Published : 01 May 2026, 11:59 AM
মিয়ানমারের বন্দি নেত্রী অং সান সু চিকে গৃহবন্দি অবস্থায় স্থানান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
৮০ বছর বয়সী এ নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী রাজনীতিক ২০২১ সালে মিয়ানমারে হওয়া সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। ওই অভ্যুত্থানেই তার সমর্থনপুষ্ঠ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল।
এতদিন সু চি রাজধানী নেপিডো’র একটি সামরিক কারাগারে বন্দি ছিলেন বলে ধারণা বিবিসির।
জান্তা প্রধান থেকে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট বনে যাওয়া মিন অং হ্লাইং বলেছেন, ‘সু চি যেন তার বাকি সাজা সুনির্দিষ্ট বাসভবনে ভোগ করতে পারেন’, সে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দেশটির সেনা শাসকদের আনা গণতান্ত্রিক সংস্কারের পর ২০১৫ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন সু চি। এর আগে দশকের পর দশকের সেনা শাসনকালে তিনি ছিলেন দেশটির গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় মুখ। সেসময় তিনি ১৫ বছরের বেশি গৃহবন্দি ছিলেন।
বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সু চির যে ছবি প্রচারিত হয়, তাতে তাকে উর্দি পরা দুই সেনার সঙ্গে বসা অবস্থায় দেখা গেছে।
তবে সু চির ছেলে মিয়ানমার সরকারের নতুন ঘোষণায় সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সু চি যে জীবিত আছেন, এমন কোনো প্রমাণ এখনও তার কাছে নেই, মন্তব্য কিম আরিসের।
রাষ্ট্রীয় টিভিতে যে ছবি এসেছে সেটি ‘২০২২ সালে তোলা’ দাবি করে এ ছবির প্রচারকে ‘অর্থহীন’ বলেও অভিহিত করেছেন তিনি।
“আমি আশা করছি এটা সত্য। আমি এখনও সত্যিকারের কোনো প্রমাণ দেখিনি, যেখানে দেখা যাচ্ছে তাকে (গৃহবন্দি হিসেবে) স্থানান্তর করা হয়েছে।
“তাই, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হচ্ছে, কিংবা কেউ স্বাধীনভাবে তার পরিস্থিতি বা তিনি কোথায় আছেন তা যাচাই করতে পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি কোনো কিছুই বিশ্বাস করছি না,” বিবিসিকে এমনটাই বলেছেন আরিস।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ঘোষণা আসার আগ পর্যন্ত সু চির স্বাস্থ্য বা জীবনধারণ পরিস্থিতি নিয়ে কিছু জানা যাচ্ছিল না। কিম আরিস ডিসেম্বরে বলেছিলেন, তিনি বছরখানেকেরও বেশি সময় ধরে মায়ের কাছ থেকে কোনো খবর পাননি।
সু চির আইনজীবী দল রয়টার্সকে বলেছে, মিয়ানমারের সাবেক নেত্রীর গৃহবন্দিত্ব নিয়ে তাদেরকে সরাসরি কিছু জানানো হয়নি।
পাঁচ বছর আগে সশস্ত্র বাহিনী তার নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার দিনই তাকে গ্রেপ্তার করেছিল। এরপর সু চিকে হাতেগোনা কয়েকবার জনসমক্ষে দেখা গেছে, তবে তার মুখ থেকে কিছু শোনা যায়নি।
তিন বছরের বেশি সময় ধরে তাকে দেখেননি তার আইনজীবীরাও; পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই দুই বছরের বেশি।
বৃহস্পতিবারের ছবির আগে সর্বশেষ তাকে ২০২১ সালের মে মাসে আদালতে তোলার ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। সেটি ছিল সু চির বিরুদ্ধে আনা অসংখ্য অভিযোগের সিরিজ বিচারের শুরুর দিকে।
দুর্নীতি, নির্বাচনে জালিয়াতি উসকে দেওয়া থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার নিয়ম লঙ্ঘনসহ নানান অভিযোগে দীর্ঘদিনের বিচার শেষে সু চি’কে ৩৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মিত্ররা সু চির বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যা দিয়ে আসছেন। তাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতেই এসব অভিযোগ ও বিচারের নাটক সাজানো হয়েছে বলেও ভাষ্য তাদের।
সু চির সাজা প্রথমে কমিয়ে ২৭ বছর করা হয়েছিল। মিয়ানমারের নববর্ষ উপলক্ষে গত ১৭ এপ্রিল ওই সাজা আরও ছয় ভাগের এক ভাগ কমানো হয়, সেবার তার মিত্র ও সহযোগী, সাবেক প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট ছাড়াও পান।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এক ঘোষণায় জানায়, সব বন্দির সাজার মেয়াদ কমানো হয়েছে। এরপরই সু চির সাজা আরও কমে ১৮ বছরের সামান্য বেশি হয়েছে বলে তার আইনজীবী দলের এক সদস্য নিশ্চিত করেন।
বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে তার আচমকা উপস্থিতিতে মনে হচ্ছে, সামরিক নেতৃত্বাধীন সরকার তাকে আংশিক বা পুরোপুরি মুক্তি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মিয়ানমারে সর্বশেষ সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা হ্লাইং এখন তার সরকারের ‘আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা’ কাটাতে তৎপর। দেশজুড়ে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে লড়াইয়ে ছোট ছোট জয় তাকে বেশ আত্মবিশ্বাসীও করে তুলেছে।
চলতি বছর শুরুর দিকে হওয়া নির্বাচনে মিয়ানমারে সেনা সমর্থিত দল ক্ষমতায় আসে। সু চির দলসহ দেশটির অনেক দলই এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। পশ্চিমারাও একে ‘নির্বাচনের নামে কলঙ্ক’ আখ্যা দিয়ে এসেছে। ওই নির্বাচনে জেতা আইনপ্রণেতারাই পরে হ্লাইং-কে প্রেসিডেন্ট বানান। যার মাধ্যমে কার্যত ২০২১ সাল থেকে চলা হ্লাইংয়ের শাসনই মিয়ানমারে বলবৎ থাকল।