলনে যখন সাংবাদিকরা এপস্টিন ইস্যুতে পাম বন্ডিকে প্রশ্ন করেন, তিনি বলেন, “এপস্টিন নিয়ে কিছু বলব না।”
তিনি জানান, বিচার বিভাগ ও এফবিআই যে স্মারক প্রকাশ করেছে, সেটাই সরকারের অবস্থানকে তুলে ধরছে। সেই তদন্তে ৩০০ গিগাবাইটের বেশি তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে বলেও স্মারকে বলা হয়েছে।
মঙ্গলবার কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট সদস্যরা এপস্টিন ফাইল প্রকাশে ভোটের উদ্যোগ নেন। কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। রিপাবলিকানরা পাল্টা বলেন, ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনও ফাইলগুলো প্রকাশ করেনি।