Published : 28 Jul 2026, 05:58 PM
আজ যে প্রান্তরটি স্রেফ সবুজ ঘাসে ঢাকা, কিছুদিন পরেই সেখানে মাথা তুলে দাঁড়াবে জাপানের ফুজিসাওয়া শহরের প্রথম মসজিদ।
কিন্তু এই নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার আগেই পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ, শঙ্কা ও আশা ও গ্রহণযোগ্যতার এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
“আমাদের চেনা সমাজটা কীভাবে বদলে যেতে পারে, তা নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা হয়,” বলছিলেন স্থানীয় দীর্ঘদিনের বাসিন্দা নোরিকো ইজুমিসাওয়া।
মূলত, সংকুচিত ও বয়োবৃদ্ধ জনসংখ্যার কারণে চরম শ্রমসংকটে ভোগা জাপান যখন বাধ্য হয়ে বিপুল সংখ্যক অভিবাসীর ওপর
নির্ভর করছে, ঠিক তখনই সামনে চলে এসেছে সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে এই উদ্বেগ।
জাপানের রাজনীতিতে অভিবাসন নীতি এখনও অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি বিষয়। তবে বাস্তবতার খাতিরে শূন্য পদগুলো পূরণ করতে দেশটিকে দিন দিন বিদেশি কর্মীদের ওপর বেশি ভরসা করতে হচ্ছে।
আর এর ফলে জাপানে আগমন ঘটছে ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম ও জীবনযাত্রার মানুষের। সুতরাং, ফুজিসাওয়ার মতো শহরগুলোতে আজ যে তর্ক-বিতর্ক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব ডালপালা মেলছে, তা আসলে সরাসরি জাপানের নিজস্ব জাতীয় পরিচয় ও আত্মদর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতেই গিয়ে আঘাত করছে।
ইজুমিসাওয়া একা নন; তার মতো ফুজিসাওয়ার বহু বাসিন্দাই দৃশ্যমান মুসলিম সম্প্রদায়ের বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি জানান, আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে অভিবাসন নিয়ে যে তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন দেখা যাচ্ছে, তা-ও তাদের মনের এই অস্বস্তি ও শঙ্কা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে স্থানীয় ট্রেন স্টেশনের সামনে মসজিদ নির্মাণের বিরোধিতায় বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ।
তাদের অভিযোগ ছিল, প্রস্তাবিত মসজিদটি পাশের জাপানি শিন্টো মন্দিরের চেয়ে আকারে অনেকটাই বড়, যা তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি অনাদরের শামিল।
পাশাপাশি, জাপানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর সূত্রমতে, বিভিন্ন মসজিদে ক্রমাগত গালাগাল ও আপত্তিকর ফোন-ইমেইল পাঠানো হচ্ছে। এই পরিস্থিতির জবাবে বেশ কিছু বিদ্বেষবিরোধী সংগঠনও রাজপথে নেমে সম্প্রীতির পক্ষে পাল্টা সমাবেশ করেছে।
তবে ফুজিসাওয়ার প্রস্তাবিত মসজিদটির ঠিক উল্টো পাশে একটি ক্যাফে চালানো হিরোকি সুজুকা পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আলোচনার ওপর জোর দিচ্ছেন।
“আমি ব্যক্তিগতভাবে এর চরম বিরোধী নই, আবার খুব একটা অন্ধ সমর্থকও নই,” সুজুকা বলেন।
তিনি আরও বলেন, “আমার মনে হয় প্রথম পদক্ষেপ হলো ওদের সম্পর্কে জানা, ইসলাম কী, তারা কেমন মানুষ এবং তাদের জীবনবোধ ও মূল্যবোধগুলো ঠিক কী। এর শুরুটা হয় একটি মুক্ত মন এবং একে অপরকে জানার আগ্রহ থেকে।”
জাপানে মুসলিম হয়ে বেঁচে থাকা:
ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মহিউদ্দিন গত ৩৯ বছর ধরে ওসাকায় বাস করছেন। শ্রীলঙ্কা থেকে ১৯৮৭ সালে ভালো কাজের সুযোগের সন্ধানে জাপানে পাড়ি জমান তিনি, যখন দেশটিতে 'ইকোনমিক বাবল' বা কৃত্রিম অর্থনৈতিক জোয়ার চলছিল।
শুরুতে তিনি মূল্যবান পাথরের ব্যবসা করতেন এবং পরবর্তীতে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে পুরোনো গাড়ি রপ্তানির ব্যবসায় যুক্ত হন।
তিনি যখন এসেছিলেন, তখন সেখানে বিদেশি বাসিন্দাদের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। কিন্তু মহিউদ্দিনের মতে, সেই সময়ের তুলনায় এখনকার স্থানীয় মানুষজন অনেক বেশি উগ্র হয়ে উঠেছে। অনলাইনে ও বাস্তবে সরাসরি মুসলিমদের উদ্দেশ্যে তারা এখন আপত্তিকর মন্তব্য করছে।
“সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘জাপান থেকে বিদায় নাও’ বা ‘নিজের দেশে ফিরে যাও’-এর মতো অজস্র মন্তব্য চোখে পড়ে,” বলছিলেন মহিউদ্দিন। “এমনকি মানুষ এখন মসজিদে এসে সোজা গালিগালাজ করে যাচ্ছে।”
ওসাকা মসজিদের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে মহিউদ্দিন প্রতিদিন নামাজ ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য সেখানে যান। তিনি জানান, জীবন বিপন্ন হওয়ার মতো অনুভূতি তার কখনও হয়নি, তবে দীর্ঘদিনের প্রতিবেশীদের আচরণের এই পরিবর্তন তাকে ভাবিয়ে তুলছে।
“এখন স্পষ্ট বুঝতে পারি, সাধারণ মানুষ আমাদের ভয় পেতে শুরু করেছে।”
গত কয়েক বছরে এই মৌখিক নির্যাতন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মহিউদ্দিন জানান, তাদের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রকাশ্যে 'জঙ্গি' বা 'বোমা প্রস্তুতকারক' বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
“এমন মুহূর্তে আমাদের একমাত্র পথ হলো ধৈর্য ধরা। ওরা উসকানি দিয়ে ঝামেলা তৈরি করতে চায়, দেখতে চায় আমরা কতক্ষণ সহ্য করতে পারি,” ব্যাখ্যা করেন মহিউদ্দিন। “তাই আমরা শান্ত থাকি, নরম সুরে কথা বলি এবং তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করি। কারণ সাধারণ জাপানিদের ইসলাম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই বললেই চলে।”
তবে এই সামাজিক দূরত্বের জন্য নিজেদের কিছু ভুলকেও দায়ী করেন তিনি।
“আমরা এতদিন কেবল নিজেদের কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, মানুষ যেন আমাদের চিনতে ও বুঝতে পারে, সেই চেষ্টা যথেষ্ট করিনি। এই সমাজের একটি অংশ হয়ে ওঠার জন্য আমরা পর্যাপ্ত উদ্যোগ নিইনি,” তিনি নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন। “তাই এখন থেকে বোঝাপড়া ও সংলাপ বাড়ানোর জন্য আমাদের আরও বেশি কাজ করা জরুরি।”
সাইতামা প্রদেশের ইয়াশিও মসজিদের প্রতিনিধি হিসেবে গত এক দশক ধরে দায়িত্ব পালন করছেন ৬১ বছর বয়সী শাকিল মোহাম্মদ। ২৬ বছর ধরে জাপানে নির্মাণ কাজের তদারককারী হিসেবে কাজ করা পাকিস্তান বংশোদ্ভূত শাকিল অনর্গল জাপানি ভাষায় কথা বলতে পারেন।
শাকিলের মতে, জাপানে টিকে থাকার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হলো দেশটির নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চলা, যার মধ্যে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা সঠিকভাবে পৃথক করা, পার্কিং আইন মানা এবং সাইকেল চালানোর সময় হেলমেট পরা।
“আমরা জাপানের রীতি ও নিয়মকে সম্মান জানানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করি,” তিনি বলেন। “সৌজন্যবোধও অত্যন্ত জরুরি, এমনকি কাউকে সাধারণ একটি অভিবাদন জানানোও অনেক বড় বিষয়।”
তিনি জানান, ইয়াশিওর স্থানীয় জাপানিরা রসিকতা করে এই এলাকাটিকে ‘ইয়াশিও-স্তান’ বলে ডাকেন।
“অবশ্যই কিছু পাকিস্তানি আছেন যারা নিয়ম ভাঙেন বা খারাপ আচরণ করেন, তবে তারা খুবই অল্পসংখ্যক। আর সত্যি বলতে, একই কথা তো অনেক জাপানির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।”
অভিবাসন বনাম জাতীয় পরিচয়:
একদিকে বিশাল জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, অন্যদিকে নিজেদের ঐতিহ্য ও পরিচয় টিকিয়ে রাখার লড়াই, এই দুইয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ সংকটে জাপান।
ওয়াসেদা ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক হিরোফুমি তানাদার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষের দিকে জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা (বিদেশি ও স্থানীয় রূপান্তরিত জাপানি মিলিয়ে) বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজারে, যা ২০১৯ সালেও ছিল মাত্র ২ লাখ ৩০ হাজার।
মুসলিমদের এই সংখ্যাবৃদ্ধি মূলত জাপানের সামগ্রিক অভিবাসন বাড়ারই একটি প্রতিফলন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জাপানে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, যাদের সিংহভাগই চীন, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইনের বাসিন্দা।
এদের মধ্যে রেকর্ড ২৫ লাখ ৭০ হাজার বিদেশি সরাসরি জাপানের বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানে যুক্ত। অথচ ঠিক একই বছরে জাপানের নিজস্ব জনসংখ্যা কমে গেছে প্রায় ১০ লাখ!
দীর্ঘদিন ধরেই জাপানি সরকারি কর্মকর্তারা দেশকে 'অভিবাসনের দেশ' বলতে নারাজ। স্থায়ী আবাসের বদলে তারা স্বল্পমেয়াদী ভিসাকেই গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। সমালোচকরা বিষয়টিকে জাপানের ‘ছদ্ম অভিবাসন ব্যবস্থা’ বলে অভিহিত করেন।
তবে তার পরও, প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ব্যাপক হারে অভিবাসনের বিপক্ষে অত্যন্ত রক্ষণশীল অবস্থান বজায় রেখেছেন। প্রায় ৫০ বছর পর, ২০২৬ সালের জুনে জাপানি সরকার বিদেশি নাগরিকদের ভিসার ফি একলাফে পাঁচগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বর্তমানে বিদেশি কর্মীদের অবৈধ অবস্থান ঠেকাতে অভিবাসন পরিষেবা সংস্থার জনবল আরও ২৩০ জন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। পাশাপাশি দেশে বিদেশি বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার নীতিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রতিনিয়ত বিদেশি সম্প্রদায়গুলো সমাজের চোখে দৃশ্যমান হয়ে ওঠায়, জাপান এখন এমন একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি, যা এতদিন তারা এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল: নিজের ঐতিহ্য, সামাজিক ঐক্য ও স্বকীয়তা বজায় রেখে জাপান কি সত্যিই একটি বৈচিত্র্যময় বহুসংস্কৃতির দেশে পরিণত হতে পারবে?
এদিকে ফুজিসাওয়া শহরে ফিরে গিয়ে জানা গেল, স্থানীয় বাসিন্দা নোরিকো ইজুমিসাওয়া আজ পর্যন্ত কখনো কোনো মুসলিম প্রতিবেশীর কাছে কোনো বাজে অভিজ্ঞতার শিকার হননি।
সবশেষে কাঁধ ঝাঁকিয়ে তিনি নিঃসংকোচে স্বীকার করেন, “সত্যি বলতে কী, হয়ত আমি স্রেফ ওই অজানা বিষয়টাকেই ভয় পাই।”